#গোপনে
#পর্ব_৪
দুদিন হয়ে গেল তৃষার দেখা নেই| অফিসে কাজের ফাঁকে কানাঘুষা চলছে| টিফিন ব্রেকে অর্কও কয়েক মুহূর্তের জন্য টপ ম্যানেজমেন্টের গাম্ভীর্যের মুখোশ ফেলে সামিল হয়েছে সেই আলোচনায়, উদ্দেশ্য লোকজনের ভাবনাচিন্তা সম্পর্কে জানা| এখানে কেউ জানে না তার সঙ্গে তৃষার গোপন সম্পর্কের কথা| হঠাৎ নয়ন সবার মাঝখান থেকে বলে উঠল অর্কদা, আপনি কিছু জানেন না? তৃষা তো আপনার পার্সোনাল সেক্রেটারী ছিল|
আমি? আমি কিভাবে ওর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানব? গম্ভীর মুখে বলে অর্ক| পার্সোনাল সেক্রেটারীর সঙ্গে অফিস আওয়ার্সে দেখা হয়| প্রয়োজনীয় নোট, দরকারি কাগজপত্র লেনদেন হয়| সেই হিসেবে তুমিই তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলে, তোমারই তো জানার কথা| তোমার সঙ্গে বুঝি আর কথা হয় নি?
কয়েকটা দিন তৃষা এক বিশেষ কাজে ব্যস্ত থাকবে বলেছিল|
চলে যায় অর্ক নিজের কেবিনে| শুচির দেওয়া ঘরোয়া চাউমিন খেয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে| কাজে দেরি হলে ওপর মহলের কাছে কথা শুনতে হবে| চাকরির এ এক বিড়ম্বনা|
টিফিন ব্রেকের সময় শেষ, ল্যাপটপে মুখ গুঁজে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে| কেবল নয়ন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে থাকে| একমাত্র সেই জানে অর্কর সঙ্গে তৃষার গভীর সম্পর্কের কথা| ঠিক করে অফিস শেষে অর্কদার সঙ্গে একবার আলাদাভাবে কথা বলবে, জানার চেষ্টা করবে হয়েছিল কি আসলে?
পার্কিংয়ে ঢুকে বোতাম টিপে গাড়ি আনলক করছিল, সেই সময় গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল নয়ন| কি হয়েছে অর্কদা? তৃষা কোথায় গেছে?
তৃষা কোথায় গেছে সে কথা আমি কিভাবে জানব নয়ন? জানার কথা তোমার| তুমিই তো ওর বেস্টফ্রেন্ড| অন্ততঃ তৃষা আমায় যা জানিয়েছিল| তোমার সঙ্গে ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই কথা হয়েছে| হয়েছে কিনা বলো সত্যি করে! আমার ধারণা আমায় টেনশনে ফেলার জন্যেই সে এমনটা করছে|
উল্টো পাল্টা কথা বলে আমায় বুঝিও না অর্কদা| কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের টপ লেভেলে আছো তুমি, তাও আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশো বলে ভাল লাগে| জানো না, কর্পোরেট সেক্টরের কর্মীরা কখনো না বলে ছুটি নেয় না, জরুরি ছুটি নেওয়ার আগে কোম্পানির এইচ আরের কাছে লম্বা মেল করে| আর যদি আকস্মিক এমার্জেন্সি এসেও পড়ে ফোনটা অন্ততঃ খুলে রাখে| চাকরি যাওয়ার ভ য় সবসময় ওদের তা ড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়|সেখানে তৃষার ফোন দুদিন ধরে হয় আউট অফ নেটওয়ার্ক কাভারেজ এরিয়া নয় সুইচড অফ বলছে| তোমার কোনরকম চিন্তা হচ্ছে না?
দ্যাখো নয়ন, তোমায় আজ সত্যিটাই বলি| সেদিনের পর থেকে তৃষার সঙ্গে আমার ফুল অ্যান্ড ফাইনাল ব্রেক আপ হয়ে গেছে| আমি ওকে স্পষ্ট জানিয়েছিলাম শুচিস্মিতাকে ছেড়ে ওর সঙ্গে সংসার পাতা আমার পক্ষে সম্ভব নয়| তার চাইতে যেমন চলছে, যেভাবে চলছে… চলতে দাও| কিন্তু… তৃষা এই প্রস্তাবে রাজি হয় নি| সে সরাসরি ব্রেক আপ করে নেয়| ফোন তো বটেই বাকি সব জায়গা থেকেও আমাকে ব্লক করে দেয়| তাহলে আমি ফোন করব কিভাবে বল! তাছাড়া আমিও ব্যপারটা মেনে নিয়েছি| একটা রিলেশনশিপ ম্যাচিওর না করতেই পারে, সেজন্য তর্ক বিতর্ক না করে হাসিমুখে সবটা মেনে নেওয়াই তো ম্যাচিওরিটি, কি বলো তুমি| গাড়িতে বসো, ড্রপ করে দিই|
মনে পড়ে গেল নয়নের, গত কয়েকদিন ধরে তৃষার স্যাড পোস্ট, দুঃখের কবিতার স্ট্যাটাসগুলো… তবে কি এই জন্যই হাসিখুশি মেয়েটা নিজেকে ঘরব ন্দী করে ফেলল| ফেলতেই পারে| অর্কদাকে নিয়ে বড় বেশি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল যে…. বারবার সাবধান করেছিল নয়ন, শুনল তার কথা! চেষ্টা করেও নিজের রা গ চেপে রাখতে পারল না সে, ম্যানেজমেন্টের ব্যা ড বুকে যাবে জেনেও বলে ফেলল, আপনি যখন কোনরকম দায়িত্ব নিতে পারবেন না, তখন বেচারি কে স্বপ্ন দেখালেন কেন?
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কিন্তু সবকিছু জেনেবুঝেই সম্পর্কে জড়ায় নয়ন| আমি তোমাকে কৈফিয়ত দিচ্ছি না, কিন্তু এই সবকিছুর জন্য আমাকে একা দা য়ী করে লাভ নেই| আমি যে বিবাহিত, এক সন্তানের পিতা, তা আগেই তৃষাকে বলে দিয়েছিলাম| হয়ত আমাদের মধ্যে সমস্যা চলছিল একটা, কিন্তু পরে সে সমস্যা মিটে গেছে| কাজেই তৃষাকে বিষয়টা বুঝতেই হত|
খানিকটা আত্মগত স্বরে বলে অর্ক, পাহাড়ি ঝর্ণার মতো উচ্ছল ছিল তৃষ, দেখো হয়ত পাহাড়ের মেয়ে পাহাড়েই ফিরে গেছে| স্টিয়ারিং ধরল হাতে, চলো তোমায় ছেড়ে দিই….
আমি নিজেই যেতে পারব, কোনদিকে না তাকিয়ে হাঁটা লাগায় নয়ন| তৃষার ভাড়া বাড়ি চেনে সে, একবার গিয়ে দেখে আসতে পারলে মন্দ হয় না|
বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশের গাড়ি দেখে বুকটা ছ্যাঁ ৎ করে ওঠে তার| পুলিশ কেন? এই বিল্ডিংয়ে কার কি হল…. পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে সে| চারতলায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে| দরজা হাট করে খোলা, বেশ কয়েকজন পুলিশের উর্দিধারী ভেতরে বাইরে দাঁড়িয়ে|
ইন্সপেক্টর এগিয়ে আসেন, আপনার পরিচয়? ভিক্টিমের সঙ্গে চেনা পরিচয় ছিল?
কি হয়েছে তৃষার?
খু ন| গলায় অ্যালুমিনিয়ামের তার পেঁ চিয়ে মে রেছে|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
