#গোপনে
#পর্ব_৬
চিলেকোঠার ঘর| দেওয়ালের রঙের সঙ্গে মেলানো দরজা| না জানলে আন্দাজ করা মুশকিল| শুচিস্মিতা বেরিয়েছে লগ্নজিতাকে নিয়ে, মেয়েটা ঘুরতে বড্ড ভালোবাসে| এটাই তার সুযোগ, সদর বন্ধ করে ছাদে উঠে এল অর্ক| এই দোতলা বাড়িটা অর্কর দাদু বানিয়েছিল| একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে মালিক হয়েছিল তার মা| চাকরি নিয়ে এখানে শিফট করার পর নিজের গরজে সে খানিক সারিয়ে নিয়েছিল, সঙ্গে করেছিল টুকিটাকি কিছু রিপিয়ারের কাজ|
দেওয়ালের সঙ্গে মিশে থাকা দরজাটা বানানোর সময় দেখিয়েছিল শুচিকে| পুরনো বরের আজব খেয়ালের একটা ভেবে হেসেছিল সে| তারপর ফিরে গিয়েছিল নিজের নিরাপদ স্থানে, কিচেনে| সুন্দর রান্নাই যে তার ইউএসপি|
তালা খুলে ঘরে ঢুকল অর্ক| লুকানো বোতাম টিপে ভেতরে ঢুকে তাকিয়ে দেখল চারপাশ| একটা ওয়ার্ডরোবের থেকে বেশি জায়গা নেই| সহজে এই গোপন জায়গা খুঁজে বের করতে পারবে না কেউ, অবশ্য খুঁজে বের করতে চাইবেই বা কেন? এখানে সেগুলোই থাকে, যেগুলোর সমাজে আর কোন প্রয়োজন নেই| যারা শুধু হা রিয়ে যায় নি, হয়ে গেছে নিশ্চিহ্ন|
ছোট্ট বাক্সটা তুলে নিল হাতে, তৃষার ঘড়ি, কানের দুল আর একটা হীরের আংটি| আংটিটা সেই দিয়েছিল কোন এক দুর্বল মুহূর্ত! মেয়েটা বড় হীরে ভালোবাসত, ভেবেছিল ছোট্ট ছোট্ট হীরের আলো মেখে দিব্যি চলবে সম্পর্কটা… কিন্তু অন্ধকারে যখন চরাচর ডুবে যায়, তখন সামান্য আলোর প্রবেশও সেখানে সমস্যা নিয়ে আসে…
সঙ্গে নিয়ে আসা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের মধ্যে ডুবিয়ে রাখল লোহার তার… হাসল সে, অ স্ত্রই আসল| অ স্ত্র খুঁজে না পাওয়া গেলে খু নের প্রমাণও নেই! চাইলেই তৃষা আজো বেঁচে থাকতে পারত| পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল সে, দেখল সময়|অনেকদিন হয়ে গেল ব্যস্ততার দরুণ আর ছাদে আসা হয় না….
গুণগুণ করে গানের সুর ভাঁজতে লাগল অর্ক! গভীর উন্মত্ত প্রেমের মতো জীবনে অবসাদেরও দরকার আছে, নতুন সুখ খুঁজে পেতে হলে, পুরনো দুঃখ খানিক ঝালিয়ে নিতে হয়| এতক্ষণে বুঝি তৃষার বাবা-মা শহরে এসে পড়েছে| একমাত্র মেয়ের প্রয়াণে কে জানে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তাঁদের? নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সন্তান হা রালে… কেমন লাগে? উথাল পাথাল হয়ে যায় না জীবনটা?
কিন্তু সে তো অনেক সাহায্য করেছে তৃষাকে! ভবিষ্যতেও করত| কিন্তু কেউ যদি স্বেচ্ছায় সব হা রাতে চায়, কি বা করতে পারে সে… মেয়েদের তার ভাল লাগে, ভাল লাগে নতুন শ রীর কিন্তু শুচি তার প্রাণ, তার মেয়ের মা| শুচিকে ছাড়া সে বাঁচে কিভাবে? তৃষা কথাটা বুঝল না, অহনা, সৌমিলিও বোঝে নি|
কাজ হয়ে গেছে| অ্যাসিডের মধ্যে গলে মিশে গেছে খু নের অ স্ত্র লোহার তারের অস্তিত্ব! দেওয়ালের সঙ্গে আবারো মিশে গেল দরজা| গোপন অথচ প্রকাশ্য, যে বোঝে সেই জানে| আস্তে ধীরে নীচে নামল অর্ক| বন্ধ গেট পরীক্ষা করল যত্ন করে| খুলে ফেলল হাইড্রেনের ঢাকা| ঢেলে দিল তরল, মিলিয়ে গেল সব| কোথায় প্রমাণ? কে যেন ছিল তৃষা তার?
নিশ্চিন্ত হয়ে সোফায় ভাজাভুজি আর সোনালি তরল নিয়ে বসল সে, সহজ জিনিসকে কেন যে মানুষ খামোখা জটিল করে?
আপনারা? ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অফিসার প্রশ্ন করলেন|
তৃষার বাবা-মা আমরা, দেখলেন অতি সাধারণ দেখতে দুজন মানুষ কেঠো চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন| দুজনের প্রৌঢ়, অতিরিক্ত পরিশ্রম শরীর, স্বাস্থ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে| চোখের দৃষ্টিতে সর্বস্ব হা রানোর বেদ না| ও আমাদের একমাত্র মেয়ে ছিল স্যার, কে এভাবে আমাদের সর্ব নাশ করল? কেন? কার কি ক্ষ তি করেছিল আমাদের মেয়েটা?
সেটা তদন্ত সাপেক্ষ, কেজো গলায় উত্তর দিলেন অফিসার| হাজার চেয়েও মেয়েটার প্রতি তাঁর কোনরকম সহানুভূতি আসছে না, এই ধরনের মেয়েদের এমন পরিণতি হওয়াই স্বাভাবিক!আপনার মেয়ের অফিসের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি| পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেছি| জানেন কি, মেয়ে আপনাদের মাঝেমধ্যেই বাড়ি ফিরত না, সম্ভবত বয়ফ্রেন্ড বা কোন পুরুষের সঙ্গে হোটেল টোটেলে… একা একটা মেয়েকে খোঁজখবর না করে অচেনা শহরে পাঠিয়ে দিলেন, জানেন দিনকাল কত খারাপ| টাকার এত দরকার হয়ে পড়েছিল আপনাদের!
আমার মেয়ে অমন নয় স্যার, বলে উঠলেন ভদ্রমহিলা| আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে…
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট স্পষ্ট বলছে আপনার মেয়ে ভা র্জিন ছিল না, কথাটার মানে বোঝেন নিশ্চয়ই… এর চেয়ে বেশি বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়! আজকালকার সব আধুনিকার দল, কিছু হলে সব দা য় পুলিশের… আপনমনেই বিড়বিড় করেন অফিসার|
স্যার, আমরা খুব সাধারণ মানুষ, ভেঙে পড়া গলায় বলেন তৃষার বাবা| মেয়েটার পড়াশোনায় খুব মন ছিল| স্কুল, কলেজে দারুণ রেজাল্ট| চাকরিটা পেল যখন ভাবলাম এবার হয়ত পরিবারটা বেঁচে যাবে| কে জানত এই সাজানো শহর আমার মেয়েটাকেই একদিন গি লে নেবে?
পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে| আজ বিকেলেই ব ডি হাতে পেয়ে যাবেন| শেষ কৃত্য কোথায় করবেন ভেবেছেন কিছু! এখানে না পাহাড়ে?
জীবিত মেয়েটাকেই তার নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম না স্যার… প্রাণ হী ন দে হটা অতদূর বয়ে নিয়ে গিয়ে কি করব? বিচার পাবে তো স্যার আমার মেয়েটা? কোনো অন্যায় যদি করেও থাকে, সে সাবালিকা ছিল| যা করেছে স্বেচ্ছায় বুঝেশুনে করেছে| তার শা স্তি তো মৃ ত্যু হতে পারে না| আমার মেয়ের খু নী কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে রাস্তায় ঘুরছে স্যার, আমার মেয়ে না হয় শা স্তি পেল, কিন্তু সেই লোকটা? সেও তো একই অন্যায় করেছে, তার শা স্তি হবে তো?
যতদূর জানা যাচ্ছে আপনার মেয়ের খু নি একজন মহিলা| আমরা তাকেই খোঁজার চেষ্টা করছি|
স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন ভদ্রলোক| মহিলা! মহিলার হাতে খু ন হয়েছে আমার মেয়ে?
তাই তো জানা যাচ্ছে, কেস ফাইল ওল্টাতে ওল্টাতে বলেন অফিসার, কি করেন আপনি?
স্কুলে পড়াই| ছোট্ট বাচ্চাদের| আমার মেয়ের খু নি মহিলা হোক, যেই হোক, বলুন না স্যার, সে শা স্তি পাবে ত?
পাবে, হয়তো| আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব নিশ্চয়ই| কিন্তু বুঝতেই পারছেন আমাদের হাতে তো আর একটা কেস নয়| তাছাড়া আপনার মেয়ের স্বভাব চরিত্রও… যাক, যে মানুষ চলে গেছে, তাকে নিয়ে এসব আলোচনা না করাই ভাল| তা আপনারা কবে পাহাড়ে ফিরছেন?
পাখির ডাক শোনা উঠল| এই বোধহয় ফিরল জিতা| বোতল, গ্লাস লুকিয়ে একগাল হেসে দরজা খুলতে এগিয়ে গেল অর্ক!
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
