#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৩.
( আজকে মন মেজাজ ভাল না গরমের কারণে। বিদ্যুৎ থাকে না। বহুত কষ্টে লিখেছি। কপি করলে থাপড়াইয়া কানের পট্টি ফাড়ায়ালামু)
শীতের প্রকোপে দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। পশমি সুয়েটার পরে ঘরে ঘরে হাঁটছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে এভাবে হাঁটতে দেখে প্রশ্ন করলেন মেয়ে কি কোনো কারণে চিন্তিত কিনা? মেয়ে মাথা নাড়ল। তিনি মেয়েকে কাছে ডাকলেন।
মেয়েরা তার কাছে ফুলের মত নিষ্পাপ। শাসন তিনি করেন না। মাঝে মাঝে পড়াশোনার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেন। কিন্তু মেয়েদের মাথায় করে রাখেন। ছেলে নেই বলে কত লোকে কত কথা শোনান। তিনি হেসে বলেন, ‘ আমার একটা মেয়ে তোমাদের একশো ছেলের সমান। ‘
আপাতদৃষ্টিতে এই কথা কেমন যেন শোনায় কিন্তু কথা সত্যি। কিভাবে জানেন? বাবারা যখন ভেঙ্গে পড়ে, দুঃখে কষ্টে ছেলের আগে মেয়েরা ছুটে যান। বাবার অসুস্থতায় মেয়ের চোখে পানি আসে। বাবার খাতির যত্নে মেয়েরা অতুলনীয়। পিতার কাছে কন্যা মাতা সম। মায়ের কি তুলনা হয়? আল্লাহ যখন বান্দার উপর খুশি হন তখন তার ঘরে মেয়ে দেন। জাবেদ সাহেব সবসময় বলেন, ‘ আমার ঘরে দুইটা জান্নাত আছে। ‘
রিদি বাবার পাশে বসে বলল, ‘ আমার একটু মন খারাপ।’
‘ কেন মা? আম্মু কিছু বলেছে?’
‘ হ্যাঁ। বলেছে বিয়ে দিয়ে দিবে তাড়াতাড়ি। ট্রেইলর আন্টির ভাইয়ের জন্য দেখছে। আমার লোকটাকে পছন্দ হয় নি। আমাকে ছবি দেখিয়েছে। ভুড়ি ওয়ালা।’
জাবেদ সাহেব হেসে ফেললেন মেয়ের মন খারাপের কারণ শুনে। আদুরে গলায় বললেন, ‘ এই যে বাবার ও তো ভুড়ি আছে।’
‘ তুমি তো এখন বাবা। তাই ভুড়ি হয়েছে। ইয়াং এইজে তো ছিল না। আমি দেখেছি। আপুর বিয়ের সময় ও তো কত সুন্দর ছিলে। এখনও সুন্দর। কিন্তু ওই ছেলে এখনই তোমার থেকে বুড়া। তোমার সুন্দর মেয়ের জামাই ভুড়িওয়ালা হলে কি তোমার ভালো লাগবে আব্বু? বিয়ে তো আমি করব তোমাদের পছন্দে কিন্তু আমাকে কিছুদিন সময় দাও। নিজের পছন্দে করার তো চান্স নেই। ‘
জাবেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘ ভদ্র বাবার ভদ্র ছেলে যদি হয় নিজের পছন্দে করতে পার। কিন্তু তুমি এখনও ছোট। তোমার দুলাভাইকে দেখেছ? তার মত না হলেও তার সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারবে এমন কাউকে প্রয়োজন আমার রিদুর জন্য। যেন আমার মেয়েকে মাথায় করে রাখে। ‘
রিদি শুকনো ঢোক গিলল। কি শীতল শান্ত বাক্য আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। এতটুকুতেই বুঝা যায় বাবা কি চান। রিদি মাথা কাত করল। আমিনা তখন পাশের বাসা থেকে আসেনি। আজকে বাসায় কক্সবাজার থেকে আনা লইট্টা শুকরির তরকারি করেছে। সেটাই দিয়ে আসতে গিয়েছিল ঘন্টা খানেক আগে। মহিলা মানুষ কোথাও গেলে কি আর এত সহজে আসে? রাহা বাচ্চাদের নিয়ে বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়েছে এখনো আসেনি।
__
অনেকদিন পর বন্ধুরা অনলাইনে এসেছে। শীতকালীন অবকাশে অনেকে বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। স্কুল কলেজ বন্ধ। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ফেসবুকে হঠাৎ একটা ছবি দেখে চোখ আটকে গেল। সমুদ্র পাড়ে বসে আছে সন্ধ্যায়। এক পাশে বিশাল সমুদ্র রাশি, অন্য পাশে বালু। হয়তো কক্সবাজারের ছবি। রিদি ওই মানুষটাকে মেসেজ দিল,
‘ ভাইয়া, আপনি কি বেড়াতে গিয়েছেন?’
রিপ্লাই এসেছে, ‘ না একটু কাজে এসেছিলাম চট্টগ্রাম। মামার বাসায় এসেছি। গতকাল কাজিন রা বলল কক্সবাজার আসবে তাই চলে এলাম। আমার সমুদ্র ভালো লাগে।’
‘ আমি কখনও যাই নি।’
‘ চলে আসো। আমি এখনও বীচে হাঁটছি একা। ‘
‘ এত রাতে? প্রায় একটা বাজে।’
‘ রাতে হাঁটার মজাই আলাদা।’
‘ আপনার গার্লফ্রেন্ড রাগ করে না এভাবে একা ঘুরতে যান যে। আমার বান্ধবীরা রাগ করে ওদের পছন্দের মানুষ একা গেলে। ‘
‘ আমার পছন্দের মানুষ আমি নিজে। আমার কেউ নেই। সিংগেল থাকার এই এক মজা। কোনো শাসন-বারন থাকে না। ‘
‘ কয়দিন থাকবেন?’
‘ কক্সবাজার দুদিন। সেন্টমার্টিন একদিন। ‘
‘ সেন্টমার্টিন কি খুব সুন্দর? ‘
‘ অসাধারণ, চমৎকার একটা জায়গা। আমার মত নিঃসঙ্গ। সাগরের মাঝে একাকী থাকে। আমিও দ্বীপ, সে ও দ্বীপ।’
‘ আপনার আসল নাম ও দ্বীপ?’
‘ হ্যাঁ, তুমি কি ভেবেছিলে তোমার তুষারের মত আমিও নকল?’
‘ আমার তুষার বলবেন না মেজাজ খারাপ হয়।’
‘ ঠিক আছে সরি।’
‘ আপনার নাম টা সুন্দর। সচরাচর শোনা যায় না এই নাম তাই ভাবলাম আর কি।’
‘ আমার পুরো নাম শাহদ্বীপ জিহান। আইডিতে দ্বীপ দিগন্ত দিয়েছি। দিগন্ত আমাকে ছোট মামা ডাকে।’
‘ ওয়াও নাইচ নেম। ‘
‘ ধন্যবাদ। ‘
‘ তোমার নাম ও সুন্দর। বিভা মানে তো আলো।’
রিদি অনলাইন থেকে বের হয়ে গেল। এখন বেশি মেসেজ দিলে বিভা নাম যে নকল তা বুঝে যাবে।
এছাড়া রাহার মেয়ে নুভা নড়ছে ঘুমের মাঝে। রিদি ভয়ে ফোনটা রেখে দিল। নুভা দেখলে দিনে সবাইকে বলে দিবে, খালামনি রাতে ফোন চালায়।
দেখতে দেখতে ছুটিটা প্রায় শেষ। এই কয়দিন আমিনা রিদিকে বকা দেয় নি। রাহা আসলে মজা হয়। দুলাভাই এদিকে সেদিক ঘুরাতে নেয়। পার্কে যায়, গ্রামের বাড়িতে যায়, রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। ওই কয়টা দিন রিদি স্বাধীন, পাখির মত উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। নতুন বছর চলে এল। রাহাও চলে গেল। রাহার ছেলেটা নানা বাড়ি আসলে যেতে চায় না, নানার কোলে উঠে বসে থাকে। এদিকে নুভা কাঁদছে। রায়হান এর ছুটি নেই। চাইলেও থাকতে পারবে না। কাস্টমস এর জব। অনেক কষ্টে মেয়েকে বুঝিয়ে নিয়ে গেল এই বলে যে, পরের মাসে আবার আসবে নানা বাড়ি।
এই কয়দিনে রিদি ফেসবুকের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়েছে যে প্রতিদিন রাতে না এসে পারে না। আজ বাসায় স্যারের কাছে পদার্থ বিজ্ঞান পড়া পারে নি। স্যার আমিনাকে বলেছে রাতে ফোন সরিয়ে রাখতে। ওর যেন ঘুম ভাল হয়। এই স্যারকে ইচ্ছেমত মারতে পারলে রিদি কিছুটা শান্তি পেত। রাতে ঘুমানোর আগে আমিনা এসে ফোন চেয়ে বসলেন। রিদি কথা দিয়েছে আজকে রাতটা তার কাছে থাকুক আগামীকাল থেকে দিয়ে দিবে। আজকে বন্ধুদের সাথে কথা বলে আইডি বন্ধ করে দিবে। আমিনা সেই সুযোগ দিয়ে ঘুমাতে চলে গেলেন। দ্বীপকেও জানাতে হবে রিদি আইডি বন্ধ করে দিবে। দ্বীপ ঘুরতে ভীষণ ভালবাসে। কথা কম বলে কিন্তু রিদির সাথে নিজের ঘুরাঘুরির সব মুহুর্তই শেয়ার করেছে এই কয়দিন। বন্ধুত্ব ভালই হয়েছে দুজনের মাঝে। সারাদিন নুভা, নুহাশের দুষ্টুমি, নিজের করা আকাজ, পড়ে যাওয়া, মায়ের বকা খাওয়া, বোন আর দুলাভাইয়ের খুনশুটি সব কিছু শেয়ার করেছে দ্বীপের সাথে। দ্বীপ মেসেজ পড়ত আর হাসির ইমোজি দিয়ে হাসত।
ফেসবুকে ঢুকতেই দ্বীপের মেসেজ দেখতে পেল। সেখানে সেন্টমার্টিন, কক্সবাজারের আরও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি। রিদি মুগ্ধ হয়ে দেখছে। মনে মনে ইচ্ছে পোষণ করেছে ইশ কবে যাবে? অনেকক্ষন পর দ্বীপ মেসেজ দিয়ে জানতে চাইল, রিদির মন খারাপ কিনা? রিদিকে তিন/চারটি মেসেজ দিলে অনেক দেরিতে উত্তর দেয়। রিদি মেসেজ দিল,
‘ কাল থেকে আম্মু ফোন নিয়ে যাবে আমি আর কথা বলতে পারব না। ‘
ও পাশ থেকে উত্তর এল,
‘ আচ্ছা, ভাল করে পড়াশোনা কর। যদি কখনও মনে পড়ে মেসেজ দিও। ফোন নাম্বার তো আছেই। ‘
নির্লিপ্ত উত্তর রিদির,
‘ আচ্ছা।’
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে এখন রাত একটা। রিদি বন্ধুদের সাথে কথা বলছে ঠিকই কিন্তু ভীষণ মন খারাপ। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে চারটায় এসে থামল। ঠিক সেই মুহুর্তে মেসেজ আসল দ্বীপের আইডি থেকে,
‘ বিভা, আবার কবে আসবে? আন্টি কি ফোন একেবারে নিয়ে যাবে?’
‘ এন্ড্রয়েড নিয়ে যাবে। বাটন ফোন দিবে। আম্মুকে আমার বজ্জাত স্যার বলেছে আমি নাকি সারাদিন ফোনে মগ্ন থাকি তাই পড়াশোনায় মন দিই না। ‘
‘ আচ্ছা যদি ফিরে আসো আমাকে প্লিজ মেসেজ দিও।’
‘ আচ্ছা।’
রিদি অনলাইন থেকে বের হয়ে থমকে গেল। দ্বীপ এভাবে মেসেজ দিল কেন? এত রাত অবধি তো কোনো দিন জেগে থাকেনা। বারোটার আগেই শুয়ে যায়। সর্বোচ্চ দুইটা পর্যন্ত জাগে। আজ এতক্ষন কি করছিল? প্রেম ও তো করে না। শ খানেক প্রশ্নের চাপ নিয়ে রিদি ঘুমাতে গেলেও ঘুম চোখ থেকে উড়ে গেল।
__
পিসির সামনে বসে কিছুক্ষন গেইমে সময় দিল। মন আনচান করছে। কিছুতেই মনোযোগ স্থির করতে পারছেনা। এরপর ভলিউম কমিয়ে টিভিতে কার্টুন ছাড়ল। যদি মনটা একটু স্থির হয়। নতুন কার্টুন শুরু হয়েছে, নাম মটু পাতলু। চাচাতো ভাইবোনদের দেখে সারাক্ষণ এই কার্টুন দেখতে। আচমকা পেছন ফিরে দাদীকে দেখে আৎকে উঠল।
সখিনা বানু, দ্বীপের দাদী। উনাকে অন্যভাবে পরিচয় করালে বলতে হবে, নিশাচরী। রাতে সারা ঘরে নিশব্দে হাঁটবে। কানে তেমন একটা শোনেন না তবে চোখে খুব ভালো দেখেন। বয়স আশির কাছাকাছি। অ্যালজাইমা আছে। ভুলে যান অনেক কিছু। বাইরে থেকে যদি কোনো অতিথি আসে এবং রাতে এই বাসায় থাকে ; সে যদি এভাবে কাউকে সাদা শাড়ি পরে রাতের দুইটা /তিনটা বাজে সারাঘর হাঁটতে দেখে, তার অনুভূতি কেমন হবে? এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা বহুবার হয়েছে অতিথিদের । চিৎকার দিয়ে সেই অতিথি সকলের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ভূত! ভূত বলে।
মিজান সাহেব মাকে কত বুঝালেন রাতে এভাবে না হাঁটতে কিন্তু কে শুনে কার কথা, সে তার মর্জির মালিক। দ্বীপ অবশ্য জানে দাদীর এই স্বভাবের কথা তাই আমলে নেয় নি। দ্বীপের পাশে বসে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল,
‘ ভাই তোমার দাদা একছের এইরম ছিল, পাতলা। একবার হইছেল কি আমি বাপের বাড়ি নাইওর যাইতাছি তার লগে। গরুর গাড়ির চাক্কা খুইলা গেছে মাঝ রাস্তায়। হেই সুমায় রাস্তায় লোকজন কম। কেউ কাউরে সাহায্য করার মতন নাই। এর মইধ্যে আইছে তুফান। তোমার দাদার লগে আমার এক দেওর ও ছেল। দেওর আমার কাপুড়ের বাসকো নামাইছে গাড়ি থেইকা। কইল, ‘ ভাইসাব চলেন হাডি, ভাবী সাব রে লইয়া রাস্তার মইধ্যে খাডাইয়া থাকলে ব্যাপারডা ভালা ঠেকে না। হাডলে অন্তত সামনে যাইয়া কারো না কারো বাড়ি পাইয়া যামু। ‘ আমরাও হাডা শুরু করলাম। তুফান বাইড়া গেল। ভিজ্জা গেলাম হগগলে। এবার তুফানের লগে জোরে বাতাস ছুডছে। চোহে কিছু দেহিনা। গাছ তলায় খাড়াইলাম। আচুক্কা আমার দেওর কয়- ও ভাবী সাব, ভাইসাব কই? আমি পাশে ফিররা দেহি তোমার দাদা নাই। কাইন্দা দিছি। এদিক সেদিক চাইয়া দেখলাম আমি আর আমার দেওর; কোনো হানে দেহি না তোমার দাদারে। কতখন পর গতরে মাডি, কাদা লাগাইয়া আইল। আমরা তো ভাবছি জ্বীন, ভূত হইবে। আমি চিক্কুর পাড়ছি। আমার দেওর কয়, ওই শয়তানের বাচ্চা কেন আইছিস। দূর হইয়া যা, আমি কিন্তু সূরা কেরাত ফারি কইয়া দিলাম। হেই সময় তোমার দাদায় কয়, ‘আরে আমি শামছু। তোগো ভাইসাব। বাতাসে আমারে উড়াইয়া নিয়া ক্ষেতের মাঝখানে ফালাইছে। কোমড় ডা ভাইঙ্গা গেছে। ‘ তহন আমি আর আমার দেওর বলদা হইয়া গেছি। বাতাস আমগোরে দেখল না হেরেই দেখল। এই গল্প যতজনের কই হাইসা মাডিত ফরে।
দ্বীপ হা করে দাদীর দিকে তাকিয়ে আছে। এইমাত্র যে গল্প টা দাদী বলল, এমন কোনো গল্প জীবনে কেউ শুনেই নাই। তার দাদার ওজন ছিল নব্বই কেজি। কিভাবে বাতাস তাকে উড়িয়ে নিবে? দ্বীপের হাসি পাচ্ছে দাদীর বানানো গল্প শুনে। দাদাকে নিয়ে আর কি কি গল্প বানাতে পারেন ভদ্রমহিলা সেটা আল্লাহ ই ভালো জানেন। মূলত দাদার প্রতি দাদীর অগাধ ভালোবাসার কারণে বিভিন্ন গল্প বানিয়ে বানিয়ে দাদার গল্প শুনিয়ে সকলের মাঝে জীবিত রাখেন। মানুষ মরে গেলে আমরা তাকে ধীরে ধীরে ভুলতে শুরু করি। কিন্তু সেই মানুষটাকে নিয়ে, তার ভালো কৃতকর্ম নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চা করলে একসময় মন থেকে ভালোবাসা এবং দোয়া চলে আসে। এই যে দাদা মারা গিয়েছেন আজ বিশ বছর তবুও দাদী প্রতি সপ্তাহে বাবা চাচাদের জোর করে গ্রামের বাড়ি পাঠায় দাদার কবর জিয়ারত করার জন্য।
দ্বীপের এখনও মনে পড়ে ছোট বেলায় ভাত খেতে না চাইলে দাদা বলত, ‘ দাদাভাই ভাত খাও দাদা তোমারে দোকান থেইকা ফান্টা কিন্না দিমু।’
রাহেলা খানম এর মুখে শ্বশুর এর গুণগান সবসময়ই থাকে। মাঝে মাঝে মিজান সাহেবকে বলেন, ‘ তুমি বাবার মত হলে আমি প্রতিদিন তোমার পা নিজের হাতে ধুয়ে দিতাম। কিন্তু দুঃখিত সেই সুবিধা তোমাকে দিতে পারছিনা। কারণ তুমি তোমার দাদীর মত।’
মিজান সাহেব এই কথা শুনলেই ক্ষেপে যান। কারণ তার দাদীর মত জল্লাদ মহিলা নাকি ওই তল্লাটে ছিলেন না। সেই গল্প আরেকদিন করা যাবে। সখিনা বেগমের ডাকে দ্বীপের ধ্যান ফিরল,
‘ ও ভাই? আমারে নিয়া মহেশখালী যাইবা? এক খান পান খামু।’
দ্বীপ ভ্রু কুচকে অবাক হয়ে একটু জোরেই বলল যাতে দাদী শোনে, ‘ মহেশখালী তো অনেক দূর দাদী। তুমি কেমনে যাইবা? গাড়ি চড়তে পারবানি? তোমার তো জার্নি সয় না দাদী। ‘
দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বলে, ‘ তোমার দাদায় আমারে কইছিল মহেশখালীর পান খাইতে স্বাদ আছে। আমারে খাওয়াইবে এক সুমায়। আমারে নিয়াও যাইতে চাইছিল। কিন্তু আমার শাশুড়ী আমারে যাইতে দিল না। বহুত মনে কষ্ট ছিল তোমার দাদার এই নিয়া। পরে তো নেওনের আর সুযোগ হইল না। আমার শাশুড়ী মরনের আগে তোমার দাদাই মইরা গেল। আমারে থুইয়া গেল জল্লাদের হাতে।
মাঝে মাঝে আমারে এই গানটা শুনাইত ,
‘ যদি সুন্দর এক খান মন পাইতাম,
মহেশ খালির পানের খিলি তারে
বানাই খাওয়াইতাম..’
দাদীর সুরেলা গলা শুনে মন ভালো হয়ে গেল দ্বীপের। দাদীকে জানাল নিয়ে যাবে। রাহেলা সবসময়ই বলতেন, ‘ তোমার দাদী মানুষ খারাপ না। কিন্তু তোমার ফুফুদের ফান্দে পড়ে আমার উপর অত্যাচার চালাত। ‘ রাহেলার কথাই ঠিক একটা বয়স পর্যন্ত মানসিক অত্যাচার করেছে রাহেলার উপর এরপর নিজ থেকে শান্ত হয়ে গিয়েছেন সখিনা বানু , ক্ষমাও চেয়েছেন ছেলের বউয়ের কাছে পূর্বের কৃতকর্মের জন্য। এখন সেসব ভুলেচুকে গিয়েছে সবাই কিন্তু মাঝে মাঝে ঠিকই দ্বীপের ছোট ফুফু তফুরা তাদের দাদীর মত আচরণ করে। এতে অবশ্য সখিনা বানুর কোনো হেলদোল নেই। তবে মাঝে মাঝে তফুরাকে কোনো কথা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাহেলা খানমকে বলেন, ‘ ও বউ কইষষা দে ওর গালে, এমন ভাবে দিবি যাতে জ্বইল্লা যায় গালডা । ঠান্ডা না হইলে জ্বলনের ভিত্রে মরিচ বাইট্টা লাগায় দে। এক্কেরে দাদীর লাহান হইছে বজ্জাতডা।’
রাহেলা বেগম আড়ালে হাসে। তফুরা কেঁদে কেঁদে বলে বড় ভাবী আমার মায়েরে তাবিজ করছে।
চলবে…
