#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
২.
প্যাচ প্যাচ করে কেঁদেই যাচ্ছে। এর কোনো সমাধান নেই। মেয়েটা এত বোকা, এত অল্পতে কাউকে কিভাবে বিশ্বাস করল? ফেসবুক তো ধোঁকাবাজির জায়গা। তুষার ছেলেটা পুরোপুরি ভন্ড একটা ছেলে। মিরা এবং প্রমাকে জানানোর পর , মিরা তার এক ভাইকে দিয়ে খোঁজ নিয়ে জানল ওই নামে কেউ ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে না। সরলা বালিকা মন খারাপ করল। তুষার কে সে ভালো বন্ধু ভাবত। তুষার হুমকি দিয়েছে সে যেকোনো সময় খোঁজ নিয়ে তার কলেজে চলে আসবে। এসে যদি ঝামেলা করে এই আতঙ্কে আত্মার পানি শুকিয়ে গিয়েছে রিদির। রিদির বাবা নোয়াখালী সদরের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। চেনা পরিচিত মুখ। এমনকি কলেজটাও তার বাবার পরিচিত লোকজন দিয়ে ভরা। কলেজের পিয়ন থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষ তার বাবাকে চেনে। এই ছেলে কলেজে এসে ঝামেলা করলে তো বাবার কানে খবর যাবে নিশ্চিত , তখন মা তাকে খুন করে ফেলবে।
অনেক কষ্টে বান্ধবীরা কান্না থামাল। হেঁচকি তুলতে তুলতে প্রাইভেটে গেল। বাসায় এসে আইডিতে ঢুকল। তুষার তো ব্লক লিস্টে তবুও মনে অনেক ভয়। যদিও তুষার কখনো রিদিকে দেখেনি কিন্তু ঠিকানা জানে। কলেজের নাম জানে। কলেজে এসে যদি বলে রিধিমা জাবেদ , সায়েন্স গ্রুপ। সবাই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিবে। এই দুশ্চিন্তায় একটা সপ্তাহ নির্ঘুম কাটল। অনেক দিন আইডিতে ঢুকেনি। আজ আইডিতে ঢুকে সব অপরিচিত দের লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছে। কলেজের ফ্রেন্ড, সিনিয়র, জুনিরদের রাখল। এরপর একটা পোস্ট লিখল,
‘ কাউকে সহজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। মানুষ দূর্বল ভেবে আঘাত করে।’
পোস্ট দেয়ার দু মিনিটের মাথায় মেসেজ আসল,
‘ আচার ব্যবহারে তো মনে হয় না আপনি কাউকে সহজে বিশ্বাস করেন। ধোঁকাটা দিল কোন প্রেমিক?’
চোখ দুটো রাগে ক্ষীন হয়ে গেল। কানে শুনলে হয়ত কানটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠত। সময়ের অপচয় না করে রিদি টাইপ করল,
‘ আপনাকে বলতে হবে? আপনি কে আমাকে জিজ্ঞেস করার?’
ওই পক্ষ থেকে রিপ্লাই আসল, ‘ ধাইন্না মরিচ কোথাকার? ‘
রিদি বেশ কিছুক্ষন ভাবল, ধাইন্না মরিচ তো বলে ঝাল মরিচ বা বোম্বে মরিচকে। কত্ত বড় ফাজিল। তাকে বলে সে কিনা ধাইন্না মরিচ? রিদি আবার মেসেজ দিল,
‘ আমি ধাইন্না মরিচ হলে আপনি তিতা করলা। গায়ে পড়ে ঝগড়া করেন কেন আমার সাথে?’
ওই পাশ থেকে রিপ্লাই আসল,
‘ শুরু টা তো আপনি করেছিলেন। ভুলে স্টিকার যাওয়াতে কত কথা শোনালেন। এনিওয়ে আমার কথায় কষ্ট পাবেন না। দুঃখিত।’
রিদির মনে হল, সত্যিই তো সেদিন সে একটু বেশিই বলে ফেলেছিল। রিদি সৌজন্যতা নিয়ে উত্তর দিল এবার, ‘ আসলে সেদিন বুঝতে পারিনি। ‘
‘ ইটস ওকে।’
আর কোনো কথা নেই। মানুষটার আইডিতে ঢুকে রিদি ছবি দেখতে লাগল আর ভাবল, দেখতে শুনতে তো খারাপ না। সকালে তুষারের আতঙ্কে কত মন খারাপ ছিল অথচ এখন আবার আরেকজনের আইডি ঘুরছে। এজন্যই মিরা এবং প্রমা তাকে এক বিন্দু বিশ্বাস করে না। এই মেয়ের কখন যে মন ভালো হয় আর কখন যে মন খারাপ হয় তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এরপর আর কথা হয় নি তাদের। রিদি পড়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মা সারাক্ষণ কানের কাছে এক কথাই বলে, মেডিকেলে চান্স পেতে হবে। তোমার বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছে, তোমার দুলাভাই বিসিএস ক্যাডার। তোমাকে মেডিকেলে পড়তেই হবে। তোমার বাবার মুখে চুনকালি যেন না লাগে। রিদি নিজ থেকেই পড়াশোনা করে কিন্তু কেউ যখন পড়া চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে তখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
__
কলেজে হিজাব খোলা যাবেনা, নিকাব তো খোলাই যাবেনা। মায়ের শক্তপোক্ত বারণ। বন্ধুদের মধ্যে ছেলেরা কখনো তার চেহারা দেখেনি। স্কুল জীবন ছিল বালিকা বিদ্যালয়ে, কলেজে এসে সহশিক্ষা হলেও সে মেয়েদেরই সাথেই বসে। ছেলেদের এড়িয়ে চলে।
বেশ কিছুদিন পর, রিদি ফেসবুকে দশ মিনিটের জন্য একটা ছবি দিল। আনমনে দিল। বেশ কিছু লাইক কমেন্ট আসল। আবার ডিলিট করে দিল৷ সাথে সাথে সেই পরিচিত আইডি ‘ Dip Digonto’ থেকে মেসেজ এসেছে,
‘ ছবি টা কি আপনার?’
রিদি রিপ্লাই দিল, ‘ জি আমার’
কিছুক্ষন চুপ থেকে পুনরায় মেসেজ দিল দ্বীপ, ‘আপনি তো বাচ্চা মেয়ে। অথচ কথা শুনলে মনে হয় অনেক বড়।’
‘ আপনি কি আমার কথা শুনেছেন?’
‘ মেসেজে বুঝা যায় আর কি।’
‘ তা আপনি বুঝি অনেক বড়?’
‘ অনেক না তবে বেশ বড় মনে হয়। কিছু না মনে করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, আপনি কিসে পড়েন?’
‘ ফার্স্ট ইয়ার।’
‘ অনার্স? ‘
‘ না না ইন্টার।’
‘ ভালোই ছোট। আমার সাথে আপনার বয়সের পার্থক্যটা সম্ভবত সাত/আট বছর হবে।’
চক্ষু ছানা বড়া হয়ে গেল রিদির। ইয়া আল্লাহ! সাত/ আট বছর! এত্ত বড়। রাতের বেলা চিৎকার ও দিতে পারছেনা। নিজেকে দমিয়ে মেসেজ দিল,
‘ সরি বড় ভাইয়া, আমাকে মাফ করে দিন এতদিন দূর্ব্যবহার করার জন্য । ‘
দ্বীপ বোকা বনে গেল। এই মেয়ে কি কথা বলার সময় এভাবে অপমান করে বলে নাকি এর কথা বলার ধরনই এমন। নিজের উপর বিরক্ত হল। মেসেজ দিল না আর। এই ছিল শেষ কথা। এরপর দ্বীপকে অনলাইনে পাওয়া যায় নি। রিদিও ভুলে গেল। ক্লাস, প্রাইভেট এসবের মাঝে সময় কেটে যেতে লাগল।
প্রায় দুই মাস পর একদিন রিদি অনলাইনে দ্বীপকে পেয়েই মেসেজ দিল,
‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন?’
আচমকা মেসেজ আসায় দ্বীপ প্রথমে চিনতে পারেনি। পুরোনো মেসেজ দেখে চিনতে পেরে উত্তর দিল,
‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম, ভালো আছ? একটু ব্যস্ত ছিলাম। হাসপাতালে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। ‘
‘ কি হয়েছে আপনার?’
‘ আমার না বাবার। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। স্ট্রোক করেছিলেন। ঢাকায় ছিলাম।’
‘ ওহ আচ্ছা, এখন কেমন আছেন?’
‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন আগের চেয়ে। অপারেশন হয়েছে। রিকভার হতে সময় লাগবে।’
এরপর আর কথা আগায়নি। পরদিন প্রাইভেটে গিয়ে বান্ধবীদের শোনাচ্ছিল এই গল্প। মিরা বকা দিয়ে বলল,
‘ এবার বাড়াবাড়ি করছিস রিদি। নিজ থেকে মেসেজ দিস কেন উনাকে? পরে ক্লোজ হয়ে যাবি৷ আন্টি, আংকেল জীবনেও মানবেনা। ‘
‘ এই ছিহ! কি বলিস মানামানির কথা। আমি কি প্রেম করব নাকি। এমনি একটু খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম। ‘
‘ দরকার নাই।’
রিদির মন খারাপ হল। সারা রাস্তা চুপ ছিল। সবার স্বাধীনতা আছে অথচ তার স্বাধীনতা নেই। কথা বলার ও স্বাধীনতা নেই। এই যে এখন ফুচকা খেতে যাবে কোলা ব্যাঙ রেস্টুরেন্টে । বাবা- মা জানতে পারলে খবর আছে। মা তো পিঠের ছাল তুলে নেবে৷ সে বাবা মায়ের অবাধ্য নয় তবুও কষ্ট হয়। দম আটকে আসে এত শাসন বারণে।
রাতে ফোনে বান্ধবীদের সাথে গ্রুপ মেসেজে দুষ্টুমি করছিল। সেই সময় ‘দ্বীপ দিগন্ত’ আইডি থেকে মেসেজ আসল।
‘ ঘুমাও নি?’
রিদি সালাম দিল। মেসেজে জানাল ঘুমায় নি। ফিরতি প্রশ্ন করেনি আজ। পুনরায় মেসেজ এলো,
‘ তোমাদের বাসা কোথায়? ‘
রিদি কিছু একটা ভেবে ভুল উত্তর দিল। ওই আইডি থেকে আর রিপ্লাই আসেনি। একটু পর আবার মেসেজ দিল, ‘ তোমার নাম কি?’
‘ বিভা। আইডিতে দেখেন নি।’
‘ হ্যাঁ দেখেছি৷ অনেকেই তো ফেক নেম ব্যবহার করে তাই। আচ্ছা থাকো গেলাম। ঘুম আসছে। ‘
ঘড়িতে বাজে বারোটা। এত তাড়াতাড়ি কে ঘুমায়? এই যে রিদি এখন চুপিচুপি বন্ধুদের সাথে মেসেজ কনভারসেশন এ ব্যস্ত থাকবে। ফযরের সময় ঘুমাবে। রিদি প্রশ্ন করল,
‘ এত তাড়াতাড়ি ঘুমান?’
‘ হ্যাঁ আমি তাড়াতাড়ি ঘুমাই। ‘
রিদি পাত্তা না দিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিল। সময় যখন আড়াইটা তখন দ্বীপের আইডি থেকে মেসেজ আসল।
‘ ঘুমিয়েছো?’
‘ নাহ আরো পরে। আপনি না ঘুমিয়ে যাচ্ছিলেন? ‘
‘ পানি খেতে উঠেছি। একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘ কি?’
‘ তুমি কি আমাকে দেখেছ কখনও? ‘
রিদি ভেবে বলল, ‘ নাহ! কোথায় দেখব?’
ইচ্ছাকৃত অস্বীকার করেছে সত্যিটা। বাকি মেসেজ আর দেয়ার সুযোগ হল না। মনে হল কেউ একজন ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছে। ফোনটা একপাশে রেখে ঘুমিয়ে গেল রিদি।
___
মিজান সাহেব, দ্বীপের বাবা। মানুষ হিসেবে ভাল হলেও আগে একসময় অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তার ফল এখন পান। চুলে মেহেদী লাগিয়ে ব্রাশটা টেবিলের উপর রাখলেন। সাজিনা ব্রাশটার দিকে তাকিয়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। কিছু একটা চেক করে পুনরায় ছুটে আসল বাবার কাছে। মিজান সাহেবকে প্রশ্ন করল,
‘ আব্বু এই ব্রাশ কোথায় পেলেন?’
মিজান সাহেব উত্তরে বললেন, ‘ তোমার মা দিল। ‘
‘ ছিঃ ফেলেন এটা। ‘
চেঁচিয়ে মাকে ডেকে বলল, ‘ আম্মু আপনি আব্বুর সাথে সবসময় এসব করেন কেন? ‘
মিজান সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ কি হয়েছে রে মা, কি করছে তোমার আম্মু?’
রাহেলা খানম খুন্তি হাতে তেড়ে আসলেন, ‘ বললেন কি করছি?’
‘ টিকটিকির হাগু পরিষ্কার করার ব্রাশ কেন দিছেন আব্বুকে?’
রাহেলা খানম অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে গেলেন মেয়ের উপর। এই সামান্য ব্যাপারে এত চেঁচাতে হবে কেন? মিজান সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন ইছ! বলে। রাহেলা খানম ভ্রু কুচকে বললেন,
‘ তাতে কি হয়েছে? মানুষের তো আর দিই নি। তোমার বাবার এত শখ জাগছে কেন যৌবন বয়সে ফেরার? চুল পাকলে চুল কালার করতে হবে কেন? আরও কয়েকটা বিয়া করার সাধ জাগছে মনে? এজন্যই দিছি। ‘
মিজান সাহেব গলায় গামছা ঝুলিয়ে দুই হাত উপরের দিকে তুলে মোনাজাতের ভঙ্গিতে বললেন, ‘ আল্লাহ তুমি আমারে একজন ভালো জীবনসঙ্গী দিয়েছ। আমি কৃতজ্ঞ কিন্তু তার মাথার ব্রেইন টা আরেকটু উন্নত কোয়ালিটির দিলে আমি উপকৃত হতাম। ভাগ্য ভাল টিকটিকির গু পরিষ্কারের ব্রাশ ছিল তাও সেটা চুলে দিয়েছি। যদি মানুষ বা অন্য প্রাণীর বিষ্ঠা পরিষ্কার করার টা দাঁত ব্রাশ করার জন্য দিত কি হত আমার? তুমি মহান আল্লাহ, আমাকে বাঁচিয়েছ। ‘
রাহেলা খানমের চোখ চকচক করে উঠল। হাসিখুশি মনে বললেন, ‘ ভাল বুদ্ধি। পরের বার এটাই করব।’
সাজিনা চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ আম্মু উ উ উ উ… খবরদার আমার আব্বুর সাথে এসব করবেন না। ‘
রাহেলা খানম মুখ ভেঙচি দিয়ে রান্না ঘরে যেতে যেতে বললেন, ‘ এমন আদরের দুলালী আমিও ছিলাম আমার বাপের ঘরে। তোমার দাদী আর ফুফুর অত্যাচারের কিছু তোমার বাপরে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আগে তো প্রতিবাদ করে নাই, এখন সহ্য করতে বল। নাহয় আল্লাহর কাছে বিচার দিব হাশরের ময়দানে।’
মিজান সাহেব ধর্মপ্রাণ মানুষ। আল্লাহর নাম নিলেই ভয় করেন। মেয়েকে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে গোসলে চলে গেলেন। আড়ালে হাসেন রাহেলার কাজে। স্বামী অন্তপ্রাণ রাহেলা ভালোবাসা থেকে যে এমন করে তা সে জানে। তার মনে ভয় চুল রঙ করলে মিজান সাহেবকে নাকি যুবক যুবক লাগে। বয়স চলে ষাটের ঘরে, তিনি নাকি যুবক!
___
এত বড় হলরুমে ক্লাস হয় অথচ জেনারেটর লাগাচ্ছে না। গরমে অস্থির শিক্ষার্থীরা। আজ প্রথমবারের মত নিকাব খুলল রিদি। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে নিল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখে সামনের সারির কয়েকজন ছেলে তাকিয়ে আছে। নিকাব পরে নিল।
ছুটির পর দেখল ছেলে গুলো কথা বলতে চাচ্ছে। এড়িয়ে গেলে ছেলেগুলো লজ্জায় পড়ে যাবে। টুকটাক কথা বলে বাড়ি ফিরল। প্রাইভেটে পরীক্ষা, বাসায় গৃহ শিক্ষক রেখেছেন জাবেদ সাহেব। এত এত পড়ার চাপে অস্থির রিদি। এস এস সি তে গোল্ডেন মিস হওয়াতে মা পাড়াতে মুখ দেখাতে পারেনি৷ এইচ এস সি তো এখন অগ্নিপরীক্ষা। সবমিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। আজ হঠাৎ আন নোন নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। ফোন চেক করে দেখে ব্লক করা আইডি থেকে আসছে। মেসেজ টাইপ এর স্টাইল দেখে বুঝেছে কে? পাজি তুষার। রাতে পড়ায় মন বসল না। খেতে ইচ্ছে হল না। গা গরম হয়ে আসল দুশ্চিন্তায়। অনলাইনে আজ কোন বন্ধু নেই। একজনকে দেখতে পেয়ে মেসেজ দিল,
‘ ভাইয়া আছেন?’
‘ হুম বল?’
‘ ঘুমান নি?’
‘ উহু। তুমি ঘুমাও নি কেন?’
‘ আপনাকে তো আমি চিনি না, আপনিও আমাকে চিনেন না তাই না?’
‘ হুম তাই। কেন কি হয়েছে?’
‘ আমার না একজনকে বকতে আর গালি দিতে ইচ্ছে করছে। অনেক কথা শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে। আপনার সাথে করি?’
‘ আমার সাথে কেন?’
‘ আমরা কেউ কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না তাই। যে কথাটা শেয়ার করতে চাচ্ছি সেটা অপরিচিত মানুষের সাথে শেয়ার করলে শান্তি পাব। পরিচিত মানুষের কাছ থেকে কথা ছড়ায়। অপরিচিত মানুষ ভুলে যায়।’
প্রায় বিশ মিনিট হয়ে গেল ও পাশ থেকে কোনো রিপ্লাই এলো না। রিদির বিরক্ত লাগল। নিজেকে ছ্যাচড়া মনে হল। কেন যে নিজ থেকে পটর পটর করে। ঠিক এই কারণে মিরা রুটিন করে বকা দেয়। সবার সাথে মিশে যেতে চায়। কিন্তু আজ মন খারাপের মাত্রা অনেক বেশি তাই না পারতে বেহায়ার মত বলেছিল। ফোন টা রেখে ঘুমাবে ঠিক তখুনি ও পাশ থেকে রিপ্লাই এসেছে,
‘ সরি, দেরি করে ফেললাম। তুমি কি আছ অন লাইনে? আসলে দাদু ডেকেছিল ক্ষুধা লেগেছে নাকি। আব্বু আম্মু সারাদিন অনেক কাজ করেন, এখন ঘুমাচ্ছেন। তাই তাদের উঠতে দিই নি। দাদুকে খাবার দিয়ে, ঘুম পাড়িয়ে এলাম। তুমি কি যেন বলতে চাইলে বল।’
রিদি আকাশের চাঁদ পেল। খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
‘ ইটস ওকে। আপনি তো খুব ফ্যামিলি ওরিয়েন্টেড।’
‘ হুম। কি বলবে তা বল।’
রিদি তুষারকে নিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। পুরোটা শুনে দ্বীপ মেসেজ দিল,
‘ ছবি দেখে তোমাকে ইনোসেন্ট ভেবেছি। মেসেজে ঝগড়া কর ভেবে ভাবলাম বাচ্চা মেয়ে ৷ এখন দেখি তুমি আস্ত বোকা আর বেক্কল। অনলাইনে এত বিশ্বাস করে কেউ কাউকে ? আচ্ছা যাও মানলাম বিশ্বাস করেছ, কিন্তু ভয় পাচ্ছ কি কারণে শুনি। তুমি কি তোমার কোনো ছবি দিয়েছ বা কোনো অথেনটিক ইনফরমেশন? ‘
‘ তা দিই নি। কিন্তু আব্বুর কাছে খবর গেলে?’
‘ তোমার আব্বু কি করে? ‘
‘ বলব না। কেন দিব এত ইনফরমেশন। ‘
ওই পাশে থাকা মানুষ টা হাসছিল, বাবার ইনফরমেশন দিবে না এই মেয়ে অথচ সব শেয়ার করেছে। হাস্যকর ব্যাপার। তবুও শেয়ার যেহেতু করেছে দ্বীপের মনে হল একটু আশ্বাস দেয়া নৈতিক দায়িত্ব।
ভরসার মেসেজ আসল দ্বীপ দিগন্ত আইডি থেকে,
‘ এতক্ষন যা যা বলেছ সব কি অবিশ্বাস করে বলেছ? ওরে আল্লাহ! আচ্ছা বাদ দাও। তোমার বাবার পরিচয় দিতে হবে না। সাবধানে থেকো। এসব ফেসবুকের মানুষ বিশ্বাস করবে না। যদি সত্যি কোনো সমস্যা হয় আমাকে ফোন দিও। নান্বার দিয়ে দিলাম। কলেজে আমার অনেক ছোট ভাই আছে ওরা সাহায্য করবে। ঘুমাও এখন। আগামীকাল না তোমার পরীক্ষা, ঠিক ভাবে পরীক্ষা দিও। শুভকামনা রইল।
রিদির কেন যেন মনটা ভাল হয়ে গেল। আপাতত শান্তি পাচ্ছে। একটা তো বড় ভাই জুটিয়েছে যে কোনো সমস্যায় সাহায্য করবে৷ পরদিন পরীক্ষা খুব ভাল দিয়েছে। মিরা এবং প্রমাকে এসব ব্যাপারে কিছু জানায় নি৷ সময় ছুটতে থাকে। পড়াশোনার মাঝে এমন ডুব দিল ফেসবুকে আসার কথা মনেই থাকে না। রাহা এসেছে বেড়াতে। রাহার বড় মেয়ে পাঁচ বছর বয়স, ছেলের তিন। রাহা আসাতে কিছুটা শান্তি পাচ্ছে। আমিনার মনোযোগ এখন নাতি নাতনীর দিকে৷ জাবেদ সাহেব মাঝে মাঝে রিদির পড়া দেখেন, প্রাইভেটের খাতা গুলো চেক করেন। আজ পড়ার টেবিলে এসেছে চেক করতে। রাহাও দাঁড়িয়ে আছে এক পাশে। যেদিন জাবেদ সাহেব খাতা চেক করেন সেদিন সকলের আত্মায় পানি থাকেনা। এভাবে হেডলাইন দাও নি কেন, ওভাবে লিখছ কেন, তারিখ দাও নি কেন, কোন স্যার কখন থেকে পড়াচ্ছে ডায়েরিতে লিখে রাখ নি কেন এসব প্রশ্নের তীর ছুড়েন। আজ রিদির দুটো খাতায় তারিখ পায় নি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করার আগেই রিদি আমতা আমতা করে বলল,
‘ আব্বু আসলে আমি দেরি ক রে গিয়েছিলাম প্রাইভে টে…’
‘ দেরি হয়েছে কেন?’
‘ জামাল স্যারের প্রাইভেট থেকে বের হয়ে রিকশা পাই নি। এরপর হাঁটা শুরু করেছিলাম। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রেল লাইনের পাথরের উপর পড়ে গিয়েছিলাম। রিকশা পেয়েছি এরপর…’
মেয়ে পড়ে গিয়েছে শুনে সব রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমিনাকে ধমকে বললেন,
‘ আমার মেয়ে ব্যাথা পেয়েছে এই খবর আমি জানিনা কেন? দেখি মা কোথায় ব্যাথা পেয়েছ।’
রিদি পা দেখাল, পায়ের দুটো আঙ্গুল ভালো জখম হয়েছে, পায়ের উপরের অংশ কেটে গিয়েছে। আমিনাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করছে সন্ধ্যা থেকে জানায় নি কেন? রিদি জবাবে বলল, ‘ জানালে তো আবার মারবে তাই ভয়ে জানাই নি।’
জাবেদ সাহেব স্ত্রীর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন, ‘ তোমার এই মারামারি স্বভাবের কারণে মেয়েরা আতঙ্কিত থাকে।’
রাহা বোনের কানের কাছে বলল, ‘ ভাগ্য ভাল ব্যাথা পেয়েছিলি নাহয় আজকে জম সাক্ষাৎ আব্বুকে উস্কে দিয়েছিল তোকে আছাড় দেয়ার জন্য।’
রিদি হাপ ছেড়ে বাঁচল।
চলবে…।
