Friday, June 5, 2026







হৃদিতে রিদি পর্ব-০৮

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৮.

বর্তমান প্রেক্ষাপট,

হোটেল হাইওয়ে ইন, কুমিল্লা

গাড়ি থামল। শাহদ্বীপ গাড়ি থেকে নেমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল। খ্যাতির বিড়ম্বনা জীবনকে তেজপাতা বানিয়ে দেয়, এটি সে প্রতিনিয়তই টের পাচ্ছে। ওয়াশরুমে এসেও শান্তি নেই। হোটেল কতৃপক্ষ ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল বিখ্যাত ফুটবল প্লেয়ার শাহদ্বীপ জিহান এসেছে। আপ্যায়নের জন্য অস্থির হয়ে উঠল।

সেলফি তুলতে ব্যস্ত তার ভক্তকুল। তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ওয়াশরুম সেরে আসল। বেসিনে হাত ধুতে ধুতে ছবি তুলছে। মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে ভিড় ঠেলে কোনো রকম বের হয়ে আসল। মাসুদ তার নির্দেশে আগে থেকেই কিছু হালকা খাবার কিনে নিয়েছে। এখানে বসে খাওয়ার অবস্থান নেই। হোটেলের বাইরে গ্লাসের ভেতর রসমালাই দেখা যাচ্ছে। রসমালাইয়ের কথা ভাবতেই স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠেছে দূরন্ত বালিকার স্নেহ মাখা মুখটা। আদুরে সব আবদারে জড়ানো স্বর,

‘ দ্বীপ জানো আমার প্রিয় ডেজার্ট কী? অবশ্য জানবে কিভাবে আমি তো বলিই নিই। আমি রসমালাই খেতে প্রচন্ড ভালবাসি৷ আমাদের যখন বিয়ে হবে, তখন তুমি আমাকে সপ্তাহে দুদিন রসমালাই খাওয়াবে। দুদিন খেলে পরেরবার খাওয়ার ইচ্ছে থাকবে, দুদিনের বেশি খেলে থাকবে না।’

রিদির কথা ভাবতে ভাবতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। খুব জোরে হোঁচট খেল। কয়েক সেকেন্ড থমকে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মাসুদ গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। গাড়িতে বসতেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে রিদনের নাম ভেসে উঠল। রিদন ভাইয়ের লোকেশন জানতে চাচ্ছে। সঠিক লোকেশন বলতেই রিদন অনুরোধ করে বলল, ‘ ভাইয়া রাগের মাথায় কিছু করো না। ভাবীকে একটা সুযোগ দাও। অতীত ভুলে যেতে বলো আমাকে, অথচ নিজে অতীত মনে করে সুন্দর একটা সম্পর্ক শেষ করতে যাচ্ছ। এসব কি ঠিক? ‘

বেশ ভারী, শক্তগলায় বলল দ্বীপ, ‘ মাই লাইফ, মাই হেডেক। ডোন্ট ইন্টারফেয়ার।’

ফোন কেটে দিল। গাড়ির সিটে নীল ফাইলটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। ওই ফাইলের ভেতর কি আছে জানেন? জীবনের হিসেব নিকেষ, সম্পর্কের ভাঙা গড়া, কিছু ডকুমেন্টস আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেপার। কলমের খোঁচায় সই হলেই দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর, নিকটতম প্রিয় সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটবে। মাসুদ বেশ কয়েকবার খাবার সাধল। দ্বীপ এক ঢোক পানি গিলে গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে আছে। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। গাড়ির গ্লাসে বিন্দু বিন্দু জল। সে জল গ্লাস বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। গ্লাসের জলধারণ ক্ষমতা শূন্য। দ্বীপের নিজের জীবনটাকেও শূন্য মনে হয়। বাইরে থেকে মনে হয় দ্বীপের সব আছে ; নাম, যশ, খ্যাতি। ভেতরের খবর উপর ওয়ালা ছাড়া কেউ জানেন না। মাসুদকে বলল, ‘ মাসুদ আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। লো ভলিউমে একটা সফট মিউজিক দাও। ঢাকা পৌঁছে গেলে আমাকে জানাবে।’

‘ জি স্যার। ‘

মাসুদ গান ছাড়ল। এই গানটা কানে আসতেই দ্বীপ চট করে কেবল বন্ধ করা চোখ খুলে ঢোক গিলল। আয়নাবাজি সিনেমার বেশ জনপ্রিয় গান,

‘ ধীরে ধীরে যাও না সময়, আরও ধীর বও। আর একটু ক্ষণ রও না সময়, একটু পরে যাও।’

গান টা রিদির প্রিয়৷ নাকের পাটাতন ফুলে উঠেছে দ্বীপের। গাড়ির ভেতর লাইট বন্ধ। চোখের উপর হাত রাখল দ্বীপ। দু চোখ বেয়ে অবিরত বর্ষন। রিদি দেখলে নিশ্চিত বলত,’ এত বড় ছেলে কাঁদলে কেমন পঁচা দেখায়, তুমি কেঁদো না দ্বীপ আমার কষ্ট হয়।’

দ্বীপ পুনরায় ডুব দিল পুরনো ভাবনায়,

১১ই মার্চ, ২০১৬

ক্লান্ত শরীর নিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। মাথার উপর ফ্যানটা ঘুরছে। মেসে দ্বীপ একা এখন। বাকি মেম্বার রা আসেনি। কারো অফিস, কারো ইউনিভার্সিটি। যে যার যার কাজে ব্যস্ত। মাথার উপর ফ্যান টা ঘ্যাটর ঘ্যাটর করছে। ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। মাইগ্রেনের ব্যাথাটা ইদানীং বাড়ছে। অফিসে হেঁটে যায়, হেঁটে আসে। খুব সকালে বেরিয়ে যায়। ফযরের নামায পড়ে আর ঘুমায় না। বেতনের অঙ্ক টাও খুব সামান্য। ব্যবসা করলে হয়ত কিছুটা আরাম পেত, নিজের মর্জি মত চলা যেত কিন্তু চাকরিতে অসম্ভব। ভেবেছিল বাবার জায়গা টা বিক্রি করে ব্যবসায় মনোযোগ দিবে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ওইটা যদি বিক্রি করে বাকি ভাইবোন দুটোকে ঠকানো হবে। অন্যদিকে রিদির পরিবার তো কখনও মেনেই নিবে না।

চাকরি তার কপালে ছিল। গাধার খাটুনি খেটে, অফিসের বসের গালি গালাজ সহ্য করা কি চাট্টিখানি কথা। যেখানে বাসায় মা কখনও বেয়াদব পর্যন্ত বলে নি সেখানে অফিসে বস মাঝে মাঝে মা বাপ তুলে গালি দেয়। রাগ উঠে যায়। এমডি কে অভিযোগ করার পর টিম পালটে দিয়ে নতুন বসের আন্ডারে দিয়েছে। এই বস বাবা মাকে গালি না দিলেও তার মুখের ভাষা যে খুব একটা ভাল এমন নয়। পরের চাকর গিরী করলে গালি খেতেই হবে। এটাই ভবিতব্য। যার জন্য এত এত কষ্ট ওই মানুষটাকে গত কয়েক মাস চোখের দেখাও দেখার সুযোগ হয় নি। মাঝে মাঝে মনে হয় শূন্যের উপর একটা সম্পর্ক ভাসছে। দমকা হাওয়া এলে উড়ে যাবে। রিদির অনুভূতি আপেক্ষিক। কখনও গাঢ় তো কখনও হালকা। কিন্তু দ্বীপের অনুভূতি তো ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। দিন যত যাচ্ছে মনে হচ্ছে রিদি তার রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। এই অনুভূতি তাকে সারা টা জীবন ভোগাবে। প্রতিদিন ভাবে রিদির চিন্তা মাথায় আনবেনা, ভবিষ্যতে যা হওয়ার হবে। ভাগ্যে থাকলে রিদি তার হবে , না থাকলে অন্য কারো। যখনই ভাবে রিদি অন্য কারো হবে তখন মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

__

মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে রিদির। বাসার শিক্ষক যাওয়ার পর থেকে পড়ার টেবিলে বসে আছে। পড়া মাথায় ঢুকছে না। মা এসে কয়েক বার জিজ্ঞেস করেছে নাস্তার কথা। দ্বীপের সাথে দেখা হওয়ার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়েছে। মাঝে মাঝে মিরার ফোন থেকে কথা হয়। দ্বীপ চাকরির জন্য এখন চট্টগ্রাম থাকে। চাকরিতে চলে যাওয়ার আগের দিন দূর থেকে দেখা হয়েছিল দুজনের। এরপর টেস্ট পরীক্ষা চলে এসেছিল। পরীক্ষার জন্য বের হতে পারেনি, কথাও হয় নি। বাসায় তো সারাক্ষণ মায়ের পাহারায় থাকে। পরীক্ষার ফলাফল তেমন ভাল হয়নি। তাই নিজ উদ্যমে পড়ার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ পড়া থেকে উঠেই ইচ্ছে করল চেঁচাতে। রাহা এসেছে গত কাল। রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাইকে কিছু কথা বলবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিল।

জাবেদ সাহেব মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিলেন। সেই মূহুর্তে রিদি বলল,

‘ আব্বু আমি ফখরুল স্যারের কাছে পড়ব না আর। ‘

ভ্রু কুচকে তাকাল সবাই। গত এক বছর ধরে পড়াচ্ছে ফখরুল। কোনো অভিযোগ শুনেনি। আজ হঠাৎ মেয়ে পড়বেনা শুনে কিছুটা চিন্তিত হলেন জাবেদ সাহেব। মেয়েকে প্রশ্ন করলেন,

‘ কেন মা, কোনো সমস্যা হয়েছে?’

রিদি ছলছল চোখ। মুখ গোমড়া। বাবা আর দুলাভাইয়ের সামনে বলতে চাইল না। আমিনা মেয়েকে দোষারোপ করা শুরু করলেন। তখন রিদি বাধ্য হয়ে বলল,

‘ স্যার আমাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে উনি আমাকে পছন্দ করে। আমার এসব ভালো লাগে না। আজ হাত ধরতে চেয়েছে। ‘

জাবেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকালেন। আমিনা যেন স্বাভাবিক। তরকারি বেড়ে দিতে দিতে পুনরায় বললেন,

‘ ভালোই হল। ফখরুল ভালো ছেলে। তোমাকে যেহেতু পছন্দ করে তবে বিয়ে দিয়ে দিব তোমাদের। এমনিতেও তুমি পড়াশোনায় ঘোড়ার ডিম। এরচেয়ে সংসার কর। জামাই টা ভাল পাবে। ‘

রিদি জানে মা কথা গুলো ইচ্ছাকৃত বলছে। সেদিনের পর থেকে রিদিকে চোখে চোখে রাখে। রাহা এবং রায়হান দুজনই বিরক্ত হল ফখরুলের ব্যাপারটাতে। রায়হান নাখোশ হল শাশুড়ির কথায়। রিদিকে বলল,

– তুই কালকে ফখরুল আসলে আমাকে ডাকবি। দেখি ও কেমনে তোর হাত ধরে। ওর হাতটা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিব। আসলেই ব্যাপারটা লজ্জার। ছাত্রী পড়াতে এসে হাত ধরতে হবে কেন? পছন্দ হলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাক। লুকিয়ে চুরিয়ে আকাম করতে হবে কেন? এই ছেলে আমার পছন্দ হয় নাই আব্বু।

মেয়ের জামাইয়ের কথায় আমিনা লজ্জা পেলেন। জাবেদ সাহেব ও একমত। আমিনা হেসে বলল,

– বাবা ছেলেটা ভাল। আমাদের মেয়েই বেয়াদব। হয়ত বাড়িয়ে বলছে।

রিদি মায়ের দিকে ক্রব্ধ চোখে তাকিয়ে খাবারের প্লেটটা সরিয়ে উঠে গেল। কান্না করতে করতে বলল,

‘ হ্যাঁ পরের ছেলে বাজে কাজ করলেও ভাল। তোমার মেয়েই খারাপ। ওই ফখরুলের কাছে আমি জীবনেও পড়ব না। কালকে বাসায় আসলে আমি ওকে বটি দিয়ে কোপাব। শয়তানের বাচ্চা একটা। আশপাশে সব বেয়াদব। কলেজে রানা, বাসায় ফখরুল। কোথাও শান্তি নেই আমার।’

কাঁদতে কাঁদতে রুমে চলে গেল। রাহা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আব্বু আমার মনে হয় ফখরুল এর খারাপ ইঙ্গিত ছিল। নতুবা আমাদের রিদি এভাবে রিয়েক্ট করত না।’

__

কয়েকবার বেজে বেজে ফোন কেটে যায়। অন্যমনস্ক থাকাতে দ্বীপ লক্ষ্য করে নি। আরেকবার বাজতেই রিসিভ করল। ক্লান্ত গলায় সালাম দিয়ে জানতে চাইল কে? ও পাশ থেকে ক্রন্দনরত প্রিয় রমনীর গলা,

‘ দ্বীপ আমি, রিধিমা।’

দ্বীপ শোয়া থেকে উঠে বসে গেল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ রিদিইই, কাঁদছ কেন? কি হয়েছে?’

কাঁদতে কাঁদতে রিদি বলল, ‘ তুমি কবে আসবে? আমার ভাল লাগছেনা আমি একটু দেখা করব তোমার সাথে। ‘

চিন্তিত মনে জবাব দিল, ‘ এখন আসব?’

‘ না না এখন না। দু একদিনের মাঝে আসো। মিরাকে জানিয়ে দিও।’

‘ কার ফোন থেকে কল করেছ?’

‘ আপুর ফোন। আচ্ছা রাখি।’

রিদি ফোন কেটেই দিতেই চিন্তা ঘিরে ধরল। শুক্রবার আসতে বহু দেরি। আজকে মাত্র রবিবার। এখন ছুটি চাইলে দিবে বলে মনে হয়না। প্রভিশনাল পিরিয়ডে ছুটি থাকেনা। এই মূহুর্তে নিজেকে কতটা অসহায় লাগছে তা হয়ত যে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে সে ব্যতীত কেউ বুঝবে না। মেসের বুয়া এসে রান্না করছে। বুয়াকে ফ্রিজ থেকে লতি নামাতে দেখে মায়ের কথা মনে পড়ল। ভাবল আজ পেট ভরে দুটো ভাত খাবে। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল লতি না বেছে, আঁশ না ফেলে সমানে কুচাচ্ছে বটির নিচে ফেলে। রান্না করছে রুই মাছের টুকরো দিয়ে। আহারে ব্যাচেলর জীবন। রাতে কিভাবে খাবে তা ভেবে ফ্রিজ খুলে দেখে কিছুই নেই। নিচে থেকে ডিম এনে ওটা ভেজে খাবে পরিকল্পনা করল।

___

সকালে রাহা ঘুম থেকে উঠে বোনকে নাস্তা বানিয়ে দিল। রাতেও কিছু খায়নি মেয়েটা। বোনকে জিজ্ঞেস করল কালকে ফখরুল কী কী বলেছে। রিদি প্রথমে মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল, পরে সব খুলে বলতেই রাহার চোখে তীব্র ক্রোধ দেখতে পেল। ফখরুল প্রেম নিবেদন করেছে। রিদি নাকোচ করেছে। তবুও ফখরুল জোর গলায় বলেছে সে রিদির পরিবারকে রিদির সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। যাওয়ার সময় রিদির হাত ধরে ফেলল। যা রিদি বাবার সামনে তখন টেবিলে লজ্জায় বলেনি। বোনকে কলেজে পাঠিয়ে আপন মনে ভাবছে কিভাবে ফখরুলকে অপমান করা যায়।

রিদির রিকশা প্রাইভেটের সামনে দাঁড়াল। রিকশা থেকে নেমে সামনে পা ফেলতেই উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেল। হাঁটু আর কনুইয়ে ব্যাথা পেয়েছে। কেউ একজন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। মাথা তুলে মানুষটাকে দেখে চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল খুশিতে। দ্বীপ ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,

‘ আস্তে, ঠিক ভাবে এখনো হাঁটতেও পারো না। তোমাকে আসলেই আন্টি একা না ছেড়ে ঠিক কাজ করেন। ‘

রিদি হাসছে। রিদির হাসি দেখে দ্বীপ ও হাসছে। হাসতে হাসতে দুজন সামনের দিকে হাঁটছে। দ্বীপ প্রশ্ন করল,

‘ ম্যাডাম রাগ না করে হাসছে, বাহ দ্বীপ তোর কপাল খুলে গেছে।’

রিদি ভ্রু উঁচিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘ আমি বুঝি সবসময় রাগ করি?’

দ্বীপ হেসে দু পাশে মাথা নাড়ল। রিদি দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ তুমি তো আমার ম্যাজিশিয়ান। তোমার উপর রাগ করতেই পারিনা।’

‘ আমি ম্যাজিশিয়ান? ‘

রিদি উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল, ‘ হ্যাঁ, রিদির ম্যাজিশিয়ান। এই যে ব্যাথা পেলাম হাঁটুতে, কনুইয়ে কিন্তু ব্যাথা অনুভবই হচ্ছে না তোমাকে পেয়ে।’

দ্বীপের মুখের হাসি উবে গেল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল, ‘ আজকে প্রাইভেটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাসায় যাও। সামনে চল দেখি ঔষধ দোকান খোলা আছে কিনা। ‘

রিদি খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ সকাল সাতটা বাজে। এই সময় কেউ খোলে না। আমি ঠিক আছি। বাসায় গিয়ে স্যাভলন লাগিয়ে নিব। তোমাকে দেখেছি এই শান্তি। ‘

দ্বীপ মৃদু হেসে জানতে চাইল হঠাৎ গতকাল ফোন দিয়ে দেখা করতে চাওয়ার কারণ। রিদি সব খুলে বলল। দ্বীপের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। রিদির শিক্ষক সম্পর্কে এর আগে কখনও জানতে চায় নি। আজ বিস্তারিত জেনে ফোন বের করে একটি ছবি দেখাল। ছবি দেখেই রিদি জানাল এটা তার শিক্ষক, দ্বীপ যেন এই ছেলে থেকে দূরে থাকে। রিদি প্রাইভেটে চলে যাওয়ার পর দ্বীপ বাসায় ফিরে গেল।

রাহেলা ছেলেকে দেখে চমকে গেলেন। গত তিনমাসে অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। দ্বীপের গলা শুনে ভেতর থেকে ওর দাদী বেরিয়ে এল। লাঠি নিয়ে ঠকঠক করে এসে দ্বীপের পাশে বসেছে। দ্বীপকে প্রশ্ন করল,

‘ ভাই একা আইলি যে বউ লইয়া আইলি না কেন? ‘

রাহেলা ছেলের হাতে ঠান্ডা একগ্লাস ডাবের পানি দিল। এক চুমুক নিতেই দাদীর কথা শুনে নাকে মুখে বিষম খেল দ্বীপ। মায়ের দিকে তাকাতেই রাহেলা বললেন,

‘ দুদিন ধরে আমাদেরকে বলছে তোমাকে বলি যেন তুমি বউ নিয়ে আসো। ‘

দ্বীপ দাদীকে জোরে বলল, ‘ দাদী বিয়ে করিনাই তো, তুমি দোয়া কর যেন তাড়াতাড়ি করতে পারি। ‘

বৃদ্ধ সখিনা বানু কি বুঝলেন কে জানে? মাথা নেড়ে বললেন, ‘ হ ভাই ঠিক কইছ বউ পালা বহুত কষ্ট। তয় বউরে তিন বেলা সোহাগ করবা। যহনই বউয়ের মুখ কালা দেখবা তহনই কোলে তুইলা খাওয়ায় দিবা। এমনে কইরা শান্তি পাইবা। ‘

রাহেলা মুখে শাড়ির আঁচল গুজে রান্না ঘরে চলে গেলেন। এদিকে দ্বীপ লজ্জায় মাথা নুইয়ে রেখেছে। সখিনা বানুর থামার নাম নেই। দ্বীপ থামিয়ে বলল,

‘ ও দাদী তুমি আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠলা কেন, যাও আরেকটু ঘুমাও। ‘

সখিনা বানু এবার হেসে বললেন,’ হ তোমার দাদায় কইছেলো , বউ হইল আমলকীর লাহান। মুখে দিলে পেত্থম তিতা পরে মিডা। আগেই মিডা পাইবা না বুঝলা। বউয়ের আদর পাওন অত সহজ না। ‘

দ্বীপ কপাল চাপড় দিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করছে। দাদীর আমলকীর কির্তন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদীর কথার সাথে তাল মিলিয়ে মনে মনে বলল,

‘ হ দাদী জানি বউ আসলেই আমলকী। প্রথমে তিতা মুখে দিলে মিডা। তবে এখনো মুখে দি নাই তাই জানিনা তিতা না মিডা। ‘

__

রিদিকে আজ রাহা নিতে এসেছে। প্রাইভেট থেকে বের হয়ে রিদি দ্বীপকে দেখে সেদিকে আগাতেই মাঝে রাহা এসে আটকে দিল। দ্বীপ দেখতে পেল রিদি রাহার সাথে চলে যাচ্ছে। মুখ গোমড়া হয়ে গেল রিদির । বুঝতে পারছেনা এই মেয়েটা কে? রিদি চলে যাবার পর এগিয়ে গিয়ে মিরাকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল রিদির বড় বোন।

কলেজের গ্যালারিতে এসে চুপচাপ বসে আছে। যার জন্য আসা তার সাথে দুটো মিনিট মনের কথা সুন্দর ভাবে বলারও সুযোগ নেই। আকাশে হঠাৎ মেঘ করেছে। আকাশের দিকে তাকাতেই মুখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চাপা কষ্ট থেকে তিনটে শব্দ উচ্চারণ করল,

‘ আল্লাহ ধৈর্য দাও। ‘

ঝড় বইছে। সবাই ছুটছে যে যার মত। দ্বীপ ঠাঁই বসে আছে। ভাবছে কোন ঝড় বেশি প্রলয়ঙ্কারী? এই ঝড় নাকি তার মনের ঝড়? কবে থামবে সব! রাতে আবার বাস ধরতে হবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আজ অসুস্থতার বাহানায় ছুটি নিয়েছে। মাসের বেতন থেকে কেটে নিবে আজকের বেতন। তাতেও সমস্যা নেই, নিক। চোখের দেখা তো দেখল রিদিকে।

__

চায়ে চিনি কম হলেই মেজাজ খারাপ হয় মিজান সাহেবের। ডাক্তার চিনি কম খেতে বলেছেন। ডায়াবেটিস বর্ডার লাইনে। তার ভাষ্যমতে সে এত চিনি খায় না, শুধু তিনবেলা চায়ে আর মাঝে মাঝে মিষ্টিতে খায়। একটা মানুষ তিনবেলা চায়ে যদি দুই চামচ চিনি খায় তাহলে আর কি বাকি থাকে? কিন্তু তাকে এই কথা কে বুঝাবে?

স্বামীর ডাকে রাহেলা ছুটে আসলেন। আজ তিনি চিনিই দেন নি চায়ে। মিজান সাহেব চায়ে চিনি দিতে বলাতে রাহেলা জানালেন তিনি এই কাজ করতে পারবেন না। কারণ দ্বীপ বারণ করেছে। বাবা মায়ের ঝগড়ার মাঝে দ্বীপ বাসায় আসল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ভিজে ছুপছুপ হয়ে বাসায় ফিরেছে। তাকে দেখে ঝগড়া থেমে গেল।

গোসল সেরে হালকা নাস্তা করে বেরিয়ে গেল বৃষ্টি মাথায় করে দ্বীপ। চট্টগ্রামবাহী বাসে চড়ে মনে হতে লাগল একবার যদি কথা বলতে পারত রিদির সাথে মনের আফসোস টা কেটে যেত। ঠিক সেই সময়ে ফোন আসল। ও পাশ থেকে রিদি বলল,

– দ্বীপ আমি খুব দুঃখিত। আপু যাবে আমি জানতাম না।

দ্বীপের ঠোঁটে হাসির রেখা। জবাব দিল,

– সমস্যা নেই। ইনশাআল্লাহ আমাদের আবারও দেখা হবে।

সিক্তগলা রিদির,

– তোমার এত ভালো হওয়া ঠিক হয় নি দ্বীপ।

– আমি শুধু তোমার ক্ষেত্রেই ভালো রিদি, বাকিদের ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধার নই। বাদ দাও কার ফোন থেকে কল দিলে?

রিদি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘ আপুর ফোন থেকে। আর কখনো কথা হবে না আমাদের। আপু মাত্র বলল তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ এটা জানিয়ে যেন ফোন দিই৷ তাই দিলাম। কিছুক্ষন আগে মিরা এবং প্রমাকে ফোন দিয়ে বলেছে ওরা যেন আমাকে সাহায্য না করে। তুমি ভালো থেকো।’

জানালার বাইরে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল জিহান,

‘ আবার মার খেয়েছ আজ?’

রিদির কান্নার আওয়াজ দ্বীপকে এলোমেলো করে দিয়েছে ভেতর থেকে। সম্পর্কে জড়ালে এত কষ্ট হতে হবে কেন? ওর কত বন্ধু সম্পর্কে আছে কই তারা তো কষ্ট পায় না। তবে সে কেন পাচ্ছে?

হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল, ‘রাখি। ভাল থেকো।’

‘পরীক্ষা টা ভালো দিও। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।’

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ