#গোপনে
#পর্ব_৫
নিস্তরঙ্গ জীবন বয়ে যায় সমতলে আসা নদীর মতো| শুচিস্মিতার পাশে শুয়ে অর্ক নিশ্চিন্তে ঘুমায়| লগ্নজিতা স্কুলে যায়, বাড়ি ফেরে| বাবার গলা জড়িয়ে ধরে গল্প করে| চিজ কেক বানায় শুচি| কখনো মেয়ের পছন্দে হোয়াইট সস পাস্তা|
তৃষার কথা ভুলেই গেছে অর্ক, বউ মেয়ে নিয়ে আছে বেশ| বোধহয় ভুলে গেছে শুচিও| নইলে অর্কর কলিগ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে অমনভাবে অপমানের পরেও হাসিমুখে কিচেনে ঢুকে অর্কর পছন্দের পায়েস বানায় কিভাবে? কিভাবে অফিস থেকে ফিরলে ট্রে তে করে বানিয়ে আনে বরফ দেওয়া লস্যি| আজ গাড়ি পার্কিং করে ওপরে উঠতেই অর্কর জন্য লস্যি নিয়ে হাজির হল শুচি, কি ভীষণ গরম পড়েছে বলো দেখি!
অর্ক ঘাড় নাড়ে, হাসিমুখে চুমুক দেয় লস্যির গ্লাসে|
একটা মৃদু আর্ত নাদ বেরিয়ে আসে নয়নের কন্ঠ চিরে… কিভাবে হল এসব? কবে হল?
আপনার পরিচয়টা…. অফিসার কঠিন চোখে তাকান|
আমি… আমি তৃষার কলিগ নয়ন| একই অফিসে চাকরি করি| দু দিন অফিস যাচ্ছে না, ফোনও বন্ধ দেখে খোঁজ নিতে এলাম| আসলে তৃষা কখনো ফোন বন্ধ রাখে না| তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও মেয়েটা সবসময় সক্রিয় থাকে, কিন্তু পরপর দুদিন একেবারে যেন… তাই ভাবলাম একবার বাড়ি এসে খবর নিয়ে যাই, যদি শরীর খারাপ করে টরে| কিন্তু এখন তো দেখছি এই অবস্থা|
ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সেন বেরিয়ে আসেন ভেতর থেকে, আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে মেয়েটির মৃ ত্যু হওয়ার সর্বাধিক সম্ভাবনা রয়েছে, অন্ততঃ মৃ তদেহে ধরা প চন তো সেদিকেই ইঙ্গিত করছে| খু ন হয়েছেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় বোঝা যায় খু নী সম্ভবতঃ কোনো মহিলা| গলায় চা প দিতে অনেকখানি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে| পুরুষ হলে অতটা পরিশ্রম করতে লাগত না| অবশ্য পাতলা চেহারার পুরুষ হলে… এখনো অনেকগুলো সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার পালা রয়েছে| ছাপ টাপ গুলো দেখতে হবে, শরীরের কয়েকটা অংশ ভিসেরায় পাঠাতে হবে| যদি আগে বি ষ প্রয়োগ ট্রয়োগ… তবে এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে তেমন কিছু হয় নি| তবুও তুমি যদি চাও… বলতে বলতে একঝলক নয়নের দিকে তাকালেন আত্মভোলা ভদ্রলোক, আপনিও পুলিশের? আগে কখনো স্পটে দেখি নি তো?
উনি পুলিশের নন| যিনি খু ন হয়েছেন সেই তৃষা ম্যাডামের বন্ধু| দুদিন ধরে অফিস যাচ্ছেন না দেখে খোঁজখবর করতে এসেছেন| তারপর ম্যাডাম আপনিও কি বন্ধুর মৃ ত্যুর তদন্ত করবেন? পুলিশ অফিসারের গলায় ব্যঙ্গের সুর ফোটে|
স্যার, আমি খুব সাধারণ মানুষ| এটুকু স্পষ্ট বুঝেছি সে যেখানে গেছে সেখান থেকে আর ফিরবে না| কেউ কোনদিন ফেরে না|কিন্তু খু নটা কেন হল, কে করল… সেটা জানলে হয়ত একটু শান্তি পেতাম স্যার|
সম্ভবতঃ এই ফ্ল্যাটে দুপুরবেলা একটা চু রির অ্যাটেম্পট হয়েছিল… আলমারির চাবি ঢোকানোর জায়গায় বেশ কয়েকটা গভীর আঁচড়ের দাগ সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে| হয়ত তৃষা ম্যাডাম লু টের সময় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন…. চু রির সময় ঝা মেলা দেখে খু নি একেবারে বামাল সমেত বিসর্জন দিয়ে গেছে!
বড্ড বেশি সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে না ব্যপারটা?
তাহলে আপনি কি বলতে চাইছেন? তৃষা ম্যাডামকে কেউ ঠান্ডা মাথায় খু ন করেছে? সরু চোখে নয়নের দিকে তাকায় অফিসার, ম্যাডামের কি কোন শ ত্রু ছিল? আপনি চেনেন?
আমার সে বিষয়ে জানা নেই, ও তো আমায় কিছু বলে নি, এটা জানি চাকরি করতে পাহাড় থেকে এসেছিল, এই চাকরিটা খুব দরকার ছিল… ঈষৎ কাঁপা গলায় বলে ওঠে নয়ন|
তাহলে খামোখা আর মাথা না ঘামিয়ে বাড়ি ফিরে যান দেখি| কাজের সময় যত্ত ঝা মেলা গজগজ করে অফিসার, একা একটা মেয়ে অচেনা শহরে থেকে এসে এরকম একটা দমচাপা জায়গায় থাকতে শুরু করল, না আছে সিসিটিভি না আছে কিছু… কেবল আছে প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য| তাদের থেকেই জেনেছি সবসময় খোলামেলা পোশাক আশাক পরত, গভীর রাতে ফিরত| মাঝেমধ্যে উ ধাও হয়ে যেত, এমন মেয়ে যে এতদিন ধরে বেঁচে ছিল… এটাই তো আশ্চর্যের!
চোখে জল আসছিল নয়নের| পেছন ঘুরে সে নামতে যাচ্ছিল… এমন সময় অফিসারের ডাকে থমকে দাঁড়াল, নীচে দাঁড়ানো সেকেন্ড অফিসারের কাছে আপনার নাম ঠিকানা লিখিয়ে যাবেন| প্রয়োজনে যাতে যোগাযোগ করতে পারি|
বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের আক্র মণের মুখে পড়ল নয়ন, প্রত্যেকেই একবাক্যে বলল, কি দরকার ছিল তার এসব পুলিশি ঝামে লায় জড়ানোর? তার নিজের একটা পরিবার আছে, পরিবারের সম্মান আছে, ভবিষ্যতে বিয়েও দিতে হবে… যে গেছে সে একটা চরিত্র হীন মেয়ে! যা হয়েছে, তা হয়েছে| তৃষার বাবা, মা যা বোঝার বুঝবে| সে যেন আর কখনো পুলিশ স্টেশনে না যায়, মাথা না ঘামায়!
রাতের বেলা অন্ধকার ঘরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে তৃষার ছবির দিকে তাকিয়ে নয়ন আফশোসের সুরে বলল, হাজার চেয়েও কিছুই করতে পারলাম না তোর জন্য, এই আফশোস আমার সারাজীবন থাকবে| কিন্তু কি করব…. কে শুনবে আমার কথা!
স্যার খু নটা যদি ওই ম্যাডামই করে থাকে! তত্ত্ব বলে খু নী খু নের জায়গায় আবারো ফিরে আসে, কোন প্রমাণ ফেলে গেছে কিনা দেখতে!
আঃ সন্তোষ, এবার ওই বস্তা পচা গোয়েন্দা গল্পগুলো পড়া বন্ধ করো দেখি| মেয়েটার চোখ দুটো দেখেছিলে ভীতি বিহ্বল, যেন ঘটনাটা বিশ্বাসই করতে পারছে না| বেচারি বন্ধু কৃত্য করতে এসে ফেঁ সে গেছে| আমার স্থির বিশ্বাস ওটা বাগলারির কেস! বাধা দিতে গিয়ে ভদ্রমহিলা খু ন হয়েছেন| শুনলে না দুপুরবেলা ফ্ল্যাটে সাবান বেচতে এসেছিল, ওই মহিলাই হয়ত একা থাকার সুযোগ নিয়ে! সারা রাজ্যে হাজার কোম্পানি, কয়েক লাখ সেলস গার্ল, সুচের গাদায় চালুনি নিয়ে বসবে কে?
কেউ যদি সাবানওয়ালী সেজে এসে থাকে? অন্য কোন ফ্ল্যাটে তো যায় নি শুনলাম| মানে যদি প্রতি শোধ স্পৃহায়…
যদি তাই হয় তাও জানতে হবে কার কার সঙ্গে শ ত্রুতা ছিল| কেন ছিল? পাহাড় থেকে এসে এই কোম্পানিতে জয়েন করল কেন? মেয়েটার বাবা-মা আসুক দেখা যাবে| শোনো বাপু, একটা কথা বলি, এই কেস নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, আমাদের ডিপার্টমেন্টে কত কেসই তো আনসলভ অবস্থায় পড়ে থাকে, আর একটা না হয় যোগ হবে তাতে!
ভাল কথা, রঞ্জু চিংড়ি ভাজা পাঠিয়েছে? আজ রাতে কিন্তু মো চ্ছব|
( ক্রমশ )
©️ Monkemoner dakbakso – Anindita
