Friday, June 5, 2026







হৃদিতে রিদি পর্ব-০৭

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৭.

আজ রিদির জন্মদিন। দ্বীপ অনুরোধ করেনি তাকে সময় দেয়ার জন্য কেবল বলেছিল প্রাইভেট এর সামনে এসে উপহার দিয়ে চলে যাবে। রিদি নিজ থেকেই বলল দেখা করবে, কোথাও বসবে। শহর থেকে কিছুটা দূরে রেস্টুরেন্ট আছে সেখানেই যাবে। বাসায় ভয় যদি আব্বু,আম্মু জেনে যায়, কলেজে ভয় রানা। জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে গেল রিদির। একটু স্বস্তি চাচ্ছে। জন্মদিন না হলেও দ্বীপকে বলত কোথাও একটা বসার জন্য। জন্মদিন হওয়াতে সুযোগটা লুপে নিল।

বিকেলের প্রাইভেটে আজ যাবে না, এ কথা দ্বীপকে বলেনি কারণ পড়ার ক্ষতি করে দেখা করবে জানলে রাজি হত না । জানিয়েছে আজ প্রাইভেট নেই। প্রাইভেটের সামনে থেকে রিকশা নিয়ে রিদি সামনে এগিয়ে গেল। দ্বীপ সেখান থেকে উঠল। রিদি এই প্রথম বাবা ছাড়া কোনো পুরুষের সাথে একই রিকশায় উঠেছে। দ্বীপের মনে হল রিদি অস্বস্তিবোধ করছে। নেমে যেতে চাইল। রিদি আটকে দিল। রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দেখল বেলুন বিক্রেতা, বেলুন বিক্রি করছে। রিদি সেদিকে ছুটে গেল। দ্বীপ বেলুন কিনে দিতে চাইলে রিদি বারণ করল। এই বেলুন নিয়ে যেতে পারবেনা বাসায় তাই কিনে লাভ নেই।

দুই গ্লাস লাচ্ছি অর্ডার দিয়েছে সাথে টুকটাক অ্যাপিটাইজার। লাচ্ছির গ্লাস টার দিকে রিদিকে ঠোঁট উলটে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল,

‘ কোনো সমস্যা? ‘

রিদি মুখটাকে প্যাঁচার মত বানিয়ে বলল, ‘ না এদের সার্ভিস ফালতু।’

দ্বীপ বুঝতে পেরে নিজের গ্লাসটা রিদিকে দিল। রিদির টা নিজে নিয়ে বলল, ‘ এখন খাও, আমি এটাতে মুখ দিই নিই।’

রিদি প্রশ্ন করল, ‘ তুমি কি টিস্যুসহ খাবে নাকি? গ্লাস টা চেঞ্জ করো৷ আমি বুঝিনা লাচ্ছির গ্লাসের উপর টিস্যু দিতে হবে কেন? দিলো যখন ওরা খেয়াল করবে না যে টিস্যু ড্রিংক্সে মিশে গিয়েছে। ‘

মুচকি মুচকি হেসে দ্বীপ বলল, ‘ ওরা তো আর জানত না এখানে ভুল ধরার জন্য রিদি আসবে৷ আমার সমস্যা নেই, তুমি তোমার টা খাও। টিস্যুই তো। উঠিয়ে ফেলে দিচ্ছি। খাবার নষ্ট করা উচিত না। মাথা ঠান্ডা কর৷ এছাড়া টিস্যু দিয়েছে হাইজিন মেইনটেইন করতে। আনহাইজেনিক হয়ে যাবে বুঝতে পারেনি। ‘

রিদি লজ্জা পেল। তৎক্ষনাৎ রেগে যাওয়ার স্বভাবটা আর গেল না। সব কিছুতেই রেগে যায়। দ্বীপ এত ঠান্ডা থাকে কেন সব পরিস্থিতিতে। রানার সাথে সেদিন কত ঠান্ডা মাথায় কথা বলল। প্রথম দিকের কিছু কথা শুনলেও পরের গুলো শুনতে পায় নি ভিড়ের জন্য। রেগে গেলেও প্রকাশ করে না। শুধু হাসে।

এই হাসিতেই আশেপাশের মানুষ সহজে গলে যায়। এই মাত্র রিদি আবার দ্বীপের প্রেমে পড়ল। দ্বীপ উপরের টিস্যু যতটুকু সম্ভব ফেলে স্ট্র দিয়ে লাচ্ছি টানতে গিয়ে রিদির দিকে চোখ গেল। রিদি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। লাচ্চির গ্লাস টা একপাশে রেখে লজ্জা পেয়ে হাসি দিয়ে বলে, ‘ এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আচ্ছা যাও খাব না এই লাচ্ছি। কিন্তু লাচ্ছি টা মজা। ‘

রিদি হেসে বলে, ‘ আমি তো তোমাকে দেখছিলাম। খাও খাও টিস্যু মিশ্রিত লাচ্ছি বেশ মজা। অনেক টুকুই তো খেয়ে ফেলেছ। ‘

দ্বীপ হেসে রিদির দিকে উপহার এগিয়ে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। রিদি খেতে খেতে উপহার খুলে দেখল একটা ঘড়ি। বেশ সুন্দর। সাথে এক বাক্স চকলেট। ঘড়িটা দ্বীপ পরিয়ে দিতে চাইল। রিদি বারণ করল। দ্বীপের মনে হল সে ভুল করেছে, অনুমতি না নিয়ে পরাতে চাওয়া উচিত হয় নি । রিদি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ পরিয়ে দাও।’

অনুমতি পেয়ে খুশি মনে পরিয়ে দিচ্ছে দ্বীপ। রিদি বলল, ‘ আমার ভয় হয় কাছাকাছি আসতে, পাশাপাশি বসতে, একসাথে খেতে ; যদি শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকতে না পারি।’

হাত থমকে গেল দ্বীপের। রিদির দিকে তাকাল। রিদি বলেই যাচ্ছে, ‘ গতকাল সন্ধ্যায় আব্বু আম্মু কথা বলছিল, তখন দুলাভাই ফোন দিয়ে আব্বুকে একটা পাত্রের কথা বলল। আমার বিয়ের জন্য। আব্বু পাত্র দেখতে বলল। যদি পছন্দ হয়ে যায়, আমার এইচএসসির পর বিয়ে হয়ে যাবে। এছাড়া ছোট চাচ্চু তো আব্বুকে রানার কথা বলেছে। আব্বু নিষেধ করে দিয়েছে। রাজনীতি করলে আব্বু বিয়ে দিবে না। আব্বুর ধারণা রাজনীতি করা ছেলেরা উগ্র হয়। এমন ধারণা হওয়ার পেছনে কারণ ও আছে। আমার ছোট মামা রাজনীতি করে। সারাক্ষণ মিটিং, মিছিল এসবে ব্যস্ত। বিয়ে করেছিল ভালোবেসে সেই সংসার ও টেকে নি। এসব দেখে আব্বু তিতিবিরক্ত। তবে দুলাভাই এর আনা পাত্রটা নাকি ভাল। ওটার দিকে বেশ মনোযোগ আব্বুর। ‘

দ্বীপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবে?’

‘ আমাদের বংশে মেয়েদের একটু আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পর যত খুশি পড়তে পারবে। আপুর বিয়েও তাড়াতাড়ি হয়েছে। বিয়ের পর পড়াশোনা শেষ করেছে। সেই হিসেবে আমার টাও হবে। যদি বিয়ে হয়ে যায় তখন কি হবে?’

দ্বীপ চুপ করে আছে। মনোযোগ দিয়ে শুনে বলল,

‘ কি আর হবে? বিয়ে করে আরেকজনের সংসার করবে৷ আর এদিকে আমার কি হবে জানি না। আচ্ছা এখন এসব না তুললে হয় না? আর যদি বল যে এখনই বিয়ে দিয়ে দিবে তোমাকে, তবে আমি আব্বুকে পাঠাচ্ছি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তোমার আব্বুর কাছে। চলবে?’

‘ ইন্না-লিল্লাহ! কি বলছ এসব। তুমি এখন কিভাবে বিয়ে করবে? আগে স্যাটেল হও। আব্বু যদি জিজ্ঞেস করে ছেলে কি করে? তখন কি উত্তর দিব? বিজনেসম্যান আব্বু পছন্দ করে না। ফুটবলার শুনলে তো মুখের উপর না করে দিবে। ‘

শান্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে দ্বীপ। কিছুক্ষন বসে রিদিকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের বাসায় গেল ৷ ফিরতে বেশ রাত হল। রাহেলা ছেলেকে ভাত বেড়ে দিয়ে বললেন, ‘ তুমি তো চাকরি করবে না, তোমার বাবা বলল সিতারাপুরের জায়গা টা বিক্রি করে তোমাকে কিছু টাকা দিবে যাতে ব্যবসা করতে পারো , ব্যবসার ব্যাপারে কিছু কি ভাবলে?’

দ্বীপ খেতে খেতে বলল, ‘ আম্মু বিজনেস করব না। চাকরি করব। আব্বুকে বলেন জায়গা টা থাক। ওটা আমাদের শেষ সম্বল। ‘

রাহেলা চমকে উঠলেন। কি বলে এই ছেলে! যে ছেলে চাকরির নাম শুনলে বাড়ি মাথায় করত সে ছেলে বলে চাকরি করবে! নিজেকে ধাতস্থ করে ছেলেকে বলল, ‘ তুমি তো চাকরি করতে চাও নি আগে, আজ হঠাৎ? ‘

‘ হঠাৎ না আম্মু, ব্যবসায় ঢুকার আগে তো অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন। আমার তো অভিজ্ঞতা নেই। তাই কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা নিই। পরের টা পরে ভাবব।’

‘ চাকরি কি পেয়েছ?’

‘ রেদোয়ান ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম আজ, উনি যে চাকরিটার কথা বলেছিলেন ওই ইন্টারভিউ টা দিব।’

‘ ওইটার তো বেতন কম।’

‘ শুরুতেই কে লাখ টাকা দিবে আম্মু? ওই দশ/ এগারো দিয়েই শুরু হয়। কষ্ট না করলে তো সফলতার মুখ দেখব না।’

রাহেলা ভাবলেন, ছেলের কথা তো ঠিক। ছেলের সাথে একমত হলেন। পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
‘ ফুটবল?’
‘ হয়ত ছেড়ে দিব। কি লাভ এত খেলে। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে খেলে যাচ্ছি অথচ এখন পর্যন্ত জাতীয় লীগে খেলতে পারলাম না।’
‘ এত তাড়াতাড়ি ধৈর্য্য হারা হয়ে যাবে?’
‘ দেখি চাকরির কি অবস্থা। হয়ে গেলে নাহয় টুর্নামেন্টের সময় ছুটি নিয়ে আসব।’

মাথা ঝাকালেন রাহেলা। চুপ করে কি যেন ভাবছেন। মাকে অন্যমনস্ক দেখে দ্বীপ প্রশ্ন করল,
‘ কি ভাবছেন আম্মু?’
‘ ভাবছি তোমার ফুফুর কথা। যা তান্ডব করে গেল, তোমার আব্বু তো চিন্তায় পড়ে গেছে। এদিকে তোমার দাদীকে কত কি বুঝিয়েছে। কানে কম শুনে বলে তাকে দিয়ে বলাতে পারল না। ‘
‘ আচ্ছা আম্মু আপনি আমাকে একটা কথা স্পষ্ট বলেন, অঞ্জু বউ হয়ে আসলে আপনি খুশি হবেন?’

রাহেলা খানম নিশ্চুপ। এই নিরবতা যেন অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বীপ হেসে শোবার ঘরে আসল। ফেসবুকে ঢুকে চেক করল কোনো মেসেজ এসেছে কিনা রিদির। না আসাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে রিদির মেসেজ আসল। দুদিন বাদে পরীক্ষা। এখন রাত জেগে পড়বে আর দ্বীপের সাথে কথা বলবে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ রিদি অফলাইন হয়ে গেল। সম্ভবত রিদির মা এসেছে। কিছুক্ষণ পর রিদি মেসেজ দিল,

‘ আম্মু এসেছিল। আমি শুয়ে তোমাকে মেসেজ দিচ্ছি।’

রিদি শুয়ে হেসে হেসে মেসেজ দিচ্ছিল। দ্বীপ কথা কম বলে। যা বলার সবসময় রিদি বলে। দ্বীপ মেসেজ দিল, ‘ ভালোবাসি কথাটা কি কখনও বলবে না?’

রিদি সরাসরি কখনওই বলে নি। দ্বীপ জোর ও করেনি। আজ এই প্রশ্ন করাতে রিদি বিচলিত হল। মেসেজ লিখল, ‘ সময় হলে বলব। ‘

ঠিক তখনই রিদির ফোনটা কেড়ে নিল নিল কেউ একজন। আচানক এমন কিছু ঘটাতে রিদি লাফিয়ে উঠল। চিৎকার দিল। আমিনা দ্রুত দরজা লাগিয়ে মেয়ের গালে কষে চড় মারলেন। ধরা পড়ে গিয়ে রিদি ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আমিনা বেগম এন্ড্রয়েড ফোন নিয়ে গেলেন এবং এর সাথে ছোট বাটন ফোনটাও। রিদির মাথায় হাত। সব শেষ! এভাবে ধরা পড়বে ভাবতে পারেনি৷ কেন শুতে এসেছিল? দ্বীপ সেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে,আজ কেন দ্বীপকে ঘুমাতে দিল না? কেন জাগিয়ে রাখল?

দ্বীপের সারা রাত অস্থিরতায় কেটেছে। ফোন বন্ধ রিদির। হয়ত রিদি ঘুমিয়ে গিয়েছে নতুবা চার্জ শেষ অথবা ওর মা ফোন নিয়েছে, কত কত চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । পরদিন সকালে প্রাইভেটেও আসেনি। ফোন বন্ধ। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। রিদির সব প্রাইভেটে গিয়েছে। মিরা এবং প্রমাকে জিজ্ঞেস করল। ওরাও জানেনা কিছু। মিরা বাসায় ফোন দেয়ার পর আমিনা জানালেন রিদি অসুস্থ। দ্বীপের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল।

__

এমনিতেই মন খারাপ, গত দুদিন ধরে রিদির কোনো খবর নেই। তার উপর রাস্তায় জ্যাম। সামনে একটা সাইকেল এক্সিডেন্ট হয়েছে। দ্বীপ নেমে গিয়েছে রিকশা থেকে। সাইকেল আর রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে। দ্বীপ সামনে এগিয়ে দেখে রিকশা যাওয়ার অবস্থা নেই। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর হেঁটে সামনে আসতেই এক বন্ধু বাইক সমেত সামনে এসে দাঁড়াল। বন্ধুর বাইকে উঠে বাসার পথে রওয়ানা দিল। অকস্মাৎ বাইক জোরে একটি রিকশার সাথে ধাক্কা খেল। বাইক থেকে ওরা দুজনই নিচে পড়ে গেল। রিকশাওয়ালা এবং যাত্রী সুস্থ আছে। দ্বীপের বন্ধু তো সরাসরি গালি দিয়ে বসল রিকশাওয়ালাকে। রিকশাওয়ালা ও গালি দিচ্ছে বাবা মা তুলে ৷ বাবা মা তুলে গালি দিচ্ছে দেখে রিকশাওয়ালাকে মারতে গেল দ্বীপ। যা কখনও করেনি। মারতে গিয়েও হাত নামিয়ে ফেলল।

চিৎকার দিয়ে ধমকে উঠল ,’ বাপ মা তুলে কথা গালি দিলি কেন, তোর রাস্তা এটা? উলটা পাশে আসছিস কেন? তোদের আসলে স্বভাবই খারাপ। উলটা পালটা রিকশা চালাবি আর এক্সিডেন্ট হলে দোষ বাইক এর নতুবা অন্য গাড়ির। ‘

রিকশায় বসা যাত্রীকে বললেন, ‘ আংকেল আপনিও বা কেমন? কিছু বললেন না কেন এই ফাজিল কে উলটা রাস্তায় আসছে যে? ‘

ভদ্রলোক চোখ গরম করে বলল, ‘ ও নাহয় ভুল করেছে, তুমি গায়ে হাত তুলতে চাইলে কেন? রক্তের গরম দেখাও? পারিবারিক শিক্ষা নেই?’

দ্বীপ মেজাজ হারিয়ে বলল, ‘ তুলিনি তো। না তুলতেই এভাবে কথা বলছেন, তুললে কি করতেন? আপনাদের জন্যই এক্সিডেন্ট গুলা হয় বুঝছেন। আপনি ওরে নিষেধ করলে এই রাস্তায় আসত না। নিজে তো ওর ভুল শুধরে দিলেন না উল্টো আমার শিক্ষার দিকে আঙুল তুলছেন। ওরে মাটিতে ফেলে মারা উচিত ছিল। ‘

‘ বেয়াদপ ছেলে, মুখ সামলে কথা বলো। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না? বাবা মা শেখায় নি কিভাবে বড়দের সম্মান দিতে হয়?’

‘ আপনি নিজের সম্মান রাখলেন কোথায়?’

মানুষ জড়ো হয়েছে। দু পাশে মীমাংসা করে যে যার যার পথে চলে গেল। দ্বীপ আর ওর বন্ধু ফার্মেসীতে ঢুকে ড্রেসিং করে নিল। দ্বীপের হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত অনেকটুকু ছিলে গিয়েছে। গুটানো হাতা খুলে হাত ঢেকে নিল যাতে মা না দেখে।

__

কাল থেকে কাঁদছে। রাতে আমিনা চড় মেরেছেন, দিনে কোনো প্রাইভেটে যেতে দেন নি। ইচ্ছেমতো বকেছেন। বাড়াবাড়ি করলে রিদির বাবাকে জানিয়ে দিবে বলেছেন। মেয়ে এত উচ্ছনে কখন গেল যে তিনি টেরই পান নি, ওই দুশ্চিন্তায় ঘুম উবে গেল।

সারাদিন রিদি তেমন কিছু খায়নি। আমিনা বেগমের রাগ উঠলে খাবার বেড়ে দেন না। রিদির সাথেও সেই কাজ করেছেন। জাবেদ সাহেব বেশ কয়েকবার ডাকলেন মেয়েকে। প্রতিবারই রিদি শরীর খারাপ বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। দম বন্ধ লাগছে তার। মা দুটো ফোনই নিয়ে গেল, কারো সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। এমনকি বান্ধবীদের সাথেও না।

রাত দুটো, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমিনা এবং জাবেদ সাহেব ৷ রিদি জানে ফোন রুমের ওয়ারড্রব এর উপর থাকে। পা টিপে টিপে বাবা মায়ের রুমে ঢুকে ফোনটা নিয়ে এল। এনেই সবার আগে মেসেজ দিল দ্বীপকে,

‘ দ্বীপ আমি ধরা পড়ে গিয়েছি। আম্মু দুটো ফোন নিয়ে গিয়েছে। আমাকে চড় মেরেছে৷ যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেছে তোমার সাথে।’

এতটুকু সেন্ড করার এক মিনিট পর রিপ্লাই, ‘ কালকে কলেজ আসো যেভাবে হোক। একবার তোমাকে দেখব শুধু।’

মেসেজ লিখে ঘাড় ঘুরাতেই দেখে আমিনা দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আৎকে উঠল বুকের ভেতর। আজকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। রিদির দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে। রুমের দরজা লাগয়ে বিছানা ঝাড়ার শলাটা নিয়ে রিদিকে এলোপাতাড়ি মারল। আর বকতে বকতে বলল,

‘ নিজের সব শেষ করছি তোদের জন্য। বাবার বাড়ি বেড়াতে যাই না, চাকরি হইছে তাও করি নাই সন্তান যদি মানুষ করতে না পারি, বাসায় অতিথিদের দাওয়াত দিই না তোর পরীক্ষা বলে। আর তুই কিনা ফষ্টিনষ্টি করিস। আজ মেরেই ফেলব। বেঁচে থেকে করবি কি? যেই মানুষটা মেয়ে মেয়ে করে জান দিচ্ছে সে যদি জানে মেয়ে দিন দিন উচ্ছনে যাচ্ছে দুঃখে কষ্টে মরে যাবে। এরচেয়ে তুই মর, তোর কারণে সাদা শাড়ি পরতে পারব না।

আছাড় দিয়ে রিদির এন্ড্রয়েড ফোনটা ভেঙে ফেলেছে। শলার মারের দাগ শরীর জুড়ে। এই অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে রিদি ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে আমিনা নিজে রিদিকে প্রাইভেট এবং কলেজে নিয়ে আসল৷ দূর থেকে রিদিকে দেখল দ্বীপ। রিদির সাথে ওর মাকে দেখে যা বুঝার বুঝে নিয়েছে। আমিনা মেয়েকে কলেজে দিয়ে বাসায় চলে এলেন। ছুটির সময় নিতে আসবেন। ঠিক তখন মিরার ফোনে মেসেজ আসল,

‘ আজকে এগারোটায় কলেজে দেখা করতে পারবে রিদিকে নিয়ে? পুরোনো বিল্ডিং এর সামনে।’

‘ জি ভাইয়া পারব।’

দ্বীপ বাসায় এসে থ মেরে বসে আছে। গতকাল রাত থেকে চোখের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। আগামীকাল একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। সেই সংবাদ টাও জানাতে পারল না রিদিকে। এগারোটা বাজার দশ মিনিট আগেই পুরোনো বিল্ডিংয়ের সামনে এসে অপেক্ষা করছে।

রিদি দূর থেকে দ্বীপ কে দেখে এগিয়ে এল। দ্বীপ কোনো কথা না বলে রিদির হাত এবং গাল দেখে শিউরে উঠল। দগদগে দাগ, ফুলে ফুলে আছে। কিছু জায়গায় র ক্ত ভেসে উঠেছে। ইচ্ছে করল ছুঁয়ে আদর করে দিতে। রিদি তখনও কাঁদছে। দ্বীপ কাঁপা গলায় বলল,

‘ আর কথা বলো না আমার সাথে। আমি নিজের একটা অবস্থান করে তোমার সামনে আসব। কাল একটা চাকরি ইন্টারভিউ আছে। দোয়া কর যেন হয়ে যায়।’

রিদি কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করল, ‘ তুমি চাকরি করবে?’

দ্বীপ ক্ষীণ হেসে বলল, ‘ উপায় আছে আর? ‘

‘ ফুটবল?’

‘ সুখ পেতে শখ ছাড়ব না হয়।’

রিদি কাঁদছে আর দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই ছেলেটা কি পাগল? ছোটবেলা থেকে ফুটবল ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না অথচ সে নাকি রিদির জন্য ফুটবল ছাড়বে? এও সম্ভব? কেউ এত ভালোবাসতে পারে?

মিরা এসে জানাল এদিকে লোকজন আসছে। রিদি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপের ছলছল চোখ দুটো অনেক কিছু বলে দিচ্ছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে নজর লুকানোর আপ্রান চেষ্টা চালাচ্ছে। যাওয়ার আগে দ্বীপের বলা অতি সাধারণ বাক্যটাও বুকের গভীরে গিয়ে লাগল রিদির ,

‘ ভালো থেকো। নিজের যত্ন কর। হাসিখুশি থেকো। পরীক্ষা যেন খারাপ না হয়। পরের বার দেখা হলে যেন আমার দূরন্ত রিদিকে দেখি। আমাকে ভুলে যেও না। খুব ভালোবাসি। ‘

রিদি দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপ চলে যাচ্ছে। মিরাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল রিদি। প্রমাও বান্ধবীর কষ্টে কাঁদছে। মিরা বলল,

‘ জানতাম আমি এমন কিছু হবে। তাই তোকে নিষেধ করেছিলাম। আর কাঁদিস না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ভাইয়া শেষ চেষ্টা করবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। দেখা যাক এবার কি হয়। ‘

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ