#হৃদয়ের গভীরে যে তোমারই নাম প্রিয়সী
#পর্বঃ২
#পাপড়ি জাহান
সেদিন রাতে আয়মান একপ্রকার জোর করেই মেহেরকে বিয়ে করল।মেহের অনেক বার পালাতে চেয়েছে কান্না করেছে তবুও তার পরিবার তাকে জোর করে আয়মানের সাথে বিয়ে দিয়েছে।এই কারনে মেহের রাগে দুঃখে টানা ১৫ দিন বাড়ির বাহিরে বের হয়নি।আজ নিজের বেষ্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে বলে বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হলো।সদর দরজা পেরোনোর আগেই তার বাবা গম্ভির মুখে বললেন
এসব কি পাগলামী করছ মেহের তোমার জিদের কারনে আয়মানের সাথে তোমার বিয়েটা ৩ মাস পিছান হলো।তবুও তোমার জিদ কমেনি।তুমি নাকি আয়মানকে একবারও কল দিয়েও খোজ নেওনা এসব কি সত্যি মেহের?
মেহেরের পা-টা হঠাৎ থেমে গেল শরীর থেকে ঘাম ছুটে গেল কি বলবে ভেবে পেলনা।কারন সে যে তার বাবাকে প্রচন্ড ভয় পায়।
নিজের মেয়ের এমন দারিয়ে যাওয়া দেখে মেহেরের বাবা যা বোঝার বুঝে গেলেন।তবুও আগেরবারের মত গম্ভির মুখে বললেন
তোমাকে আর যেন আয়মানের সাথে বেয়াদবি করতে না দেখি মেহের। কথাটা মনে রেখ।যত যায়হোক আয়মান তোমার স্বামী ভুলে যেওনা।বলেই তিনি বাড়ির সিড়ির দিকে হাটা দরলেন তবে হঠাৎ থেমে পিছন ফিরে বললেন সন্ধা হওয়ার আগে ফিরে এসো.
———–+++————————
সূর্য তীর্যকভাবে আলো দিচ্ছে দুপুর ১ টা বাজে তাই।চারপাশের মানুষ ব্যাস্ত পায়ে নিজের গন্তবের দিকে দৌড়াচ্ছে।প্রচন্ড গরমের কারনে বিয়ে বাড়ির পরিবেশটা আর গরম হয়ে উঠেছে।সবাই ছুটছে ঠান্ডা পানির দিকে।আবার কেউবা আইস্ক্রিম খাচ্ছে।
মেহের সবেমাত্র বিয়ে বাড়িতে ডুকেছে।চারদিকে তাকিয়ে কাউকে খুজতে লাগল।হঠাৎ কেউ পিছন থেকে জরিয়ে ধরল। মেহের চমকে উঠে পিছনে তাকাল দেখল আয়মানের বোন নিরা দারিয়ে আছে।
একি ভাবি মনি তুমি এখানে?কেমন আছে বল? কনে তোমার কি হয় ?
একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করতে দেখে মেহের খানিকটা থতমত খেয়ে গেল।তবুও নিজেকে সামলিয়ে বলল কনে আমার বান্ধবী হয় নিরা।
নিরা খুশিতে লাফিয়ে উঠল সত্যি তার মানে আজ তুমি সারাদিন আমার সাথে থাকবে কি মজা বলেই নাচানাচি শুরু করল।মেহের হা হয়ে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শোনা গেল।মেহের ভ্রুকচকে সেদিকে তাকাল।
দেখল মেয়েরা সবাই বাহিরের দিকে ছুটছে।মনে হচ্ছে হিরের খনি বাহির তাই এমন ছুটছে।সবাই বলছে এই মন্ত্রীর আয়মান সাদিক এসেছে চল চল দ্রুত।আমাদের ক্রাশ এসেছে।
নিরা এসে ধাক্কা দিয়ে বলল ভাবি মনি দাদাভাই এসেছে তাই সব মেয়েরা তাদের ক্রাশকে দেখতে ছুটে গেল কথাগুলো শেস করেই মুখ টিপে হাসল।
মেহেরের বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল বারবার আয়মানের শান্ত অথচ গম্ভির মুখটা ভেসে উঠল।কারন বিয়ে হবার পর থেকে আয়মান একবারও মেহেরের খোজ নেয়নি এমনি কি কল প্রর্জন্ত করেনি।একপ্রকার সবকিছু বন্ধ রেখেছিল।যদি আজ কোন ভাবে মেহের জানত আয়মান আসবে তাহলে ও আসতোয় না।কিন্তু কি করার ভাগ্য তাদের আবার দেখা করিয়ে দিল।
আয়মাম গেটের সামনে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে দাড়িয়ে আছে।তার এসব একদমই ভালো লাগে।মেয়েরা একপ্রকার গায়ে পরছে।কেউ ছবি তুলছে কেউ বা আটোগ্রাফ চাইছে।আয়মান সেগুলো খুব শান্ত হাতে দিতে লাগল। তবে ভিতরে ভিতরে সে রেগে আগুন হয়ে আছে।অসস্তিতে গা টা রিরি করছে আয়মানের।আজ তার দাদীর ফ্রেন্ডের নাতীর বিয়ে তাই একপ্রাকার বাধ্য হয়েই এই বিয়েতে এসেছে। যার সবটায় তার সহকারি বুঝতে পেরে খানিকটা ভয় পেয়ে গেল।রুমাল বের করে ঘাম মুছতে লাগল।কারন সে জানে আয়মান একবার রেগে গেলে ঠিক কতটা ভয়ংকর হয়।
মেহের গেটের সামনে এসে ভিড়ের মধ্যে এসে আয়মানের ক্লান্ত মুখটা দেখল।এতটায় ক্লান্ত আয়মানকে দেখাচ্ছিল যে মেহেরের না চাইতেও বুকটা বার বার কেপে উঠল।ভাবতে লাগল।
“আচ্ছা, লোকটা সকালে কিছু খেয়েছে তো?”
হঠাৎ মেহেরকে ওর বান্ধবী কল করল। মেহের কোন কিছু না ভেবে দ্রুত বান্ধবীর রুমে গেল।গিয়ে দেখল তার প্রিয় বান্ধবী বউ সেজে বসে আছে।কি সুন্দরই না লাগছে।মেহের মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
আচ্ছা মেয়েরা বউ সাজলে কি এমনি সুন্দর লাগে।আমিও তো কার বউ তাহলে কবে ওর মত বউ সাজব।
—————–
১ ঘন্টা পর
প্রিয় বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে নিরার কথা মেহের মনেই নেই।হাসাহাসি করতে করতে কখন যে নিরার কথা ভুলে গেছে ও নিজেও জানেনা।কিছুখনপর নিরা হন্তদন্ত হয়ে রুমে ডুকল।চিৎকার করে বলল ভাবি মনি চল আইস্ক্রিম খেতে যায়…..অনেক গরম পরেছে।একদম সস্তি পাওয়া যাচ্ছে না বিয়ে বাড়িতে।
মেহেরকে আর কিছু বলতে না দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল।আইস্ক্রিম এর স্টলের কাছে।গিয়েই লাফাতে লাফাতে দুইটা চকবার আইস্ক্রিম অর্ডার করল।মেহের মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল।এই দুই ভাইবোন পুরাপুরি ভিন্ন একজন রাগি আর অন্যজন ফাজিল।
———————————-
দাদীজান এখন আমার যাওয়া উচিত।অনেক কাজ পরে আছে।I don’t have time to sit here and waste time.
সেতারা খান একটুও বিচলিত না হয়ে উল্টো ধমক দিয়ে বললেন….
চুপ করতো দাদুভাই সবেমাত্র এলি। জাবি তো একটু ওয়েট কর।তুইতো দেখছি বড্ড অধৈর্য।
আয়মানকে এমন ধমক দিতে দেখে ওর ফ্রেন্ড সার্কেল হা – হু করে হেসে উঠল।আয়মান রাগি দৃষ্টিতে তাকাল ওমনি সবাই ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ হয়ে গেল।কিন্তু মুখ চেপে তবুও হাসতে লাগল।কারন আয়মানকে ধমক দেওয়ার সাহস ওর দাদীজানরই আছে আর কার নেই।এই পৃথীবীতে একমাত্র সম্মান ও ভয় একমাত্র ওর দাদী কেই করে।
আয়মানে বসে বার বার ঘরির টাইম দেখতে লাগত।বিরক্তিতে তার রাগ মাথায় উঠে গেছে। নিজের দাদীজানের কথা ফেলতে না পেরে এখনও সে এই বিয়ে বারিতে বসে আছে।
হঠাৎ সেতারা খানের চোখ আটকে গেল একটি মেয়ের দিকে যার পরনে কালো বোরকা। হাতে পায়ে মোজা যা তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে।সেতারা খান মুচকি হাসলেন তারপর কাউকে কিছু না বলে দ্রুত হাটতে লাগলেন।
আয়মান চিন্তিত গলায় বলল
একি দাদীজান এমন দ্রুত কেন হাটছ পরে যাবে তো।প্লিজ আস্তে হাটো।এত তাড়াহুড়া করে কোথায় যাচ্ছো।
সেতারা খান কোন জবাব না দিয়ে আইস্ক্রিম স্টলের সামনে থেমে গিয়ে বললেন মেহের তুমি এখানে?
মেহের আইস্ক্রিম খাচ্ছিল।তাই কিছুটা ভরকে গেল।
তা দেখে সেতারা খান মেহের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
ভয় পেয়োনা মেহের।বলো তো কেন এখানে এসেছো।
মেহের মিন মিন করে বলল বান্ধবীর বিয়েতে এসেছি দাদীজান।
সেতারা খান রেগে গিয়ে নিরাকে বললেন এই নিরা মেহের অনেক আগে এসেছে আমাকে কেন বললিনা।
নিরা ভেংচি কেটে বলল এহ নিজের চোখ নাই নিজে দেখোনি কেন।এক কথা দুই কথায় দুজনের ভিতর ঝগরা লেগে গেল মেহের চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।কি হচ্ছে বুজতে পারছেনা।
সেতারা বেগম খানিকটা থেমে গিয়ে বললেন
চলো চলো মেহের তোমাকে আয়মানের কাছে নিয়ে যায়।
আয়মানের কাছে মেহেরকে নিয়ে যাবে শুনে। মেহের থরথর করে কাপতে লাগল।অজানা ভয় এসে মনের ভিতর ঝেকে বসল।একবার বলতে চাইল যে মেহের আয়মানের কাছে যাবেনা।কিন্তু কথাটা কেমন দেখায় তাই বলতে গিয়েও বললোনা।
নিরা মুখ কুচকে বলল আস্তে কথা বল দাদীজান।এমন জোরে কথা বললে মানুষ তোমায় পাগল বলবে।
সেতারা খান কিছুটা রেগে বললেন কিহ আমি পাগল। আবার শুরু হল দুজনের ঝগরা।
দুজনের এমন ঝগরা দেখে মেহের হো হো করে হেসে উঠল।যার কারনে দুজনের ঝগরা থেমে গেল।আর লজ্জার কারনে দুজন লাল হয়ে গেল।
সেতারা খান মেহেরের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আয়মানের সামনে দার করাল।
এই দেখ আয়মান কাকে নিয়ে এসেছি? দেখ চিন্তে পারিস কিনা?
আয়মান একবার চোখ দিয়ে মেহেরকে পরক্ষ করল।দেখল মেহের মাথা নিচু করে বার বার ডান হাত দিয়ে বাম হাত কচলাচ্ছে।যা দেখে আয়মান ভ্রুকুচকে তাকিয়ে রইল।এই পাগল মেয়েকে কেন তার দাদীজান তার জন্য পছন্দ করল ভেবে পেলনা।তবুও নিজের দাদীজানের কাছে স্বাভাবিক থাকার জন্য বলল এই বিয়ে বাড়িতে মেহেরকে কিভাবে খুজে পেলে দাদীজান?
সেতারা খান খুশিতে গদ গদ হয়ে বললেন
মেহের ওর বান্ধবীর বিয়েতে এসেছে দাদুভাই। তাই ওকে তোর কাছে নিয়ে এলাম।এবার বল ভালো।করেছিনা।
আয়মান কিছু বললোনা শুধু অদ্ভুত চোখে মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহের সামনে তাকাতেই আয়মানের এমন অদ্ভুত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠল।ভয়ের চোটে ওর অন্তরআত্না কেপে উঠল।
এইভাবে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে কেন বদ লোকটা? নিশ্চয়ই কোন খারাপ মতলব আছে?
হঠাৎ মেহেরের চোখ আটকে গেল আয়মানের ঠোটের মাঝখানের কালে তিলটায়। যা গোলাপি ঠোট দুটোয় দারুন মানিয়েছে।আয়মানের এমন মোহনীয় রুপ দেখে মেহের হালকা ঢোক গিলল।
আচ্ছা লোকটা এত সুন্দর কেন? কেন তার সবকিছু এত পার্ফেক্ট?
আয়মান নিজের বিবাহিতা বউয়ের এমন চাহনি দেখে খানিকটা নিঃশব্দে হাসল।চোখ তুলে একেবার মেহেরের কালো বর্নের চোখের মনির দিকে তাকাল।ওমনি মেহের থতমত খেয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।
হাই আল্লাহ আমি কি না শেষমেষ ঐ শয়তান বেটার ঠোটের দিকে তাকিয়েছিলাম।কি অধঃপতন হলো আমার।তবে লুচু বেটা যদি টের পায় আমি উনার ঠোটের দিকে তাকিয়েছিলাম।তাহলে নির্ঘাত আমাকে লজ্জায় ফেলার চেষ্টা করবে।কারন বেটাতো আস্ত একটা মিচকা শয়তান।
সেতারা খান মেহেরকে এমন দারিয়ে থাকতে দেখে বললেন এই মেহের দারিয়ে আছো কেন বস আয়মানের পাশে।
মেহের তবুও দারিয়ে রইল।আর এদিক – ওদিক তাকাতে লাগল।তা দেখে আয়মান ঠাস করে টান দিয়ে ওর পাশে বসিয়ে দিল।ডান হাত দিয়ে মেহেরের কোমরটা জরিয়ে ধরল।বাম হাত দিয়ে মেহেরের বাম হাতটা নিজের হাতে মুঠোয় নিল।গায়ে গা গেসে বসে রইল।
মেহের আয়মানের এমন কার্যকলাব করতে দেখে চমকে উঠল। থর থর করে কাপতে লাগল।এসির বতাসের ভিতরও ওর শরীর দিয়ে ঘাম ছুটে গেল
তা দেখে আয়মান বাকা হেসে মেহের কানের পাশে মুখ লাগিয়ে বলল
কি হল মেহেরজান এমন কাপছ কেন? বুড়ো বর পছন্দ হয়নি।
আয়মানের প্রতিটি কথা মেহেরের কানের কাছে বার বার বারি খেল।নিজেকে ছাড়ানোর ব্যাস্ত হয়ে পরল।কিন্তু ছাড়াতে পারলনা। কারন ও যত ছারাতে চাইছে আয়মান তত আকরে ধরছে।
মেহেরের অবস্থা এবার নাজেহাল হয়ে গেল।মনে হচ্ছে এখনই ও জ্ঞান হারাবে।তাই কোনমতে বলল
নেতা সাহেব প্লিজ আমার কোমরটা ছারুন?
আয়মান শুনেও না শুনার ভান করে বসে রইল।মেহের এবার ঠোট চেপে নিজের কান্না আটকাল।এমন বদলোকের পাল্লায় ও কিভাবে পরল সেটাই ও ভেবে পেলনা।তাই কাদো কাদো গলায় আর একবার বলল প্লিজ ছেড়ে দিন আমায়।আমি কথা দিচ্ছি আর কখন আপনার সামনে আসব না।
আয়মান খামখেয়ালি গলায় ফিসফিস করে বলল ছেড়ে দেওয়ার জন্যও তো বিয়ে করেনি মেহেরজান।বুড়ো বরের এতটুকু রোমান্সে তোমার এ হাল তো আমার সাথে যখন একই রুমে রাত্রিবেলা একা থাকবে তখন কি করে নিজেকে সামলাবে মেহের জান?ভেবে দেখেছো???
আয়মানের এমন তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠ শুনে মেহের বুঝে গেল সেদিন ওকে বুড়ো বলেছে তাই আজ ও এমন করছে।ভাবতেই মেহের ঠোট উল্টিয়ে বসে রইল।এই আয়মানকে মেহের চিনতে পারছেনা।এযেন অন্য এক আয়মান যে ভালোবাসতে জানে রোমান্স করতে জানে সব করতে জানে…
বিয়ের দিন মেহের সাথে কি ব্যবহারটায় না করল।যা মেহের আজও ভুলতে পারেনি।বিয়ে করবে না বলে জিদ ধরেছিল।তারপর আয়মান ফোন করে এমন এক ধমক দিল যে মেহের ঠাস ঠাস করে কবুল বলে দিয়েছিল।
আয়মান একপ্রকার রাগ + জিদের কারনে মেহেরের সাথে এতদিন কথা বলেনি।এতটুকু পিচ্ছি মেয়ে কিনা তাকে কিভাবে রিজেক্ট করল।সেটা ভেবেই ও সেদিন রেগে আগুন হয়েছিল।
#চলবে————-
ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
