#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৬.
দ্বীপদের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। সাজিনার বিয়ে। বংশের একমাত্র মেয়ে সাজিনা। এই বংশে ছেলের অভাব না থাকলেও মেয়ের বড্ড অভাব। দ্বীপের চাচাদের ও কারো মেয়ে নেই। তাই সাজিনা থাকে সবার আদরে এবং ভালোবাসায়। সাজিনাকে সাজাচ্ছে দ্বীপের ফুফাতো বোন অঞ্জনা। সাজিনার ছোট। রিদনের বয়সী। সবাই সাজিনাকে পার্লারে সাজতে বলেছে কিন্তু হলুদে সাজিনা পার্লারে সাজতে চাইল না। একদম খাঁটি বাঙালি ধাঁচে সেজেছে। আগামীকাল সাজবে পার্লারে, স্কিন সেনসিটিভ এত এত সাজ তার স্কিনে সইবে না। তাই আজ হালকা পাতলা সাধারণ থাকতে চেয়েছে।
অঞ্জনার সাজানোর হাত ভাল। তাল তলা রোডে পুকুরের পাশে তিনতলা ভবনের দোতলায় ভাড়া থাকেন মিজান সাহেব তার পরিবার নিয়ে। আজ প্রায় দশ বছর এই বাড়িতে থাকেন। পুকুরের পাশে এই বাড়িটা তার বেশ পছন্দ। বাড়িওয়ালা ও ভীষন ভালো মানুষ। ছিমছাম এই পরিবারকে পছন্দ করেন। এই পরিবারের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাড়িওয়ালা নিজ উদ্যোগে পুরো বাড়ি সাজিয়েছেন। ছাদে প্যান্ডেল করা। ভবনের সকলের মাঝে বেশ আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক। রিদন, দ্বীপ সবাই ব্যস্ত ছুটোছুটিতে৷ দ্বীপের ফোনটা সাজিনার রুমে চার্জে আছে। বেশ কয়েকবার বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাজিনা অঞ্জনাকে বলল,
‘ অঞ্জু দেখতো কে ফোন দিয়েছে?’
অঞ্জনা উঠে গিয়ে দেখে ফোনের স্ক্রিনে লিখা ‘ Madam ‘ ঠোঁট উলটে বলল, ‘ আপু কোনো এক ম্যাডাম কল করেছে। ‘
সাজিনার ভ্রু কুচকে বলল, ‘ নাম নেই ম্যাডামের?’
অঞ্জনা উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘ নাহ। ধরব?’
সাজিনা মাথা নেড়ে বলল, ‘ না না ধরিস না, ভাইয়া রেগে যায় ভাইয়ার জিনিস ধরলে। বাদ দে। ‘
‘ যদি প্রেমিকা হয়?’
সাজিনা মৃদু ধমকে বলল, ‘ কি বলিস যা তা। হয়ত কোনো ম্যাডাম-ই।’
‘ তবে নাম নেই যে?’
এই মেয়েটা তো এত পাকনা। কথা বেশি বলে। তবে ওর কথা একেবারে ফেলে দেয়ার মত ও নয়।
এবার চিন্তায় পড়ে গেল? ভাই কি প্রেম করে? প্রেম করলে তো আরেক ঝামেলা সামনে হাজির হবে। ফুফু তফুরা যে তার মেয়ে এই বাড়িতে বউ করে পাঠাতে মুখিয়ে আছে এই কথা সকলের জানা। সরাসরি প্রস্তাব না দিলেও বছর খানেক আগে ইনিয়েবিনিয়ে বলেছিল এই কথা। কিন্তু ভাইয়ের চালচলনে তো বুঝা যায় না সে প্রেম করে। তবুও মন সায় দিচ্ছে না। অঞ্জনাকে নিষেধ করল। অঞ্জনা কথা না শুনে ফোন রিসিভ করে ফেলল। হ্যালো বলার আগেই পেছন থেকে দ্বীপ টান দিয়ে ফোনটা নিয়ে নিল। ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করছে। সাজিনা বুকে থুতু দিয়ে বললো, ‘ ভাইয়া বেশ কয়েকবার ফোন বাজছিল, তাই…’
‘ আমার অনুমতি ছাড়া ফোন ধরা অপছন্দ করি তুই জানিস না?’
‘ দুঃখিত ভাইয়া।’
দ্বীপ ফোন হাতে বেরিয়ে গেল। অঞ্জনা বুকে হাত দিয়ে বলল, ‘ আমি একশো ভাগ শিউর এটা প্রেমিকা।’
‘ তাতে তোর কি? এখনই চিবিয়ে ফেলত।’
‘ আমার ই তো সব।’
অঞ্জনা বিড়বিড় করলেও কথাটা স্পষ্ট সাজিনার কানে পৌঁছাল। মেয়ে হিসেবে অঞ্জনা খারাপ না তবে মুখ চলে বেশি। সাজিনার মন খারাপ হয়ে গেল। মন থেকে চাইল যেন ভবিষ্যতে সংসারে ঝামেলা না হয়। সুখের সংসার তাদের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন ঝামেলার আভাস পাচ্ছে।
__
কানে ফোন রেখেই ডেকোরেশন এর লোকদের সাথে চিল্লাচিল্লি করছে। রিদি ও পাশ মুচকি মুচকি হাসছে আর শুনছে দ্বীপের চিৎকার। দুইদিক একসাথে সামলাতে হচ্ছে দ্বীপকে। রিদি ফোন রেখে দিতে চেয়েছিল। দ্বীপ রাখতে দেয় নি। অনেক দিন পর কথা বলার সুযোগ পেয়েছে হাত ছাড়া করে কিভাবে? রিদিদের বাসার দোতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। তিনি দেখা করতে এসেছেন আমিনার সাথে। এই সুযোগে রুমের দরজা লাগিয়ে রিদি কথা বলছে।
‘ এদিকের লাইট টা জ্বলছে না কয়বার বললাম। এ্যই রিদন এটা চেক করা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে হাত ঠ্যাং ভাঙবে মানুষের। ‘
থেমে গিয়ে রিদিকে বলল, ‘ তুমি পড়ছ না কেন? পড়ার আওয়াজ যেন আমি শুনতে পাই। ‘
রিদি ফিক করে হেসে বলে, ‘ ও পাশে আমার প্রিয় মানুষটা গরম গরম ভাব দেখাচ্ছে আমি এইপাশে পড়ি কী করে? তোমাকে কি আজকে খুব সুন্দর লাগছে সবুজ পাঞ্জাবীতে?’
‘ বেক্কল আর বলদের মত লাগছে। ঘেমে নেয়ে একাকার আমি।’
‘ আমি জানি আমার বেক্কলের দিকে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। আমার বলদ সুন্দর। ‘
ও পাশ থেকে দ্বীপের অট্টহাসি শোনা যাচ্ছে। রিদিও মুখ চেপে হাসছে। দ্বীপের কানে ফোন দেখে রিদন আড়ে আড়ে দেখছে। ভাইকে ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছেনা তবে কিছু একটা আন্দাজ ঠিকই করতে পারছে। প্রায় ঘন্টা খানেক পর ফোন রাখল। সাজিনাকে আনা হল স্টেজে। দূরে একপাশে বসে ছিল দ্বীপ। পারিবারিক ছবি তোলার সময় গিয়ে, বোনকে সামান্য হলুদ লাগিয়ে চলে আসল। বোন কালকে চলে যাবে এই ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। সারাক্ষন এটা লাগবে, ওটা লাগবে, এটা করিস নি কেন? ওটা ভুল হল কেন? এসব বকা খাওয়ার মানুষ টা আর থাকবে না। শ্বশুর বাড়িতে সাজিনা কেমন থাকবে? ওকে আদরে রাখবে তো? এসব ভাবতে ভাবতে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। ভবনের কোল বেয়ে বেড়ে উঠা নারকেল গাছের পাতা গুলো নড়ছে বাতাসে। শীত চলে গিয়েছে, গরমের দাবদাহে অতিষ্ঠ প্রকৃতি ।
__
রাস্তার ওই পাশে মানুষটা প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকত। আজ আসতে রিদি নিজেই বারণ করেছে। সারা রাত জেগে ছিল কমিউনিটি সেন্টারে। বাবুর্চিদের পাহারা দিয়েছে। ভোর চারটায় মামা, চাচাদের বসিয়ে ঘুমাতে গিয়েছে। কিছু ঘন্টাও যদি না ঘুমায়, মানুষ টা তো অসুস্থ হয়ে যাবে।
প্রাইভেট থেকে বের হয়ে দেখে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মিরা আর প্রমা মুচকি মুচকি হাসছে। রিদি কপালে হাত চাপড়াচ্ছে। অন্যদিকে দ্বীপ চোখ কচলাচ্ছে। চোখে এখনো ঘুম তা স্পষ্ট। দেখা করে রিদি প্রাইভেটে চলে গেল, দ্বীপ বাসায় ফিরে এল। বাসায় এসে সোফায় শুয়ে পড়ল। ড্রইং রুমে ফুফু তফুরা, মিজান সাহেব এবং অন্য ভাইদের নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার বিষয় হল অঞ্জনা এবং দ্বীপের বিয়ে। মিজান সাহেবের ছোট ভাই মাহফুজ সাহেব বললেন,
‘ জিহানের তো পড়াশোনা শেষ, অঞ্জু ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এখন মনে হয় বিয়ের কথা আগানো যায়। ‘
রাহেলা ট্রে তে করে চা হাতে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
‘ মাহফুজ , সাজিনার বিয়েটা শেষ হোক এরপর নাহয় ভাবি। ‘
তফুরা কেঁদে উঠল। মিজান সাহেব রাহেলা খানমকে ইশারা দিলেন চুপ থাকতে। তফুরার স্বামী বললেন,
‘ মরার আগে মেয়েটার গতি করতে পারলে খুশি হতাম। বড় ভাইজান সম্মতি দিলে যে কদিন আছি এই কদিনের মধ্যে আংটি বদল টা হয়ে যাক।’
মিজান সাহেব বেশ ইতস্তত বোধ করলেন। তিনি জানেন দ্বীপ সব টা শুনেও চুপ করে আছে। তাই ছেলের দিকে ঠেলে দিলেন মত,
‘ বিয়েটা তো জিহান আর অঞ্জুর। ওদের জিজ্ঞেস কর। ওরা রাজি থাকলে আমি দ্বিমত করব না।’
মাহফুজ সাহেব বললেন, ‘ জিহানের কি মত নিব? ও তো ছোট মানুষ। ‘
দ্বীপ শোয়া থেকে উঠে বসল। ট্রে থেকে এক কাপ চা নিয়ে বলল, ‘ তাহলে ছোট মানুষের বিয়ে করার ও প্রয়োজন নেই চাচ্চু। বড় মানুষ দেখে আপনাদের ভাইঝিকে বিয়ে দিন। আমার বিয়েতে মত নেই।’
তফুরার গালে হাত। রাহেলার ঠোঁটের কোণে হাসি। মিজান সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলেন। ইশারা দিতেই রাহেলা চোখ ঝাপটালেন। তফুরা হাহাকার করে উঠল,
‘ এটা কি কইলি বাবা, তাহলে কি অঞ্জুর কথা ঠিক। তোর অন্যদিকে লাইন আছে? তোদের বিয়ে তো জন্মের পরই ঠিক করছিলাম৷ এই বন্ধন কেমনে ভাঙবি তুই?’
দ্বীপের মাথা গরম করা উত্তর, ‘ খুব বড় ভুল করে ফেলছ ফুফু। জন্মের আগে আম্মুর পেটে থাকতে গায়েবানা বিয়ে পড়িয়ে দিতে। তাহলে পেট থেকে বের হওয়ার সময় জানতাম আমি কারো স্বামী হয়ে জন্ম নিয়েছি। কিন্তু যার স্বামী হয়েছি তার এখনও জন্মই হয় নি। ‘
তফুরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দ্বীপ নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিল। এদিকে দ্বীপের দাদী দরজা ভেঙ্গে ফেলার উপক্রম। এই মহিলার একমাত্র কাজ দ্বীপ দরজা লাগালেই দরজা ভাঙা। বাইরে থেকে ডাকছে। ঘড়িতে বাজে সকাল সাড়ে নয়টা। বাড়ির অতিথিরা সব নিরব হয়ে গিয়েছে এই ঘটনার পর। আজকের ঘটনার জন্য অঞ্জু দায়ী স্পষ্ট। পারিবারিক ভাবে ঠিক করা বিয়ে গুলোতে যদি কারো দ্বিমত থাকে পরবর্তীতে এই ব্যাপার গুলো ফ্যামিলি পলিটিক্স এর কাতারে পড়ে যায় যে জিনিসটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।
রুম থেকে বের হয়ে ধমকাল সাজিনাকে, এখনও পার্লারে না যাওয়ার কারণে। খালাতো বোনদের বকা শুরু করেছে কেন কেউ সাজিনাকে নিয়ে বের হচ্ছে না। দ্বীপের মত শান্ত, নিরিবিলি প্রাণী একটিও নেই এই বাসায়। ছেলেটা রাগে না, কাউকে আঘাত করে কথা বলে না। মাই ডিয়ার টাইপ পারসোনালিটি অথচ আজ ছেলেটাকে রাগিয়ে দিল। সাজিনার কান্না পেল ভাইয়ের আচরণে। আজ সে চলে যাবে অথচ ভাই তাকে এভাবে সবার সামনে বকল। সব দোষ ফোনের ওই ম্যাডাম এর। সাজিনা তাকে কখনো মেনে নিবে না। রিদন ভয়ে ভাইয়ের পাশে ঘেষছে না।
মিজান সাহেব ভাইবোনদের থামিয়ে দিলেন নিজে ব্যাপারটা দেখবেন জানিয়ে। দুপুর একটা নাগাদ সবাই বিয়ে বাড়ি পৌঁছে গেল। দ্বীপ রিকশার উপর বসে আছে। রিদি কলেজ থেকে বের হবে সেই সময়। দ্বীপকে দেখেই মুখে হাত দিল। রিদির দেয়া স্ট্রাইপের অফ সাদা ফরমাল শার্ট আর কালো প্যান্ট পরেছে আছে। দেখতে সাহেব বাবু লাগছে। রিদি তৎক্ষনাৎ ফোন দিয়ে বলল,
‘ বাবু মশাই এভাবে দিন-দুপুরে কলেজ ছুটির সময় আসা অনুচিত। যে কোনো মুহুর্তে যে কেউ আপনার ম্যাডামের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।’
রিদিকে রিকশায় উঠতে দেখে দ্বীপ হেসে নিজের রিকশাওয়ালাকে সামনে আগাতে বলল। ফোনে জবাব দিল, ‘ আমাকে আপনি বহুবার দেখেছেন আপনার পছন্দের বেশে। শুধু এই গরীবের চোখ দুটো অতৃপ্ত রয়ে গেল ম্যাডামকে মনের মত সাজে না দেখে।’
‘ সময় হোক। ম্যাডাম ধরা দিবে বাবু মশাই। ‘
‘ আমার চুল না পাকলে হয়।’
দুজনই একসাথে হাসছে। অথচ কে বলবে এই ছেলে বাসায় একটা রীতিমতো ঝড় তুলে দিয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছেই দেখতে পেল বর পক্ষ চলে এসেছে। আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে যায় সবার সাথে। সাজিনাকে বিদায়ের সময় মা, বাবা কাঁদলেও দ্বীপ এবং রিদন কাঁদেনি। দু’জন ই ভীষণ স্বাভাবিক। শুধু গাড়িতে দুঠার সময় সাজিনার বরের হাত ধরে দ্বীপ বলেছে, ‘ আমাদের ঘরের আলো নিয়ে যাচ্ছেন ভাই, যত্ন করবেন। অযত্নে স্বর্ন ও কালচে হয়। যদি কখনও বোঝা মনে হয় ফোন দিয়ে জানিয়ে দেবেন। আঘাত করবেন না দয়া করে। ‘
সাজিনার বর জড়িয়ে ধরল দ্বীপকে। বয়সে দ্বীপের চেয়ে চার বা পাঁচ বছরের বড় হবে৷ তবুও সম্মানের সহিত বললেন, ‘ ভাইয়া আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন। আপনাদের ঘরের স্বর্ন আমি আমার মাথার তাজ বানিয়ে রাখব। কথা দিলাম।’
দ্বীপের ঠোঁটে হাসি চোখে পানি। হয়ত সুখের পানি। সাজিনার বিয়ের গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার থেকে।
___
গত কয়েকদিন দাওয়াত খেতে খেতে শরীরের অবস্থা ভাল না৷ আজ খেলা আছে। রিদির সাথে সকালে দেখা করে এসেছে। দ্বীপকে তৈরি হতে দেখে রাহেলা রুমে এসে বসলেন। মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে তার মন ভালো না। দ্বীপ চা-তে চুমুক দিয়ে মাকে প্রশ্ন করল,
‘ আম্মু কি হয়েছে? মন খারাপ?’
রাহেলা খানম মাথা নাড়লেন দু পাশে। দ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছে নিশব্দ চাহনীতে। ছেলে মায়ের পাশে বসে মায়ের দু হাত মুঠোয় নিয়ে প্রশ্ন করল,
‘ আম্মু কি লুকাচ্ছেন?’
রাহেলা খানম প্রশ্ন করল, ‘ ওই মেয়েটা কেমন? আমাকে কি পছন্দ করবে?’
দ্বীপ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল, ‘ কোন মেয়েটা?’
‘ যার সাথে তোমার বন্ধুত্ব আছে।’
দ্বীপ মায়ের কথায় কিছুটা বিব্রতবোধ করল। মা রিদির সাথে তাদের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলছেন? ব্যাপার টা খুবই ভালো লাগল। কি সুন্দর, ভদ্রভাবে বললেন৷ এভাবে ও তো বলতেন পারতেন, যার সাথে তোমার সম্পর্ক আছে। অথচ তিনি ওই সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বললেন। অবশ্য বলার পেছনেও কারণ আছে। মায়ের একটাই আফসোস তার কোনো বন্ধু নেই। বাবাকে কখনোই মনে খুলে দুটো কথা বলতে পারেন নি। দুজনের মাঝে স্বামী স্ত্রী, ভালোবাসার সম্পর্ক থাকলেও বন্ধুত্বের সম্পর্কটা অনুপস্থিত।
‘ জিহান…?’
দ্বীপের ধ্যান বিচ্যুতি ঘটল। জবাব দিল, ‘ জি আম্মু।’
‘ ওর নাম কি?’
‘ রিধিমা ‘
‘ বাহ খুব সুন্দর নাম তো। ওকে বলবে আমার ছেলের বউ হতে হলে আগে আমার সাথে সই পাততে হবে। আমি ওকে রিধু ডাকব। ঠিক আছে?’
দ্বীপ মাথা নেড়ে দু চোখের পলক ঝাপটে বলল, ‘ ঠিক আছে, আর কিছু?’
‘ দেখা করাবে কবে?’
‘ ওকে আরেকটু বড় হতে দেন এরপর।’
রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে ফেললেন, ‘ আরেকটু বড় মানে? ও কিসে পড়ে?’
দ্বীপ মাথা চুলকে বলল, ‘ ইন্টারে।’
রাহেলা খানম মুখে হাত দিয়ে বললেন, ‘ আআ! ওমা অনেক ছোট তো। আমাদের রিদনের ও ছোট।’
দ্বীপকে আর লজ্জায় না ফেলে উঠে দাঁড়ায়। নাস্তার ট্রে টা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ মেয়ে ভাল তো?’
দ্বীপ হাসল মৃদু। রাহেলা বেরিয়ে গেলেন। দ্বীপ ও দেরি না করে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে ক্লাবের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল।
খেলা শেষে দ্বীপের বন্ধুরা সবাই কলেজ মাঠে একত্রিত হল। সবার পরনে সবুজ জার্সি। দ্বীপ টিউবওয়েল চেপে মুখ ধুতে ব্যস্ত। মুখ ধুয়ে ঘাড় ঘুরাতেই দেখল কলেজ ছুটি হয়েছে। দলে দলে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছে, একটু সামনে এগিয়ে এলো যদি রিদির দেখা পায়? নারকেল গাছ তলায় এসে দাঁড়াল। জুনিয়ররা সালাম দিচ্ছে। আজকের খেলার আপডেট নিচ্ছে। রিদিকে দেখতে পাচ্ছে প্রমা এবং মিরার সাথে কথা বলতে বলতে আসছে। দ্বীপ কে দেখে হাসি দিল। দুজনের দূরত্ব অল্প কিছু মিটার। আচমকা সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়াল। রিদি থমকে গেল। বাইক থেকে নেমে, হেলমেট খুলে রানা রিদির দিকে আগাল। রিদি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, রানা পেছন থেকে ডাকল,
‘ রিদি পায়ের কি অবস্থা? ব্যাথা আছে?’
রিদি ঘাড় ঘুরাল। এদিকে দ্বীপ বুঝার চেষ্টা করছে, রিদির পায়ের খবর রানা কেন নিচ্ছে? দ্বীপ ও খানিকটা আগাল। রানার সাথে কথা বলার অনিচ্ছা থাকার সত্ত্বে ও রিদি জবাব দিল, ‘ ভাল আছে। ‘
‘ জাবেদ কাকা ভাল আছেন?’
‘ আছে।’
‘ সেদিন আমি দেখিনি, দেখলে তো আর ইচ্ছে করে আত্মীয়ের পায়ে বাইক উঠিয়ে দিতাম না।’
রিদির গা জ্বলে উঠল। দ্বীপ সব শুনতে পাচ্ছে। রানা যেভাবে জোরে কথা বলছে, তা আশপাশের সবার কানে যাচ্ছে। রিদি দেখতে পাচ্ছে দ্বীপ চলে যাচ্ছে মুখ বিষন্ন করে । রিদি পায়ে ব্যাথার কারণ দ্বীপ থেকে লুকিয়েছিল। কলেজের পাতি গুন্ডার কারণে ব্যাথা পেয়েছে এটা শুনলে হয়ত ঝামেলা করবে কলেজে এসে। যেহেতু ফুটবল খেলে মোটামুটি অনেকেই দ্বীপকে চেনে। কলেজে এসে রানার খোঁজ করে যদি বাড়াবাড়ি করতে যায় নতুন ঝামেলা সৃষ্টি হবে।
রানা নিজের পথে চলে গেল। রিদি রানাকে বিচ্ছিরি একটা গালি দিল। প্রমা আর মিরা রিদির মুখে গালি শুনে অবাক হল। রিদিকে প্রশ্ন করতেই রিদি জানাল দ্বীপকে সে কিছুই জানায় নি। মিরা রাগ করে বলল, ‘ সম্পর্কে লুকোচুরি রাখিস কেন? ভাইয়া যদি তোকে এখন ভুল বুঝে এখানে তার অন্যায় হবে না।’
রিদি মন খারাপ করে দ্বীপকে ফোন দিল। দ্বীপ ফোন রিসিভ করেছে। কিন্তু কথা বলছে আরেকজনের সাথে, ‘ তুহিন, কালকে সকালে স্টেডিয়ামে আসিস। ‘
‘ রাফি বাসায় গিয়ে পায়ের যত্ন নেবে। ‘ আরো অনেক কথা। ‘
রিদি রিকশায় উঠে বলল, ‘ আমার সাথে একটু কথা বলো। ‘
‘ তুমি বলো , আমি শুনতে পাচ্ছি। ‘
‘ সরি।’
‘ কেন?’
‘ তোমার কাছ থেকে কথা লুকিয়েছি তাই।’
‘ ইটস ওকে।’
‘ আসলে তুমি শুনলে…।’
‘ রিদি… ব্যাখ্যা দিতে হবে না। তোমাদের নিজেদের ব্যাপার। আমাকে জানানো টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তোমার পা ভালো হয়েছে এটাই অনেক। ‘
‘ নিজেদের মানে?’
‘ রানা তো বলল ও নাকি তোমার আত্মীয়। ‘
‘ হ্যাঁ আমার দূরসম্পর্কের কী যেন হয়। তাই বলে তুমি এভাবে বলবে? আমি কষ্ট পেয়েছি দ্বীপ। ‘
দ্বীপ চুপ করে আছে। জোরে শ্বাস ছাড়ল। রিদি ওই পাশ থেকে শুনতে পেল। চোখ গুলো ছলছল করে উঠল রিদির। দ্বীপ প্রশ্ন করল, ‘ কতদূর গিয়েছ?’
কাঁপা গলায় বলল, ‘ শহীদ মিনারের সামনে।’
‘ রিকশা ঘুরাও। বেশিদূর যাওনি। কলেজে আসো।’
‘ এখন?’
‘ হ্যাঁ।’
‘ কেউ দেখলে।’
‘ তোমার অসুবিধা হোক এমন কিছু করব বলে মনে হয়? ‘
রিদি দু চোখ মুছে রিকশাওয়ালাকে বলল কলেজে যেতে। এদিকে দ্বীপ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিবে সেই মুহুর্তে কোথা থেকে রানা আবার উড়ে আসল। সবার মাঝখানে বাইক ঢুকিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ এসব ফুটবলে পেটের জ্বালা মিটবে না। টাকা কামাইয়ের জন্য ব্রেইন লাগে। ‘
কথাটা যে দ্বীপকে বলল তা স্পষ্ট। দ্বীপ কথা না বাড়িয়ে সামনে হাঁটছে। রানার বাইক অনেক দূর চলে গেছে। গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চ্যালাপেলাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। রিদির রিকশাও এসে থেমেছে খানিকটা দূরে । দ্বীপকে ফোন দিল রিদি৷ দ্বীপ ফোন ধরে বলল, ‘ একটা সুন্দর হাসি দিবে যাতে আমার মন ভালো হয়ে যায়। আরেকটা জিনিস চাইব।’
রিদি মুখে হাসি রেখে প্রশ্ন করল, ‘ কী জিনিস?’
‘ তোমার ওয়াটার পট।’
‘ পানি খাবে?’
‘ হুম।’
রিদি রিকশা ওয়ালাকে দিয়ে দ্বীপের কাছে পানির বোতল টা পাঠাল। দ্বীপ পানির বোতল টা হাতে নিয়ে রিকশাওয়ালাকে পাঠিয়ে দিল। রিদি ফোনে জিজ্ঞেস করল, ‘ পানি খাবে না?’
‘ হ্যাঁ খাওয়ার জন্যই তো রেখেছি। প্রতিদিন পানি খাব। এনিওয়ে এটা আর ফেরত পাচ্ছ না। তুমি এখন যেতে পারো।’
রিদি খিলখিল করে হেসে উঠল। রিকশা তখনও ঘুরে নি। রানাকে দেখে রিদি আড়াল হল। চলেই যেত কিন্তু দ্বীপের সাথে রানাকে কথা বলতে দেখে রিকশাওয়ালাকে একটু আগাতে বলল।
দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে রানা বলল, ‘ নেতা সাহেব, খেতা হয়েছে; মানুষ লাথি দেয়ার পরিবর্তে ফুটবলে লাথি দেয় আহারে। স্টেমিনা কমে গিয়েছে। জায়গা মত পুরুষত্ব খাটাতে পারবে তো নাকি বউ পালাবে?’
আশপাশের জুনিয়র রা সব শুনতে পেল। রিদির দিকে তাকাল দ্বীপ। মেয়েটার মুখে হাত। দ্বীপের বন্ধু, ছোট ভাই সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে ইচ্ছে করে রানা দ্বীপকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করছে। গতবছর কলেজের ভিপি ছিল দ্বীপ। কলেজ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, পদ ও আর নেই । রানা বছরের পর বছর ভিপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ায়। মাস্টার্সে বিগত তিনবছর ধরে আছে। গত বছর দ্বীপের জন্য হেরে গিয়েছে। এই অপমান ভুলে নি।
দ্বীপ বের হওয়ার পর পুনরায় ভিপি হয় রানা। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের ভাষ্যমতে এই আদুভাই রানা জীবনেও পাশ করবেনা ভিপি পদের লোভে। তার জুনিয়রেরা সব বের হয়ে যাচ্ছে অথচ সে আগের জায়গায় লটকে আছে।
মিজান সাহেবের অনুরোধে দ্বীপ ছাত্র রাজনীতি থেকে সরে এসেছে। যার কারণে কলেজে আসা ছেড়ে দিয়েছে। বন্ধু, বড় ভাই এবং শিক্ষকদের সাথে দেখা হলেই সকলের এক প্রশ্ন রাজনীতি ছেড়ে দিলে কেন? দ্বীপ হাসিমুখে জবাব দেয়, ‘ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজনীতির প্রয়োজন নেই। সঠিক সময় প্রতিবাদ করলেই হয়।’ দ্বীপের এত জনপ্রিয়তা রানার পছন্দ হল না ৷ এখনও কলেজে দ্বীপের গুণগান চর্চা হয়। তাই দ্বীপকে সামনে পেলেই খোঁচাতে থাকে। তবে রানা আজ বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
দ্বীপের বন্ধুরা সবাই রানাকে মারতে আসলে, রানার চ্যালাপেলারা এগিয়ে যায়। দু পক্ষের মাঝে হাতাহাতি কারবার হওয়ার আগেই দ্বীপ জোর খাটিয়ে নিজের বন্ধু, ছোট ভাইদের শান্ত করে। রানাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ বিয়ে করে বাচ্চা সহ তোর বাসায় দাওয়াত খেতে যাব। তবে তুই একটু সাবধানে থাকিস। যে মরণ খেলায় নেমেছিস , পুরুষত্বের খায়েশ পরে করিস ; জান বাঁচাতে পারিস কিনা সেটা দেখ। তোর গড ফাদারই তোরে খাবে।’
রানা উচ্চ স্বরে বলল, ‘ নিজেকে কুল দেখাস তাই না, সব পরিস্থিতি সামলাতে পারার নাটক করিস? কি ভাবিস তুই নিজেকে?’
‘ তুই যা ভেবে আমাকে সামনে পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে চাস তাই ভাবি। নতুবা আমার মত সুন্দর ছেলের প্রেমে পড়ার কথা মেয়েদের। তুই তো ছেলে, তুই কেন আমার পিছে ঘুরিস? ‘
‘ খুন করে ফেলব…’
‘ থেমে যা। বলা যায় না, আমি যদি সত্যি খুন হই৷ তখন পুরা কলেজ সাক্ষী দিবে তুই খুনী। সেখানে যদি তুই যদি খুনী না হোস, তবুও বাঁচতে পারবিনা। মুখের কথা প্রমাণ হয়ে থাকে আজীবন। রাজনীতি করতে নেমেছিস, বুদ্ধি খাটিয়ে চলবি। ফাপরবাজি দিয়ে রাজনীতি চলে না। গুরুজনেরা বলেন, ডান হাত দিয়ে খুন করলে বাম হাত যেন টের না পায়। দুই একজনকে কোপাবি ভাল কথা, তবে সেটা মনে মনে রাখবি।এভাবে জনসম্মুখে বললে, জন আক্রোশে পড়বি। তোর গডফাদারও তোর মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নেবে। এনিওয়ে ফ্রিতে অনেক জ্ঞান দিলাম। ভালো থাক।
দ্বীপ সামনে পা আগাল। পুনরায় থেমে বলল,
‘ আরেকটা কথা, তোর চ্যালাপেলা দের আমার পেছনে লাগতে মানা করবি। শুধু যে গোল ঠেকাই তেমন নয়, প্রয়োজনে দু একটা দিতেও পারি। লাত্থি দেয়া শুরু করলে আমি ভুলে যাই কোনটা মানুষের মাথা আর কোনটা ফুটবল।’
চলবে…
