#হৃদয়ের গভীরে যে তোমারই নাম প্রিয়সী
#পর্বঃ১৪
#পাপড়ি জাহান
মেহের আয়মানের কথা শুনে ওকে জরিয়ে ধরে কেদে দিল।এত অনুভতী লোকটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল।ও বুঝতেই পারেনি।এত গভীরভাবে লোকটা ওকে ভালোবাসে। ওর বিশ্বাসই হচ্ছেনা।প্রতিটি মেয়েই এমন স্বামী চাই।যে স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি আসক্ত থাকবে।আর ও না চাইতেও এমন স্বামী পেয়ে গেল।
আয়মানঃ এই জান কাদছ কেন কি হয়েছে বল আমায়?
মেহেরঃ এত ভালোবেন কেন আমায়?
আয়মান মুচকি হেসে হাত উঠিয়ে চোখের জল মুছে দিল।তারপর মেহেরের কান্নাভেজা চোখে চুমু খেয়ে বলল
জানি না কেন তোমায় এত ভালোবাসি? শুধু জানি তোমায় ছাড়া আমি বাচতে পারব না।
মেহের আয়মানের গালে একটা চুমু দিয়ে ঘুম জরান কন্ঠে বলল আমিও আপনাকে ভালোবাসি নেতাসাহেব।বলতে বলতে একসময় ঘুমিয়ে গেল।
আয়মান তা দেখে হেসে বলল পাগলি বউ আমার।
——————————————————-
বিকেলে আয়মান ও মেহেরের রিসিপশনের অনুষ্ঠান হচ্ছে।মেহের হালকা গোল্ডেন কালারের লেহেঙ্গা পড়েছে।আয়মানও সেইম রংয়ের সেরয়োনি পড়েছে।দেখতে একেবারে দুজনকে সিনেমার নায়ক- নায়িকাদের মত লাগছে।আয়মান একটএ পর পর মেহেরের দিকে তাকাচ্ছে।তা দেখে রিমি ও কলি মেহেরকে খেপাতে লাগল।মেহের লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল।আয়মান তা দেখে মেহের পাশে এসে বলল
মেহের প্লিজ এমন করে লজ্জা পেওনা তুমি কি চাও আমি আবারও কন্ট্রোলেস হয়ে পড়ি।
আয়মানের এমন কথায় মেহের চোখ গরম করে তাকাল।
চুপ করবেন আপনি?এতগুলো মানুষের সামনে এসব কি বলছেন? কেউ যদি শুনে ফেলে তখন কি হবে।
আয়মান নেশা ভরা চোখে তাকিয়ে মেহেরের হাত ধরে বলল
কিছুই হবে না মেহের?
মেহের চমকে উঠে তাকাল।লোকটার কোন হেলদোল নেই। এতগুলো মানুষের সামনে হাত ধরেছে। ছিহ।দাত কটমট করে বলল
এই নিলজ্জ লোক হাত ছাড়ুন আপনি?আর একদম আমার দিকে তাকাবেননা বলেদিলাম।আপনার জন্য দেখছি আমার মানসম্মান ফালুদা হয়ে যাবে।
আয়মান ঠোট কামড়ে হেসে বলল ;
চুপ কিভাবে থাকব মেহেরজান? আমিতো আর বোবা না যে চুপ থাকব।
মেহের হাত ছাড়াতে চাইল।কিন্তু আয়মান ছাড়লো না।উল্টো বলল
মেহেরজান আমি তোমার হাত ছারব না তাই অযথা চেষ্টা কর না।
মেহের থতমত গলায় বলল তাহলে অন্যদিকে তাকান।
আয়মান হেসে বলল সেটাও সম্ভব না মেহেরজান।কারন আজ আমার চোখ তোমাতে আটকে গেছে।তাই চাইলেও চোখ সরাতে পারব না।আজ তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
মেহের আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল কেউ আবার এসব শুনছে কিনা।কিন্তু নাহ সবাই সবার মত ব্যাস্ত তাই মেহের সস্তির নিশ্বাস ফেললো।
———————*———————————-
— “আপনি তো খুব বাজে, রাফি! সেদিন কিভাবে পারলেন একটা পাগলকে আমার দিকে খেপিয়ে দিতে?”
রাফি সবে মাত্র ছাদে এসে বসেছে। রিমির এমন কথা শুনে অবাক হয়ে একটু হেসে বলল —
— “আমি খেপিয়ে দিয়েছিলাম? আবার আমিই তোমাকে বাঁচিয়েছি, ভুলে গেলে নাকি সেসব কথা?”
রিমি মুখ ফুলিয়ে চুপ করে রইল।
রাফি ভ্রু তুলে মজা করে বলল —
— “চুপ কেন? নাকি পাগল বরটাকে দেখে নিজেও পাগল হয়ে গেছো?”
রিমি রেগে বলল —
— “কি! আমি পাগল?”
রাফি হেসে কাত হয়ে বলল —
— “ওপস, স্যরি! তুমি তো পাগল না, তুমি তো পাগলি… হাহাহা!”
রিমি রেগে বলল —
— “ফালতু, অসভ্য লোক একটা! আমি পাগলি না, আপনি পাগল! আপনার বউ পাগলি— বুঝেছেন?”
রাফি হালকা হাসল, তারপর ধীরে ধীরে রিমির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
রিমি এক পা পিছিয়ে গেল, চোখ বড় করে বলল —
— “এই, এগিয়ে আসছেন কেন?”
রাফি এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল —
— “ইউ নো রিমি পাখি… তুমি ঠিকই বলেছো, আমার বউ একটা পাগলিই— একদম তোমার মতো।”
এটা শুনে রিমি রাফির পায়ে জোরে পারা দিল। রাফি ব্যাথার চোটে আহ বলে শব্দ করল।
রিমি ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল —
— “কি হলো বেয়াইসাহেব? এখন কেমন লাগছে?”
রাফি রিমির হাত দুটো মুচরে ধরে বলল
এখন কেমন লাগছে রিমি পাখি বলতো?
রিমি ব্যথার চোটে কুঁকড়ে উঠে বলল —
— “আমার হাত ছাড়ুন, হারকিপটা লোক!”
রাফি রেগে গিয়ে বলল, —
— “তুমি আবার আমায় হারকিপটা বলছো? এত সাহস তোমার?”
বলেই সে রিমির হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
রিমি এবার রাগে ফেটে পড়ল, —
— “শয়তান! ইবলিশ! হাত ছাড় আমার!”
রাফি হেসে বলল —
— “হাত ছাড়তে পারি… যদি তুমি আমায় স্যরি বলো।”
রিমি চিবি কেটে বলল —
— “অসম্ভব! আমি আপনাকে কখনো স্যরি বলব না!”
রাফি কাঁধ ঝাঁকিয়ে শান্তভাবে বলল —
— “আমিও তাহলে হাত ছাড়ব না।”
রিমি রাগে চোখে আগুন নিয়ে বলল —
— “আপনাকে আমি দেখে নেব!”
রাফি মৃদু হেসে বলল —
— “ওকে, মন ভরে দেখো রিমি পাখি… কারণ আমিতো তোমারই।”
রিমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল— চোখে রাগ, মুখে বিস্ময়, আর বুকের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত কাঁপন।
অ্যা…! — বলে রিমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
রাফিও অবাক হয়ে একই সাথে চিৎকার করল —
— “অ্যা! কী হলো আবার?”
রিমি বিরক্ত মুখে বলল —
— “ফালতু, ঝগরাটে লোক একটা!”
রাফি মুচকি হেসে বলল —
— “আমি ঝগরাটে?”
রিমি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল —
— “হুম…”
রাফি হঠাৎ রিমির দিকে হা করে তাকিয়ে রইল।শ্যামবর্ণের মেয়েটাকে নিল লেহেঙ্গায় দারুন মানিয়েছে।এত সুন্দর রিমি তা আজ রাফি ওকে না দেখলে বুঝতোও না।
রিমি চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল —
— “এই লুচু! আপনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”
রাফি একটু ঠোট বাকিয়ে বলল —
— “তোমার দিকে না তাকিয়ে কীভাবে থাকি , রিমি পাখি?”
রিমি লজ্জা সামলাতে মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু গাল দুটো লাল হয়ে উঠল–
রাফি কিছু বলল না, চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
রিমি হঠাৎ মুখে দুষ্টু হাসি এনে বলল —
— “জানেন আপনাকে এখন কার মতো দেখতে লাগছে?”
রাফি ভ্রু তুলে বলল —
— “কার মতো?”
রিমি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে স্ক্রিনে একটা ছবি দেখাল।
ছবিটা এক পাতি নেতার — যাকে জনগণ পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে, কারণ সে চাঁদা
তুলেছিল জোর করে।
রাফি চোখ কুঁচকে বলল —
— “এইটা কে ?”
রিমি হাসতে হাসতে বলল —
— “এইটা আপনি! একদম হুবহু লাগছে!”
রাফি রেগে মেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিমি একদৌড়ে পালালো।হঠাৎ পিছন ফিরে ভেংচি কেটে বলল —
— “এই যে পাতি নেতা সাহেব, ভালো থাকবেন!”
তারপর আবার হো হো করে হেসে দৌড় দিল।
রিমির এমন বাচ্চামো দেখে রাফির নিজের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সে মাথা চুলকে, নিঃশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইল রিমির চলে যাওয়ার দিকে —
মনে মনে বলল,
— “এই মেয়েটা একদিন আমাকে পাগল বানিয়েই ছাড়বে…”
😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭😭
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। নিরা ঠিক মত ঘুমাতে পারছিল না। চোখের নিচে ক্লান্তি, মনে অদ্ভুত ভার — হঠাৎ ফোনটা কাঁপতে শুরু করল। পর্দায় ভেসে উঠল “রোদ নামটা — ”।
হাত কাঁপছিল, তবুও ফোনটা তুলে নিল নিরা। গলা শুকিয়ে গেছে, কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ছোট্ট একটা তুতলানো আওয়াজ ভেসে এল—
— “মাম্মা…”
নিরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ওটা ছিল রায়ানের গলা।
ছোট্ট, নিষ্পাপ, মায়ায় ভরা।
— আমি কি মাম্মার সাথে কাথা বলতেচ্ছি…?”“
__ হুম বাবা
__মাম্মা, তুমি ঘুমাওনি
নিরার গলা ভারী হয়ে গেল। গাল বেয়ে চোখের পানি নিজের অজান্তেই গড়িয়ে পড়ল ।
সে কাঁপা গলায় বলল,
— “না বাবা, মাম্মা ঘুমায়নি… তুমি কেমন আছো রায়ান?”
রায়ান খিলখিল করে হেসে বলল,
— “ভালো মাম্মা, আমি পাপ্পার সাথি ঘুমাই, কিন্তু তুমি কবে আতবা মাম্মা? আমি তোমারে মিস করি।”
রোদ তখন পাশে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে সব শুনছিল নিঃশব্দে। তার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু নিঃশ্বাসের ভার।
নিরা চোখ মুছে বলল,
— “বাবা, মাম্মা তো অনেক দূরে এখন… তুমি পাপ্পার কথা শোনো, ঠিক আছে?”
রায়ান বলল,
— “ঠিক আছে মাম্মা, কিন্তু তুমি কেদো না… আমি পাপ্পাকে বলব তোমাকে নিয়ে আসতে।তুমি কি আমার কাছে আতবা?।”
এই কথাটুকু শুনে নিরার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে গেল। সে ফোনটা বুকে ঠেকিয়ে কেবল ফিসফিস করে বলল—
— “আল্লাহ, এই শিশুর মুখ থেকে কেন এমন কথা বেরোয়…”যেটা কখনো হওয়া সম্ভবনা😭😭😭
রোদ ফোনটা ধীরে ধীরে কেটে দিল। তারপর দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকল।
চোখের কোণে জমে থাকা জল আর চাপা নিঃশ্বাসে মিলেমিশে গেল — একটা অপূর্ণ জীবনের নীরব যন্ত্রণায়।
রায়ান তখন তার কোলের ওপর আধো ঘুমে বলল,
— “পাপ্পা, নিরা মাম্মা কাদতেচিল?”
রোদ হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু ঠোঁট কাঁপল।
— “না বাবা,নিরা মাম্মা কাঁদিনি… তুমি ভুল শুনেছো।
রায়ান চোখ আধখোলা রেখে আবার বলল
পাপ্পা সুহানা মাম্মা কি আত্না হয়ে গেছে।
এই কথাটায় রোদের বুক হিম হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে রায়ানকে কোলে নিয়ে বলল—
— “হ্যাঁ বাবা, মাম্মা এখন আত্না এবং আল্লাহর কাছে থাকে, আর তোমার জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করছে দেখা করবে বলে।”
রায়ান তখন ঘুমিয়ে গেল রোদের বুকের ওপর।
রোদ ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
চোখের সামনে ভেসে উঠল সুহানার মুখ—
সেই দিনটার কথা,
যেদিন ঝগড়ার শেষে সুহানা বলেছিল,
> “রোদ, আমি চাই না তুমি শুধু টাকার জন্য বিধর্মী রাষ্ট্রে থেকে নিজের জীবনের বরকত হারাও… চল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বাংলাদেশে ফিরে যাই।”
রোদ তখন রেগে বলেছিল,
> “সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলে, কিন্তু পেটে ভাত না থাকলে মানুষ নামাজও ভুলে যায়!”
সুহানার এসব শুনে কেদেছিল, কিন্তু সে কিছুই বলেনি।
আজ এত বছর পর রোদ সেই একই চোখের জল নিরার ভেতর অনুভব করল।
রোদ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাতের আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে।
একটা বাতাস এল— খুব চেনা একটা ঘ্রাণ, যেন সুহানার পারফিউমের গন্ধটা এখনো বাতাসে রয়ে গেছে।
রোদ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “সুহানা… আমি পারিনি। আমি তোমার মতো হতে পারিনি।”
চোখের কোণে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
রায়ান ঘরের ভেতর থেকে ঘুমের ঘোরে বলল—
— “পাপ্পা… মাম্মা…”
রোদ ফিরে তাকিয়ে দেখল, তার ছোট্ট বাবাটা শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে।
তারপর নিজের কণ্ঠটা নিচু করে বলল—
— “বাবা, তোমার মাম্মা আত্না হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে… আমরা নেক আমাল করলে, আমরা ওর সাথে দেখা করতে পারব।
আকাশের দিকে তাকিয়ে রোদ ধীরে ধীরে বলল—
“সুহানা, আমি এখনো তোমাকে ভুলতে পারিনি।”
————–
সকালে রোদ একা একা সোফায় বসে আছে।কাজের লোকের হাতের রান্না সে খেতে পারেনা।চারপাশে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা— যেন মেহের চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটাই ফাঁকা হয়ে গেছে।
ফ্রিজের ঠান্ডা বাতাসও আজ গরম লাগছে।
মেহেরের গন্ধ, মেহেরের হাসি, এমনকি তার নরম কণ্ঠের “চা খাবি ভাইয়া?” — সব যেন এক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেছে।
রোদ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল।
চুলার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাঁড়িতে ডাল চাপাল, তারপর ভাত বসালো।
হঠাৎ হাঁড়ির ভেতর থেকে ফোঁস করে গরম পানি ছিটকে এল,
রোদের ডান হাতে গিয়ে পড়ল।
সে ব্যথায় চমকে উঠল,
— “আহ্!”
হাতের চামড়া লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।কাজের লোক পাশের ঘরে ঝাড়ু দিচ্ছিল।হঠাৎ এমন শব্দ শুনে দৌড়ে এল,
— “হায় আল্লাহ স্যার! আপনার হাত পুড়ছে কেমনে! ঠান্ডা পানি দেন এখনই!”
রোদ একদম চুপচাপ পানির নিচে হাত ধরল, কিন্তু
গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল ।
সে জানে না ব্যথাটা হাতের জন্য নাকি মনের জন্য।
পানির নিচে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
— “তুই ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না মেহের… এমনকি রান্নাও না।”
+++++++++++++++++++++++
২০ মিনিট পরঃ
রোদ ধীরে ধীরে রুমে ঢুকল। জানালার পর্দা দিয়ে সকালের হালকা আলো ঢুকছে।
রায়ান তখনো ঘুমে ঢুলে আছে, ছোট্ট হাতটা মুখের পাশে রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
রোদ বিছানার পাশে বসে নরম গলায় বলল —
“বাবা, উঠবে না? সকাল হয়ে গেছে।”
রায়ান চোখ মেলল, আধো ঘুমের স্বরে তুতলিয়ে বলল —
“পাপ্পা…”
রোদ হেসে ওর চুলে হাত বুলিয়ে বলল —
“হ্যাঁ পাপ্পার রাজকুমার, উঠে পড়ো এখন।
রায়ান চোখ ঘষে মুখ বাঁকালো —
“না, আমি আর ঘুমাবো…”
রোদ হেসে বলল —
নাহ বাবা এখন উঠতে হবে।তুমি যদি এখন ঘুম থেকে উঠ তাহলে তোমাকে গরুর দুধ দিবো আর তোমার পছন্দের কার্টুন টিভিতে চালাবো।”
রায়ান তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে উঠল, —
“ইয়েত! কার্টুন!”
রোদ ওকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ব্রাশ হাতে দিল।
রায়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ ফুলিয়ে বলল —
“পাপ্পা, আমি বড় ছেলে হয়ে গেছি, নিজেই ব্রাশ করবো।”
রোদ হেসে বলল —
“ঠিক আছে, দেখি কত বড় হয়েছো।”
রায়ান মন দিয়ে ব্রাশ করছিল, কিন্তু মাঝেমাঝি হেসে বলল —
“পাপ্পা, টুথপেস্টটা ঝাল!”
রোদ হেসে ওর নাক টিপে বলল —
“ওটা ঝাল না বাবা, পুদিনা। এখন মুখ ধুয়ে এসো, তারপর দুধ খাও।”
++++++++++++++++
রোদ হসপিটালে যাওয়ার জন্য রেডি হতে শুরু করল।
ছোট্ট রায়ান হঠাৎ তার দিকে ছুটে এসে বলল—
“পাপ্পা, মেহের সাম্মার সাথে কথা বলব।”
রোদ একটু থমকে, শান্ত স্বরে বলল—
“না বাবা, এখন নয়। আমরা পরে কথা বলবে।”
রায়ান হঠাৎ কেঁদে উঠল—
“পাপ্পা, আমি মেহেরকে চাই।”
নিজের ছেলেকে এমন কান্না করতে দেখে রোদ তাড়াতাড়ি মেহেরকে কল করল।
“মেহের, রায়ান তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে।”
ফোনের পাশ থেকে রায়ান তুতলিয়ে বলল—
“সাম্মা, তুমি কবে আসবে?”
মেহের শান্ত স্বরে বলল—
“ আমি দুদিন পর আসব বাবা। তুমি বরং এই ২ দিন অপেক্ষা কর ওকে।”
রায়ান চোখে অশ্রু জড়িয়ে বলল—
“ঠিক আছে সাম্মা, দুদিনের জন্য অপেক্ষা করব।”
রোদ হাসি ঢেকে হাত বুলিয়ে বলল—
“দেখছো বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে। সাম্মা খুব তাড়াতাড়ি আসবে।”
রায়ান ধীরে ধীরে কান্না থামল, আর রোদ তার ছোট্ট ছেলেকে কোলে চেপে ধরল।
“চল বাবা, এবার আমরা হসপিটালে যাই।”
রোদের বাবা তখন ঘরে ঢুকে বললেন,
“আমিও যাব। তোমাদের সঙ্গে। ”
রোদ মাথা নাড়িয়ে বলল,ওকে বাবা চল।
রোদ গাড়ি চালাচ্ছে আর রায়ান পিছনে বসে রোদের বাবাকে বলল
দাদু জানো মাম্মা অনেক ভালো।
রোদের বাবা অবাক হয়ে বললেন,
“কোন মাম্মা, দাদুভাই?”
রায়ান ছোট্ট মুখ উঁচিয়ে বলল,
“নিরা মাম্মা।”
রোদের বাবা চমকে উঠে রোদের দিকে তাকালেন, চোখে হালকা বিস্ময় আর কৌতূহল।
রোদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল,
বাবা তেমন বড় কিছু না তাই অযথা চিন্তা,কর না।
রায়ান ছোট্ট দুই হাত তুলে উচ্ছ্বাসে বলল —
“দাদুভাই, আমি নিরাকে মাম্মা হিসেবে চাই, তুমি এনে দিবে?”
রোদের বাবা একবার রোদের দিকে তাকালেন, তারপর নরম হাসি দিয়ে বললেন,
“ওকে এনে দিব, দাদুভাই।”
রায়ান আনন্দে লাফিয়ে উঠল,
“ইয়েত! দাদুভাই নিরা মাম্মা এনে দিবে!”
রোদ গাড়ি চালাচ্ছিল, কিন্তু রিয়ার মিররে ছেলের মুখ দেখে থমকে গেল।
চোখে মিশে গেল বিস্ময়, দুঃখ আর একচিলতে অজানা ভয়।
রোদের বাবা বললেন,
নিরাকে বিয়ে করবি রোদ।জীবন তো আর থেমে থাকে না বাবা। একা একা এই সংসার কতদিন চালাবি?”
রোদ নিঃশব্দে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“বাবা, এসব কথা এখন না প্লিজ…”
রোদের বাবা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
“আমি তোর ভালো চাই বলেই এসব বলছি, রোদ। একদিন তুই ঠিকই বুঝবি—
রায়ানের একটা মা দরকার, আর তোর দরকার একজন সঙ্গী।”
রোদ কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
রায়ান তখনো পিছনে বসে খুশিতে খেলনা নাড়ছে —
সে জানে না, তার ছোট্ট ইচ্ছে একটা পূর্ণবয়স্ক হৃদয়ে কত বড় ঝড় তুলেছে।
রোদ হসপিটালে পৌঁছালো।অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে শেষবারের মতো রায়ানের মুখটা দেখল —
ছোট্ট মুখে ভয়, কিন্তু চোখে অগাধ ভরসা।আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন — জটিল কেস, সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। রোদ নিজের হাতে গ্লাভস পরল, গভীর শ্বাস নিল, মনে মনে বলল — “বিসমিল্লাহ…”
অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশের পর সময় যেন থেমে গেল। সবকিছু নিখুঁতভাবে চলছে, মনোযোগ একদম রোগীর ওপর। ঘণ্টাখানেক পর, অপারেশন সফলভাবে শেষ হলো। সহকর্মীরা প্রশংসায় ভরিয়ে দিল — “স্যার, দারুণ কাজ করেছেন!”
রোদ হালকা হাসল, কিন্তু মনে একটা শূন্যতা। চুপচাপ বাইরে এসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই বুকটা হালকা কেঁপে উঠল — **একটাও কল নেই।**
নিরা, যে প্রতিদিন সকাল-বিকেল অন্তত কয়েকশ বার ফোন করত, আজ পুরো দিন কেটে গেল কিন্ত একবারও কল করেনি।
রোদের বুকটা ভারী হয়ে গেল। মনে অজস্র প্রশ্ন— “নিরা কি জানে না আজ আমি অপারেশনে করেছি? নাকি ওর এখন আর সময় নেই আমার জন্য?”
দুটো’মুহূর্ত চুপ থেকে রোদ ঠোঁট কামড়ে হাসল। “না, মন খারাপ করা ঠিক না।”
তারপর নিজের মনে মনে বলল— “সুহানা থাকলে হয়ত বলত— রোদ, মানুষের ভালোবাসা আল্লাহর রহমতের মতো নয়, আজ আছে, কাল না-ও থাকতে পারে। তুমি শুধু তোমার কাজটাকে ভালোবাসো।”
রোদ ফোনটা পকেটে রাখল। চোখে একটুখানি ক্লান্তি। হাসপাতালে নিজের জন্য বরাদ্দ করা রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলল— “সুহানা, তোমার কথাগুলো আজও আমাকে বাঁচিয়ে রাখে …”
রুমে ডুকতেই রায়ান দৌড়ে এসে চিৎকার করে বলল,
— “পাপ্পা! হয়েতে অপালেতন!”
রোদ চমকে ঘুরে তাকাল,
— “কি বলছো বাবা?”
রায়ান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “ওই যে টিভিতে বলতেছে… তুমি অপালেতন করছো!”
রোদ হেসে হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে রায়ানের চোখে চোখ রাখল,
— “হ্যাঁ বাবা, পাপ্পা অপারেশন করেছে। মানে, অসুস্থ মানুষকে ঠিক করে দিয়েছে।”
রায়ান চোখ বড় বড় করে বলল,
— “মানে তুমি হিরো?”
রোদ মৃদু হাসল, রায়ানের মাথায় হাত রেখে বলল,
— “হিরো না বাবা, আমি শুধু ডাক্তার। আল্লাহ ঠিক করেন, আমি শুধু চেষ্টা করি।”
রায়ান হেসে বলল,
— “তবুও তুমি আমার হিরো।”বলেই রোদের গালে চুমু দিল আর ওর কোলে উঠে বুকে মুখ লুকিয়ে শুয়ে রইল।
রোদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল রায়ানের দিকে।
মুহূর্তটা যেন সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নিল।
নিরার অভিমান, সুহানার স্মৃতি—সব মিলিয়ে ওর মনে একটাই অনুভূতি জেগে উঠল—
“এই ছোট মানুষটার জন্যই আমি এখনো টিকে আছি।”
রোদের বাবা হাতে দুটো আইস্ক্রিম নিয়ে রুমে ঢুকলেন। মুখে মিষ্টি হাসি।
তিনি রায়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এই নে দাদুভাই, আইস্ক্রিম খা।”
রায়ানের চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল আনন্দে,
— “সত্যি দাদুভাই! আমার জন্য?”
রোদের বাবা হেসে বললেন,
— “হ্যাঁ দাদুভাই তোর জন্যই। তুই তো আজ খুব শান্ত ছিলি, তাই এই পুরস্কার দিলাম।”
রায়ান দৌড়ে গিয়ে দাদুর কাছ থেকে আইস্ক্রিমটা নিল,
ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল,
— “দাদুভাই, তুমি একদম বেস্ট!”
রোদ পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখে মুচকি হাসল।
তার বাবা আর ছেলের হাসির মধ্যে এক টুকরো শান্তি মিশে আছে।
রোদের বাবা মজা করে বললেন,
— “তোর পাপ্পাকেও দিবো নাকি একটা আইস্ক্রিম?”
রায়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “না দাদুভাই, পাপ্পাকে দিও না। কারন পাপ্পা বলে ঠান্ডা খাওয়া খারাপ!”
রুমের সবাই হেসে উঠল।আর রায়ান ছোট্র মুখ নিয়ে আইস্ক্রিম খেতে লাগল।
নোটঃ যা যা মনে করলে শিরক হয়..
৪১) যার পীর নাই তার পীর শয়তান মনে করা।
৪২) নতুন ঘর, ব্যবসা শুরু করতে মিলাদ দিতে হয় মনে করা।
৪৩) রান্না করার জন্য হলুদ ধার দেয়া যাবে না
৪৪)গাছের ফল চুরি হলে গাছে আর
ফল ধরে না।মনে করা
৪৫) মৃত ব্যক্তির জন্য চল্লিশা, মৃত্যু বার্ষিকী না করলে মৃতের আত্মা কষ্ট পায় মনে করা।
৪৬) মৃত ব্যাক্তির কবর জিয়ারতের সময় মোমবাতি, আগরবাতি, ফুল দিতে হয় মনে করা।
৪৭) জামা গায়ে থাকা অবস্থায় সেলাই করলে অসুখ হয়। মনে করা
৪৮) মাথায় বা গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে অসুখ হয় মনে করা।
৪৯) মহিলারা হাতে বালা বা চুড়ি না পড়লে স্বামীর অমঙ্গল হয় মনে করা।
৫০) পুরুষ ছেলের রাগ দমন করার জন্য কান ছিদ্র করতে হয়।
