#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [সূচনা পর্ব]
~আফিয়া আফরিন
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম; গ্রামের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে চোখে পড়ে বেশ প্রাচীন একটা বাড়ি। গ্রামের ধুলোঝরা মাটির পথ দিয়ে হেঁটে গেলে একেবারে শেষ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে আছে বাড়ি। বড় দু’তলা, পুরনো ইট, কাঠের মিলিত কাঠামোর তৈরি বাড়িটিতে প্রতিটি কোণায় বহু যুগের ইতিহাসের ছাপ লেগে আছে। বাড়ির প্রবেশদ্বারের উপরে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করা আছে: “খন্দকার আবু মোশাররফ হোসেন, ১৮৮৭”। বছরের সংখ্যাটা পূর্বপুরুষদের গল্প বয়ে নিয়ে আসে। স্থানীয়দের কাছে বাড়িটিকে ঘিরে নানা কল্পকাহিনি আছে; কিভাবে আবু মোশাররফ তখনকার এক হিন্দু ব্রাহ্মণ থেকে নামমাত্র মূল্যে বাড়িটা কিনেছিলেন, কীভাবে সময়ের আঘাত তা সহ্য করলেও তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে।
বাড়ির চারপাশে প্রশস্ত আঙিনা, যেখানে একসময় গোয়ালঘর ছিল, বর্তমানে সেখানে বাগান। বড় বড় বটগাছ, ফুল গাছ, এছাড়াও অজানা অনেক গাছগাছড়া। ঘরের কাঠের দরজাগুলো চমৎকার খোদাই করা, প্রায়শই সময়ের রেখায় ফেটে গেছে, তবুও সৌন্দর্য হারায়নি। জানালার কাঁচ আর কাঠের খিলানগুলোকে সূর্যাস্তের আলো স্পর্শ করলে সময়ের পুরনো ছবি চোখের সামনে নেমে আসে।
বাড়ির বর্তমান অঙ্কন হলো: খন্দকার আলফাজ উদ্দিন, শান্ত স্বভাবের একজন ব্যক্তি, তার স্ত্রী সালেহা বেগম এবং তাদের একমাত্র ছেলে খন্দকার মতিউর রহমান।
মতিউর রহমানের পরিবারেরও ডালপালা ছড়িয়েছে। তার স্ত্রী আমিনা, এবং তিন কন্যা। বড় মেয়ে মিতুল বিয়ে করে স্বামীর সাথে জার্মানিতে থাকছে। মিতুলের অনুপস্থিতি বাড়িতে নিঃসঙ্গ শূন্যতা তৈরি করেছে। মেজ মেয়ে মেহুল; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট মেয়ে তুতুল, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়াশোনা করছে। তুতুলের কিশোরী চঞ্চলতা বাড়িটাকে একমুহূর্ত স্থির থাকতে দেয় না।
বাড়িতে মোট সদস্য এখন মাত্র ছয়। চারপাশের বিশাল ঘরগুলোর নিরিবিলি স্থাপনার মধ্যে মানুষের কমতি স্পষ্ট। খন্দকার আলফাজ উদ্দিনের এক মেয়েও আছে, কিন্তু বাড়িতে তার উপস্থিতি কয়েকবছর যাবত নেই বললেই চলে। গত ১২ বছর ধরে বোন জামাইয়ের সঙ্গে মতিউর রহমানের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। সেসময় থেকে তাদের মধ্যে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ। আলফাজ উদ্দিনের বয়স হয়েছে, মেয়ের জন্য মনটা বড্ড পোড়ে। কিন্তু একটা খোঁজ জানা নেই, জানার উপায়ও নেই। ইদানিং শরীরটা বেশ খারাপ লাগে। হুট করে পরাপারে চলে গেলে, আর কোথায় পাবেন একমাত্র মেয়েকে…
ছুটির দিনে নিস্তব্ধ খন্দকার বাড়িটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সকালের রোদ্দুর পুরনো জানালা দিয়ে ঢুকে দেয়ালে ধুলোকণা ঝলমল করে তোলে। এমন দিনে মেহুলের তেমন কিছু করার থাকে না। নাস্তা আর মায়ের সঙ্গে সকালের কাজগুলো শেষ করে কিছুক্ষণ দাদা-দাদির ঘরে গিয়ে বসে। দাদা তখন পুরনো দিনের গল্প বলেন। এখন তো জীবন অনেকটা উন্নত, কিন্তু কেমন ছিল সেই সময়ের জীবন? সালেহা বেগম পাশে বসে বিরক্ত হয়ে বলেন,
— “মণি রে, তোর দাদার এক গল্প শুনতে শুনতে আমার কান পচে গেল। তোর বিরক্ত লাগে না? সারাক্ষণ এক ঢংয়ের গপ্পো।” মেহুল হাসে। এই গল্পগুলো ও শতবার শুনেছে, তবুও একঘেয়ে লাগে না। একধরনের ভালোবাসা আর মায়ার মিশ্রণ রয়েছে দাদার গল্পে।
সব কাজ শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে আসে। বাড়ির চারপাশে নিস্তব্ধতা, দূরে কারও হাঁকডাকও শোনা যায় না। এই সময়টায় মেহুল নিজের ঘরে গিয়ে ছোট টেবিলের পাশে বসে। পুরনো একটা স্পিকারে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে নিজেও গুণগুণ করে, “আমারও পরানও যাহা চায়, তুমি তাই… তুমি তাই…”
সুরের তালে তালে চোখ বন্ধ করে হারিয়ে যায়। বাইরের পৃথিবী, বাড়ির একঘেয়েমি, এমনকি নিজের চিন্তাও মিলিয়ে যায় সেই সুরে। ততক্ষণে তুতুল ঘরে ঢুকে পড়ে। ওর মুখে চিরচেনা উচ্ছ্বাস। একদম কিশোরীদের মতই প্রাণবন্ত। ব্রেকিং নিউজ প্রকাশের ভঙ্গিতে বলে,
— “আপা, শুনছো? নীলা আর রিয়াদ নাকি আবার দেখা করেছে।”
মেহুল হেসে উঠে। পাড়ার সমস্ত প্রেমের কাহিনী তুতুলের কাছে পাওয়া যাবে। সকলে ওকে সিসিটিভি নামেই চেনে। কে কার সঙ্গে কথা বলছে, কারা কোথায় দেখা করছে, কারা একসাথে হাত ধরে হাঁটছে; পাড়ার নিঃসঙ্গ গোয়েন্দা, সবকিছু ওর নখদর্পনে। সবার সব হাড়ির খবর জেনে মেহুলের কাছে বলা একধরনের দায়িত্ব… মেহুল বলল,
— “তুই প্রেমের গল্প ছাড়া আর কিছু জানিস না? সবসময় এসবই।”
তুতুল গাল ফুলিয়ে বসে পড়ে,
— “এইসব না থাকলে জীবনটা কি একেবারে শুকনো লাগত না আপা?”
রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর তখনও ভাসছে, তুতুলের কথার মাঝে মিশে যায় সেই মধুর গানের লাইন, “তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও…”
মেহুল আর তুতুল গান আর গল্পে মশগুল, এমন সময় ঘরের দরজা খোলার শব্দ শোনা যায়। এলেন আমিনা, ওদের মা। তার চোখে বিরক্তি, চিন্তার রেখা। গমগমে কণ্ঠে বললেন,
— “আবার গান? অজাত কতগুলো। ঘরের মধ্যে কাজকর্ম নাই, কিচ্ছু নাই। গল্প, গান-বাজনা, নাচানাচি; এসবই চলবে সারাদিন? পড়াশোনার খবর আছে? হুদাই বাপের টাকাগুলো নষ্ট।”
দুইবোন চুপ। মা কিছুদিন আগে মেহুলের জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধের কথা বলছিলেন। সেই সম্বন্ধ এখনও তার মাথায় ঘুরছে। ছেলেটা ভালো, পরিবারের অবস্থাও যথেষ্ট। কিন্তু মেহুল? ও কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। আপাতত পড়াশোনা করতে চাচ্ছে। আজও ফোন এসেছিল। ছেলের পরিবার চায়, অন্তত ছেলে-মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলুক, বুঝে নিক একে অপরকে। কিন্তু মেহুল চুপচাপ বসে আছে। আমিনা মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে বসল। তারপর বলল,
— “মেহুল, তুই কি জামাইকে ফোন করেছিস? অন্তত ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা তো কর।”
এহে, মা তো এখনই ছেলেটাকে জামাই বানিয়ে ফেলেছে। মেহুল কিছুই বলল না। মা বোঝেই না। তুতুল তখন পাশ থেকে কিছু বলার চেষ্টা করতেই আমিনা চোখ রাঙালেন। এই মেয়ে আরেক বজ্জাত। কোথায় বড় বোনকে রাজি করাবে তা না করে উল্টো আরো কাহিনী করে বেড়াচ্ছে, কানে বিষ ঢালছে। নীরবতা ভেঙে আমিনা বললেন,
— “মেহুল, আজ বিকেলে সৈকত দেখা করতে চাচ্ছে। আমি চাই, তুই যা। কথা বললেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। অন্তত কাউকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তো উপযুক্ত কারণ লাগে। তুই দেখা করলি না, জানলি না, চিনলি না, বুঝলি না অথচ ফিরিয়ে দিচ্ছিস কোন আক্কেলে? আজকে যা তুই। ভালোভাবে রেডি হয়ে, একটু সাজগোজ করিস। চুলগুলোর কী অবস্থা? গোসল করে শ্যাম্পু করবি। তোর বাবার আর আমার ছেলেটাকে বেশ লেগেছে।”
মেহুলের চোখে প্রথমে দ্বিধা, ভয় আর অস্থিরতার মিশ্রণ খেলে গেল। অন্তরজ্বালায় ঝড় বইছিল। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে থেকে, মায়ের কথাগুলো ভালো করে ভেবে দেখলো। ঠিকই তো বলেছে মা। কাউকে ফিরিয়ে দিতে গেলে নির্দিষ্ট কারণ দরকার হয়। একবার বরং দেখা করেই দেখুক, ক্ষতি কী তাতে? ভালো লাগলে লাগবে, না লাগলে কেউ জোর করবে না। মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে মেহুল মাথা হেলাল,
— “আচ্ছা মা, ঠিক আছে। আমি দেখা করব উনার সঙ্গে।”
আমিনার মুখে হাসি ফুটল। যতটা বিরক্ত নিয়ে ঘরে এসেছিলেন ততটাই উচ্ছ্বাস নিয়ে ফিরে গেলেন। তুতুল বসল, মেহুলকে ক্ষ্যাপাতে। ওর ভাষ্যমতে, মেহুলকে খুব লাজুক দেখাচ্ছে। চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
মেহুলের কপালে পরপর কয়েকটা ভাঁজ পড়ে। সবকিছু মিলিয়ে ভীষণ বিরক্ত। বিকালে কারো সাথে দেখা করতে যেতে হবে, ভাবতেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে। মেজাজ খারাপ নিয়েই গোসলে গেল। কোনোরকম গোসল থেকে বের হয়ে দেখল বিছানার ওপর সুন্দর একটা টুকটুকে গোলাপী রংয়ের শাড়ি রাখা আছে। নির্ঘাত মায়ের কাজ! মেহুল অনুভূতিহীন হয়ে শাড়িটা ফেলে রেখে একটা থ্রি-পিস বের করল। সবার জন্য শাড়ি পড়া যায় না। এটা বিশেষ এক সাজ, বিশেষ এক অনুভূতি, বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গী। মেহুলের জীবনে যখন সেই বিশেষ মানুষটি আসবে, যখন হৃদয় পাবে প্রতিফলন, তখনই তার জন্য ও শাড়ির আঁচল গায়ে জড়াবে। এর আগে না, কোনোভাবেই না…
.
জার্মানির ছোট, সুশৃঙ্খল শহর হাইডেলবার্গ। নদীর ধারে ছিমছাম ঘরবাড়ি, লালচে ছাদের সারি আর সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নিস্তব্ধ শহর। এখানে পাথরের তৈরি পুরনো সেতু আর দুর্গের ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যায় রাস্তা রোড লাইটের নরম আলোয় আলোকিত হয়ে আছে, ক্যাফেগুলোর জানালা দিয়ে ভেসে আসছে কফির ঘ্রাণ আর গিটারের সুর।
ছোট্ট একটা ক্যাফে। ক্যাফের এককোণে বসে আছে চার-পাঁচজন তরুণ। হাসছে, গল্প করছে, মাঝে মাঝে গিটার হাতে নিচ্ছে কেউ। ঠিক মাঝখানে বসে আছে ইরশান; পরনে ব্ল্যাক জ্যাকেট, কাঁধে ঝুলে থাকা ব্রাউন গিটার। তার আঙুল গিটারের তার ছুঁয়ে দিচ্ছে আর আবির্ভুত হচ্ছে কোমল সুর; একটু বিষণ্ণ, একটু মিষ্টি। বন্ধুরা হাসছে, কেউ গলা মেলাচ্ছে, কেউ চুপচাপ বসে। ইরশান হেসে গিটার টিউন করে বলে,
— “আজই শেষ রাত এই শহরে… তাইনা? একটু স্মৃতি জমিয়ে রাখি। এইবার ফিরতে হয়ত দেরি হতে পারে আবার নাও ফিরতে পারি।”
বন্ধুরা একটু মনখারাপ করল বটে তবে কেউ কিছু বলল না। ইরশানের যাওয়ার দিনক্ষণ আরও মাসখানেক আগে থেকে ঠিক হয়ে আছে। ওদের মনখারাপ কাটাতে আঙুলের ছোঁয়ায় তারগুলো থেকে নেমে এলো নরম সুর, “Lights will guide you home… and ignite your bones…”
ইরশান গাইতে গাইতে একবার চোখ তুলে বাইরে তাকায়। আকাশে জ্বলছে ম্লান চাঁদ, আর মনে হচ্ছে বাংলাদেশ তাকে ডাকছে। আগামীকাল ফ্লাইট। এইবার ফিরে যাওয়ার খুব তাগিদ অনুভব করছে। দশটা বছর… কম সময় না। এত বছর পরিবার থেকে দূরে, সব ফিকে হতে শুরু করেছে। এখানে আকাশে নক্ষত্রেরা নীরব, বুকের ভিতরে কেবল একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়; “ফিরে এসো তুমি নরম মাটির গন্ধে, মায়ের কণ্ঠের মতো কোমল টানে।”
.
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। চারপাশে ছায়া নামছে, বাতাসে পলাশপাতা নড়ে উঠছে। মেহুল নির্দিষ্ট রেস্তোরায় এসে বসেছে। ও একটু আগেভাগেই এসে গেছে। মা বারবার সাজগোজ নিয়ে উপদেশ দিচ্ছিলেন তাই বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, তাড়াহুড়ো করে আসাটাই ভুল হয়েছে। মনে অস্বস্তি হচ্ছে, আগে আসার কারণে ওই লোকটা ভাবতেই পারে মেহুল খুব আগ্রহী। কিন্তু না, এটা হতে দেওয়া যাবে না। ও উঠে দাঁড়ায়। ভ্রূকুটি করে মসৃণ পথ ধরে দু’পা সামনে এগোতেই পেছন থেকে পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
— “এক্সকিউজ মি! তুমি কি মেহুল?”
মুহূর্তেই থেমে যায় মেহুলের পা। ঘুরে দাঁড়ায় ও। চোখে একচিলতে কৌতূহল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন; লম্বা, গাঢ় নীল শার্ট পরনে, চোখে চশমা, মুখে হাসি, ২৯/৩০ বছরের এক যুবক। মেহুল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, নিঃশব্দে। চিনতে পারেনা আগুন্তককে। উত্তর দেয়,
— “হ্যাঁ… আমি মেহুল। আপনি?”
— “আমি সৈকত রহমান।”
মেহুলের মনে একমুহূর্তের জন্য ধাক্কা লাগল। ওহ, এই তাহলে সেই পাত্র! কোনো ভাব প্রকাশ করল না ও। নীরবে পাশের কাঠের চেয়ারটা টেনে বসল। এই দেখা-সাক্ষাৎটা ওর কাছে কেবল আনুষ্ঠানিকতা। সৈকতও হেসে উল্টোদিকের চেয়ারে বসল। মেহুল চুপচাপ বসে মৃদু স্বরে বলে,
— “জি, বলুন।”
— “একাই বলব?”
— “না না, তা কেনো? আপনি শুরু করুন।”
সৈকত গলা পরিষ্কার করে সোজা হয়ে বসে। সে কি বলবে না বলবে, তা আগেই ভেবে এসছে।
— “শুনলাম আপনি বিয়েতে রাজি হচ্ছেন না? ব্যক্তিগত কারণ আছে কোনো? আমার পড়াশোনা, জব, সবমিলিয়ে তো আমাকে রিজেক্ট করার মতো কারণ দেখি না।”
মেহুলের ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে,
— “তেমন কোনো কারণ না। আসলে বিয়েটা পরে করতে চাচ্ছি।”
— “কেনো?”
— “পড়াশোনা করব।”
সৈকত ভ্রু কুঁচকে বলে,
— “মেয়েমানুষের এত পড়ে কি হবে? বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করার জন্য যতটুকু পড়েছ তাই অনেক বেশি। আর রইল চাকরি-বাকরি? তা করলে সংসার সামলাবে কে, বলো তো?”
মেহুল নিঃশব্দে তাকাল সৈকতের দিকে। ধীরকণ্ঠে বলল,
— “আমার আসলে সংসার সামলানোর ইচ্ছে নেই।”
সৈকত খানিক অবাক, খানিক বিরক্ত,
— “কেনো?”
— “এটার উত্তর নেই।”
সৈকত প্রশ্ন করে,
— “তোমার কাছে আছে কি?”
মেহুল হেসে মাথা নাড়ল,
— “ভাবার মতো বিষয়। মনে হয় না, কিছু আছে। মানে, আপনি যা চাচ্ছেন, তার কিছুই আমার মধ্যে নেই।” মেহুলের চোখেমুখে তখন এক চিলতে শান্ত বিদ্রুপ। কিন্তু বোকা সৈকত তা বুঝল না। উল্টো দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
— “উঁহু, আমি সুন্দরী চাচ্ছি। তোমার মধ্যে তা আছে। তুমি বেশ সুন্দরী।”
মেহুল আবারও কিছু না বলে হেসে ফেলল। একটা ঠান্ডা, ভদ্র ধরনের হাসি। যার ভেতরে ছিল তাচ্ছিল্য। সেই হাসির গভীরতা সৈকতের চোখে ধরা পড়ল না। সে আরও কাছে ঝুঁকে নরম স্বরে বলল,
— “রান্নাবান্না পারো?”
মুহূর্তে মেহুলের চোখে একঝলক বিদ্যুৎ নেমে এলো। হাসিটা মিলিয়ে গেল ঠোঁটের কোণে, ওর আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দ প্রতিবাদের গন্ধ। মেহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা পিছিয়ে দিল। নিজেকে সংযত রেখে একেবারে স্থির কণ্ঠে বলল,
— “আপনার সময় আছে? আমাদের বাসায় যেতে পারবেন?”
সৈকত হকচকিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— “কেন?”
মেহুল শান্তভাবে তাকাল,
— “চলুন না, প্লিজ। অনুরোধ করছি। একটা জিনিস দেখাব।”
সৈকত অবাক হলেও হেসে ফেলল,
— “বিয়ের আগে শ্বশুরবাড়ি?”
মেহুলের ঠোঁটে একটা খেলাচ্ছলে হাসি ফুটল। চোখে খুব সামান্য রহস্য। রহস্য সামান্য মনে হচ্ছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে বড় কিছু খেলা করছে বোধহয়।
— “সমস্যা কী? রান্নাবান্না সম্পর্কে একটু আইডিয়া দিতাম।”
সৈকত হেসে হাত নাড়ল,
— “আচ্ছা আচ্ছা! বিয়ের আগেই জামাই আদর! বেশ বেশ, চলো।”
মেহুল উত্তরে কিছুই বলল না শুধু সামান্য মাথা নাড়ল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সামনের পথে। সন্ধ্যা বেশ গাঢ় হয়ে উঠছে। দূরে শোনা যাচ্ছে হারমোনিয়ামের সুর। সৈকত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মেহুলের পাশে হাঁটছে, আর মেহুলের ঠোঁটের কোণে লেগে আছে চওড়া, অচেনা হাসি। যে হাসির মানে সৈকত বুঝতে পারছে না। সম্ভবত বুঝতেও চাচ্ছে না।
বাড়ির সামনে এসে মেহুল থামল। সন্ধ্যার পর এই বাড়ির রূপ পাল্টে যায়। মেহুল অন্যপাশে গিয়ে রান্নাঘরের জানালায় উঁকি দিল। ভাজা পেঁয়াজের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করছে। ও একটু উঁচু গলায় ডাক দিল,
— “জুঁই! জুঁই!”
মিনিটখানেকের মধ্যেই ভেতর থেকে চুল বাঁধতে বাঁধতে, ভেজা হাত ওড়নায় মুছতে মুছতে জুঁই নামের মেয়েটা বেরিয়ে এল। বয়স বেশি নয়, উনিশ-বিশ হবে। দৃষ্টিতে সরলতা, মুখে একটু বিস্ময়।
— “কি হইছে আপা?”
মেহুল মৃদু হাসল। এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে বলল,
— “আয়, একটু সামনে আয়।”
জুঁই অবাক হলেও আপার মুখ দেখে কিছু বলল না। মেহুল ওর হাত ধরে সৈকতের সামনে দাঁড় করাল। খুব শান্ত স্বরে বলল,
— “দেখ তো, পছন্দ হয় উনাকে?”
সৈকত হতবুদ্ধি, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। জুঁইও ভয় মিশ্রিত বিস্ময়ে একবার মেহুলের দিকে, একবার সৈকতের দিকে তাকায়।
দু’জনের সেই হতভম্ব মুখ দেখে মেহুলের ঠোঁটের কোণে কঠিন হাসি ফুটে উঠল।
— “শুনুন, মিস্টার,” ওর কণ্ঠ এখন তীক্ষ্ণ এবং স্থির, “ও হচ্ছে জুঁই। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের বাসায় কাজ করে, কিন্তু ও আমাদেরই একজন। খুব ভালো রান্নাবান্না জানে, পড়াশোনাও মোটামুটি, দেখতেও ঠিকঠাক। বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতে পারবে আর সংসার সামলানোর মতো ধৈর্যও ওর আছে।”
সৈকত আমতা আমতা করে বলল,
— “কী বলছ? এসব শুনে আমি কি করব?”
সৈকতের চোখে চোখ রেখে মেহুল বলল,
— “বিয়ে করবেন ওকে। আপনি যেরকম মেয়ে খুঁজছেন, ও ঠিক সেরকম।”
.
.
.
চলবে….
#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০২]
~আফিয়া আফরিন
অপমানে সৈকতের মুখ রক্তিম হয়ে উঠল। শরীরের প্রতিটি শিরায় রাগ আর লজ্জা একসাথে ছুটে বেড়াচ্ছে। বাড়ি ডেকে এনে এইভাবে অপদস্থ করবে, এমন দৃশ্য সে কল্পনাও করেনি কখনো। মেয়েটাকে দেখে মনে হলো সোজা-সরল, আলাভোলা। এখন পেটে পেটে এমন চালাকি? সৈকতের গলা ভারী হয়ে উঠল,
— “তুমি কী ভাবো নিজেকে? এতক্ষণ তোমাকে ভদ্র, শান্ত মেয়ে মনে হচ্ছিল। আমাকে বাড়ি ডেকে এনে এইভাবে অপমান করার সাহস কোথা থেকে পেলে তুমি?”
মেহুল ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
— “অপমান? না, আমি শুধু আপনাকে আপনার যোগ্য জায়গাটা দেখালাম।”
— “যোগ্য জায়গা? তুমি কে রে ভাই, আমাকে যোগ্যতা শেখাবার? একটা মেয়ে হয়ে আমাকে জায়গা দেখাচ্ছ? নিজের যোগ্যতা আছে?”
মেহুলের চোখে তীব্র দৃষ্টি,
— “নিজেকে অসম্মান করার রাস্তা তো আপনিই তৈরি করছেন। ‘একটা মেয়ে হয়ে’ এই কথাটাই তো আসল সমস্যা, মিস্টার সৈকত। আপনারা ভাবেন, মেয়েরা চুপচাপ থাকবে। মাথা নিচু করে সব মেনে নেবে। ভুল ভাবছেন। ওইদিন চলে গেছে।”
সৈকত দাঁত চেপে বলল,
— “তুমি বুঝি নিজেকে খুব আধুনিক ভাবো? ছেলেদের মতো তর্ক করলে কিংবা কথাবার্তা বললেই কেউ বড় হয়ে যায় না।”
— “বড় হওয়া তর্কে না, চিন্তায় হয়। আপনি যে মানসিকতায় আটকে আছেন, সেখানে কেউ বড় হয় না বরং ছোট হয়ে যায়।”
সৈকত রাগে কাঁপছে। তারপরেও গলা উঁচু করে বলল,
— “তোমার মতো মেয়েরা সংসার টিকাতে পারে না, তাই বিয়ের আগে
এত…”
মেহুল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
— “সংসার টিকানো আমার একার কাজ নয় মিস্টার, সম্মান টিকানো আমার কাজ। আর আমি সেটাই করছি।” কিছুক্ষণ থেমে সৈকতের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করে মেহুল ফের বলল, “আসুন এখন। আপনার এই নাটক এখানেই শেষ। আমারও অন্য কাজ আছে।”
সৈকত রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
— “তোমার মা-বাবা ভদ্রতা শেখায় নাই? বড়দের সাথে এইভাবে বেয়াদবি করতে শিখিয়েছে?”
— “বেয়াদবি বলছেন? আমি শুধু আপনার মানদণ্ডটা দেখালাম, যেখানে একজন মেয়ের মূল্য তার রান্না আর বাচ্চা মানুষ করার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ। আমি অপমান করিনি, শুধু আপনার সামনে আয়নাটা ধরেছি যাতে নিজেকে দেখতে পারেন। বাই দা ওয়ে, একটা মেয়ে যে আপনার বউ হবে সে আপনার থেকে বেশি কিছু চাইবে না। একটু সম্মান দিতে শিখুন। আপনার পরিবার মানে অভিভাবকদের মধ্যে কেউ যদি আমাকে রান্নাবান্নার এই কথাটা বলতো কিংবা সংসার সামলানোর কথা বলতো তবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আপনি? মানে কীভাবে? আপনার সাথে আমার বিয়েই হলো না আর আপনি আমাকে সংসারের গন্ডিতে আটকানোর চেষ্টা করছেন, রান্নার বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছেন; বিষয়টা আমি একদম মানতে পারছি না। প্লিজ আপনি আসুন, আপনার চেহারাও দেখতে ইচ্ছে করছে না। প্লিজ…”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মেহুল পেছন ঘুরে হাঁটা শুরু করল। সৈকত ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মুখে অপমানের ছায়া আর চোখে দগদগে আগুন।
সৈকত চলে গেল না, থাকল; কেউ খেয়ালই করল না। মেহুলের মুখ থেকে যেই সবাই কথাগুলো ওমনিই একেকজনের মুখ কালো হয়ে গেল। একটু আগে পর্যন্ত সবাই যেভাবে প্রশংসার স্রোত বইয়ে দিচ্ছিল ঠিক সেইভাবেই সকলের মেজাজ আগুনে পরিণত হয়েছে। সৈকতের সাহস দেখে সকলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। আমিনার মুখে তো রীতিমতো ক্রোধের বজ্রপাত,
— “ওই ছেলেটার সাহস দেখছ? আমার মেয়েকে এভাবে অপমান? প্রশ্ন করে রান্না জানো কিনা! কেনো? কি করবে? বিয়ে করে বুয়া বানাবে নাকি? ভালো ভেবেছিলাম, এত দেখি জাত শয়তান।” অথচ একটু আগে তিনিই “জামাই জামাই” করতে করতে মুখে ফেনা তুলছিলেন, এইমুহূর্তে সে ছেলের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ফেললেন এমন স্বরে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। তুতুল একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। দাঁত কেলিয়ে হাসছিল। মেহুলের চোখ পড়ল ওর দিকে।
বিরক্ত গলায় বলল,
— “এত দাঁত কেলাচ্ছিস কেন?”
তুতুল হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলল,
— “আমি জানতাম আপা, ওই ছেলের সাথে তোমার কিচ্ছু হবে না।”
মেহুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— “এটা তো জানারই কথা। এই ছেলেটা ভালো না, বিরক্তিকর চরিত্র।”
তুতুল হো হো করে হেসে উঠল,
— “দেইখো আপা, তোমার জন্য রাজপুত্র আসবে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চেপে! সে একদিন আসবেই। তাকে আসতেই হবে। সোনালি বিকেলের হাওয়ায় চুল উড়িয়ে… তোমার উঠোনে থামবে।”
মেহুল ভ্রু তুলে তাকায়। তুতুল থামে না,
— “তার চোখে থাকবে ক্লান্তি, কিন্তু তোমাকে দেখার পর তা নিমিষেই উধাও হয়ে শান্তি ভর করবে। তার গলায় থাকবে তোমার প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত। তুমি ভাববে, অচেনা কেউ বোধহয় পথ ভুলে এসেছে। কিন্তু না, সে আসবে ঠিক তোমার দিকেই… যেন অনেক দূর থেকে অপেক্ষার উত্তর দিতে এসেছে।”
মেহুল আড়চোখে তাকাল। ইশশশ, এমন রাজপুত্র যদি আসত! যে আসছে সে সংসারের মাপকাঠি মাপতে ব্যস্ত। এমন মানুষ মেহুল কখনো চায় না। ওর ইচ্ছে আছে, মন দিয়ে সংসার করার। কিন্তু যে মানুষ সম্পূর্ণ অচেনা একটা মানুষকে সরাসরি তুমি সম্বোধন করতে পারে, অসম্মান করতে পারে; তাকে অন্তত জীবনের আশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আপাকে চুপ থাকতে দেখে তুতুল ফের বলল,
— “জানো আপা, রাজপুত্রেরা কিন্তু হঠাৎ আসে না। তারা আগে আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখে; মেঘের ভাঁজে, বাতাসের গন্ধে, কফির ধোঁয়ায়…”
মেহুল বিরক্ত মুখে তাকায়,
— “তুই আবার শুরু করলি?”
তুতুল হেসে বলে,
— “না না, সিরিয়াস কথা বলছি। তার চোখে থাকবে গল্প, মায়া, ভালোবাসা… আর তুমি যখন রাগ করে তাকাবে, তখন সে তোমার রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টায় মত্ত থাকবে। তুমি হয়ত বলবে, ‘আমি তো সংসার সামলাতে চাই না।’ আর সে মৃদু হেসে বলবে, ‘তোমাকে কেউ সংসার সামলাতে বলেনি, তুমি শুধু পাশে থেকে যাও সারাজীবনের জন্য।’ আমি তখন তাকিয়ে তাকিয়ে তোমাদের দেখব।”
মেহুল আচ্ছা করে তুতুলের কান টেনে দিল। বলল,
— “ক্লাস ফাঁকি নিশ্চয়ই আবার হলে গিয়ে প্রেমের সিনেমা দেখে এসেছিস। সামনে থেকে সর এক্ষুনি, মাকে বলে দিব একদম।” তুতুলের হাসির রিনিঝিনি শব্দটা মিলিয়ে যায়। ও জিভ কেটে সরে পড়ল। ইশশশ, ডায়লগগুলো খুব সিনেমাটিক হয়ে গেছে। আপা ধরে ফেলেছে। মাকে বলে দিলেই কাহিনী খতম।
মেহুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তুতুলের কথা বাতাসে এখনো ভাসছে, “রাজপুত্র আসবে… অপেক্ষার উত্তর দিতে…” ওর মনে একটা হালকা কাঁপন লাগে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে, তারপর চোখ নামিয়ে ফেলে। মনের গভীরে ছোট্ট একটা ভাব জেগে ওঠে, “এই কল্পনা যদি সত্যি হত…”
হয়তো সত্যিকারের রাজপুত্র সত্যিই আসবে না, কিন্তু তুতুলের কথার মতো একটা অপেক্ষা রয়ে যায় হৃদয়ের কোথাও অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা হয়ে।
.
পরদিন গভীর রাতে হাজার মাইল দূরে, আকাশে উড়ে চলেছে সাদা বিমান। নীল মেঘ কেটে এগিয়ে চলছে ধীরে। জানালার পাশে বসে আছে ইরশান। চোখে ঘুম নেই, কেবল একরাশ ভাবনা আর হালকা ক্লান্তি। জানালা দিয়ে বাহির দিকে তাকালে দেখে, গাঢ় অন্ধকার। অন্ধকারেও কাছ থেকে ধোঁয়াশা মেঘগুলো স্পষ্ট। চাইলেই ছুঁয়ে দেওয়া যায়।
ভোর নাগাদ বিমান বাংলাদেশের আকাশে ঢোকে। নিচে সবুজ মেঠে, নদী, আর গাছের মাথায় তুলোর মত নরম কুয়াশা, নদীর মতো বাঁক নেওয়া আলো আর মাটির রঙে মিশে যাওয়া পৃথিবী। চোখে পড়ে একমুঠো আলোকছটা। বিমান মাটি ছোঁয়… দীর্ঘ দশ বছরের দূরত্ব নিঃশব্দে নিঃশেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের আকাশ, সবুজে মোড়া গাছের মাথা, মানুষজনের কোলাহল। ইরশানের বুকের ভেতর গানের মতো একটা অনুভূতি হলো। সে নিঃশব্দে বলে ওঠে নিজের মনেই, “এই মাটির গন্ধ, এই আকাশের আলো, এতদিন পর একটুও বদলায়নি।”
ইরশান যখন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল থেকে বের হল, তখন চোখটা থেমে গেল। নাহ, বদলে গেছে অনেককিছুই। দশ বছর আগের ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরের মতো আর কিছুই নেই। রাস্তা, ফুটপাত, লাইট, উঁচু বাসস্ট্যান্ড, নতুন গাড়ি, আকাশে উড়তে থাকা হেলিকপ্টারের ছায়া সবকিছুর মধ্যে শুধুমাত্র দেশের ঘ্রাণ, মাটির টান আগের মতই আছে। তা কখনোই বদলাবে না। ইরশান নস্টালজিয়া নিয়ে আশেপাশে তাকায়। মা-বাবা কোথায়? ডানদিকে ঘুরতেই দেখতে পেল, দূর থেকে দৌড়ে আসছে বাবা সাজ্জাদুল আলম। পাশাপাশি মা, শারমীন। তাদের পেছনে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে কয়েকটা কণ্ঠস্বরের হাহা, হিহি হাসি। ভাইয়ের ফেরা উপলক্ষে সব কাজিনেরাও হইহই করে ছুটে এসেছে। ইরশান এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। শারমীন চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে বললেন,
— “আর তোকে কোথাও যেতে দিচ্ছি না বাবা।”
সাজ্জাদুল আলম প্রতিবাদের সুরে বললেন,
— “তুমি বললেই হলো? এখানে ছেলে করবেটা কি? এসেছে, ঘুরেফিরে কয়েকদিন পর চলে যাবে। দরকার পড়লে তুমিও একেবারের জন্য জার্মান চলে যাও।”
— “দেখলি বাবা, কী পাষাণ তোর বাবা? আগে নাহয় ছেলে আমার ছোট ছিল, এখন তো যথেষ্ট বড় হয়েছে। দু’দিন পর বিয়ে দিব। বউ বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে? তারচেয়ে ছেলে আর ছেলের বউ, দু’জনকেই আমার সাথে রেখে দিব।”
মা-বাবার তর্কের মধ্যে ইরশান বাঁধ সেধে দাঁড়িয়ে চুপ করিয়ে দিল। সে এসেছে আধা ঘন্টাও হলো না এখনও আর এরমধ্যেই আবার ফিরে যাওয়া, বিয়ে-শাদী সব হয়ে গেছে। ইরশান বেশিক্ষণ অপেক্ষা করল না। বেশি অপেক্ষা করতে গেলে দেখা যাবে, বাচ্চাকাচ্চাও হয়ে গেছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাসি-ঠাট্টার ভেতরেই গাড়িতে উঠল সবাই। বাইরে তখন ঝকঝকে রোদ উঠেছে। গাড়ি ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পথ ধরে গাড়ি ছুটছে। ইরশানের বাড়ি ফেরার আনন্দ আছে, তবুও মনের মধ্যে একরাশ চিন্তা। এইবার দেশে ফেরা শুধু ছুটি কাটানোর জন্য কিংবা মায়ার টানেই নয়, ফেরার পেছনে একটা জোরদার কারণ আছে; যা গত কয়েক বছর ধরে তাকে তাড়া করেছে।
জার্মানির হাইডেলবার্গে, নীরব এক ক্যাফের কোণে বসে সে বহু রাত আলোচনা করেছে এই কারণটা নিয়ে, একজন ঘনিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে।
অবশেষে তারা এক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, যা বাস্তবায়নের দায় এখন ইরশানের কাঁধে।
দু’দিন পর মা’র জন্মদিন। সেদিনই পরিকল্পনার প্রথম অংশটা শুরু করতে চায়। মা অনেকদিন মন খুলে হাসে না। মায়ের মুখে সেই পুরোনো হাসিটা আবার দেখতে চায়, যা হারিয়ে গিয়েছিল অনেক বছর আগে।
বিকেলের রোদটা তখন ঢলে পড়ছে। চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড়ে ছেলেবেলার বন্ধুরা গোল হয়ে বসেছে। পাড়ের পানি চিকচিক করছে, পাশে সারি সারি বট আর কৃষ্ণচূড়া গাছড় বাতাসে কেমন লবণাক্ত গন্ধ, সমুদ্রের কাছাকাছি শহর বলে কথা। জীবনের ১৭টা বছর এই শহরে কেটেছে তার। এই লালদীঘির পাড়েই স্কুলের পরে ক্রিকেট খেলা, প্রথম প্রেমের গল্প, প্রথম হার আর প্রথম কষ্টের কান্নাও। চায়ের দোকানে কাচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা চা, প্লাস্টিকের টেবিলে ছড়িয়ে থাকা সিঙ্গারা আর বিস্কুট, সেই সঙ্গে আড্ডা; যার শেষ কোনোদিনই হবে না। পুরো দিনটাই কেটে গেল বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই মিলে এক জায়গায় জমেছে পুরনো সময় ফিরিয়ে আনতে। গরম চায়ের কাপ হাতে গল্প থামছে না কিছুতেই। এক বন্ধু পুরোনো প্রেমের কথা টেনে আনে,
— “এই, মনে আছে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা? ইরশানের সেই প্রেম। মোনামি নাম ছিল না? ভাই, ওর জন্য কান্না পর্যন্ত করছিলি।”
ইরশানও তাল মিলিয়ে বলে,
— “সারারাত কাঁদতে কাঁদতে দুটো বালিশ ভিজিয়ে ছিলাম ভাই। যাইহোক, অনেক অবুঝ ছিলাম। ভুলেও গেছি সেসব।”
— “তারপর বিয়েশাদী কবে?”
এরপর গল্পগুজব চলতে থাকে অবিরত। কেউ বলে অফিসের গল্প,
কেউ বলে সংসারের চাপ। আর ইরশান শুধু শুনে যায়, মাঝে মাঝে হেসে ওঠে…
.
আজকের দিনটায় দাদা-দাদির মনটা কেমন ভারী হয়ে থাকে। বাড়ির উঠোনে সকালের রোদ পড়েছে, এই রোদেও একটু বিষণ্নতা মিশে আছে। দাদা বারান্দায় বসে আছেন, ভাবছেন কিছু, তার দৃষ্টিতে অনন্ত শূন্যতা। দাদি চুপচাপ উঠোনের একপাশে বসে মুগডাল কুটছেন, কিন্তু চোখদুটো বারবার ভিজে উঠছে অজান্তেই। কারণটা একটাই, তাদের একমাত্র মেয়ে যিনি বহু বছর আগে এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আজ তার জন্মদিন।
প্রথমে নাকি রাগ, পরে অভিমান আর তারপর সময়ের নদীতে ভেসে গিয়েছে যোগাযোগের সব সেতু। বছরের পর বছর ধরে কোনো চিঠি নেই, ফোন নেই, খোঁজ নেই শুধু থেকে গেছে নামটা। বাড়ির প্রতিটি দেওয়ালে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি অপেক্ষায়। আজও দাদি দুপুরে রান্না করতে বসে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বললেন,
— “শারমীনের পছন্দ ছিল ডালটা একটু ঘন করে রাঁধা…”
মেহুলের বুকটাও কেমন করে ওঠে। ভাবতে পারে না, কীভাবে এত বছর ধরে কেউ কারো কোনো খোঁজ ছাড়া বাঁচতে পারে! সে তো সম্পর্কে মেহুলের ফুপু হয়। অথচ ও নিজেও তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানেনা। কারণ, মা-বাবা পছন্দ করেন না। শুনেছে তাদের সাথে মারাত্মক ঝামেলার কথা। তবে ইতিবৃত্ত জানে না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দাদি তখনও চুপচাপ উঠোনে বসে আছেন, আর দাদা টানা দৃষ্টি ফেলে রেখেছেন বাড়ির গেটের দিকে। মেহুল পাশে বসে বই পড়ছিল। তুতুল এসে চুপচাপ তার পাশে বসল, কিছুক্ষণ নীরব।
তারপর মৃদু স্বরে বলল,
— “আপা…”
মেহুল চোখ তুলে তাকাল,
— “কী রে?”
— “দাদি আবার কাঁদছিল একটু আগে। আমি দেখেছি।”
— “জানি।” মেহুল নিঃশব্দে উত্তর দিল, চোখ বইয়ের পাতায় স্থির রেখে।
তুতুল একটু থেমে বলল,
— “তুমি কি কখনও ভেবেছ, ফুপু এখন কই? বেঁচে আছে তো?”
মেহুল গভীর নিশ্বাস ফেলল। বইটা বন্ধ করে বলল,
— “প্রতিদিন ভাবি, তুতুল। কিন্তু ভাবলেই বুকটা বড্ড ভার হয়ে যায়।”
তুতুল নিচু স্বরে বলল,
— “দাদি বলে, ফুপুর হাসিটা নাকি তোমার মতোই ছিল।”,
— “তাই নাকি? তাহলে হয়তো… আমি ওনাকে একটু হলেও মনে করিয়ে দিই।”
তুতুল হেসে মেহুলের কাঁধে মাথা রাখল,
— “আমাদের পক্ষে সম্ভব হলে তাকে খুঁজে বের করে এনে দিতাম। মা-বাবা কেনো রেগে আছে তাদের উপর? আমরা কি কখনো তাকে দেখতে পারব না?”
মেহুলের দৃষ্টি মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার ওপর স্থির হয়। এই বাড়ির বাতাসে লুকিয়ে আছে একটা অচেনা নামের প্রতিধ্বনি, যে নামটা এই বাড়িতে কেউ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করে না। কিছু শুনেছিল মেহুল, মা-বাবার ঘরোয়া কথার ফাঁকে; আবছা, ভাঙা টুকরো টুকরো কথা।
ফুপা নাকি কাউকে বিয়ে দিয়েছিলেন জোর করে, আর সেই বিয়েই নাকি আরেকটা সংসার ভেঙে দিয়েছিল। তারপরেই সব সম্পর্ক স্রোতে ভেসে যায়; চিঠিপত্র বন্ধ, সম্পর্ক ছিন্ন, যোগাযোগ হারিয়ে ফেলা। কে দোষী, কে নির্দোষ, আজও কেউ স্পষ্ট করে বলে না।
যেই মুহুর্তে মেহুল ভাবছিল তার ফুপুর কথা সেই একই মুহূর্তে, চট্টগ্রামের শান্ত বিকালে বাড়ির ড্রইংরুমে বসে আছে ইরশান। হাতে একটা কেকের বাক্স, মোমবাতি তিনটা। পাশে মা-বাবা, আজ মায়ের জন্মদিন। বাড়িতে হৈচৈ থাকার কথা, কিন্তু কী অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে চারপাশে। মা নরম গলায় বললেন,
— “বছর কেটে যাচ্ছে, কিছুই আগের মতো লাগে না ইরশান। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, এসব পাগলামি কেন করছিস?”
— “আমি বিয়েশাদী করলাম না, তার আগেই তুমি বুড়ো হয়ে গেলে মা? দিস ইজ নট ফেয়ার।”
সাজ্জাদুল আলম হেসে যোগ করলেন,
— “তোর মা নিজেই স্বীকার করল সে বুড়ি হয়ে গেছে। এখন আমার কি এই বুড়ি বউ নিয়ে সংসার জীবনে আর আগানো উচিত হবে? আরেকটা বিয়ে করে নিই, কী বলো?”
বাপ-ছেলেতে হেসে উঠল। শারমীন মোটেও হাসলেন না। ইরশান আড়চোখে তাকাল মায়ের মুখের দিকে। চোখের কোণে ঝিলিক দেয় জল, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ক্লান্তি। এই ক্লান্তি ঘোঁচাতেই তো এসেছে ইরশান…
.
.
।
চলবে…..
