#হৃদয়ের গভীরে যে তোমারই নাম প্রিয়সী
#শেষ পর্ব
#পাপড়ি জাহান
অনুষ্ঠান শেষে আয়মান শ্বশুড় বাড়ি এসেছে।আসা মাত্রই সবাই একপ্রকার ঝাপিয়ে পরল।রিমি আয়মানকে অনেক আপ্যায়ন করল।যতই হোক নতুন জামাই বলে কথা।মেহের রায়ানকে ঘুম পরিয়ে দিয়ে।রিমি কলি ও সকল কাজিনদের সাথে গল্প করছে।আর মাঝে মাঝে হাসছে।হঠাৎ ঘরিতে রাত ১২ টা বাজতে দেখে দ্রুত কিচেনে গিয়ে আয়মানের জন্য গ্রিন্টি নিয়ে রুমে প্রবেশ করল।চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল আয়মান রুমে নেই তাই ভাবল হয়ত বারান্দায় আছে তাই দরজা বন্ধ করে।চুপি চুপি আয়মানের পিছনে গিয়ে দারাল।তারপর পিছন থেকে আয়মানকে জরিয়ে ধরে বলল
কি করছেন নেতাসাহেব?
আয়মান মেহের হাতদুটো ধরে বলল ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম মেহেরজান।
মেহেরঃ কি নিয়ে সেটা?
আয়মান ঠোট বাকিয়ে মজা করে বলল
এই যে বয়স তো আমার কম হল না।তাই এখন আমার বাবা হওয়া দরকার তাইনা মেহেরজান।
মেহের লজ্জা পেয়ে আয়মানকে ছেড়ে দিল।দৌড়রে রুম যাওয়া ধরলে আয়মান টান দিয়ে পিছন থেকে জরিয়ে ধরল।চুলের ঘ্রান নিতে নিতে বলল ;
পালাচ্ছো কেন মেহেরজান?
কই পালালাম?
আয়মান মেহেরের মুখে এসব শুনে বাকা হেসে ওকে কোলে তুলে নিল।
মেহের হকচকিয়ে গিয়ে বলল এই এই কি করছেন নামান আমাকে?
উহু তা বললে তো আর হবেনা।
রুমে এনে বিছানায় শুয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে শক্ত করে জরিয়ে ধরল।এতটাই শক্ত করে জরিয়ে ধরল যে মেহেরের দম আটকে আসল।
নেতাসাহেব আপনি এত জোরে জরিয়ে দরেছেন কেন? আমার দম আটকে আসছে ছারুন প্লিজ….
আয়মান হালকা করে ধরে বলল
রুমে আসতে এত দেরি লাগল কেন?
একটু গল্প করছিলাম।
তাই বুঝি বলেই মেহেরের গালে চুমু খেল।
মেহের লজ্জা পেয়ে আয়মানের মন অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য বলল
আপনার জন্য আমি গ্রিন্টি বানিয়ে এনেছি খাবেন না?
আয়মান হেসে বলল হুম খাব তবে…
মেহের বাকিটুকু শেষে করতে না দিয়ে বলল প্লিজ এখন না এসব।আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি ওকে।কথাগুলো বলে আয়মানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে ছুটল।
আয়মান টি- টেবিল থেকে গ্রিন্টিটা নিয়ে খেতে লাগল।আর অফিসের কাজ করতে লাগল।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখল আয়মান অফিসের কাজ করছে।তাই ওকে বিরক্ত না করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরল।যেইওর চোখ টা লেগে গেল।আয়মান তখন রুমের লাইট অফ করে ওর পাশে শুয়ে পরল।হঠাৎ ওকে শক্ত করে নিজের দিকে টানল।
মেহের ভয় পেয়ে গেল।আয়মান হেসে তাকিয়ে রইল।
আজকে আর তোমায় পালাতে দিব না মেহেরজান বলেই ওর হাত পা মেহেরের পেটের উপর দিল।মেহের এবার রেগে তাকিয়ে রইল সেদিকে বিন্দুমাত্র আয়মান খেয়াল না করে নিজের কাজ করতে লাগল।মেহের ঠোটে স্লাইড করতে করতে বলল
তোমার ঠোটগুলো এত নরম কেন মেহের? মনে হয় পাকা কমলা লেবু।
মেহের আয়মানের এমন স্পর্সে কেপে উঠল।অজানা কিছু একটা ভাবতেই ওর শরীর দিয়ে ঘাম ছুটে গেল।তা দেখে আয়মান বাকা হাসল।যার অর্থ আজ মেহের আর ওর থেকে পালাতে পারবেনা।আয়মান মেহেরের দিকে ঝুকে কপালে একটা চুমু খেল।
আস্তে আস্তে রাতটি নিস্তব্ধতায় মুড়ে গেল—
বাহিরে নিস্তরঙ্গ আকাশে ঝুলে আছে এক টুকরো পূর্ণ চাঁদ,আর ভেতরে—দু’টি হৃদয়ের মাঝে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত শান্তি।ঘরের বাতাসে মিশে আছে ভালোবাসার মিষ্টি গন্ধ,জানালার পর্দা দুলছে নরম হাওয়ার ছোঁয়ায়।মেহেরের মুখে চুল এসে পড়লে আয়মান আলতো হাতে সরিয়ে দিল।সেই স্পর্শে সময় যেন থমকে গেল—শব্দহীন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল তাদের চারপাশের পৃথিবী।মেহেরের চোখে ভাসল কোমল এক মায়া,যেন সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না—এই মানুষটা সত্যিই তার,
এই ভালোবাসা সত্যিই তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।আয়মান ফিসফিস করে বলল,
— “আজ রাতটা শুধু আমাদের, মেহের।”
সেই কথায় এক নরম হাসি ফুটল মেহেরের ঠোঁটে,
দু’জনের মাঝে ভেসে উঠল অজানা এক প্রশান্তি।
নিশব্দ ঘরটা যেন রূপ নিল ভালোবাসার এক শান্ত আশ্রয়ে।চাঁদের আলো জানালা পেরিয়ে এসে পড়ল তাদের উপর,যেন প্রকৃতি নিজেই সাক্ষী হয়ে থাকল তাদের ভালোবাসায়।ওরা কাটিয়ে দিল এক দীর্ঘ, নিস্তব্ধ রাত—যেখানে ছিল না কোনো উচ্চারণ,ছিল শুধু দু’টি হৃদয়ের মৃদু ধ্বনি,
ছিল ভালোবাসার নিঃশব্দ ছন্দ।ভালোবাসতে বাসতেই কেটে গেল রাতটা—যেন সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে রইল তাদের জীবনের এক নতুন শুরু,
এক নতুন গল্পের প্রথম অধ্যায়…
——————-++++++++🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
রিমি নিচে এসে খাবার টেবিলে বসল। পোলাও, রোস্ট, কাবাব— চারপাশে রান্নার গন্ধ ছড়িয়ে আছে। প্লেটে পোলাও তুলে মুখে দিচ্ছে, এমন সময় রাফি চুপচাপ এসে ওর পাশে বসে পড়ল।
রিমি চোখ কুঁচকে বলল —
— “দূর হন এখান থেকে!”
রাফি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল —
— “সিটটা কি তোমার নামে রেজিস্ট্রি করা? যে আমি বসতে পারব না?”
রিমি বিরক্ত গলায় বলল —
— “এই বিয়ের বাড়িতে আপনাকে আর আমাকে একসাথে দেখলে মানুষ খারাপ ভাববে।”
রাফি হালকা হেসে চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে বলল —
— “ভাবলে ভাবুক, তাতে আমার কী?”
রিমি এবার রেগে গেল। গাল ফুলিয়ে বলল —
— “আপনার কোনো লজ্জা-শরম নেই?”
রাফি নির্লজ্জ মুখে হেসে বলল —
— “তোমার সামনে লজ্জা পেয়ে কি করব, রিমি পাখি।”
রিমি দাঁত কামড়ে বলল —
— “আপনার এই মুখটা আমার একদম অসহ্য লাগে !”
রাফি হেসে কাত হয়ে বলল —
— “তাই বুঝি।তবে তোমার দৃষ্টিতো তা বলছে না।
রিমি মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল —
রাগে, নাকি লজ্জায়, সেটা সে বুঝতে পারল না।
রাফি চামচটা নামিয়ে হালকা হেসে বলল —
— “এই, রিমি পাখি… এত চুপ কেন? নাকি আমার সাথে ঝগরা করার শখ মিটে গেছে?
রিমি মুখ ঘুরিয়ে বলল —
— এই আপনি চুপ করবেন নাকি আপনার মুখ সেলাই করে দিব।
রাফি মৃদু গলায় বলল —
— “আমি চুপ থাকলে তো বিয়ে বাড়িটাই নিরব হয়ে যাবে।”
রিমি চোখ ছোট করে তাকাল —
— “বেশি মিষ্টি কথা বললে কিন্তু আমি চলে যাব।”
রাফি হেসে বলল —
— “তুমি চলে গেলে তো আমার খাওয়াটাই ফিকে হয়ে যাবে।”
রিমি মুখে রাগ দেখালেও ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
বলল —
— “আপনার মুখটা না, একদম বেয়াদব টাইপ।”
রাফি চোখ টিপে বলল —
— “এই বেয়াদবটাই কিন্তু তোমার পাশে বসে আছে? ভবিষ্যৎতেও এমনি ভাবে বসে থাকবে ইনশাআল্লাহ ।”
রিমি মাথা নেড়ে চুপ করে গেল, কিন্তু মনে মনে ভাবল—
এই লোকটার সঙ্গে ঝগড়া না করলে আমার কেন মন খারাপ হয়।
রাফি হঠাৎ চুপচাপ পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগল।
রিমি কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলল —
— “এই আবার কি করছেন?”
রাফি কিছু না বলে পকেট থেকে একটা নেতিয়ে যাওয়া গোলাপ বের করল। ফুলটা হয়তো সারাদিন রাফির পকেটেই ছিল, তাই পাপড়িগুলো একটু ভাঁজ পড়ে গেছে, তবুও গন্ধটা ঠিকই আছে।
সে ধীরে গোলাপটা রিমির সামনে ধরে বলল —
— “এই নাও… তোমার জন্য।”
রিমি অবাক হয়ে তাকাল।
— “এই শুকনো ফুলটা?”
রাফি হেসে বলল —
— “হ্যাঁ, ফুলটা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু গন্ধটা না।”
রিমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নরম গলায় বলল —
— “আপনার এসব নাটক আমার ভালো লাগে না।”
রাফি মৃদু হাসল —
— “ভালো লাগে না বুঝলাম, কিন্তু ফুলটা নিচ্ছো না কেন?”
রিমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফুলটার দিকে,
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিয়ে বলল —
— “এই ফুলটা কিন্তু এমনিই নিছি তাই উল্টাপাল্টা কিছু ভাববেননা ওকে।
রাফি হেসে বলল —
— “ঠিক আছে ভাববো না , তবে আমি তোমার পাগল হতে চাই … তুমি কি আমার পাগলি হবে।”
রিমি দাঁত কামড়ে তাকাল তার দিকে… কিন্তু মুখে সেই পরিচিত লজ্জা মেশানো হাসিটা ধরা পড়েই গেল।
চারপাশের কোলাহলের ভেতর দু’জনের মাঝখানে নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা।
হঠাৎ উপরতলা থেকে রিমির মায়ের গলা ভেসে এলো —
— “রিমি! মা, কোথায় তুই? খাওয়া শেষ করেছিস?”
রিমি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল, —
— “ওফফ, মা ডাকছে, যাই এখন।”
রাফি চোখ তুলে ধীর গলায় বলল —
— “এখনই যাবে?”
রিমি মাথা নেড়ে বলল —
— “হ্যাঁ, না গেলে মা রেগে যাবে।”
রাফি হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল —
— “না, এখন যেতে দিব না।”
রিমি অবাক হয়ে তাকাল —
— “মানে? আপনি কে যে যেতে দিবেন না?”
রাফি হেসে চেয়ারে হেলান দিল —
— “এই মুহূর্তে আমি তোমার পাশে বসা একজন মানুষ, যে চায় এই মুহূর্তটা আর একটু লম্বা হোক।”
রিমি মুখে রাগ দেখিয়ে বলল —
— “আপনার সাথে থাকলেই আমি বিপদে পড়ি!”
রাফি মৃদু স্বরে বলল —
— “তবুও থাকো আরেকটু… তোমার মা অপেক্ষা করতে পারবে, কিন্তু আমি?”
রিমি এক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই চেনা দুষ্টুমি, কিন্তু আজ তাতে যেন একটু কোমলতা মিশে গেছে।
তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল —
— “ঠিক আছে, দুই মিনিট। তারপর কিন্তু যাচ্ছি।”
রাফি হেসে বলল —
— “এই দুই মিনিটটাই যদি চিরকাল হতো…”
রিমি চোখ ঘুরিয়ে বলল —
— “বেশি ডায়লগ দিলে দুই মিনিটও পাবেননা!”
রাফি হেসে চুপ করে রইল।
দুমিনিট শেষ হলে রিমি অবশেষে চেয়ার থেকে উঠে দাড়াল, ওর মায়ের ডাক এবার আরও জোরে শোনা গেল —
— “রিমি! মা, কই গেলি তুই?”
রিমি তাড়াতাড়ি বলল —
— “যাই, না গেলে বিপদে পড়ব।”
রাফি টেবিলে ভর দিয়ে একটু সামনে ঝুঁকল। চোখে সেই পরিচিত দুষ্টু হাসি—
— “ঠিক আছে, যাও… কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
রিমি ভ্রু কুঁচকে বলল —
— “আবার কী শর্ত?”
রাফি নিচু গলায় বলল —
— “রাতে ছাদে এসো।”
রিমি অবাক হয়ে তাকাল —
— “কি বললেন?”
রাফি হেসে বলল —
— “শুনেছো তো ঠিকই। আজ রাতে ছাদে আসবে, না হলে রাগ করব।”
রিমি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল —
— “আপনি রাগ করলে আমার কিছু যায় আসে না।”
রাফি হালকা মুচকি হেসে বলল —
— “তবুও তুমি আসবে… কারণ তোমারও জানতে ইচ্ছে করবে, আমি কেন ডেকেছি।”
রিমি কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে উপরে উঠতে লাগল,
কিন্তু সিঁড়ির মাঝখান গিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকাল—
রাফি তখনও ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে সেই অর্ধেক হাসি।
রিমির মনে অজানা কাঁপন বয়ে গেল—
ছাদে যাবে না ভাবছে, তবুও মনে হচ্ছে… হয়তো যেতেই হবে।
রিমি তাড়াহুড়ো করে উপরে উঠল। তার মায়ের চোখে অল্প রাগ আর উদ্বেগ —
— “কই ছিলি এতক্ষণ ? রাত ১২ টা বাজে খেয়াল আছে তোর?
রিমি হালকা সাস নিয়ে বলল —
— “মা, আরেকটু রাত জাগিনা … শুধু কয়েক মিনিট।”
মা কঠোর গলায় বলল —
— “কতবার বলেছি? সময়মতো ঘুমোতে হবে, যা গিয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পর।
রিমি মাথা নেড়ে বলল —
— “ঠিক আছে মা, যাচ্ছি।”
মা সন্তুষ্ট চোখে তাকিয়ে বলল —
— হুম যা।”
রিমি চুপচাপ তার রুমের দিকে চলে গেল।
*********************************
রাতটা ছিল নিঃস্তব্ধ। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে কুকুরের হালকা ঘেউ-ঘেউ শব্দ আসছিল।
রাফি ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এক ধরনের অস্থিরতা।
হাওয়ার দোলায় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, তবে তার মন একটাই প্রশ্নে আটকে আছে—
“রিমি আসবে?
সে ঘড়ির দিকে তাকাল — রাত ১২:১৫।
মৃদু হেসে নিজেই বলল —
— “এই মেয়েটা সব সময় শেষ মুহূর্তে এসে চমক দেয়।”
ঠিক তখনই পায়ের মৃদু আওয়াজ।
রাফি ঘুরে তাকাল— সিঁড়ির ধাপে নীল ওড়নাটা দুলছে।
রিমি ধীরে ধীরে ছাদে উঠছে। মুখে হালকা বিরক্তি, তবু চোখে একটা অজানা কৌতূহল।
রাফির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, চোখে ঝিলিক —
— “জানতাম, তুমি আসবেই রিমি পাখি।”
রিমি ভ্রু তুলে বলল —
— “কে বলল আমি আপনার জন্য এসেছি?”
রাফি হেসে বলল —
— “হয়তো কেউ না, কিন্তু তোমার চোখটাই বলে দিচ্ছে।”
রিমি চুপ করে গেল।
চাঁদের আলোয় দুজনের ছায়া মিশে গেল একসাথে।রাতের নিস্তব্ধতা হঠাৎই যেন একটু মায়াবী হয়ে উঠল।
রাফি ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বলল —
— “রিমি, জানতে চাইবেনা কেন ডেকেছি?”
রিমি চোখ ভোঁতা করে তাকাল, ভ্রু কুঁচকে বলল —
— “আগ্রহ নেই।”
রাফি হালকা মুচকি হেসে বলল —
— “আগ্রহ নেই? তাহলে কি এখানে এমনি এমনি এসেছো?”
রিমি ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল।
রাফি হঠাৎ ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসল।পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। তাতে ছিল— একটা সাধারণ, ছোট্ট সোনার রিং।
রাফি তাকিয়ে বলল —
— “… ভালোবাসি তোমায় রিমি পাখি। সত্যিই অসম্ভব ভালোবাসি।”
রিমির চোখ বড় হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল —
— “আপনি যা বলছেন, সেটা সম্ভব না রাফি।”
রাফি তাকাল সরাসরি ওর চোখে —
— “কেন? কারণ আমি দেরিতে বলেছি?”
রিমি গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল —
— “না… কারণ আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
রাফির হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে নিচের দিকে তাকাল, হাতের আংটিটা যেন হঠাৎ ভারি হয়ে গেল।
— “কি বললে? তোমার বিয়ে…?”
রিমি চোখ নামিয়ে বলল —
— “হ্যাঁ, মা–বাবা ঠিক করেছেন।
রাফি নিঃশব্দে শ্বাস ফেলল, মুখে জোর করে হাসি টানল —
— “তাহলে অভিনন্দন, রিমি পাখি… তোমার জন্য আংটিটা নিয়ে এলাম, কিন্তু তা পরানোর ভাগ্য আমার হয়নি।”
রিমি চুপ করে রইল।রাফির চোখে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে বলল—
— “বিয়েটা ভেঙে দাও, রিমি… আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”
রিমি এক ধাপ পেছিয়ে গেল, চোখে রাগ আর বিস্ময়ের মিশ্র আগুন —
— “কি বললেন আপনি? আপনি হুশে আছেন তো?”
রাফি থরথর কণ্ঠে বলল —
— “পুরো হুশেই আছি, রিমি। তোমাকে হারানোর চিন্তায়ই পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
রিমির মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে।
— “এইসব নাটকীয় কথা বন্ধ করুন! আমার জীবন নিয়ে আপনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে?”
রাফি হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই বলল —
— “আমি শুধু চাই তুমি সুখে থাকো, কিন্তু আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া সুখী হতে পারবে না… যেমন আমি তোমাকে ছাড়া পারব না।”
রিমি হতভম্ব হয়ে বলল _
আপনি কি সিরিয়াস রাফি?
রাফি এক পা এগিয়ে এসে ধীরে বলল,
— “হ্যাঁ, রিমি পাখি, আমি সিরিয়াস। জানি, হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে… তবুও আমি তোমাকে হারাতে পারব না।”
রিমির গলা কাঁপছে, চোখ সরিয়ে নিল সে।
— “সব কিছু এত সহজ না, রাফি… বাবা-মা বিয়ে ঠিক করেছেন, আমি এই বিয়ে ভাঙতে পারব না।”
রাফি কষ্টের হাসি হেসে বলল,
— “মানুষ চাইলে সবকিছু বদলে দিতে পারে, রিমি। শুধু একবার বলো— তুমি আমায় ভালোবাসো।
দেখবে, আমি তোমাকে আমার করেই ছাড়ব।”
রিমি রাগ মেশানো গলায় বলল,
— “চাওয়া-পাওয়া এখন আর গুরুত্বপূর্ণ না… সময় আমাদের দু’জনকেই হারিয়ে দিয়েছে।
তাই দয়া করে, আপনি সবটা মেনে নিন।”
রাফির চোখে গভীর ব্যথা, তবুও সে শান্ত স্বরে বলল,
— “তবুও আমি সময়ের কাছে হারব না। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব, রিমি…”
রিমির বুকের ভেতর কাঁপন ধরল। রাগে, অভিমানে, ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে সে চিৎকার করে উঠল,
— “আমি আপনাকে ভালোবাসি না, রাফি!”
তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে দৌড়ে নেমে গেল—
চোখে পানি, মুখে রাগ, আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ঝড়।
চাঁদের আলোয় রাফি একা দাঁড়িয়ে রইল,
হাতে এখনো সেই রিংটা,
আর হৃদয়ের গভীরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই শব্দ—
“রিমি পাখি… আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া বাঁচব না…”
😍😍😍😍😍😍😍😍😍😍😍😍😍😍
অন্যদিকে রোদ ও নিরার বিয়ে হয়েছিল। আয়মান ও মেহেরের বিয়ের ৩ মাসের মাথায়।কারন রায়ান মাম্মা বলে কান্না করত।তাই বাধ্য হয়ে রোদ নিরাকে বিয়ে করে।
বিয়ের দিন সকালে রায়ান খুশিতে পাগল হয়ে গেল—সাদা শার্ট, ছোট বো-টাই পরে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে,আর সবাইকে বলছে,
— “আজ আমার মাম্মা আসবে! আমার নিরা মাম্মা!”
রোদ আয়নায় নিজেকে একবার দেখল। মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে চাপা একটা ভাব। সুহানার স্মৃতি আজও বুকের ভেতর কোথাও ব্যথার মতো রয়ে গেছে। তবুও আজ সে বাধ্য—রায়ানের জন্য, পরিবারের জন্য, আর নিজের ভেতরের শূন্যতা ভরাট করার জন্য এই বিয়েটা দরকার।বিয়ের আসরে নিরা আসতেই সবাই অবাক হয়ে তাকাল। গায়ে হালকা গোলাপি শাড়ি, মুখে মিষ্টি হাসি—তবে চোখ দুটো লাজুক আর একটু অচেনা। রায়ান দৌড়ে গিয়ে নিরার হাত ধরল,
— “মাম্মা, আজ তুমি আমার হলে?”
সবাই হাসল। নিরা চোখের কোণে জল চেপে রেখে বলল,
— “হ্যাঁ বাবা, আজ থেকে আমি তোমার মাম্মা।”
রোদ নিরার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মঞ্চে বসে রোদ আর নিরা একে অপরের হাতে আংটি পরাল। আশেপাশের সবাই করতালি দিল সিটি বাজাতে লাগল, কিন্তু রোদের মনে শুধু একটা কথায় বাজল—
“হয়তো জীবন এমনই, এক ভালোবাসার পর আরেক ভালোবাসা এসে আমাদের নতুন করে বাঁচতে শেখায়।”রায়ান খুশি হয়ে বলল,
— “ইয়েহ! এখন আমাদের পরিবার পুরো হলো!”
রোদ রায়ানের খুশি দেখে হাসল, নিরা রোদের দিকে তাকাল, আর রায়ান দৌড়ে এসে দুজনের মাঝখানে বসে বলল,
— “একটা পাপ্পা একটা মাম্মা ইয়েত….
কিছুক্ষনের মধ্যেই কাজি চলে এল।কাজি সাহেব ওদের সমনে বসে মৃদু স্বরে বললেন,
— “ডাক্তার রোদ জামান, আপনি কি কনের সঙ্গে, মিস নিরা ইসলামকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী মোহর নির্ধারণ করে বিয়েতে কবুল করছেন?”
রোদ গভীর নিশ্বাস নিল।চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠল সুহানার মুখ ওদের বিয়ের মূহর্তগুলো।কিন্তু পাশেই বসে আছে ছোট্ট রায়ান, বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। রোদ মাথা তুলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
“কবুল কবুল কবুল করেছি।”
সবাই একসঙ্গে “আলহামদুলিল্লাহ” বলল।
নিরার মুখ নিচু, চোখে জল চিকচিক করছে। কাজি সাহেব এবার ওর দিকেও তাকিয়ে বললেন,
— “মিস নিরা ইসলাম, আপনি কি ডাক্তার রোদ জামানকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
নিরা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“কবুল কবুল কবুল করেছি।”ঘরে মিলাদ পড়া শুরু হলো, সবাই দোয়া করল।রায়ান দৌড়ে এসে রোদের কোলে উঠে বলল—
— “পাপ্পা, এখন মাম্মা আমার সাথে থাকবে তাই না?”
রোদ মুচকি হেসে বলল—
— “হ্যাঁ বাবা, এখন থেকে নিরা তোমার সাথে থাকবে।”
রায়ান আনন্দিত হয়ে হাততালি দিল, নিরার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “ইয়েহ! এখন আমি দুজনকে পাব—পাপ্পা আর মাম্মা!”
সবাই হেসে উঠল।রোদ মাথা নিচু করে নিরার দিকে তাকাল।
জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো, এক অস্থির কন্ঠে “কবুল করেছি” কথার মধ্য দিয়ে।
বিয়ের প্রথম দিকে রোদ নিরাকে মেনে নিল না।সবসময় এড়িয়ে চলত।কিন্তু আস্তে আস্তে নিরার ব্যবহার দেখে ওকে ভালোবাসতে শুরু করল।
নিরা একদিন এক্সিডেন্ট করল।ডাক্তার বলল নিরা আর বাচবে না ।সেদিন রোদ চিৎকার করে কান্না করল আর ভাবল আবার সুহানার মত হারিয়ে ফেলবে না তো। নিরা সুস্থ হল আর রোদ ভাবল—জীবন থেমে থাকে না, ভালোবাসাও বদলে যায় না, শুধু রূপ পাল্টায়।
২বছর পর……..
নিরা ৯ মাসের পেগনেন্ট তবে রোদের ভয় কমছেনা।রোদ বাচ্ছা নিতে চাইনি নিরা জোর করে নিয়েছে।অবশেষে তাদের একটা মেয়ে বাবু হল।রায়ান খুশিতে লাফিয়ে উঠল, ছোট্ট হাত দিয়ে নতুন বোনকে আদর করতে লাগল। রোদও আনন্দে ভেসে গেল, হাসি ও উচ্ছ্বাসের মধ্যে নিজের সমস্ত ভয় ভুলে গেল।
বিকেলে নিরার দিকে তাকিয়ে রোদের মনে হলো, সমস্ত ভয়, সমস্ত সংশয়, সব হারিয়ে গেছে; নিরাকে পেয়ে।
————————🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
কেটে গেছে প্রায় দুইবছর। এই দুইবছরে অনেক বার আয়মান ও মেহের বাচ্চা নিতে চেয়েছে।কিন্তু মেহেরের বাচ্ছা হবে না ডাক্তার বলেদিয়েছে।তবুও মেহের আল্লাহর উপর ভরসা করে দোয়া করতে লাগল।ও আয়মানকে অনেক বার বলেছে বিয়ে করতে কিন্তু আয়মান বলেছে ও বিয়ে করবেনা।এ নিয়ে মেহের ও আয়মানের অসংখ্য বার ঝগরা হয়েছে।প্রতিবারই আয়মান মেহেরকে সামলিয়েছে।এখন সবকিছু স্বাভাবিক ।
সন্ধায় মেহের ফেসবুক সক্রোল করছিল হঠাৎ একটা পোস্ট ওর সামনে পরল।ও পোস্টটা পরা শুরু করল।
দোয়া কবুলের গল্প….
এক লোক মসজিদে প্রবেশ করলো। মন খারাপ। এক পাশে গিয়ে বসে রইলো। একজন বৃদ্ধ হুযুরও আরেক পাশে ছিলেন। বৃদ্ধ হুযুর কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেনঃ
.
– বাছা! এখন তো নামাযের সময় নয়। তুমি কেনো মসজিদে এলে?
– হুযুর! আমি বিয়ে করেছি, বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো। এখনো আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে, আমাদের ঘরে নতুন কোনও মেহমান আসে নি। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বেশ পেরেশান। সংসারে সন্তান না থাকাতে আমার স্ত্রীকে নানা জন নানা কথা বলে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সন্তান না দেয়ার ফায়সালা করলে, আমি সেটাতে রাজি।
.
আমি আমার স্ত্রীকেও বারবার সান্তনা দিয়ে আসছি। আর সন্তান না হওয়াতো স্ত্রীর দোষ নয়। আমরা দুজনেই বিষয়টার সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের কটাক্ষ আর বিদ্রুপের কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে,আমার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
.
এভাবে চলতে থাকলে, সে কিছুদিন পর পুরোপুরি পাগল হয়ে যাবে। রুবাবাহ মানে আমার স্ত্রী, সে এতো ভালো একটা মেয়ে, তাকে ছাড়া আমার জীবনটাও পানসে হয়ে যাবে। জীবনের কোনও স্বাদ আমি পাবো না। আমি কোনও ডাক্তার-বৈদ্য-কবিরাজ বাদ রাখিনি। কিছুতেই কিছু হলো না।
বৃদ্ধ হুযুর বললেন:
– তুমি স্থির হয়ে বসো। আমি তোমাকে একটা ওষুধ দেবো। ওষুধটার ব্যবহারবিধি খুবই কঠিন। তবে আমি আল্লাহর ওপর পুরোপুরি তাওয়াক্কুল করেই বলছি। এ ওষুধে তোমার অবশ্যই সন্তান হবে। ইনশাআল্লাহ।
.
– আল্লাহর দোহাই লাগে হুযুর! আপনি যত কঠিন আর কষ্টকর ওষুধই দেন, আমি সেটা ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত। ইন-শা-আল্লাহ।
-তোমরা দুজনেই, ফজরের আযানের কমপক্ষে একঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠবে। সময়টাকে দুইভাগে ভাগ করে নিবে।
.
= প্রথম ভাগে কিয়ামুল লাইল অর্থাত তাহাজ্জুদ পড়বে।
= দ্বিতীয় ভাগে ইস্তিগফার (তওবা) পড়বে। এভাবে নিয়মিত আমল করে যাবে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন
“আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার করো, নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল। (এর ফলে) তিনি তোমাদের ওপর প্রবল বর্ষণ করবেন, আর তিনি তোমাদেরকে সম্পদ, সন্তান দ্বারা সাহায্য করবেন। আর তোমাদের জন্য বানিয়ে রাখবেন বাগ-বাগিচা। আর তোমাদের জন্য প্রবাহিত করবেন নদীনালা”। – (সূরা নূহঃ ১০-১২)
লোকটা ঘরে ফিরে গেলো। স্ত্রীকে বললোঃ
– ওগো! আল হামদুলিল্লাহ, অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের দিকে তুলে তাকিয়েছেন।
-কিভাবে?
স্বামী বিষয়টা খুলে বললো। জিজ্ঞাসা করলো:
– তুমি কি এই আমল করতে প্রস্তুত?
– জ্বি, আমি অবশ্যই প্রস্তুত। আপনার সাথে কোন কাজেই বা আমি অপ্রস্তুত থাকি? আমরা কোন দিন থেকে আমলটা শুরু করবো?
– কেনো আজ থেকেই, কোনও ওযর আছে
তোমার?
-জ্বি না।
.
তারা দুজনেই আমলটা শুরু করলো। পনের দিন যেতে না যেতেই স্ত্রীর মধ্যে গর্ভের বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করলো। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর তিনিও বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনাদের জন্য তো সুখবর আছে।”
এটা ছিলো ইস্তিগফারের বরকত। কুরআনের আয়াতটাতে তো আল্লাহ তা‘আলা এমনটাই ইঙ্গিত করেছেন। ইয়া আল্লাহ! আমাদেরকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
আশাকরি আপনাদের ইসলামিক গল্পটি ভালো লেগেছে। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।খোদাহাফেজ।( বাস্তব ঘটনা তবে কপি)।
দোয়া কবুলের গল্প শুনে মেহের ও আয়মান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে আমল করা শুরু করল।ঠিক তিনমাসের মাথায় খবর এল মেহের মা হবে।
মেহের প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে চোখ বড় করে আয়মানের দিকে তাকাল,
— “আয়মান সত্যি? সত্যিই আমরা…?”
আয়মান হেসে কাঁধে হাত রাখল,
— “হ্যাঁ, মেহের। সত্যিই আমাদের ছোট্ট রাজকুমারী আসছে।
মেহের আয়মানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাদতে লাগল।
তা দেখে আয়মান মেহেরের হাত ধরে বলল,
দেখলে তো মেহের আল্লাহর উপর ভরসা করলে সবকিছু পাওয়া যায়।
মেহের কাঁপা কণ্ঠে আবারও ফিসফিস করল,
—অবশেষে “আমাদের দোয়া… সত্যিই কবুল হলো।”
আয়মান হেসে, মৃদু চুম্বন দিয়ে বলল,
হুম আমার রানি আমাদের দোয়া কবুল হয়েছে।তবে তোমার কি বিশ্বাস হচ্ছে না।
মেহের কাদতে কাদতে বলল হুম হয়েছে।তবুও ভয় করছে।
আয়মান মেহেরের হাত ধরে বলল,
আহা ভয় কিসের পাগলি আমি আছিতো।
মেহের আয়মানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
— “আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে এই খুশি এতটা গভীর হতে পারে।”
সেদিন থেকে তারা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরল। ছোট্ট দানার মতো নতুন জীবনকে আল্লাহর কাছে উৎসর্গ করে, তারা জানল—ভালোবাসা আর বিশ্বাস মিললে সবকিছু সম্ভব।
🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
রাফি ও রিমির বিয়ে হয়েছে এইতো ২ মাস আগে।তারা দুজন সুখেই আছে। রিমির বিয়েটা আয়মানকে বলিয়ে রাফি ভেঙ্গে দিয়েছে।ঝগরার মাধ্যমে যে প্রেম হয় তা ওদের দুজনকে না দেখলে কেউ বিশ্বাসও করত না।ওরা দুজন আল্লাহর কাছে বহুবার ক্ষমা চেয়েছে হারাম প্রেম করার কারনে।
সকালে রিমি আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে, মুখটা গম্ভীর।
রাফি পাশ থেকে হাই তুলে বলল—
— “এই যে মিসেস রাফি, সকাল সকাল এত সিরিয়াস মুড নিয়ে বসে আছেন কেন?”
রিমি রেগে তাকাল, — “আমাকে একদম মিসেস রাফি বলবেন না। আপনি খুব অগুছালো রাফি🤬 অফিস থেকে এসে কাপরগুলো সোফায় রেখেছেন কেন?
রাফি হেসে বলল—
— তুমি এখন এই সংসারের মন্ত্রী হয়ে গেছ নাকি?”
রিমি তেড়ে এসে বলল—
— “আপনি না, একদমই শৃঙ্খলাহীন! বিছানায় মোজা, টেবিলে ঘড়ি, আর ওয়াশরুমে তো চিরুনি রেখে আসেন!”
রাফি হেসে উত্তর দিল—
— “তুমি ঠিক করে দেবে ভেবে একটু অগুছালো হয়ে গেছি।”
রিমি ঠোঁট কামড়ে বলল—
— “তাহলে আমি তোমার কাজের মেয়ে নাকি?”
রাফি নাটকীয় ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল—
— “না না, তুমি তো আমার ‘রিমি পাখি’।
রিমি রেগে মেগে কিচেনে চলে গেল।
নতুন সংসার, নতুন সকাল।রিমি কিচেনে কাজ করছে, মুখটা ফুলে আছে। রাফি চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল, তারপর বলল—
— “চা কই?”
রিমি তাকাল না, শুধু রাগি গলায় বলল—
— “চা বানানোর জন্য বউ না, চাকর আনতে পারতেন।”
রাফি অবাক হয়ে বলল—
— “এই যে মিসেস ঝগরুটে রানি… বউয়ের কাছে একটু আদর করে চা চাইছি, তাতেই এত রেগে গেল বউ ?”হায় কপাল আমার।
রিমি তেড়ে এল—
— “আদর নাকি আদেশ! আপনার মুখে ‘চা কই’ শুনে মনে হয় আমি হোটেলের কর্মচারী!”
রাফি হাসি চেপে বলল—
— “ঠিক আছে, রিমি পাখি… তাহলে আজ চা আমি-ই বানাব।”
রিমি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
— “না না, লাগবে না,আমিই বানিয়ে দিচ্ছি।না হলে পড়ে দেখা যাবে আগুন ধরিয়ে পুরো বাড়িটায় উড়িয়ে দিবেন।”
কি গো প্রেমে পড়ে গেলে নাকি?
আপনার প্রেমে আমি পরব হাহাহ..আজ থেকে আমি খারাপ বউ হব সাথে আগুনও হব হুহ……
রাফি ঠাট্টা করে বলল—
— “তুমি না থাকলে জীবনটাই নিরামিষ হয়ে যায় রিমি পাখি। তাই একটু আগুনেরও দরকার আছে!”
রিমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, চোখ বড় বড় করে বলল—
— “তাই নাকি? তাহলে আজ থেকে আমি আগুন না, বরফ হবো!”শুধু আপনাকে শায়েস্তা করার জন্য।
রাফি মুচকি হেসে কাছে গিয়ে বলল—
— “বরফ গলাতে আমি জানি , রিমি পাখি।”
রিমি গম্ভীর মুখে চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড, তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
রাফি বলল—
— “দেখলে? আমার রিমিপাখি রাগ করে আমার কাছে টিকতে পারে না।”
রিমি হালকা অভিমানে বলল—
— “রাগ না করলে ভালোবাসা টিকে না বুঝলেন হারকিপটা লোক?”
রাফি উত্তর দিল—
— “তুমি রাগ কর , আমি রাগ মানাই—এই তো আমাদের সংসারের ।”
দু’জনের ঝগড়ার মাঝেও মিষ্টি এক ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে। ☕💞
🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
★★পাচবছর পর…………………♥♥♥♥♥
মেহের বারান্দায় দাড়িয়ে আছে।রাতের হালকা বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ছে। চাঁদের আলোয় ওর মুখটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।।হঠাৎ আয়মান এসে ওকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরল।ওর গালে একের পর একেক চুমু খেতে লাগল।
মেহের চমকে উঠে বলল;
এই কি করছেন নেতাসহেব? ছারুন আমায়? মেয়ে উঠে যাবে।
আয়মান উল্টো মেহেরকে ঘুরিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল
উহু ছারবোনা।
মেহের হতবাক হয়ে বলল;
কেন?
আয়মান হেসে ফিসফিস করল,
— “কারণ এখন তোমাকে আমার লাগবে…”
মেহের লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— “ইস! কী যে বললেন না! বুড়ো বয়সে ভিমরতি ধরেছে বুঝি?”
আয়মান হেসে উঠল,
— “ভিমরতি না মেহেরজান, এটা তোমার প্রেমে ধরেছে।”
মেহের লজ্জায় লাল হয়ে আয়মানের বুকে মুখ লুকাল।আয়মান ওকে কোলে তুলে নিল।মেহের শুধু তাকিয়ে থাকল।
আয়মাম ওকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে বলল আমাদের আরেকটা ছেলে বাবু থাকলে কেমন হবে বলতো?
মেহের লজ্জা পেয়ে কাঁপা গলায় বলল,
— “জানি না…”
আয়মান হেসে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “আমি তো জানি, বেস্ট হবে! তুমিও চাও যেন আরেকটা বাবু হোক।
তাই আমি দেশের দায়িত্বশীল মন্ত্রী হয়ে জনগণের ইচ্ছা পূরণ করতে চাই—মানে তোমার ইচ্ছা।”
বলেই আয়মান মেহেরের কপালে আলতো করে চুমু খেল।
ঠিক তখনই তাদের মেয়ে মাইশা এসে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
— “পাপ্পা, কী করতো?”
আয়মান নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
— “এই তো এসে গেল আমার আম্মাজান, আমার প্রেমের বারোটা বাজাতে!”
মেহের হো হো করে হেসে উঠল,
— “ঠিক হয়েছে, এখন বোঝো মজা! সবসময় আমাকে লজ্জায় ফেলো,
এবার দেখো নিজে লজ্জা পেলে কেমন লাগে!”
আয়মান হেসে মেয়েকে কোলে তুলে নিল,
চলো আম্মাজান আমরা বারান্দা গিয়ে রাতের হাওয়া খাই।
মাইশা আয়মানের গলা জরিয়ে ধরে বলল ;
ইয়েত পাপ্পা চল।
আয়মান মাইশাকে ও মেহেরকে নিয়ে বারান্দার সোফায় বসল।
মাইশা তোতলাতে তোতলাতে বলল পাপ্পা আমার একতা ভাই তাই?
আয়মান হেসে মেয়ের গালে চুমু দিয়ে বলল;
তাই বুঝি আম্মাজান।
মাইশা হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
— “পাপ্পা, আরও চুমু!”
আয়মান আবারও মেয়ের কপালে চুমু দিল ।
মাইশা গাল ফুলিয়ে বলল আমাকে না পাপ্পা মাম্মা কে দেও…
আয়মান হেসে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “দেখছো, আমাদের ছোট্ট মেয়েটাও চাই আমি যেন তোমাকে চুমু খায়!”
মেহের লজ্জা কেঁপে উঠল, আর আয়মান তার হাত ধরে মৃদু চুমু দিল।
মাইশা লাফাতে লাফাতে বলল ইয়েত পাপ্পা মাম্মাকে তুমু দিয়েতে.…
আয়মান হেসে মেহেরের কপালে চুমু দিয়ে মজা করে বলল ;
তোমার লজ্জা কবে কমবে মেহেরজান? এতবছর হয়ে গেল তবুও তোমার লজ্জা কমাতে পারলাম না।তাই ভাবছি আরেকটা বাচ্ছা নিলে হয়ত তোমার লজ্জা কমবে হাহাহ …♥
মেহের আয়মান কিল ঘুষি দিতে লাগল।আয়মান মেহেরকে থামিয়ে দিয়ে বুকের মাঝে জরিয়ে ধরল।
মেহের মাইশার দিকে তাকিয়ে লজ্জায় পেয়ে বলল ;
ধ্যাত ছারুন তো।
আয়মান হেসে বলল উহু এত সহজে ছারব না।
মাইশা আয়মানে বাম বুকে শুয়ে বলল ইয়েত পাপ্পা মাম্মাকে ছালবে না ওতে.…♦
মাইশার এমন কথাশুনে আয়মান ও মেহের একটসাথে হেসে উঠল।মেহের আয়মানের গালে চুমু দিয়ে বলল;
ভালোবাসি নেতাসাহেব। অনেক বেশি ভালোবাসি….
আয়মাম হেসে তাকিয়ে বলল;
এই ছোট কথাটা বলতে তোমার ৫ বছর লেগে গেল।তবে অবশেষে বলেছো এতেই আমি খুশি.।
মেহের গাল ফুলিয়ে বলল
বলতে হবে কেন আপনি কি বুঝেননি যে আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি।
আয়মান মেহেরের কপালে চুমু দিয়ে বলল
বুঝেছিতো তাই তো কখনো জিজ্ঞাসা করেনি তুমি আমায় ভালোবাস কিনা।
তারপর তিনজন মিলে বারান্দার শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।
চাঁদের আলোতে মাইশার ছোট্ট মুখটা ঝলমল করছে,
মেহের আর আয়মান একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল,
আর সেই হাসি ভেতরই শান্তি আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হলো।
মুহূর্তটা এতই সুন্দর , মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে।
এই ছোট্ট পরিবারের হাসি, ভালোবাসা আর একে অপরের প্রতি যত্নই তাদের জীবনের সবথেকে বড় ধন।
#সমাপ্ত………………………🌹
গল্পটা কেমন হয়েছে ভালো মন্দ জানাবেন।
