#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-১১]
~আফিয়া আফরিন
মেহুলের বোধহয় রাগ করা উচিত ছিল কিন্তু ও ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। বলল,
— “আপনার কথাবার্তা দিনদিন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, জানেন?”
ইরশান নিরীহ মুখ করে বলল,
— “আমি তো শুধু চারটা অপশন দিলাম। খুব সুন্দরভাবে, গণতান্ত্রিক উপায়ে।”
— “চুপ থাকুন।”
— “না, না, সেটা তালিকায় ছিল না।” ইরশান গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, “তুমি নিয়ম ভাঙছো।”
মেহুল চুপচাপ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু গলায় বলল,
— “আমার থাকা না থাকায় কি সত্যি কিছু যায় আসে?”
— “অনেককিছুই। আমার দেওয়া চারটে অপশন থেকে তোমার তা বোঝার কথা।”
— “বুঝেছি। উত্তর পরে দিই… এই করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। চলুন, রওনা হই।” মেহুল ইরশানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সামনের দিকে পা চালাল।
বাড়ি ফিরে ইরশান একমুহূর্তও বসে থাকল না। অন্যকারো সাথে দেখাও করল না। সোজা ছুটল শ্বশুর মশাইয়ের খোঁজে। আহারে! অনেকদিন দেখেনি মানুষটাকে। যতটা না মান, তারচেয়ে বেশি টান। “মনটা ডাকছে। যাই একবার অন্তত দেখা করে আসি।” মেহুলকে এই কথা বলে বেরিয়ে গেল।
মেহুল বুঝে গেছে, ইরশানের এই জেদ কেউ থামাতে পারবে না। বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ওর মনে হলো, এই মানুষটা একেবারে আলাদা। তার রাগ আছে, একগুঁয়েমি আছে, হাস্যকর সব পাগলামিও আছে, কিন্তু প্রতিটা কাজের ভেতরে একটা শিশুসুলভ সরলতাও লুকিয়ে আছে। এই অদ্ভুত মানুষটাকে ভালো না বেসে উপায় কী? মেহুল মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবল, “এমন একটা মানুষই তো দরকার ছিল জীবনে… যে মাঝেমাঝে পাগলাটে হবে,
কিন্তু ঠিক সময়ে বুকের ভেতর একটুখানি আশ্বাস রেখে যাবে।”
ওর ঠোঁটে একফোঁটা হাসি খেলে গেল। বুকে জমে থাকা অভিমান একটু একটু করে নিজেদের জায়গা খুঁজে পাচ্ছে। যে সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে শুধুই এগ্রিমেন্ট হিসেবে, আজ সেই সম্পর্কের ভেতর গজিয়ে উঠছে অনাবিল আবেগ; যার নাম ভালোবাসা!
.
দুপুরের কড়া রোদে এবং মানুষের ভীড়ে বাসস্ট্যান্ডটা গরম হয়ে উঠছে। লোকজনের আনাগোনা, হর্ণের শব্দ, ধুলো উড়ছে। তার মাঝেই ইরশান এক হাতে শ্বশুরের কাঁধ স্পর্শ করে দাঁড়াল। কেন যে সে মতিউর রহমানকে এখানে নিয়ে এসেছে তা তিনি বুঝতেই পারছেন না। কিছুক্ষণ আগে ইরশান যখন তার দোকানে পা রেখেছিল তখনই তার ভুরু কুঁচকে গেছিল। চোখেমুখে এমন একটা ভাব ধরে রেখেছিলেন যেন বলছেন, “সর্বনাশ তো চলে গেছিল। আবার ফিরে এসেছে কি করতে?”
ইরশান এগিয়ে এসে মুখে একগাদা হাসি নিয়ে তাকে কদমবুচি করতেই তিনি বিরক্ত মুখে তাকালেন,
— “আবার এসেছো? আমি ভেবেছিলাম তোমার নাটক শেষ হয়েছে। এখনও কেন ফিরে যাওনি?”
— “আপনি তো বেশ খুশি মনেই ছিলেন। আমাকে দেখেই আবার রাগ চড়ে গেলো? আমি কি দেখতে খারাপ? আপনার মেয়ে কিন্তু আমাকে হেব্বি পছন্দ করে।”
মতিউর রহমান গর্জে উঠলেন,
— “তুমি আর তোমার ওই বন্ধু এখুনি বিদেয় হও। আমার বাড়িতে আমি অপবিত্র ছায়া দেখতে চাই না।”
— “অপবিত্র ছায়া? আচ্ছা, আমিও তো নিজের জীবনে এক অপবিত্র ছায়াকে বরণ করে নিয়েছি। যেমন, আপনি। আমি কি কখনও অভিযোগ করেছি? না, চুপচাপ সহ্য করছি। আমার সহ্যশক্তি দেখেছেন, মশাই? আমার মতো হতে শিখুন, একটু। উফফ আল্লাহ, কোথায় ফেঁসে গেলাম আমি? শুধুমাত্র আমার পরাণপ্রিয় বউয়ের জন্য এই অসুরকে সহ্য করতে হচ্ছে।”
মতিউর রহমানের মুখ লাল হয়ে গেল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
— “এই ছেলে, মুখ সামলে কথা বলো।”
ইরশান ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
— “মুখ সামলেই বলছি, মশাই। আপনি এভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না। আশপাশ থেকে দশ গ্রামের মানুষ এসে হাজির হবে। যা গলা আপনার! গলা তো না, যেন ফাটা বাঁশ। বয়স তো অনেক হলো। এত হাইপার হলে যেকোনো সময় আমার শাশুড়ি বিধবা হবে।”
এরপর আর তেমন কোনো কথা হয়নি। মতিউর রহমান রাগে মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ইরশান একপ্রকার জোর করেই তাকে টেনে এনেছে বাসস্ট্যান্ডে। চারপাশে প্রচন্ড ভিড়, বাসগুলোর শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ধূলোবালিও সমানতালে নিঃশ্বাসের সাথে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সূর্যের আলো গরম হয়ে পিচের ওপর পড়ে চিকচিক করছে।
ইরশান কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। কিছু একটা ভাবছে গভীর মনোযোগে, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছে। মতিউর রহমান তিক্ত হয়ে তাকিয়ে আছেন। এখানে এসেও এই রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ইরশানকে জিজ্ঞেস করলেও সে চুপ, কোনো উত্তর নেই।
তার চোখ শুধু রাস্তার দিকে, যেন কারও অপেক্ষায়।
সময় আরেকটু কেটে যায়। অপেক্ষার পালা তখনই শেষ হয় যখন দূরে আরেকটা বাস এসে থামে। যাত্রীরা নামছিল… সেই ভিড়ের মাঝেই দু’জনকে দেখা গেল। শাড়ি পরা মধ্যবয়সী একজন নারী আর মধ্যবয়সী পরিচিত একজন ভদ্রলোক। মতিউর রহমান চোখ কুঁচকে তাকালেন। অবাক হয়ে বললেন,
— “ওরা তো… শেফালী আর ফরহাদ! এখানে কেন ওরা? এখানে ওদের কি কাজ? কে ডেকেছে?”
ইরশান তবুও চুপ। তার ওষ্ঠ্যকোণে হাসি, এই মুহূর্তটাই সে চেয়েছিল। কিছু না বলে সামনে এগিয়ে গেল। দূর থেকে পরিচিত স্নেহের হাসি নিয়ে এগিয়ে আসছে খালামণি। ইরশান তাদের কাছে পৌঁছে হেসে আদুরে গলায় বলল,
— “এসেছ খালামণি? কষ্ট হলো আসতে?” তারপর ব্যাগটা নিজের হাতে নিলো। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মতিউর রহমানের মুখের অভিব্যক্তি গিরগিটির মত বদলে যাচ্ছিল। এখানে তিনি নিজের চাপা রাগটা প্রকাশ করতে পারছিলেন না। হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “তুমি আবার কী করতে চাও, ইরশান?”
কিন্তু ইরশান তখনও নীরব। শুধু ঠোঁটেই হাসি খেলে যাচ্ছে। এইমুহূর্তে তার আর কিছুই বলার নেই। বলার মানুষ তো এসেই গেছে। ভাই-বোনের সেই ১২ বছরের ব্যবধানের নীরবতা এইবার যদি মেটে!
শেফালী সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জল চিকচিক করছে। মতিউর রহমান প্রথমে তাকাতে চাইলেন না। মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন, এই দেখা অনিচ্ছার… তবে তার চোখের কোণেও ভেসে উঠল পুরোনো চেহারা, পুরোনো দিন। মুহূর্তের মধ্যেই বুকটা কেমন ভারী হয়ে গেল।
কণ্ঠ শুকিয়ে গেল, অথচ মুখে সেই পুরোনো জেদের রেখা স্পষ্ট।
— “এখানে আসার কি কারণ? এত বছর পরও এই শহরে তোর মুখ দেখতে হবে ভাবিনি। লাজলজ্জা একেবারেই নেই।”
— “মনে আছে ভাই, আমি আপনাদের কেউ না হওয়া সত্ত্বেও আপনারা আমার জন্য কী ছিলেন! আমার জন্য কী করেছিলেন! আপনিই তো…” শেফালীর কণ্ঠে কাঁপন, কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে ফের বললেন, “শীতকালে একদিন বৃষ্টি পড়ছিল, ভিজে যাচ্ছিলাম। আমার তো আবার একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায়। আপনি কোথা থেকে বড় একটা কচুপাতা এনে আমার মাথায় ধরলেন। আমি ভিজলাম না অথচ নিজে পুরো ভিজে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুই আমার ছোটোবোন, তোকে ভিজতে দেব না।’ কনকনে ঠান্ডায় সারা পথ ওইভাবেই নিজে কাঁপতে কাঁপতে ভিজে আমায় বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন ভেবেছিলাম, দুনিয়ার সেরা ভাই আপনি। তবে এমন কেনো করলেন? রক্তের পথ আলাদ হয় কিন্তু আত্মার বন্ধন? তা কি করে আলাদা করবেন? পেরেছেন, এতগুলো বছর আমায় ভুলে থাকতে? বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, ভালো-খারাপ যেকোনো মুহূর্তে আমার কথা আপনার মনে পড়ে নাই?”
তিনি কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। চোখ নামিয়ে নিলেন, যেন মাটিতে কিছু খুঁজছেন। মনে মনে সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল; বৃষ্টিভেজা বিকেল, ভিজতে থাকা শেফালী, আর নিজের ভেজা কাপড়ে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা তিনি নিজে।
শেফালী ফের বলল,
— “আপনি ভাবেননি, কিন্তু আমি ভেবেছি ভাই। ভেবেছি, মানুষ কয়দিন বাঁচে? এই ছোট্ট জীবনে যদি বাঁচার মত না বাঁচতে পারে, তবে কি হলো? আমার নিজের কেউ ছিল না। আপনাদের নিজ বলে জেনেছি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আব্বা-আম্মা, আপা, আপনি, ভাবি না থাকলে আমি কি নিয়ে থাকব বলেন তো?”
মতিউর রহমান মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলেন। কণ্ঠে বরফ মেশানো স্বর,
— “সেদিনের কথা মনে করিয়ে এখন লাভ কি? সব শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে যে যার পথে। তোমাদের এই নাটক এখন আর এখানে আসর জমাতে পারবে না। সব বুঝে গেছি আমি।”
ইরশান আর ফরহাদ হোসেন এখানে নিরব দর্শক। তবে তিনিও এই পরিকল্পনার অংশ। এই বিরোধ মিটে যাক, তা তিনিও চান। তাই তো, অপমানের তীর গুলো সরিয়ে ফের এখানে এসেছেন। এরইমধ্যে ইরশান বলল,
— “আমরা বরং এখন বাড়ি যাই। রোদে আমার স্ক্রিনে ট্যান পড়ে যাচ্ছে। পরে আবার আপনার মেয়ে আমাকে পছন্দ করবে না। তখন তো আপনি আবার সহজেই আপনার মেয়ের সাথে পছন্দের পাত্রের বিয়ে দিতে পারবেন। আমি বেঁচে থাকতে তা কখনোই হতে দিব না। চলুন চলুন আব্বাজান… আপনার মতলব আমি বেশ ভালো বুঝেছি। রোদে আমাকে পোড়ানোর ধান্দা তাইনা? লোক আপনি ভীষণ খারাপ। তাড়াতাড়ি আমার শ্বাশুড়ির জন্য অন্য একটা শ্বশুরের ব্যবস্থা করতে হবে…”
তিনি রক্তচক্ষু নিয়ে ইরশানের দিকে তাকাল। ইরশান তা উপেক্ষা করে দাঁত কেলিয়ে হাসল। নিজেই খালা-খালুকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অসুরটা থাকুক এখানে… বাড়িতে গেলেই চেঁচামেচি শুরু করবে। এমন একটা ভাব যেন সারা দুনিয়া তার খেয়েপরে বেঁচে আছে। পৃথিবীর প্রধানমন্ত্রী ভাবে বোধহয় নিজেকে!
.
শেফালীকে দেখে প্রথমে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। সালেহা বেগম প্রায় ছুটে এলেন রান্নাঘর থেকে। দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের কোণে জল, অথচ মুখে হাসি। এতদিনের অভিমান, এত বছরের দূরত্ব… আমিনাও ছুটে এলেন, চোখ ভিজে গেল আনন্দে। শেফালী সবাইকে আলিঙ্গন করছিল, ফরহাদ হোসেনের মুখের মৃদু হাসি আর আন্তরিকতা। দেখা হলো আলফাজ খন্দকারের সাথে। রাগ-অভিমান যা ছিল তা তো কত আগেই ধুয়েমুছে গেছে। মেয়ে আর জামাইকে দেখে কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতে কতবার যে ক্ষমা চাইলেন, তার ইয়ত্তা নাই। ইরশান একপাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। মেহুলের দিকে তাকিয়ে বলল নিচু গলায়,
— “দেখলে? আমি বলেছিলাম না, এই বাড়িতে আবার হাসি ফিরবে। শুধু তোমার অসুর বাপটাকে দেখো। হাসলেও বোধহয় তাকে ট্যাক্স দিতে হবে। কিপটার কিপটা!”
মেহুলও হাসল।
বারো বছর আগের কথা—
আলফাজ খন্দকার এখনো ভুলতে পারেন না সেই দিনটার প্রতিটি মুহূর্ত। তিনি তখন এলাকায় গর্বিত, সম্মানিত মানুষ। ব্যবসায়িক জগতে পরিচিত নাম। চেয়েছিলেন, মেয়ের বিয়েটা যেন তার সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী হয়। সেই ভাবনা থেকেই বন্ধুর ছেলে সাব্বির রহমানের সঙ্গে সম্পর্কটা পাকা করেছিলেন। ছেলেটা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী, রুচিশীল, মার্জিত; সবমিলিয়ে আদর্শ পাত্র। কিন্তু শেফালী তখন অন্য গল্পে ডুবে। চুপিচুপি ভালোবেসে ফেলেছে ফরহাদকে, তিনি সাজ্জাদুল আলমের বন্ধু। এই বাড়িতে যাতায়াতের সুবাদে শেফালীর সঙ্গে পরিচয়, তারপর প্রেম।
যখন খবরটা প্রথম আলফাজ খন্দকারের কানে পৌঁছাল, তিনি জ্বলে উঠলেন। সেই ক্ষোভে তড়িঘড়ি ঠিক হলো বিয়ের দিনক্ষণ। সবাই হতভম্ব, কোনো প্রস্তুতি নেই। মতিউর রহমানও তখন একদম পাষাণের মতো দৃঢ়। যা বলেছেন, তা হবেই। শেফালী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
— “আব্বা আমি পারব না…” কিন্তু তার কানে কিছু ঢোকেনি। বাড়ির আঙিনায় আলোকসজ্জা চলছে, অতিথিরা আসছে। ঠিক সেসময় শেফালী মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। শেষ মুহূর্তে যদি সাজ্জাদুল আলম না থাকতেন, আজকের এইমুহূর্তটা হয় আসতো না কিংবা অতীত অন্যরকম হত।
তিনি শেফালীকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসে। এখানে ফরহাদের সঙ্গে শেফালীর বিয়ে দিয়ে দেয়। তারপর সোজা কুমিল্লা। কিন্তু এই ঘটনার পরে যা ঘটল, তা জীবনের গল্পটাই পাল্টে দিল। আলফাজ খন্দকার তখন আগুনের মতো জ্বলছেন। মেয়ের মুখে বিষ না উঠলেও তাঁর চোখে যেন আগুন জ্বলছে।
— “এই মেয়ে তো আমার রক্ত না। রক্ত হলে এই বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারত? পরিবারের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করত। কুড়িয়ে এনেছিলাম, মনে আছে? এই প্রতিদান দিল ও!”
অন্যদিকে মতিউর রহমানও তখন সম্পূর্ণ উন্মত্ত। সাজ্জাদুল আলম যে তার বোন জামাই, সে কথা একপ্রকার ভুলেই গেলেন। হাতে থাকা দা ছুঁড়ে মারলেন তার দিকে। একটুর জন্য তা গায়ে লাগল না। এই কাজের পর ওই মানুষগুলোর সাথে আর সম্পর্ক রাখার প্রশ্নই ওঠে না। আরোও অনেক কথাবার্তা, বাকবিতন্ডা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন,
— “আজ থেকে তুই আমাদের কেউ না। রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তোকে যে দাম দিয়েছিলাম, তার প্রতিদান খুব ভালোভাবে দিয়েছিস। আমরা চরম বোকা, আমাদের মানুষ চিনতে শিখিয়েছিস। আমাদের বাড়ি, আমার দোরগোড়া; এখানে দ্বিতীয়বার কেউ যেন নিজেদের অপবিত্র পা না রাখে।”
শেফালী পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গলায় শব্দ আটকে গেল, শুধু চোখের জল গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। চেনা মানুষ, অথচ এত অচেনা লাগছে! তারা আঙ্গুল তুলেছিল সাজ্জাদুল আলম এবং শারমীনের দিকেও। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল…
তারপর তো কেটে গেল দীর্ঘ বারো বছর, একটা যুগের পরিসমাপ্তি। না কোন ফোনকল, না কোন চিঠি, না কোন খবর। এই বারো বছরে অনেককিছু পাল্টেছে, শুধু সম্পর্কটা থেকে গেছে আগের মতোই ভাঙাচোরা। তবুও সময়ের ব্যবধানে কোথাও একটা নিঃশব্দ বেদনা রয়ে গেছে, যেটা কেউ মুখে বলে না কিন্তু সবার বুকের ভেতর নিঃশব্দে জ্বলে।
বাড়ির সবাই তখন আরও বেশি স্তব্ধ হয়ে গেল যখন শুনল শাওন-ই শেফালীর একমাত্র ছেলে। আমিনা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালেন। তুতুলের মুখ হাঁ হয়ে গেল, চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল শাওনের দিকে।
এতদিন যে ছেলেটাকে ও “সাবান” বলেছে, চা’তে লবণ মিশিয়েছে, সে নাকি ওর ফুফাতো ভাই!
শাওন-ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের ভার তার বুকেও চেপে বসেছে। চোখের দৃষ্টিটা একদম শান্ত, সেই শান্তর মধ্যেই লুকানো কতশত অজানা কষ্ট!
তুতুল এক ফাঁকে শাওনের কাছে এগিয়ে আসে। সবাই তখন ঘরের ভেতর গল্পে ব্যস্ত, কেউ পুরনো কথা বলছে, কেউ চোখ মুছছে।
শাওন উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে, হাত দুটো পকেটে। তুতুল একটু থেমে গলা নামিয়ে বলল,
— “একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
শাওন হেসে তাকাল,
— “করো। আমি না বললে তো তুমি থামবে না।”
— “আপনি সত্যি শেফালী ফুপুর ছেলে?”
— “হুম। সত্যি।”
তুতুল ভুরু কুঁচকে বলল,
— “তাহলে তো আপনি আমার ফুফাতো ভাই! কেন মিথ্যে বলেছিলেন যে আপনি ইরশান ভাইয়ার বন্ধু?”
শাওন পকেটে হাত রেখেই উদাস গলায় বলল,
— “আমি কারও ভাই হতে চাইনি, তুতুল। ইরশান ভাইয়ের সাথে আমার বন্ধুর মতোই সম্পর্ক। আমি আসলে একটা গোটা পরিবার দেখতে চেয়েছিলাম। মাকে সবসময় দেখেছি এই বাড়ির অন্তর্কূটের আগুনে পুড়তে। দেখতে এসেছি, এই বাড়ির মানুষের ভালোবাসা এখনও বেঁচে আছে কিনা! রক্ত রক্ত করে যে মানুষ এত চেঁচামেচি করে, রক্ত কী বেইমানি করে না? শুধুমাত্র নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য পাগলামী করলেই তা বেইমানি?”
তুতুল অনুরোধের সুরে বলল,
— “ভুলে যান না। ওসব তো এখন কেউ মনে রাখে নাই। দেখুন, সবাই কত খুশি।”
— “হ্যাঁ। কিন্তু তুমি যদি তখন জানত যে আমি তোমার ফুফাতো ভাই, তাহলে কি ওই লবণ মেশানো চা খাওয়াতে?”
তুতুল মুখ লাল করে বলল,
— “ছিঃ! আপনি এখনও সেটা মনে রেখেছেন?”
— “মনে না রাখলে চলবে? আটলান্টিক সাগরের স্বাদ যে তোমার সৌজন্যে পেয়েছি!”
তুতুল এবার হেসে ফেলল। হেসেই মাথা নিচু করল। ওর মনে হচ্ছে, শাওন যতই ফুফাতো ভাই হোক; ও কিছুতেই ভাইয়া ডাকতে পারবে নি। ইয়ে মানে… সবাই তো আর ভাই টাইপ হয়না। ইরশানকে এক লহমায় ভাইয়া ডাকতে পেরেছে। শাওনকে পারবেই না, কিছুতেই না।
.
জানালার পাশে বসে আছেন মতিউর রহমান। সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দ-উৎসব। মাঝেমাঝে গিটারের টুংটাং আওয়াজ-ও কানে আসছে। তিনি চোখ নামিয়ে রাখলেও, মনটা সেখানে গিয়ে পড়ছে বারবার। ভাবছেন, “সবাই মিলে হাসছে… আমাকে ছাড়া? ওরা তো ভুলেও গেছে আমার রাগ, আমার কথা, আমার সিদ্ধান্ত। এত বছর পর ফিরে এসেছে; কোথাও কি একবারও ভাবল, আমি কেমন আছি?”
চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, মনের ভেতর তীব্র টানাপোড়েন। হঠাৎ আবার নিজেরই ভেতর থেকে অন্য সত্ত্বা বলে ওঠে, “আচ্ছা, আমি কি সত্যিই ঠিক করেছিলাম সেদিন? শেফালী তখনও বাচ্চা মেয়ে… ভালোবেসেছিল, তাতে দোষ কোথায়?”
মুহূর্তের জন্য তার বুকটা কেঁপে ওঠে। কিছু একটা গলায় আটকে আসে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর অপরাধবোধ মিশে যায় একাকার। পরক্ষণেই মুখ শক্ত করে ফেলেন তিনি। নিজের গলায় চাপা স্বর বেরোয়, “না, না… আমি ভুল করিনি। যা করেছি, সম্মানের জন্যই করেছি। পরিবারের মুখ রক্ষা করেছি আমি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তিনি জানেন, কথাগুলো এখন কেবল নিজেকে বোঝানোর জন্যই বলা। বুকের গভীরে কোথাও একটা স্বর বারবার বলে চলেছে, “তুমি ক্ষমা চাও, ভাই। এই যে ওদের হাসির ভেতর তুমি একা হয়ে গেছো, এটাই তোমার শাস্তি। এই শাস্তি সারাজীবন বহন করতে না চাইলে ক্ষমা চাও।”
মতিউর রহমান মুখ ঘুরিয়ে নেন জানালা থেকে। নিজের অহংকারকে বুকের ভেতর আরও শক্ত করে গুঁজে রাখেন। ওদের মাঝে উপস্থিত হন না। রাতে খাবারের টেবিলে সবাই বসে, কিন্তু মতিউর রহমানের খালি চেয়ারটা নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে তার অহংকার আর দম্ভের…
.
.
.
চলবে…..
#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-১২]
~আফিয়া আফরিন
বিকেলের ম্লান আলোটা জানালার গরাদের ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে। বাতাসে ধুলো উড়ছে সোনালি রেখায়, সময়ের ধূসর স্মৃতিগুলোও সেই আলোয় ভেসে বেড়াচ্ছে। পুরোনো টেপরেকর্ডারটার রিল ঘুরছে ধীরে, তারপর বাজছে—
“তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম…”
জানালার পর্দাটা দুলে ওঠে, সেই দোলায় ঘরটা ভেসে যায় বিষণ্নতা আর শান্তিতে। মেহুল টেবিলের পাশে বসে, গালে হাত রেখে ভাবুক চিত্তে ঠোঁট নাড়ছে গানের তালে তালে… গুনগুন করছিল একদম নিচু স্বরে।
ইরশান তখন দরজায় এসে থেমে গেছে। আসলে সে এসেছিল একটা জরুরি কথা বলতে, কিন্তু সুর ও সারগমে থেমে গেল পদচারণা। চোখে পড়ে জানালার পাশে বসে থাকা মেহুলকে, চুলে রোদের আলো পড়ে ঝলমল করছে। টেপরেকর্ডারের মৃদু ঘূর্ণনের শব্দের সঙ্গে ওর গলার মিশ্র সুর মিলেমিশে একধরনের মোহমায়া তৈরি করছিল। এই সুরে প্রেমে পড়া যায়। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া প্রেম; যার কোনো ঘোষণা নেই, শুধু অনুভব আছে।
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম…
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে
মম জীবন যৌবন, মম অখিল ভুবন
তুমি ভরিবে গৌরবে নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে,
জাগিবে একাকী, তব করুণ আঁখি,
তব অঞ্চলছায়া মোরে রহিবে ঢাকি।
মম দুঃখবেদন, মম সফল স্বপন
তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম…
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী-সম
তুমি রবে নীরবে।
বাইরে কাক ডেকে উঠল, দূরে কোথাও রিকশার ঘণ্টা বাজল, রোদ, ধুলো, গান, এক চুপচাপ বিকেল আর দু’টো মানুষ; যারা কিছু না বলেও দূর থেকে কত কথা বলে ফেলে! তখনই দরজা থেকে ভেসে এলো ইরশানের কণ্ঠ,
— “তুমি এত্ত সুন্দর গান গাইতে পারো?”
মেহুল চমকে উঠল। ওর চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্মল হাসি। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বলল,
— “কোথায় আর আমি গান গাইলাম? একটু সুর মেলালাম শুধু…”
ইরশান এক পা এগিয়ে এলো, দূরত্বটা ঠিক রেখে সামনাসামনি দাঁড়াল,
— “সুর মেলানোও একটা শিল্প, মেহুল আফরোজ। তুমি জানো না, তোমার সুরের মধ্যে ঠিক কতটা প্রেম লুকিয়ে আছে?”
মেহুল বিরক্ত মুখে বলল,
— “আবার শুরু হলো… কথাগুলো এমন বলেন, যেন আমি কোনো জাদুকরী টাইপ কিছু হয়ে গেছি।”
— “তুমি তা নও?” ইরশান সোজা হয়ে দাঁড়াল, দু’হাত পকেটে, “তোমার চোখে যেই চুপচাপ গল্প লুকিয়ে থাকে, সেই গল্পটাই তো জাদু; যা আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানে।”
চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। মেহুল ইরশানের দিকে পলকহীন তাকায়। চোখগুলো কোনো শব্দ ছাড়াই কথার ভার বহন করছে। ওর দৃষ্টিতে লজ্জার ছায়া নেই, অথচ একরাশ জিজ্ঞাসা, বিস্ময়। মনে হচ্ছে; ছোট্ট ছোট্ট অঙ্গভঙ্গি, চোখের মলিন হাসি সবকিছুই এখন পড়তে হবে, বুঝতে হবে।
এত কি দেখার আছে? এত দেখতে হবে কেনো? এই ভাবনা ইরশানের মনকে ঘিরে ঘুরছে, কিন্তু সে নিজেও চোখ সরাতে পারছে না। তার দৃষ্টিও মেহুলের দিকে আটকে গেছে… নির্ভীক, সরল, আকর্ষণীয় রহস্যে। ইরশান হঠাৎ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে,
— “তুমি যদি এমনভাবে তাকিয়ে থাকো, তাহলে ভীষণ সমস্যা হয়ে যাবে মেহুল।”
মেহুল ভ্রু তুলে তাকাল,
— “যেমন?”
ইরশান একটু দম দিয়ে বলল,
— “আমার চোখের অনেক কথা লেখা আছে। তুমি যদি পড়ে ফেলো, বিপদ হতে পারে।”
মেহুল একমুহূর্তের জন্য কিছু বলতে পারল না। সত্যি সত্যি বোধহয় তার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে।
— “কী কথা লেখা আছে চোখে? আমি তো শুধু তাকাচ্ছি।”
— “তুমি যদি সত্যি পড়ে ফেলো, আমি আর নিজের মনকে সামলাতে পারব না।”
ইরশান একটু থেমে নিজের কথার ওজন বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারপর একটু এগিয়ে এলো সামনের দিকে। জানালা দিয়ে ঢোকা বিকেলের আলো মেহুলের গাল ছুঁয়ে পড়ছে, আর নরম আলোয় ওর মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরশান থামল খুব কাছে এসে, দুজনের মাঝে এক নিঃশ্বাসের দূরত্ব। তার কণ্ঠ তখন প্রায় ফিসফিসে,
— “এই দূরত্বটা না রাখলেই কি হয়না?”
মেহুলের বুকের ভেতর কেমন দপদপ করছে। চোখে একটুখানি
সঙ্কোচ, অথচ তাতে অজানা টান। ওর ঠোঁট নড়ল আস্তে,
— “সব দূরত্বই কি মুছে ফেলা যায়, ইরশান?”
— “চেষ্টা করলে যায়… অন্তত, আমার মনে হয়।”
মেহুলের চোখে লাজ, ভিতরে উথালপাথাল আনন্দ। ও বলল,
— “আপনি সবকিছু এত সহজভাবে বলেন। সবকিছু সহজ মনে করেন, সহজভাবে ভাবেন। আমি তো পারি না, ভয়ও পাই না, শুধু… কেমন যেন, বুকের ভেতরটা দপদপ করে।”
— “এখনও করছে?”
— “হুঁ।”
ইরশান হেসে বলল,
— “সেটা তো ভালো লক্ষণ। মানে, তোমার মনও আমার দিকে আসছে।”
মেহুল ভ্রু কুঁচকে ইরশানের দিকে তাকাল,
— “আমার মনের দখলদারিত্ব চাইছেন?”
— “চাইব না? এটা কি অনুচিত?”
মেহুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ফিসফিস করে বলল,
— “ঠিক… ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি নিজেই নিজেকে বুঝি না। নিজেকে বুঝতে গেলে ভীষণ অস্বস্তি হয়।”
— “ভীষণ স্বাভাবিক, মেহুল। যখন মন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন অস্বস্তি হয়ই। কিন্তু জানো কি? সেই অস্বস্তিতেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। ভয় পেলে হারিয়ে যায়, কিন্তু সাহসী হলে মন নিজ দায়িত্বে নিজেকে খুঁজে পায়; আর তখন মনে হয়, সবকিছু ঠিকঠাক।”
ইরশানের কথায় মেহুলের অন্যরকম অনুভূতি হল। এমন অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। এই অনুভূতিতে চোখ রেখে সব কথা বলা হয়, শব্দের প্রয়োজন পড়ে না। এই অনুভূতিতে শব্দের গভীরতা না বলা অনেককিছুই বলে দেয়। ভাবনার মাঝে ইরশান হঠাৎ বলে উঠল,
— “তোমায় উৎসর্গ করে একটা কথা বলব… শুধুমাত্র তোমার জন্য। তবে শর্ত আছে।”
মেহুল কপালে ভাঁজ ফেলল,
— “শর্ত?”
— “হুম।” ইরশান গম্ভীর মুখে বলল, “এই কথাটা শুনে তুমি কিছু মনে করতে পারবে না, রাগ করতে পারবে না, শুধু মনে রাখবে।”
মেহুল মাথা নাড়ল,
— “বলুন।”
ইরশান তাকাল ওর চোখে,
— “যদি কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলো, মনে রেখো আমি আছি। তোমার হারানো ‘তুমি’-টাকে আমি খুঁজে আনব। কারণ আমি তোমায় খুঁজতে খুঁজতেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেললে, আমি তোমার আয়না হবো; যতবার তাকাবে, নিজেকে আমার চোখে খুঁজে পাবে। যদি আঁধারে নিজের পথ ভুলে যাও, আমি আলো হবো না… আমি ছায়া হয়ে পাশে থাকব, যাতে তুমি ভয় না পাও। নিজের কাছে নিজেকে কখনো অচেনা মনে হলে, তখন আমি আবার আসবো; তোমাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিতে। ভাবছ তুমি হারিয়ে গেছো, অথচ আমি আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে তোমার পথের দিশা রেখে গেছি। তুমি নিজেকে খুঁজছো, আর আমি খুঁজছি সেই মুহূর্তটা; যখন তুমি বুঝবে, তুমি আমার ভেতরেই আছো।”
এটুকু বলেই ইরশান আর দাঁড়াল না। চলে গেল… তার পায়ের শব্দটা দূরে মিলিয়ে গেলেও মেহুলের মনে হচ্ছিল, সে এখনও এই ঘরেই আছে। বাতাসে এখনো লেগে আছে সেই সুরেলা উষ্ণতা, যেটা ভালোবাসার ওপরে গিয়েও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায় অচেনা অনুভূতিকে।
এটা ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু, ও ঠিক বুঝতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, ভালোবাসা যদি কোনো গন্তব্য হয় তবে এইমুহূর্তটা হয়তো তার পরে থাকা অবস্থা। একরকম সাধনার সফর; যেখানে না বলা কথাগুলো অর্থ পেয়ে যায় আর নিঃশব্দতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে সুন্দর সংলাপ। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেহুল একটুখানি হেসে ফেলল। চোখে জল এসে গেল। কিন্তু সেটা দুঃখের না, বরং সন্তোষের। ওর চারপাশে সবকিছু থেমে গেছে, শুধু একটা অনুভব বেঁচে আছে; যা ভালোবাসার ঊর্ধ্বে, পরিচয়েরও ঊর্ধ্বে, পরিসরেরও ঊর্ধ্বে, সীমানারও ঊর্ধ্বে।
ভালোবাসার পরেও কিছু থাকে। একটা নীরব উপলব্ধি, যেখানে মানুষ আর মানুষ নয়, হয়ে যায় পরস্পরের প্রতিচ্ছবি। সেই প্রতিচ্ছবিতেই এখন মেহুল নিজেকে খুঁজে পেল ইরশানের চোখে, ইরশানের কথায়, ইরশানের অন্তরে…
.
মতিউর রহমান ঘরে এককোণে দাঁড়িয়ে দূর থেকে সবকিছু দেখছেন। বাড়ির বাতাসে এখন আনন্দ, উচ্ছ্বাস, একেকজনের মাতামাতি… শুধুমাত্র তার চারপাশে ভয়াবহ শূন্যতা। কেউ তাকে ডাকছে না, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। তিনি অনুভব করছেন, এই আনন্দের জায়গায় সে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেই অহংকারের প্রাচীর, যা এতদিন তাকে শক্ত করে রেখেছিল; সেই প্রাচীর তাকে নিজের ফাঁদে বন্দি বানিয়েছে। ক্ষমা চাওয়া বা এগিয়ে যাওয়া এখন অসম্ভব বিষয়। চোখে মৃদু হতাশা, দমে থাকা আবেগ আর অহংকারের দ্বন্দ্ব; দু’টোই ভেতরে একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে। দূর থেকে বাড়ির প্রতিটি মানুষের আনন্দ দেখে মনের মধ্যে হাহাকার জাগে; একদিকে মনে হয় তিনি তাদের অংশ হতে চাইছেন, অন্যদিকে নিজের অহংকার অন্তরাত্মাকে আটকে দিচ্ছে।
আজ মিতুল আসছে। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ওর আগমনের অপেক্ষা করছে। সাধারণত প্রতিবার মতিউর রহমান নিজেই মেয়ে, জামাই এবং একমাত্র নাতিকে বরণ করতে এগিয়ে যান। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরশান, সাজ্জাদুল আলম এবং ফরহাদ হোসেন সবাই একত্রে রওনা দিয়েছে। উনারা মতিউর রহমানকে বারবার যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে কিন্তু তিনি যেতে পারেননি। অবসন্ন দৃষ্টিতে দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। হৃদয় চায় এগিয়ে যেতে, তবে অতীতের মানমার্জনা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মিতুল দেশে ফিরেছে তিন বছর পর। ওর হাজব্যান্ড তন্ময়, ওখানেই স্থায়ী। কাজকর্মের ফাঁকে একদমই সময় পায়না। তবে এইবার সময় না পেলেও আসতে হয়েছে কারণ তার একমাত্র বউয়ের জেদ। আর বউয়ের জেদের কারণ হচ্ছে সাম্প্রতিক ঘটনা। ওদের ছোট্ট ছেলে আরশ; বেশ বড় হয়ে গেছে। চলে যাওয়ার সময় ওর বয়স ছিল মাত্র চার বছর। এখন সে দেড়-দুই হাত লম্বা, কথা বলার ভঙ্গি আর অভিব্যক্তিতেও বেড়ে গেছে। আসার পর থেকে বাড়ির সবার সাথে মিশে গেছে। বেশি ভাব ইরশানের সাথে যেহেতু আগে থেকেই পরিচয়। ও বারবার দৌড়ে এসে ইরশানের কোলে উঠে, “মামা! মামা!” বলে বুলি আওড়াচ্ছে। মেহুলের তো এসব সহ্য হচ্ছে না। ওর বোনের ছেলে, কোথায় ওর কাছে আসবে… তা না। ইরশানের কোলে উঠে লাফাচ্ছে। মেহুল অবশ্য নিজেকে এইভাবে দেখে নিজেই অবাক। এত হিংসুটে একটা সত্তা ওর মধ্যে বসবাস করে? অবিশ্বাস্য!
বাড়ির পরিবেশ অস্বাভাবিক রকমের আনন্দে আছে। প্রতিটি কক্ষ থেকে চেঁচামেচি, হাসাহাসি আর হৈ-হুল্লোড়ের শব্দে ভরপুর। এমন এক পরিবেশে আশেপাশের নির্জনতা কাটিয়ে কীভাবে কীভাবে সকলে যেন টের পেয়েছে, তা বুঝে ওঠা মুশকিল। সবাই দেখা করতে আসছে, যাচ্ছে। সালেহা বেগম ভীষণ খুশি। ভেবেছিলেন, মরার আগে হয়ত তিনি সবাইকে একসাথে আর দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু না, সৃষ্টিকর্তার কাছে কেঁদে কেঁদে করা প্রার্থনা তিনি বিফলে যেতে দেন নাই।
চিনি খালা এলেন সন্ধ্যা নাগাদ। উনি তো ইরশানকে সহ্যই করতে পারেন না। সেদিন তার ছোটো ছেলেটাও বাড়ি ফিরে ইরশানের কী প্রশংসা! ধমকে থামিয়েছিলেন।
ইরশানকে দেখলেই তার মুখ কুঁচকে যায়। এইবারও ব্যতিক্রম হলো না। ইরশানের চুপচাপ, প্রহসনময় দৃষ্টিতে উনি বিদ্ধ হয়ে গেলেন। ইরশান তা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,
— “আপনি আর আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই কি মেলায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাই-বোন নাকি? দু’জনেরই একই সমস্যা। আমাকে দেখতে পারছেন না কেন? আমি কি দেখতে খারাপ? আমাকে দেখলেই দেখেছি আপনার কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে, ভুরু কুঁচকে যায়, চোখেগুলো ছোটো ছোটো হয়ে যায়। কেন?”
চিনি খালা চোখ কুঁচকে বললেন,
— “আমি মেহুলের জন্য কত ভালো একটা সম্বন্ধ এনেছিলাম, ও কত ভালো থাকত! সব শেষ করেছ তুমি ছোকরা।”
ইরশান ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
— “কেনো, মেহুল এখন খারাপ আছে? জিজ্ঞেস করেন তো ওকে?”
চিনি খালা নাক উঁচু করে বললেন,
— “পিরিতের বিয়ে না? খারাপ থাকলে তা কি আপনাদের বলার জন্য বসে আছে?”
ইরশান মাথা কাত করে গম্ভীর মুখে বলল,
— “তা ঠিক বলেছেন। তবে একটা কথা জানতে চাচ্ছি, ওর বিয়েতে আপনি এত জেলাস কেন খালা? আমার জন্য? মানে… আমাকে কি আপনার মেয়ের জন্য ঠিক করতে চেয়েছিলেন? একটুর জন্য বোধহয় ফসকে গেলাম।”
চিনি খালা তেড়ে উঠলেন,
— “কীভাবে এসব বলতে পারো? কী আজেবাজে কথা। আমার মেয়ের জন্য তোমাকে কেন ঠিক করতে যাব? আরো ভালো পাত্র আছে।”
ইরশান একটুও বিচলিত হলো না বরং আরো নির্ভার গলায় বলল,
— “না না, রাগ করবেন না। আমি বুঝি এগুলো। আপনার ছেলে তো আছে, তাকে রেখে দিন। আমার মেয়ে হলে ওর সাথেই বিয়ে দেব। আপনি আমাকে না পেলেও অন্তত আমার মেয়েকে পাবেন। তবে একটা শর্ত থাকবে…”
চিনি খালা ভুরু কুঁচকে তাকালেন,
— “কী শর্ত?”
ইরশান দুষ্টুমিভরা হাসি হেসে বলল,
— “চিনি নামটার সার্থকতা দরকার খালা। নামে চিনি হলেও আপনার কাজকর্ম কিন্তু মরিচের মত ঝাল। বিয়ের পরেও আমার বউয়ের জন্য সম্বন্ধ আনছেন, এই করছেন, সেই করছেন! একদম আমাদের অসুর মশাইয়ের মতো। কী এক চেয়ারম্যানের ছেলের গল্প শোনাচ্ছে এখনও। কী মধু আছে ওই ছেলেটার মধ্যে বলুন তো? বাংলা সিনেমার ভিলেনের মত, আপনি হচ্ছেন তার সহকারী রীনা খান! রূপে-গুণে অতুলনীয়া, কিন্তু বিষে ভরা!”
চিনি খালা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন, তিনি বাকরুদ্ধ। এমন ছেলে জন্মে দেখেননি। হাসতে হাসতে এইভাবে অপমান। উপস্থিত সকলেই হেসে ফেলল। একদম উচিত হয়েছে… খুব জ্বালাচ্ছিল এই চিনিটা। তুতুল বাচ্চা মেয়ে, বিয়ের সম্বন্ধে ওকেও ছাড় দেয় নাই। যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ বিয়েশাদীর গল্প। এই ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। তিনি যখন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন ইরশান তখন হেসে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
.
মেহুল একপাশে দাঁড়িয়ে বোঝার কিছু চেষ্টা করছে। তুতুল আর শাওনের মধ্যে সচরাচর কোনো কথা হয় না, কোনো আলাপ হয় না তবুও ভিড়ে, হাসির মাঝে ওরা একে অপরের দিকে কিছু বলছে শুধু চোখের ভাষায়। শাওনের হাসি, তুতুলের লজ্জা মেশানো দৃষ্টি… অন্যকিছুর দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মেহুল বুঝতে পারছে, কোনও সাধারণ বন্ধুত্ব নয়। দুই হৃদয়ের মধ্যে নীরব মায়া, একে অপরের জন্য টান, খেয়ালি হাসিতে ওরা ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এইটুকু মেয়ে প্রেমের কি বোঝে যে একেবারে প্রেমে পড়ে গেল? শাওনকে নিয়ে দ্বিধা নেই, ছেলে ভালো। তবে তুতুলও তো সেই একই পথে যাচ্ছে। বাবা মানবে কি? অসম্ভব ব্যাপার! তাই ও মনে মনে প্রার্থনা করে, “ভালোবাসলে দুটি হৃদয় যেন সঠিক সময়ে সঠিক পথে এগোতে পারে, আর ওদের সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার আগেই যেন সব বিরোধ মিটে যায়।”
ইদানিং মতিউর রহমান খুব কমই বাড়িতে থাকেন। বাড়ির কোলাহল এখন তার কাছে অচেনা ঠেকে। মিতুলরা এসেছে দু’দিন হলো, অথচ তিনি মেয়ের সঙ্গে দু’মিনিটের বেশি কথা বলেননি। আগে যেমন কাছে পেতেন, আদরে করে কাছে টানতেন, এইবার তা হচ্ছে না। মেয়েরা সবাই বড় হয়ে গেছে, দূরে চলে যাচ্ছে। এই দূরত্বে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিছু থাক বা না থাক, তাতে আফসোস নেই। কিন্তু মেয়েগুলোকে এইভাবে দূরে সরে যেতে দেখে ভেতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আজ তিনি মনস্থির করেছেন, সব ঠিক করবেন। যা হয়েছে, যা ভেঙেছে, যা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, সব মিটিয়ে ফেলবেন। তার জন্য একটা ছক-ও কষলেন। বাড়ি ফিরে বসার ঘরের দিকে গেলেন। এখানে তন্ময়, ইরশান, শাওন, সাজ্জাদুল আলম, ফরহাদ হোসেন, আলফাজ উদ্দিন সবাই গল্পে মশগুল। মতিউর রহমান কিছুক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই হাসির শব্দ থেমে গেল। তিনি চারপাশে একবার তাকালেন তারপর ভারী স্বরে বললেন,
— “বাহ্! জমজমাট আসর বসেছে। এত বছর পর এসে নিজেদের পরিকল্পনায় আপনারা সাকসেসফুল, তাইনা? উদ্দেশ্যে তো এই বাড়িটাই ছিল নাকি খন্দকার আলফাজ উদ্দিনের পুরো স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তি?”
এই পর্যায়ে সাজ্জাদুল আলম মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেলেন। কণ্ঠে ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক মিশিয়ে মতিউর রহমান আবার বললেন,
— “আব্বাকে তো ভালোই হাত করা গেছে? বুড়ো মানুষ, আবেগ দিয়ে খেলা করা সহজ। এখন শুনি, কার ভাগে কতটুকু পড়েছে?”
এইবার কথা বলল ইরশান,
— “আপনি ভুল বুঝছেন।”
মতিউর রহমান তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন,
— “আমি ভুল বুঝি না। আমি খুব ভালো করেই বুঝি, কে কেন কোথায় আসে। যাদের মুখ দেখতে চাইনি, তারা আজ এই বাড়িতে মনের উল্লাসে চা খাচ্ছে, গল্প করছে; এরমানে তো কিছু আছে, তাইনা?”
অকস্মাৎ তীব্র উত্তেজনায় এবং অপমানে একেকজনের চেহারা লাল হয়ে গেল। ইরশান নিজের জায়গায় স্থির। সে ধীর স্বরে বলল,
— “আপনি এখন সরাসরি অপমান করছেন। কোন আক্কেলে আপনি ‘কার ভাগে কতটুকু পড়েছে’ এই প্রশ্নটা করলেন? এখানে কে সম্পত্তির জন্য পড়ে আছে?”
মতিউর রহমান কণ্ঠে তীব্রতা মিশিয়ে বললেন,
— “তুমি।”
ইরশান মূহুর্তেই কেমন থেঁতলে গেল। মুখে বিস্ময়ের রেখা,
— “আমি?”
— “হ্যাঁ, তুমি।” তিনি কটাক্ষ করে বললেন, “ছলে-বলে, কৌশলে আমার মেয়েকে কেড়ে নাওনি? এখন বাকিরা সম্পত্তির লোভে আছে, তোমরা সবাই এক হয়ে এই জায়গা দখল করতে চাও।”
ইরশানের গলায় কিছু শুনশান ধরা-বাঁধা কষ্ট চেপে গেল। সে নিজেকে গম্ভীরভাবে সামলাল, রূক্ষ কিছু অনুভব করল। এইমুহূর্তে আর তর্কে গা ভাসাতে চায় না। মেহুলকে ডাকল। মেহুল দৌড়ে আসতেই কঠোরভাবে বলল,
— “মেহুল তুমি ফিরে যাও তোমার বাবার কাছে। এই অপমান আর নেওয়া যাচ্ছে না।”
মেহুল সকলের দিকে তাকিয়ে হতবুদ্ধির প্রশ্ন করল,
— “কি হয়েছে?”
কেউ কোন কথা বলছে না শুধু চোখের দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছে তীব্র, ভারী, আর কষ্টে ভরা। ইরশান দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে প্রথমবারের মতো মেহুলের হাত ধরল। নিয়ে এল মতিউর রহমানের সামনে। তারপর শান্ত গর্জনময় কণ্ঠে বলল,
— “নিন, আপনার মেয়েকে। যেহেতু আমি ছলে-বলে কৌশলে নিয়েছি, তাই এখন নিজের দায়িত্বে ফেরত দিলাম।”
তিনি ইতস্তত করলেন।পরক্ষণেই হাত বাড়িয়ে মেহুলের হাত ধরলেন, নিজের কাছে টেনে নিলেন। মেহুল বিস্মিত। ও ঘটনার কিছুই জানে না। তারপরেও আন্দাজ করল,
— “কি হচ্ছে এসব? আমি কি খেলনা নাকি আমার জীবনটা খেলনা? বাবা, আমি তোমার মেয়ে। তোমার জায়গা সবচেয়ে উঁচুতে। ওই জায়গা কেউ কখনও নিতে পারবে না। কিন্তু ইরশানকে আমি বিয়ে করেছি… ও আমার স্বামী।” কথাটা বলার সময় ওর গলা কেঁপে উঠল, “ও যেখানে যাবে, আমিও সেখানেই যাব। আর তুমি যদি ভাবো, ও সম্পত্তির লোভে এসেছে তবে তা সম্পূর্ণ ভুল।। দু’দিন পরই জার্মানি ফিরে যাবে। বড় আপা বলেছে, ও নাকি টিকিটও কেটে ফেলেছে।”
মতিউর রহমান স্তব্ধ হয়ে রইলেন। একমুহূর্তের জন্য মুখের রেখা স্থির হয়ে গেল। ইরশান এইবার একধাপ এগিয়ে এলো। তার চোখে কোনো রাগ নেই, শুধু তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা। মেহুলের হাত আবার নিজের হাতে নিয়ে বলল,
— “দেখলেন? আপনার এই সম্পত্তি আমারই পাওয়ার কথা ছিল তাই পেয়েছি। কিন্তু সেটা জমি বা টাকা নয়… আপনার মেয়ে। আর এই প্রাপ্তিটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদের ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। যা আছে তা আমি ওর ভেতর ছাড়া আর কোত্থাও খুঁজে পাইনি। এই সম্পদ একবারই ছিনিয়ে নেওয়া যায়… আর রোজ ভালোবাসা দিয়ে দিয়ে অর্জন করতে হয়। এসব আপনি বুঝবেন না, আপনার মনটা তো পাথরের মত শক্ত। ভালোবাসা বোঝার চেষ্টা করেছেন কখনো? সেই চেষ্টা করলে আজ এত বছর পর এই মানুষগুলোর ফিরে আসায় আপনি হিসেব-নিকেশ খুঁজতেন না। চিন্তাভাবনা সহজ করুন, জীবন সহজ হয়ে যাবে।” তারপর সকলের দিকে অটলভাবে ঘোষণা করল, “সবাই, তৈরি হয়ে নাও। আমরা রওনা দেব। এক্ষুনি, এই মুহুর্তেই…”
.
.
.
চলবে….
