#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#ষষ্ঠ_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
কালিয়াগঞ্জ স্টেশনে যখন ওরা নামলো, সন্ধে হয় হয়। ট্রেনটা পাক্কা দু’ঘণ্টা লেট। পিকনিকের নাম করে বেরিয়েছে পিঙ্কি আর মিতুল আর সাথে অর্ণব।পিকনিকে আসবে বলে
সকালেও কিচ্ছু না খেয়ে বেরিয়েছে ।শুধু ট্রেনে দু’বার চা আর ঝালমুড়ি। ট্রেনে অনেক কিছুই উঠেছিল—চপ, ডিম টোস্ট, ডিম সেদ্ধ। মিতুলের ইচ্ছে করছে কিছু একটা খাক। আসার সময় হৈমন্তী দিয়েও দিয়েছিল দু’হাজার টাকা। আর মিতুলও নিজের জমানো থেকে তিন হাজার এনেছে। কিন্তু পিঙ্কি বা অর্ণব কারোরই খাওয়াতে সেরকম মন নেই।
অথচ মিতুলের খালি খেতে ইচ্ছে করছে। যেটা দেখছে, সেটাই খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু একসাথে তিনজন এসে একা খাওয়া যায় নাকি! অগত্যা খালি পেটেই ওদের সাথে আলোচনায় যোগ দিয়েছে মিতুল।
তাগিদটা মিতুলের হলেও পিঙ্কি আর অর্ণবের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ট্রেনে উঠেই ছোট্ট কালো ব্যাগটা পিঙ্কির হাতে দিয়ে দিয়েছিল মিতুল। সেদিন হৈমন্তী মাসি বাড়ি যাওয়াতে অনেক সুবিধা হয়েছিল মিতুলের। সব নামিয়ে তারপর দাদুর আলমারিটা আবার গুছিয়েছিল।
কী পায়নি সেখান থেকে—সোনার দোকানের বিল, প্রেসক্রিপশন, পুরোনো ছবি! কোনটা কাজের, কোনটা নয়, বুঝতে পারছিল না মিতুল। শুধু প্রেসক্রিপশনের ছবিটা পাঠিয়েছিল অর্ণবদাকে ঠিকানাটা বোঝার জন্য। অর্ণবদা ফোন করে জানিয়েছিল, রায়গঞ্জে যাওয়ার জন্য কালিয়াগঞ্জে নামতে হবে! সেখান থেকেই ওদের প্ল্যান শুরু। পিঙ্কি রাতারাতি একটা গ্রুপ খুলে দিল—পিঙ্কি, অর্ণব আর মিতুল। গ্রুপের নাম—“মিশন সীতাহার”।
“তাড়াতাড়ি পা চালা রে মিতুল। অন্ধকার হওয়ার আগে রায়পুর পৌঁছতে হবে!” — পিঙ্কি তাড়া দিল।স্টেশন থেকে হাটছে ওরা।হাঁটতে পারছে না যেন মিতুল। পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। একটা দুপুর হয়ে গেল, ভাত খায়নি মিতুল। ভাত ভীষণ প্রিয় ওর। পরীক্ষা শেষের দুপুরগুলোতে মা কত রকম রান্না করে—নিম বেগুন ভাজা, ধনেপাতা বাটা, তিল বাটা, মাছের তেল চচ্চড়ি। সস্তায় যত খাবার হয় আর কী!
“পিঙ্কি দিদি, খুব খিদে পেয়েছে!” — আর না পেরে বললো মিতুল। মিতুলের কথা শুনে অর্ণবও যেন একই সুর ধরলো—“অরে, আগে হোটেলে ঢুকি, তারপর খাওয়া!” পিঙ্কিকে দেখে মিতুল অবাক হয়ে যায়—ওর কি খিদেও পায় না!
কালিয়াগঞ্জ স্টেশনের পাশেই ছোট্ট একটা ভাতের হোটেল—“অন্নপূর্ণা ভাতের হোটেল”। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হয় হয়। কিছু কি পাবে এখন! মিতুল তাকিয়ে আছে দোকানের দিকে। অর্ণব বুঝতে পেরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো—“ভাত হবে?” দোকানদার অবাক দৃষ্টিতে তাকালো! এই সময়ে এদের এখানে দেখে হয়তো একটু অবাক! গম্ভীর গলায় বললো—“ডিম-ভাত হবে শুধু। চল্লিশ টাকা।”
অর্ণব তাকাতেই মিতুল হাসিমুখে বললো—“চলবে, চলবে!” কিন্তু পিঙ্কি খুশি নয় এই পুরো বিষয়টাতেই। কিন্তু অর্ণব আর মিতুল ঢুকতেই পিঙ্কিও পিছন পিছন ঢুকলো।
তিনজনে ঢুকে বসল কোণের একটা টেবিলে। ভাত, ডাল, আলুভাজা নিয়ে প্লেট হাজির একজন! তাকে দেখে আহ্লাদে আটখানা মিতুল! খিদেতে যেন এটাই অমৃত! প্লেট টেনেই গপগপ করে খাচ্ছে মিতুল! আলুগুলো আবার পোস্ত ছড়িয়ে ভেজেছে! কতদিন পর পোস্ত খাচ্ছে! দাম বাড়ার পর তো আর আসে না বাড়িতে!
অর্ণবও এক মনে খেয়ে যাচ্ছে, শুধু খাওয়ার দিকে মন নেই পিঙ্কির! “মিতুল, প্রেসক্রিপশনটা দে তো!”
মিতুল বিরক্ত মুখে ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করলো। “এটাই…” — খেতে খেতে বললো ও। পিঙ্কি কাগজটা হাতে নিয়ে খুললো। এতটাই পুরোনো যে হলদে হয়ে গেছে। ওপরে লেখা—“জ্যোতিষ সুবীর চন্দ্র”, নিচে—“পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ”।
অর্ণব ভুরু কুঁচকে বললো—“সিরিয়াসলি? প্রিয়াঙ্কা, পারিস ও তুই, চেয়ে না না আগে!”
পিঙ্কি অর্ণবকে পাত্তা না দিয়ে বললো—“ঠিকানাটাই ঝাপসা!” — কাগজের নিচের দিকটা দেখিয়ে বললো।
মিতুল চুপ করে ডিমের কুসুম খাচ্ছে। কাল রাতেও বাড়িতে ডিম হয়েছিল। এখন ডিমটাই বেশি হয় বাড়িতে! তাও যেন অমৃত! পিঙ্কি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল।
দোকানের সামনে বেশ কয়েকজন বসে আছে। তাদের প্রেসক্রিপশনটা বাড়িয়ে দিল, তারপর আঙুল দিয়ে দেখালো নিচের দিকটা। একটা ঠিকানা আছে ঠিকই—কিন্তু এতটাই অস্পষ্ট, অর্ধেক মুছে গেছে… বোঝাই যাচ্ছে না।
“আচ্ছা অর্ণবদা, খেয়েই তো যেতে পারতো! ভাত, ডিম সব ফেলে চললো!” — মিতুল বলতেই অর্ণব বললো—“বাদ দে! ওর খিদে পায় না! আমি ভাবছি, তোর দাদু নিশ্চয়ই ওই জ্যোতিষীর কাছে এসেছিল, কিন্তু কেন!”
পিঙ্কি ধীরে বললো—“কেন? হাত দেখাতে, ভবিষ্যৎ জানতে!”
অর্ণব খেতে খেতে বললো—“নামের নিচে কী লেখা ছিল দেখেছিস? ‘পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ’!”
খাওয়া থেমে গেল মিতুলের! এত তো ভেবে দেখেনি! পূর্বজন্মের বউ! পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ!
পিঙ্কি ফিরে এসে বললো—“না, কেউ চেনে না! একে খুঁজতে বেশ বেগ পেতে হবে! ‘জ্যোতিষ সুবীর চন্দ্র’!” নামটা আবার বললো পিঙ্কি। চাটনি দিতে এসে বয়স্ক, রুগ্ন লোকটা থমকে দাঁড়ালো! ওদের দিকে তাকিয়ে বললো—
“এই নামটা কোথায় পেলেন?”
আলো দেখতে পেয়ে পিঙ্কি তাড়াতাড়ি কাগজটা বের করে সামনে ধরলো লোকটার।
লোকটা একটু এগিয়ে এসে বললো—“জ্যোতিষ সুবীর চন্দ্র… তাই তো?”
মিতুল তাড়াতাড়ি বললো—“হ্যাঁ! আপনি চেনেন?”
লোকটা হালকা হেসে বললো—“চিনতাম… একসময় বেশ নামি লোক ছিলেন! এখন আর তেমন কেউ চেনে না ওকে।”
অর্ণব সন্দেহের গলায়—“মানে?”
লোকটা সবজান্তার মতো বললো—“ও সব ভুয়ো ব্যাপার করতো। পূর্বজন্ম, আত্মা—এইসব বলে লোক ঠকাতো। ভালোই নাম করেছিল একসময়। লোকজন ‘ভুয়ো সুবীর’ বলে ডাকতো।”
তিনজন চুপ করে শুনছে।
লোকটা আবার বললো—
“লোক ঠকিয়েই আর কদিন! শেষে কেস খেয়ে জেলে যায়। অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল এইসব বুজরুকি করে। জনা পাঁচেকের টিম ছিল, দুটো মেয়েছেলে ছিল।”
“মেয়েছেলে” কথাটা বড্ড বাজে লাগে মিতুলের! শুনলেই প্রতিবাদ করে, কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। বুকের ভেতরটা অস্থির করছে। ওই মহিলাদের কেউই কি কমলা?
অর্ণব নিচু গলায় বললো—“আমি আগেই বলেছিলাম…”
মিতুল আস্তে বললো—“এখন… কোথায় পাবো ওকে?”
লোকটা একটু ভেবে বললো—“আছে… এখন থেকে আধা ঘণ্টার পথ। রায়গঞ্জ যেতেই পড়বে। তবে আগের মতো নেই। শরীর খারাপ। বিছানা নিয়েছে পুরোপুরি! ছেলে আছে। সেও ওই জ্যোতিষীর কাজকর্ম করে।”
মিতুল তাড়াতাড়ি বললো—“ঠিকানাটা বলবেন?”
লোকটা বুঝিয়ে দিল ঠিকানাটা।
খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে এলো তিনজন। হাতে শক্ত করে ধরা সেই কাগজটা।
“পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ…” ভুয়ো? তাহলে দাদু কেন গিয়েছিল ওর কাছে?
পিঙ্কি পাশে এসে বললো—
“দেখ, ও যদি ফ্রড হয়, তাহলে আমাদের সাবধানে এগোতে হবে।”
অর্ণব বললো—“হ্যাঁ, সবকিছু বিশ্বাস করলে চলবে না।”
মিতুল ধীরে মাথা নেড়ে বললো—চলবে
চলবে।
