#প্রেমচিত্র-[২]
লেখনীতে:#ইশা_আহমেদ
তুশি সবে ব্যাগটা রেখেছিলো সোফাতে। এর মাঝেই কিছুক্ষণ আগের ভালো লাগা সব উবে গিয়ে রাগ উঠে গেলো। তুশি তুক্ষর মেজাজে বলল,“ছোট চাচি ওপর মাঝে মাঝে প্রচন্ড রাগ হয়। দু’জনে ঝগড়া করে কেনো বিচার দেওয়া লাগবে?”
চাঁদনী তুশিকে থামতে বললো, ছোট চাচ্চু চাচিকে ভীষণ ভালোবাসে, সে জানলে ব্যাপারটা ভালো হবে না। তুশিকে টেনে নিজের রুমে আনলো। তুশি তখনো রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। চাঁদনী তুশিকে বিছানায় বসিয়ে বলল,
-“তোকে নিষেধ করেছি না? চাচিকে চাচ্চু কত ভালোবাসে জানিস না? চাচ্চু এসব কথা শুনতে পেলে বাড়ি ছাড়বে, জানিসই তো”
তুশি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো। বলল,“আপা কি করবো? রাগটা যে মাথা চড়া দিয়ে উঠেছিলো। ছোট চাচি বেশি বেশি করে সব সময়”
-“তুশি আমারদের সহ্য করতেই হবে। না হয় দাদি মাকে একশটা কথা শোনাবে”
শেষের কথাটুকু বলতে চাঁদনীর গলা কাঁপলো। মেয়েটা কেমন নিষ্প্রাণ কন্ঠে জবাব দিলো। তুশির বাবা শামসুল মির্জা সংসার নিয়ে উদাসীন! মাকে দাদি হাজারটা কথা শোনালেও তাদের বাবা কোনো দিন টু শব্দ করেনি। তুশি অর্ধভেজা অবস্থাতেই শুয়ে পরলো চাঁদনী আপার বিছানায়। চাঁদনী কিছু বলল না। তুশির হুট করেই ছাতাটার কথা মনে পরলো। তড়িৎ গতিতে উঠে বসলো। ব্যস্ত পায়ে উঠে আসলো বসার ঘরে ব্যাগ আর ছাতা নিয়ে ছুটলো নিজের রুমে। দরজা বন্ধ করে ভেজা ছাতাটাই বুকে জড়িয়ে নিলো তুশি। তুশি বেশ যত্ন করে উঠিয়ে রাখলো ছাতাটা। ছাতা ফেরতের বাহানায় তুশি আরেকবার পার্থর কাছাকাছি যেতে পারবে। এটুকু ভেবেই তার খুব আনন্দ হচ্ছে।
–
দু’দিন পরের ঘটনা। আকাশ তখন মেঘলা। কালো মেঘে ঢাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ। যখন তখন ঝুম বৃষ্টি নামবে। কলেজে ক্লাস শেষে তুশি বের হলো বান্ধবী রিক্তার সাথে। আধভেজা ফুতপাত দিয়ে হেঁটে আসছে মেয়েে দুটো। তুশির ব্যাগে দুটো ছাতা। একটা পার্থর আর একটা তার নিজের। রিক্তার বাড়ি কলেজ থেকে দু গলি সামনে। এরপরের পথটুকু তুশির একাই হেঁটে আসতে হয়। মেঘলা দিন তুশির এমনিতেই ভীষণ পছন্দের। আজ সাথে মৃদু হাওয়া ও বইছে। তুশি কিছুদূর যেতেই পার্থ নামক বখাটে ছেলেটাকে দেখলো। তুশির চলন্ত পা থেমেছে। ঘাড় কাত করে নিচু চোখে আশপাশ দেখলো কেউ আছে কি না! ঝড়ো হাওয়া ছেড়েছে তার জন্য বোধ হয় কেউ নেই। তুশি মিশ্র অনুভূতি নিয়ে কম্পিত পায়ে এগিয়ে গেলো পার্থের কাছে। পার্থ তখন সিগারেট টানতে ব্যস্ত। বরাবরের ন্যায় চোখে রোদচশমা, হাতে ব্যান্ডেড ওয়াচ্!
তুশি সিগারেটের বাজে গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। নাকে আসতেই কেশে উঠলো মেয়েটা। পার্থ ফিরে তাকালো। তুশি তখনও কাশছে। পার্থ তবুও সিগারেট ফেললো না। এমন ভাব করলো তুশিকে সে দেখেইনি। কাশতে কাশতে তুশির চোখ মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে, তুশি বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। পার্থ তখন সিগারেট খেতে ব্যাস্ত। তুশি অস্বস্তিবোধ করলো। ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কম্পিত কণ্ঠে শুধাল,
-“আপনার ছাতা!”
পার্থ এক পলক তাকালো মাত্র। যেনো তাকালে খুব পাপ হবে! তুশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। তুশির সাহস নেই চোখে চোখ রেখে কথা বলার। পার্থ সিগারেটে আরেকটান দিয়ে বলল,
-“রেখে দাও”
-“কিন্তু এটা তো আপনার জিনিস, আমি কেনো রাখব?”
পার্থ তৎক্ষনাৎ তাকালো। তুশি হকচকালো। মাথা নুইয়ে দাঁড়ালো। পার্থ বলল,
-“এই মেয়ে যাও এখান থেকে। লোকে আমার সাথে দেখলে খারাপ বলবে”
তুশি বাধ্য মেয়ের মতো হাঁটা ধরলো। পিছু ফিরে তাকালো না। সে সাহস নেই তুশির। তুশি ছাতা দিতে না পেরে অখুশি নয় বরং খুব বেশি খুশি ছাতাটা রাখতে পেরে। ছাতাটা সে খুব যত্নে রাখবে, যতটা যত্ন মানুষকে করে। তুশির বাড়ি ফিরতে ফিরতেই ঝুম বৃষ্টি নামে মাঝ রাস্তায়। তুশি ভিজে জুবুথুবু! বাড়ি এসে চাঁদনী আপা, মিমি সবাই মিলে ওই বৃষ্টির মাঝে ভিজেছে।
–
ঠিক পাঁচ দিন ধরে তুশি জ্বরে বিছানায় পরে আছে। আজ একটু শরীরটা ভালো। জ্বর সামান্য আছে, তবে কাশিটা কমেনি। তুশি দুর্বল পায়ে চাঁদনী আপার রুমে আসলো। আপা তখন ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। তুশি জানে ফোনের অপাশে কে! চাঁদনী আপা এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। তুশির বড় চাচির মেয়ে শান্তা আপার বিয়ে হয়েছে ছয় মাস আগে। সে বর সহ চট্টগ্রামে থাকে। তুশির আবার শান্তা আপার থেকে চাঁদনী আপার সাথে বেশি ভাব। তুশি ধপাস করে শুয়ে পরেছে চাঁদনী আপার বিছানার মাঝ বরাবর। তুশি খেয়াল করলো চাঁদনী আপা ভুলে ও তাকালো না, সে তো প্রেমিকের সাথে কথায় মগ্ন। তুশি জানে চাঁদনী আপার প্রেমিক কে? কোথায় থাকে! চাঁদনী আপার প্রেমিক অয়ন ভাই। চাঁদনীর আপার সাথে এডমিশন কোচিং করেছিলেন! সেখান থেকেই প্রেমের সূত্রপাত। অয়ন ভাই থাকেন এগলির শেষ বাড়িটায়। অয়ন ভাই মানুষটা বেশ দারুন মানুষ। তুশিকে দেখলেই মিষ্টি হেসে সালাম দিয়ে কথা বলে। তুশির বেশ লাগে। তুশি খুব করে চায় অয়ন ভাই যেনো তুশির দুলাভাই হয়।
অয়ন ভাই এখন আর্মিতে আছেন। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট,সরকারি চাকরি। তুশির মনে হয় চাঁদনী আপা পেয়েই যাবে অয়ন ভাইকে। অয়ন ভাই বাড়িতে আসেন অনেক মাস পরপর একদিন। চাঁদনী আপা সেদিন লালটুক টুকে শাড়ি পরে বসে থাকেন। কোনো দিন আবার ভার্সিটির বাহানায় বের হয়ে পরে প্রেমিকের সাথে ঘোরার উদ্দেশ্যে। চাঁদনী কল কাটলো আরো আধা ঘন্টা পর।
তুশিকে উদ্দেশ্য করে বলল,“কি রে কখন আসলি?”
তুশি শোয়া ছেড়ে উঠে বসল।বলল,
-“এসেছি তো অনেকক্ষণ। তুমিই তো পাত্তা দিলে না। অয়ন ভাই কেমন আছে আপা?”
-“ ভালো আছে”
তুশি বলল,“আসবে কবে অয়ন ভাই?”
-“সামনের মাসে আসতে পারে। তুশি অয়ন বলছিলো এবার এসেই বিয়ের প্রস্তাব দিবে”
তুশি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। একপ্রকার লাফিয়ে চাঁদনী আপার পাশ ঘেঁষে বসলো। বলল,“সত্যি বলছো আপা? আমার যে কি ভালো লাগছে শুনে।”
-“বেশি উত্তেজিত হোস না। আব্বু রাজি হবে কি না কে জানে? আমার ভয় হচ্ছে?”
তুশির মেজাজ কিছুটা খারাপ হলেও নিজেকে শান্ত রেখে বলল,“উফফ্ আপা চিন্তা করো না কিছু হবে না। আপা চলো না আম মেখে খাই। মিমি, মাইশা, টিনটিন ইফরান, জাওয়াদ ভাইকেও ডাকি?”
চাঁদনী মানলো, বলল সবাইকে ছাদে ডেকে আনতে। তুশিদের ছাদটা বিশাল বড়ো। তুশিদের ছাদে প্রতিদিন বিকাল হলেই মহিলাদের আড্ডা বসে। তুশির মা, চাচি সহ ভাড়াটিয়ারাও এসে যোগ দেয়। এক সাইডে বসে বড়দের মেলা আরেকট পাশে ছোটরা। যদিও তুশির থাকা হয় না, অসুস্থতার জন্য আজ থাকতে পেরেছে। তুশি মিমি মাইশাকে দিয়ে জাওয়াদ ভাইকেও ডাকিয়েছে। জাওয়াদ তুশির বড় চাচার ছেলে। চাঁদনী আপার থেকে ছোট হলেও তুশির থেকে বছর দেড়েকের বড়। জাওয়াদ ভাইকে ডাকা মূলত আম পরার জন্য। তুশিরা সবাই ছাদে একজোট হলো। চাঁদনী এক প্রকার জোড় করেই জাওয়াদকে গাছে উঠিয়েছে।
জাওয়াদ আম পেরে দিয়ে বলল,
-“চাঁদনী আপা কাজটা একদম ঠিক করলে না। আগে জানলে আমি আসতামই না”
চাঁদনী আম ছিলতে ছিলতে জাওয়াদকে ধমক দিয়ে বলল,
-“চুপ বেয়াদব। বড় বোন বলেছে যখন করবি। এতো কথা কীসের? চুপ করে এখানে বোস। আমি আম মেখে দিচ্ছি খেয়ে উদ্ধার কর”
তুশি হাসলো জাওয়াদ ভাইয়ের কান্ড দেখে। এই জাওয়াদ ভাইকেও নাকি তার প্রেমিকা নাকানিচুবানি খাওয়ায়, ভাবা যায়? জাওয়াদ ভাইয়ের প্রেমিকা তুশির সাথেই একই কলেজে, একই ক্লাসে পড়ছে। শুনেছে জাওয়াদ ভাই নাকি একদিন পাও ধরেছে সেই প্রেমিকার। এ খবর শুনে তুশি কতই না টিটকারি মেরেছে জাওয়াদ ভাইকে। সেই ভেবে হেসে উঠলো তুশি। জাওয়াদ ভাইয়ের ভ্রু কুঁচকে গেলো, বলল,
-“কি রে তুশি পাগলের মতো একা একা হাসিস কেনো? জ্বীন ভুতে ধরলো নাকি?”
তুশি বিরক্ত হলো। নাক মুখ কুঁচকে বলল,“জাওয়াদ ভাই তুমি এতো বেশি প্যাক প্যাক করো কেনো হাঁসের মতো? আমি হাসি নি তোমার আসলে চোখে সমস্যা, ডাক্তার দেখাও।”
চাঁদনী আপা মাখ মেখে সবাইকে দিলেন। চাঁদনী আপার আম মাখা যে একবার খাবে সে জীবনেও ভুলবে না, জিভে লেগে থাকার মতো। সেদিনের মতো তুশিরা দারুন সময় কাটালো।
#চলবে
