#নিষ্ঠুর_নিয়তি
পর্ব – ৫
Kzal Mithun
আমি তোমাকে একান্তে কাছে পেতে চাই শায়লা ।একদম নিজের করে কাছে পেতে চাই । সেই ভারসিটি লাইফের মতো । তোমার মনে আছে শায়লা ? ভাবি যখন সিয়াম আর সারাকে স্কুলে দিতে যেতো , তখন তুমি কলেজ ফাঁকি দিয়ে বাসায় চলে আসতে ! আমিও তখন ভারসিটির ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ভাইয়ার বাসায় চলে আসতাম ! তারপর তো …….উফ্ ! কয়েক ঘন্টা ধরে ইচ্ছে মতো তোমাকে অন্তরঙ্গ ভাবে কাছে পেতাম । তুমি কিন্তু সেই সাহসি ছিলে । বাপরে …! কোনো ডর – ভয় ছিলো না তোমার ! কতবার ভাবির কাছে ধরা পড়তে পড়তে বেচে গেছি বলো তো ? তুমি কি দারুভাবে ম্যানেজ করে ফেলতে সে সময় !
জানো ? আমার খুব ইচছে হচ্ছে আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই । বিশ্বাস করো শায়লা ! এতো বছর পর তোমাকে কাছে পেয়ে , আমি যেনো কেমন ছেলেমানুষ হয়ে গেছি ! আমার আর তর সইছে না ! প্লিজ তুমি না করো না । বলেই শায়লার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরলো নাজমার হাসব্যান্ড , মাহবুব ।
শায়লা , নাজমার বড় জায়ের ছোট বোন । দুই সন্তানের মা , ডিভোর্সি । মহিলা দেখতে শুনতে খুব একটা ভালো না । তবে বেশ স্মার্ট, সেই কলেজ লাইফ থেকেই । মহিলা এখনও তার ফিটনেস ধরে রেখেছে । মাহবুবের হাতদুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরে মিষ্টি হেসে শায়লা বললো – এতো অধৈর্য হচ্ছো কেনো তুমি ? সব হবে । আগে সিয়ামের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো শেষ হোক , পরে আমরা অবশ্যই একান্তে সময় কাটাবো । সেই পুরানো প্রেম নতুন করে ঝালাই করবো আবার ।কি বলো ? বলেই মুখে বাম হাত চাপা দিয়ে খিক খিক করে চাপা হাসি দিলো শায়লা । পরক্ষনেই শায়লা মুখে অভিমানের ভাব এনে আদুরে গলায় বললো – কিন্তু ! তোমার বউ যদি জেনে যায় ? তখন কি হবে ? তুমি তো তখন আমাকে আর চিনবেই না ।
ঠোঁট উল্টে মাহবুব বললো – আরে ধ্যুর ! ওর কথা বাদ দাও তো । ও জানলেই কি আর না জানলেই কি ? আমি কি ওকে ডরাই নাকি ? শালা গাউয়া ক্ষ্যাত একটা । দিন দিন তো ভুটকি হচ্ছে , চেহারার কোনো যত্ন নেই । ওকে দেখলে এখন আমার জাস্ট বিরক্ত লাগে ।
আচ্ছা ! সিয়ামের বিয়েতে তোমার বউ আসছে না কেনো ? কাল হলুদে এলো না । আজকে বিয়ের প্রোগরামেও দেখছি না । কি ব্যপার বলো তো ? তোমাদের কি ঝামেলা চলতেছে নাকি ?
ব্যস্ত হয়ে মাহবুব বললো – আরে নানা ! সেরকম কিছু না । নাজমার শরীরটা ভালো নেই । প্রায় দু , সপ্তাহ হলো – ফ্লোরের উপর পা পিছলে পড়ে গিয়ে ওর একটা পা মচকে গেছে । পায়ে প্লাস্টার করা । ঠোঁট কেটে সেলাই লেগেছে দুটো । বেচারি ঘর বন্দি হয়ে আছে বেশ কয়েকদিন হলো ।
বাব্বাহ্ ! বউয়ের প্রতি তো দেখি দরদ উথলে উঠছে ? ছাড়ো আমার হাত । যাও , তাহলে বউয়ের কাছে যাও ! বলেই শায়লা নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিতে গেলো । অস্থির হয়ে মাহবুব এবার আচমকা জড়িয়ে ধরলো শায়লাকে । প্লিজ শায়লা ! এভাবে বলো না । ভালো নেই আমি । বিশ্বাস করো , সংসার জীবনে আমি ভিষণ অসুখী । আমি তোমার কাছে একটু সুখ ভিক্ষা চাই । আমাকে ফিরিয়ে দিও না প্লিজ !
বর – কনে সহ সবাই যখন কমিউনিটি সেন্টারে চলে গেছে , তখন শায়লা আর মাহবুব , বড় ভাইয়ের বাসার ড্রইংরুমের এক কোনায় দাড়িয়ে এমন একান্ত আলাপে মগ্ন । ওরা ভাবছে কেউ দেখছে না । অথচ এক জোড়া চোখ আর কান , অনেকক্ষন ধরেই ওদেরকে ফলো করছে । নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে , মনে মনে ভাবছে – সংসার জীবনে মাহবুব অসুখী ? ও ভালো নেই ! এটা কিভাবে সম্ভব ? ওদেরকে দেখে তো কখনও মনে হয়নি যে ওরা অসুখী ? মাইশা আর আলিফের মতো ওদের ফুটফুটে দুটো সন্তান আছে । নাজমার মতো একজন শান্ত , ভদ্র , মার্জিত স্ত্রী থাকা সত্তেও একটা মানুষ অসুখী থাকে কেমন করে ? নাকি , মেয়ে মানুষ পটানোর এ এক নতুন কৌশল মাহবুবের । নাহ্ ! বিষয়টা তো তলিয়ে দেখতে হচ্ছে !
এই চলো ! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো । সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে । তাড়া দিলো শায়লা । আর একটু থাকো না প্লিজ ! আরো একটু আবেগি হলো মাহবুব । ইস্! বুড়ো বয়সে ভিমরতি ! ছাড়ো শিগগির ! কেউ দেখে ফেললে কিন্তু বিপদ হবে । ওহ – হো ! যাওয়ার আগে আমাকে একটু বুথে যেতে হবে বুজছো ?
শায়লাকে ছেড়ে দিয়ে রানা নিজের চুল আর টাই ঠিক করতে করতে বললো – এটিএম বুথ ? কেনো ?
আরে সিয়ামকে বিয়ের গিফট দিতে হবে তো । ভাবছি ! ওদেরকে হানিমুনের টাকাটা আমি দিবো । পঞ্চাশ হাজার দিলেই তো হবে তাই না ? বলেই শায়লা নিজের হাত ব্যাগের ভিতর কি যেনো খুঁজতে লাগলো । ধ্যুর ছাই ! কোথায় যে রাখি একেকটা জিনিস ! ইদানিং কিছুই মনে থাকে না বুজছো ? কিছু না দিলে তো মান সন্মান থাকবে না আমার ।
কি পাচ্ছো না ? কোতুহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলো রানা । আরে এটিএম কার্ড টা । মুখে দুশচিনতার ছাপ এনে বললো শায়লা । আরে এটা নিয়ে এতো ভেবো না । পরে পাওয়া যাবে । আমার কাছে কার্ড আছে । কতো লাগবে ? বলেই রানা শায়লার কাঁধে হাত দিয়ে বললো – চলো !
মনে মনে একটা পৈচাশিক আনন্দ নিলো শায়লা ।
___________
গাড়ির মধ্যে আনমনা হয়ে বসে আছে মাইশা । অনেককিছু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ওর । মনটাও ভালো নেই । মুখটা ভয়ানক গম্ভির করে আছে মাইশা । ভিতরে ভিতরে বেশ অস্থিরতা কাজ করছে ওর । কালকে ওর নাচের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে অনেক , অনেক মেসেজ এসেছে ইনবক্সে । এখনও আসছে । কি সব বাজে বাজে কথা লিখছে ওকে মেসেজে ।কমেনটেও লিখে চলেছে সব খারাপ খারাপ কথা –
কেউ লিখেছে এক রাতের জন্য রেট কত ? কেউ লিখেছে – এসব নাচনেওয়ালিদের তো কেউ বিয়ে করবে না । কেউ লিখেছে – তোমার ব্যাক সাইড টা কিন্তু সেই … সুন্দর ! আহা ! খেলা হপপে বেবি…! কি সব বাজে বাজে ইমোজি সেন্ড করেছে । কেউ তো এমন কথাও লিখেছে – আরে খনিক ! তোরে বিয়া কইরা আমি চান্দা তুইল্যা ডিভোর্স দিমু ! আর যে ছেলের সাথে মাইশা নাচ করেছে , সে তো সেকেন্ডে সেকেন্ডে , মিনিটে মিনিটে , মেসেজ করেই চলেছে । বিরক্ত ধরিয়ে দিচ্ছে লোকটা !
ওফ্ আল্লাহ ! দুই কানে হাত দিলো মাইশা । বিড়বিড় করে বললো – আমি আর নিতে পারছি না । মানুষ এতো খারাপ হয় কি করে ? আমাকে না চিনে , না বুঝে – শুধুমাত্র একটা নাচ দেখেই ওরা আমার চরিত্র বিশ্লেষণে লেগে গেলো মানুষগুলো ? একবারও ওরা ভাবছে না , এতে একটা মেয়ের ভিতরে কতটা এফেক্ট করতে পারে ! হায়রে মানুষ !
কালাম ভাই – সামনের গলিতে একটু দাঁড়াবেন । একজনকে নিতে হবে । ড্রাইভারকে বললো মাইশার ছোট চাচি সুমি । ভাবনায় ছেদ পড়লো মাইশার । একটু অবাক হলো মাইশা – গাড়িতে তো যায়গা নেই । ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে ছোট চাচচু ! পিছনে আমি , চাচি আর চাচাতো ভাই পিকলু । পিকলুর বয়স এগারো হলেও স্বাস্থ্য বেশ ভালো । আমরা তিনজনই তো পেছন সিটে চাপাচাপি করে বসেছি ।
সামনের গলিতে গাড়ি থামলো । রাস্তায় দাড়িয়ে আছে কালকের সেই ছেলেটা, যার সাথে মাইশা হলুদের অনুষ্ঠানে নাচ করেছিলো । আশ্চর্য ! ওকে কেনো এই গাড়িতেই নিতে হবে ? ভ্রূ কুঁচকালো মাইশা । তাহলে কি আম্মু ঠিকই বলেছে ? ছোট চাচির নিশ্চয় কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে আছে আমাকে নিয়ে । আম্মু বিয়ের অনুষ্ঠানে আসার আগে এটাও বলেছে – নিজের আত্মসম্মানে বাধে , এমন কোনো কাজ কখনও করবা না । এতে কিন্তু নিজেকে হ্যাংলা প্রমানিত করা হয় । তুমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছো । আশা করি আম্মুর কথার মানে , একদিন না একদিন তুমি ঠিকই বুঝতে পারবা । চোট চাচির দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্তি নিয়ে মাইশা জিজ্ঞেস করলো – উনি কি তোমাদের আত্মীয় হয় নাকি ?
এক গাল ফেইক হাসি দিয়ে সুমি বললো – আরে হ্যা হ্যা ! রাফসান আমার খালাতো বোনের ছেলে । জানিস ! ও কানাডাতে পড়াশুনা করে । ওর কিন্তু গ্রাজুয়েশন শেষ । তাইতো দেশে এসেছে । ক’ দিন পর আবার কানাডা চলে যাবে ।
সুমি ভেবেছিলো রাফসানের পরিচয় পেয়ে মাইশা হেববি খুশি হয়ে যাবে । কিন্তু মাইশা ওর চাচিকে একদম পাত্তা দিলো না । বরং চাচির কথা শুনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো । বললো – তো ! রাফসানের বিজ্ঞাপনি প্রচার আমার সামনে করার মানে কি চাচি ?
সুমি একটু থতমত খেয়ে গেলো । নিজেকে সামলে নিয়ে বললো – একটু সরে বস না ! রাফসানকে একটু বসার যায়গা দে ।
চাচির কথায় গুরুত্ব না দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলো মাইশা । তারপর রাফসানকে বললো – আপনি উঠে বসেন । আরে তুই নামলি কেনো ? ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো মাইশার ছোট চাচা । তুই একটু সরে বসলেই তো হয় । গাড়ি থেকে নামার কি হলো ? খুব রাগ হলো মাইশার ওর ছোট চাচার উপর । নিজে পিছন সিটে এসে লোকটাকে ড্রাইভারের পাশের সিটটা দিলেই তো হতো । সেটা না করে উনি আমার পাশে এই বলদটাকে বসাতে চাইছে । তার মানে ছোট চাচচুও চাচির ফাঁদে পা দিয়েছে । বুঝিনা – পুরুষ মানুষগুলো বউয়ের কথা শুনে কেনো এমন ছাগল মার্কা আচরন করে ?
তোমরা চলে যাও চাচি ! আমি আমার মতো ঠিক পৌছে যাবো । বলেই মাইশা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো । মাইশার ছোট চাচা গাড়ি স্লো করে বললো – আরে তুই একা যেতে পারবি তো ? অযথা জিদ করিস না । হাত নেড়ে মাইশা বললো – আমি ইউনিভার্সিটিতে নিয়মিত একা যাতায়াত করি চাচচু ! সো আমাকে নিয়ে ভেবো না । আমি সময় মতো পৌছে যাবো দেখো ।
__________
আলিফ বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় থাকলেও তার চোখ মুখের অবস্থা মোটেও স্বাভাবিক ছিলো না । আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে তড়িঘড়ি করে তার হাতের মোবাইলটা বালিশের নিচে লুকানোর চেষ্টা করলো । আলিফের এই চোরের মতো ভঙ্গি দেখে আমার বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠলো । আমার ছেলেটা বরাবরই চাপা স্বভাবের । সহজে কিছু বলতে চায় না । আমি ওর বিছানার পাশে গিয়ে বসলাম । এক পা খোড়া বলে বসতে গিয়ে একটু টাল খেলাম , ও সাথে সাথে আমাকে ধরে ফেললো – আম্মু ! সাবধানে বসো । ব্যথা পাবা তো ।
আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম । কি রে আব্বা ! রেডি হয়েও গেলি না কেনো ? তোর বোন আর তোর বাবা তো সেই কখন চলে গেছে ।আলিফ প্রথমে কোনো কথা বললো না । শুধু ওর লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকালো । তারপর হঠাৎ করেই আমার বুকে কাল ভোরের মতো করে মুখ লুকালো ।
বুকের ভিতরটা হা হা করে উঠলো আমার । ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম – কি হয়েছে আমার কলিজার টুকরাটার ? কি হয়েছে আব্বা ? বল আম্মুকে ! আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে ।
আলিফ রক্ত লাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো – তোমাকে আমার অনেককিছু বলার আছে আম্মু ! কিন্তু তুমি তো অসুস্থ ! এসব কথা এখন সহ্য করতে পারবা না । আরো অসুস্থ হয়ে পড়বা তুমি …!
চলবে ……!
