#গোপনে
#পর্ব_৩
দরজাটা খুলল তৃষা| সেলস গার্ল মেয়েটা গরম থেকে বাঁচতে মুখে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে রেখেছে| সস্তা সানগ্লাসের আড়াল থেকে চোখ দুটো দেখে বোঝা যাচ্ছে কতটা নিরুপায় হলে মানুষ এই কাঠফাটা গরমে চারতলা অবধি উঠে আসে সামান্য কয়েক প্যাকেট সাবান বেচার জন্য|
নরম গলায় তৃষা বলল, এই মুহূর্তে আমার কোনরকম সাবান লাগবে না| না, না প্যাকেট বের করার কোন দরকার নেই|
আমার কাছে ঘর মোছার ফিনাইল, বাসন মাজার বার আর লিকুইড রয়েছে| ব্রাশও| একটু দেখতে পারেন মিস…
তৃষা… যন্ত্রচালিতের মতো পাদ পূরণ করে সে| সত্যিই এই মুহূর্তে আমার কিছু লাগবে না| আপনি যেতে পারেন|
একটু যদি জল খাওয়াতেন| আসলে অর্ক স্যার…
নামটা শুনে একটু যেন সচেতন হয় তৃষা| সেদিনের পর অর্কর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে একবার, ঝগড়া, অশান্তি করে ব্লক করে দিয়েছে সমস্ত জায়গা থেকে| কিন্তু তার জন্য অর্ক একটা মেয়েকে তার বাড়িতে, হয়ত অর্ক ভীষণ অনুতপ্ত| এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, সে তৃষাকে বড্ড ভালোবাসে| তবু নিজেকে সামলে বলল, আপলে অচেনা কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া… দিনকাল ভাল নয় বুঝতেই পারছেন|
আমি কিন্তু অর্ক’র কাছ থেকে আসছি| আপনাকে তো বললামই|সে আপনাকে এই ছবিটা পাঠিয়েছে| ছবির পেছনে কয়েকটা লাইন লেখা| সে ভীষণ অনুতপ্ত, আপনার সঙ্গে অ ন্যায় করেছে বলে| আসলে উপায় ছিল না…. আপনি তো সবটাই জানেন| বাকি কথাও কি বাইরে দাঁড়িয়ে বলব?
ছবিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তৃষা, উল্টোপিঠের লেখাগুলো চোখে পড়ে তার, অর্কর হাতেই লেখা| দরজা ছেড়ে দাঁড়ায় সে, আসুন, ভেতরে আসুন| কি বলেছে অর্ক? সে কি সত্যি শুচিস্মিতাকে ছেড়ে দিতে রাজি?
আগে ছবিটা নষ্ট করে ফেলুন, প্লিজ| আপনি তো শুনেছি অর্ককে ভালোবাসেন| এই ছবি থাকলে হয়ত ডিভোর্সের সময় শুচিস্মিতা… মেয়েটা বড্ড গোঁ য়ার, অর্ক বলেছে নিশ্চয়ই!
আগুন জ্বলে ওঠে নিমেষে| পড়ে থাকে একমুঠো ছা ই| বুঝতে পারছি না, হঠাৎ সে আপনাকে পাঠাতে গেল কেন?
নিজে আসতে পারছে না বলে… আপনাদের মধ্যে বোধহয় ঝা মেলা হয়েছে কিছু নিয়ে| আমি অর্কর পিসতুতো বোন, আমার কাছেই যা একটু মন খুলে কথা বলতে পারে অর্ক| আপনি চাইলে ফোন মারফত জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন| একটু জল খাওয়াবেন প্লিজ| এই বোঝা নিয়ে চারতলায় উঠতে গলাটা একেবারে শুকিয়ে গেছে|
এসব নিয়ে আসতে গেলেন কেন?
অর্ক বলেছিল| আপনি নাকি রে গে আছেন| প্রথমে ওর নাম করলে আপনি দরজা খুলবেন না|
লজ্জা পেয়ে হাসে তৃষা, ফোন করে অর্ককে| বেজে যায় ফোন, ও প্রান্ত থেকে মেলে না উত্তর|
কাঁধে ঝোলানো বিরাট ঝোলাটা অবসন্ন ভঙ্গিতে নামিয়ে রাখে সে, প্লাস্টিকের গদিওয়ালা চেয়ারে বসে আস্তে ধীরে| একবার চারপাশটা দেখে নেয় ভালো করে| জল আনতে তৃষা ভেতরে যেতেই কর্মকাণ্ড দ্রুত হয়, গ্লাভসটা বের করে দু হাতে পরে নেয় সে| তারপর পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করে… শি কারী যে ভঙ্গিতে অপেক্ষা করে শি কারের ফাঁ দে পা দেওয়ার জন্য|
জল আর দুটো মিষ্টি নিয়ে এসে অবাক হয়ে যায় তৃষা| সেই ভারী ঝোলাটা এখন মেঝেতে পড়ে আছে| কিন্তু মালকিন নিরুদ্দেশ| কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না…. একটু যেন চমকে ওঠে সে, তবে কি ব্যাগের মধ্যে কোন আ ত ঙ্কজনক বস্তু! আজকাল তো এমন কতই হচ্ছে| হঠাৎ দরজার দিকে চোখ যায় তার… হিমেল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়া দিয়ে! ছিটকিনিটা কে লাগাল? সে তো কেবল দরজা ভেজিয়ে রেখে গিয়েছিল|
হঠাৎ গলায় প্রচন্ড চা প অনুভব করে সে| তৃষ্ণায় ছাতি যেন ফে টে যাচ্ছে তার, একটু জল… এটুকুই কেবল, আর কোন আর্ত নাদ বেরোল না মুখ দিয়ে| কয়েক মিনিটের সামান্য ছট ফটানি, তারপরেই নি স্তেজ হয়ে গেল মেয়েটা, শরীরটা এ লিয়ে পড়ল ফ্লোরে| খানিকক্ষণ অপেক্ষা শেষে পালস দেখল সে, এত সময় ধরে অপেক্ষা করতে প্রবল কষ্ট হলেও এক মুহূর্তের জন্যও মুখের ওড়না খোলে নি সে, সানগ্লাসও ঢেকে রেখেছে চোখ, নোনা ঘাম নেমে আসছে সেখান থেকে| জানে সে গল্পটা… মৃ ত মানুষের চোখের তারায় শেষ মুহূর্তের ছবি থেকে যায়…. পরীক্ষা করলে অনেক সময় ধরা পড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়| শেষ মুহূর্তে তৃষা তাকেই দেখেছে| সে অপ রাধী হতে পারে কিন্তু বোকা নয়|
আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে| চারতলার অংশটা এই কাঠফাটা রোদ্দুরে উত্তপ্ত কিন্তু একেবারেই ফাঁকা| জানে তৃষার ঘরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ইন্সটল করা নেই, নেই তৃষার নিজের স্বার্থেই… অর্ককে ভালোবাসে যে! কনসোল ইউনিট থেকে চাবি লাগানো তালাটা তুলে নেয়| তারপর… সামান্য দম নিয়ে দরজায় তালা দিয়ে ধীরে সুস্থে গাড়িতে উঠে বসে| চাবিটা ফেলে দেয় ধাপায়… আর ওই ঝোলা ভর্তি সাবান গুলে যায় জলে…. গল্প শেষ হয়!
বড্ড ক্লান্ত লাগছে, এক গ্লাস জল দেবে প্লিজ| ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় ল্যাপটপ ব্যাগটা নামিয়ে রাখে অর্ক|
এগিয়ে আসে শুচি| শরবতের ওপর ভাসতে থাকা কয়েক টুকরো বরফ প্রাণে শীতলতার আমেজ আনে| রাতের জন্য ডিম ভুর্জি আর রুটি করেছি| সঙ্গে একটু আলুর দম করে নেব নাকি?
তোমার যা ইচ্ছে| সকাল থেকে আজ বড্ড পরিশ্রম গেছে| ফ্রেশ হয়ে এসে কথা বলছি| জিতা কি ঘুমিয়েছে?
ওর ঘুমের সময় তো জানো| নড়চড় হয় না কখনো….
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
