#নিষ্ঠুর_নিয়তি
পর্ব – ৬
Kzal Mithun
আমাদের বাবাটা পচা হয়ে গেছে আম্মু ! বাবার জন্য আমি বন্ধুদের সামনে মুখ দেখাতে পারছি না । বাবার সামনে যেতে আমার এখন নিজেরই লজ্জা লাগে আম্মু ! তুমি অসুস্থ , তাই তোমাকে কিছু বলতে পারছি না আমি । বলতে বলতে আলিফ আমার বুকের মধ্যে ফুপিয়ে কেদে উঠলো । ছ্যাৎ করে উঠলো আমার বুকের ভিতরটা। নিজের সন্তানের মুখে স্বামীর বদনাম শুনতে সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছিলো আমার । সন্তানদের সামনে ওদের বাবাকে সবসময় একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছি । কখনও ছোট হতে দেয়নি । অথচ আজ আমার আঠারো বছরের ছেলেটা তার বাবার চরিত্র নিয়ে শংকিত !
নিজেকে সামলে নিলাম । আলিফের দুই কাঁধে হাত রেখে একটা ঝাঁকুনি দিলাম । কি হয়েছে ? কি বলতে চাচ্ছিস তুই ? কি করেছে তোর বাবা , যার জন্য তুই মুখ দেখাতে পারছিস না ?
আলিফ কাপা কাপা হাতে ওর ফোনটা আমার সামনে ধরলো ।
ফোনের স্ক্রিনে সিয়ামদের বিয়েবাড়ির আলো-আঁধারিতে মাহবুব আর শায়লার অতি ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি। শুধু তাই নয়, আলিফ আঙুল দিয়ে স্ক্রল করে আরও কিছু পুরনো চ্যাট আর ছবি দেখাল—মাহবুবের অফিসের এক জুনিয়র কলিগের সাথে বছরখানেক আগের কিছু আলাপ। আম্মু জানো – আমার এক ফ্রেন্ড আমাকে এই ছবিগুলো পাঠিয়েছোট । ও বাবাকে ছবির এই মহিলাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে দেখেছে কয়েকদিন । আরো কি দেখেছে জানো …..! হাত উচিয়ে ছেলেকে থামিয়ে দিলাম । চুপ কর …আলিফ !
আমি দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই সেই মানুষ, যার রুচি আর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করতে করতে আমি নিজের জীবন পার করে দিলাম । অথচ এই মানুষটাই অন্য এক নারীর কাছে তাকে ‘ক্ষেত’ আর ‘ভুটকি’ বলে উপহাস করছে। গোপনে গোপনে অন্য নারীর সাথে হোটেলে … ছি ! ছি ! আর ভাবতে পারছি না আমি । নিজের সমস্ত আত্মত্যাগ এক মুহূর্তে অর্থহীন মনে হলো আমার ।
আলিফ ভাঙা গলায় বলল, “আজকে বড় চাচা ওদেরকে ড্রইংরুমের কোণায় ওভাবে কথা বলতে দেখে ফেলেন। উনি নিজেই আড়াল থেকে ছবিগুলো তুলে আমাকে পাঠিয়েছেন। বড় চাচা লজ্জিত আম্মু, কিন্তু উনি চাননি সিয়ামের বিয়েতে কোনো হুলস্থুল হোক। তাই আমাকে দিয়ে বলেছেন তোমাকে শান্ত রাখতে।”
ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এলো। আমার ভাশুরের পাঠানো বার্তা: “মেজো বউ, আমি বড় লজ্জিত। মাহবুব যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। তবে সিয়ামের বিয়ের অনুষ্ঠানটা কেটে যেতে দাও। এসব বিশ্রি ব্যাপার নিয়ে লোক জানাজানি হোক সেটা আমি চাচ্ছি না । তবে অবশ্যই এর একটা বিহীত আমি করবোই । আমি মাহবুব আর শায়লাকে শাস্তি দিবো । শুধু তুমি শক্ত থাকো।”
আমি ফোনটা উপুড় করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। কোনো নাটকীয় প্রতিশোধের চিন্তা আমার মাথায় এলো না। শুধু মনে হলো, দীর্ঘ চব্বিশ বছরের চেনা সংসারটা এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।ও আল্লাহ ! এই বিপদ থেকে একমাত্র আপনিই রক্ষা করতে পারেন । বুক চিরে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বের হলো আমার !
এদিকে কমিউনিটি সেন্টারে গাড়ির জটলা থেকে নেমে মাইশা যখন হাঁটছিল, তার মনের ভেতর কালকের নোংরা কমেন্টগুলো তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিল। ছোট চাচি সুমি আর তার তথাকথিত কানাডিয়ান আত্মীয় রাফসানের সস্তা মতলবটা সে ধরে ফেলেছে। সমাজ একটা মেয়ের সামান্য অসাবধানতা দেখলেই তাকে ছিঁড়ে খেতে আসে, আর আপন মানুষগুলো তাতে নুন-মরিচ মাখায়—এই নিষ্ঠুর সত্যটা মাইশা আজ প্রথম হাতেনাতে বুঝল।মনে মনে বললো – সরি আম্মু ! সেদিন যদি তোমার কথা শুনতাম ! তাহলে হয়তো এমন বাজে পরিস্থিতির সন্মুখীন আমাকে হতে হতো না ।
সে বিয়েবাড়িতে পৌঁছে কোনো হুলস্থুল করল না। সুমি ও রাফসানকে স্রেফ এড়িয়ে চলল। নিজেকে সস্তা প্রমাণ করার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। অনুষ্ঠান শেষের দিকে, যখন সবাই স্টেজে ছবি তুলতে ব্যস্ত, মাইশা তার ফোনের ফেসবুক লাইভটা অন করল। কোনো উগ্রতা বা পাল্টা আক্রমণ নয়, সে অত্যন্ত শান্ত ও পরিপক্ব গলায় দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলল:
“কালকে আমার একটা পারিবারিক নাচের ক্লিপ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। মানুষের চরিত্র বিচার করাটা বোধহয় খুব সহজ। আজ আমি আপনাদের কোনো বিনোদন দিতে আসিনি। শুধু দেখাতে এসেছি, নাচ একটা শিল্প , সস্তা বিনোদন নয়।”
মাইশা , ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্লাসিক্যাল মিউজিক অন করে নিজের মতো করে ভরতনাট্যমের কয়েকটা শুদ্ধ মুদ্রা প্রদর্শন করল। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আর শরীরী ভাষায় কোনো সস্তা আবেদন ছিল না, ছিল এক ধরণের তীব্র আভিজাত্য আর জেদ। নাচ শেষে সে লাইভটা বন্ধ করে দিল। লাইভের কমেন্ট বক্সে ততক্ষণে নিন্দুকদের কথা বলা বন্ধ হতে শুরু করেছে। মাইশা বুঝতে পারল, নিজেকে প্রমাণ করতে গেলে সমাজকে গালি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, নিজের ব্যক্তিত্বই যথেষ্ট। অনুষ্ঠান শেষ করে সে আর সুমিদের গাড়িতে ফিরল না । একটা সিএনজি নিয়ে একাই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
রাত একটা নাগাদ সবাই বাসায় ফিরল। ড্রইংরুমের পরিবেশ তখন বরফের মতো ঠাণ্ডা। আমি একা সোফায় সোজা হয়ে বসে আছি । ভেবেছিলাম ছোট জা সুমি আজকে হয়তো আর আমার বাসায় আসবে না । কিন্তু না ! মোবাইল ভাঙার প্রতিশোধ নিতে সে ঠিকই চলে এসেছে আমার বাসায় । তাছাড়া ,বড় জায়ের বাসায় এতো সস্তা ভাত নেই যে দুই / তিনদিন ফেলে ওদেকে ফ্রি খাওয়াবে । বড্ড বেশি হিসেবী মহিলা ।
ছোট জা সুমি ঘরে ঢুকেই একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “কী মেজো ভাবি, ফোন ভাঙার পর এখন কেমন লাগছে তোমার ? তা , রাগ কি কমলো ? আমাদের তো তোমার বাসায় মেহমান পর্যন্ত পাঠাতে দিলে না, এখন শান্তিতে আছো তো ?
আমি সুমির দিকে তাকালাম । আমার চোখ দুটো এত শান্ত আর শীতল ছিল যে , সুমি কিছুটা থমকে গেল। আমি খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বললাম , “সুমি, অন্যের মেয়েকে ভাইরাল করার নেশায় তুমি এতটাই মত্ত যে, তুমি নিজেই কার কার সাথে অনলাইনে কী কি করে বেড়াচ্ছো , কার কার টাকা পয়সার লেনদেন করতেছো আর জুয়া খেলতেছো , সেই খবরটা মনে হয় রাখো না । ভুলেই গেছো । আরো বললাম – শুনেছি তুমি নাকি বিগো লাইভ করেও টাকা ইনকাম করো ? তোমার হাসব্যান্ড রফিক (ছোট দেবর) হয়তো এখনও জানেই না যে , তোমার এই অভ্যাসের কারণে অলরেডি তোমার ওপর কতটা দেনা জমেছে। আমার কথা শুনে আৎকে উঠলো ছোট জা । মুহুর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো ওর মুখটা । সুমি বুঝতে পারছিলো না যে , মেজো ভাবির মতো একটা বোকা সোকা মানুষ. এতো কিছু জানলো কি করে ? একটু থতমত খেয়ে ঢোক গিলে বললো – মানে ? কি বলতে চাও তুমি মেজো ভাবি ?
আমি কোনোরকম ভনিতা ছাড়াই সুমির কিছু চ্যাটের স্ক্রিনশট রফিকের ফোনে ফরোয়ার্ড করে দিলাম । ছোট বউর কিছু আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপও ছোট দেবরকে শেয়ার দিলাম । এগুলো আলিফ আমাকে জোগাড় করে দিয়েছিল । যদিও এসব নোংরা বিষয় নিয়ে ছেলের সাথে আলাপ করতে আমার রুচিতে বাঁধছিলো । কিন্তু নিতান্ত বাধ্য হয়েই আমাকে এগুলো করতে হচ্ছে । আর কতো মুখ বুজে থাকবো ?
রফিক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে এই ধরণের আর্থিক কেলেঙ্কারি এক বড় বিপর্যয়। রফিক কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে থাকলো । সুমি নিজেকে সামলে নিয়ে রফিকের হাত থেকে মোবাইলটা ছো মেরে কেড়ে নিতে গেলো । হেচকা টান দিয়ে রফিক হাতটা সরিয়ে নিয়েই কষে একটা থাপ্পর লাগালো সুমির গালে । আচমকা থাপ্পর খেয়ে সুমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো । তারপর আমার দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো – মেজো ভাবি তুমি এতো নিচ ? আমার মোবাইল ভেঙেও শান্ত হলে না তুমি ? শেষ পর্যন্ত আমার স্বামীর চোখে আমাকে এইভাবে ছোট করলে ? এসব মিথ্যে ভিডিও কোথায় পেয়েছো তুমি ?
প্রচন্ড রেগে গেলাম আমি । ইচ্ছে হচ্ছে আরো একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিই সুমির গালে । বেয়াদব মহিলা ! স্বামীর কাছে ধরা পড়ে এখন আমাকে মিথ্যাবাদি বানানোর চেষ্টা করছে । কিন্তু রাতদুপুরে আর ঝামেলা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না । শান্ত এবং শীতল কন্ঠে বললাম – সত্যি মিথ্যে যাচাই করার মতো বুদ্ধি বিবেচনা তোমার হাসব্যান্ডের আছে সুমি । আর বিশ্বাস করো – এগুলো কিছুই করার ইচ্ছে বা মন মানসিকতা আমার ছিলো না । তুমি আমার এবং আমার মেয়ের পিছনে এমনভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলে ! তাই বাধ্য হয়েছি তোমাকে থামাতে । এটা না করলে তুমি হয়তো আরো ভয়ানক কিছু করে ফেলতে । তারপর রফিককে বললাম – বউকে নিজের বাসায় নিয়ে যেয়ে শাষণ করো । এখন রুমে যাও প্লিজ ।
আর কোনো চড়-থাপ্পড় বা চিৎকার হলো না, কিন্তু সুমির মুখটা এবার ভয়ে আরো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার পর শুধু সুমির চাপা কান্না আর অনুনয়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আমি বুঝলাম , সুমির অহংকার ভাঙতে কোনো নাটকীয়তার প্রয়োজন ছিল না, তার নিজের অপরাধই যথেষ্ট।
সবাই যার যার ঘরে চলে যাওয়ার পর, ড্রইংরুমে অমি একা চুপচাপ বসে রইলাম । কিছুক্ষন পর দেখলাম আমার হাসব্যান্ড ড্রইংরুমে এসে উকি দিচ্ছে । আমি তার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবে বললাম – কিছু বলবা ? ভিতরে আসো । কি মনে করে সে রুমে ঢুকলো । আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে কি যেনো বলতে গিয়েও থেমে গেলো । তারপর
নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আমি বললাম , “একটু বসো মাহবুব। কথা আছে।”
মাহবুব কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “রাতদুপুর এসব ভালো লাগছে না নাজমা। সারাদিন বিয়েবাড়ির ঝামেলার পর ক্লান্ত আমি।”রুমে আসো , আমার শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে । একটু ম্যাসাজ করে দিবা । এক সেকেন্ড ও দেরি করলাম না আমি । ফট্ করে বলে উঠলাম – কেনো ? শায়লা তোমাকে ম্যাসাজটা দেয়নি বুঝি ? আহারে ! একান্ত করে যাকে কাছে পেতে চাইলে , সে তোমার কষ্টটা বুঝলো না ..বুঝি ? তারপর আরো একটু কথার মধ্যে রহস্য আর তাচ্ছিল্যে ঢেলে দিয়ে বললাম – মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে এমন চিকনি চামেলির মতো ফিগারওয়ালা ডিভোর্সি বেটিরে এতো সহজে বিছানায় নিতে পারবা না মিস্টার মাহবুব রানা ! এর জন্য তোমাকে আরো খরচা করা লাগবে বুঝছো ?
আকাশ থেকে পড়লো যেনো আমার হাসব্যান্ড ! ওর মুখটা জাষ্ট দেখার মতো হলো । মুহুর্তে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলো লোকটা । মানে , কি যে সে বলবে সেটা বুঝতে পারছে না । চোখ দুটো বড় বড় করে , ভিষণ ; ভিষণ অবাক হয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো সে ।
কথায় এর একটু মরিচের ঝাঁঝ মিশিয়ে বললাম – বেটা মাইনষের মেয়ে মানুষ দেখলে একটু ছোঁক ছোকানি লাগে সেটা জানতাম । তাই বলে – নিজের ভাইসতার বিয়েতে তুমি পুরানো প্রেমিকারে পাইয়া . এককেবারে তারে জড়ায় ধইরা প্রেম ভিক্ষা কইরা বসলা …!
হায়রে …! এইজন্যই মনে হয় মানুষ বলে – পুরুষের যখন কামনা জাগে .. সে নাকি তখন পশু হয়ে যায় ..!
চলবে ….!
