#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#একাদশ_পর্ব।
কলমে অনিন্দিতা
আজ অনেক অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠেছে মিতুল । ঘুম থেকে উঠে থেকেই খুব ভালো লাগছে , মনের ভিতর থেকে থেকে সুন্দর অনুভূতির সাড়া পাচ্ছে।মনে হচ্ছে আজ যা হবে ভালোই হবে। আসলে কাল রাতে অনেক ভেবেছে মিতুল ! ও তো চেষ্টা করেছিল হারটা ওই কমলাকে মানে রানীকে পৌঁছে দিতে !কিন্তু যদি মানুষটাই না থাকে ! এখনো পর্যন্ত যা খবর পেয়েছে সব জায়গায় একই বলছে কমলা মারা গেছে ! কেউ কেউ বলছে ওকে নাকি খুন করা হয়েছে সম্পত্তির লোভে !
সে যাই হোক সেই নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই ! যদি সীতাহারের মালিক নাই থাকে ও আর কি করবে ! একবার ভেবেছিলো রেখে দেবে হারটা নিজের কাছে , পরে ভাবলো ওই সুখ ওর জীবনে অসুখ হয়ে যাবে। তাই ঠিক করে নিয়েছে থানা থেকে পুরো বিষয় টা জেনে এসেই যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে নেবে।তখন এই সীতাহারের গতি করে যাবে !
এটা বাড়ি নিয়ে গেলে সবেতেই ঝামেলা ! পিসির , বম্মা , কাম্মা রা মাকে ভুল বুঝবে। তার থেকে এই রায়পুরেই হারটার সৎকার করে যাবে।এটা ঘিরে থাকা পাপা, লোভ এটা নিয়ে আর ফিরবে না
অটোতে উঠে বসলো মিতুল,, পিঙ্কি আর অর্ণব। থানায় যাচ্ছে তিনজন। অফিসারই বলেছিলেন পরের দিন আসতে! অর্ণব আর পিঙ্কি সিগারেট ধরিয়েছে। আর তার ধোয়ার দিকে তাকিয়ে একটা মেয়েকে কল্পনা করছে মিতুল।সুন্দরী,ছোট খাট, মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল মানে মিষ্টি একটা মেয়ে এমন সুন্দরী না হলে গলায় ওই সীতাহারটা মানাবে কী করে!
“:শোন থানায় ঢুকে কেউ কিছু বলবি না! যা বলার আমি বলবো! মনে রাখবি পুলিশরা কিন্তু খুব চালাক হয় ,এঁদের কাছে উল্টো সিধে কথা বললেই ধরা পড়ে যাবি!” – অর্ণব সাবধান করে বললো। পিঙ্কি ওর কথায় সায় দিলেও মিতুলের চোখ বাইরে, প্রকৃতিতে আটকে ।আজকে অসম্ভব শান্ত মিতুল- পিঙ্কি বুঝলেও ঘাটাল না বেশি । কখনো কখনো শান্ত থাকলে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়
থানায় যখন পৌঁছালো ওরা ঘড়িতে দশটা বাজে নি ।অফিসার দশটা নাগাদ আসতে বললেও উনি আগে থেকেই ফাইলটা বের করে রেখেছে। সামনে তিনটে চেয়ার । ওঁনার আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে উনিও খুব খুশী এই ফাইল টা আবার খুলতে পেরে ।হয়তো বা এটা ভাবছে আজ এই ফাইলটা পুরো বন্ধ করতে পারবে সাধারণত কোনো কেস শেষ না হলে সেটা পরবর্তী লোকের হাতে চলে যায় তার দায়িত্ব পড়ে! এই রাণী ভিলার কেসটা ও বোধহয় সেই সূত্র ধরে অফিসারের হাতে ।
ওদের বাইরে বসতে হয়নি ডেকে নিলেন ভিতরে অফিসার অর্ণবও যেন বুক ফুলিয়ে ঢুকলো ভেতরে।কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপির বোনপো বলে কথা!ভাবনাটা আসতেই অর্ণবের হাসি পেয়ে গেল।
“আচ্ছা, তোমরা এই কেসটা খুলতে চাও কেন? শুধু প্রপার্টি নেওয়ার জন্য তো না?”অফিসারের সরাসরি প্রশ্নে অর্ণব চুপ রইল। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় যেন অর্ণবেরই । কারণ অফিসার প্রশ্নটা ওকেই করেছে । অর্ণবকে একটু নার্ভাস লাগছে অনেক ভেবে উত্তর দিতে যাবে তার আগেই অফিসার বলল –
“দেখো, পুলিশকে, উকিলকে আর ডাক্তারকে সব বলতে হয়। ওদের কাছে মিথ্যা বা কিছু লুকানো মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা! “ভদ্রলোকের গলাটা বেশ গম্ভীর
আর তাতেই আরও ঘাবড়ে গেল মিতুল। মাত্র সাতরো বছর বয়সে এত জটিলতার মুখোমুখি হয়নি সে আগে । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পুলিশকে সবটা খুলে বলা দরকার। উনি কিছু না করুক ক্ষতি করবে না আর এই ভদ্রলোক অনেকটা বড়ো। সেক্ষেত্রে সাহায্যও করতে পারে।
অফিসার চশমাটা নাকের ওপর তুলল।
“দেখো, তোমরা অনেক ছোট, জটিলতা বুঝতে পারো না। কাল বললে—তুমি সুবীর কাঞ্জিলালের বোনপো,কথাও বলালে মামার সাথে কিন্তু তোমার ওই ছোকরা বন্ধুর গলা আমি বেশ বুঝেছি, আরও বিষয়টা সুবিধা হলো যখন মনে পড়লো তিন বছর আগে সুবীর বাবু মারা গেছেন ”
কথাটার সাথে সাথে যেন ঘরে বোম পড়লো । ঘাম দিচ্ছে মিতুলের।অর্ণব মাথা হালকা করে নাড়ল। অনেক কিছু বলতে চাইছে হয়তো বা শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছে ।
“পুলিশকে এত বোকা ভেবো না। চাইলে পুলিশকে মিথ্যা বলার জন্য তোমাদের জেলে ঢোকাতেও পারি।” টেবিল চাপড়ে বললো অফিসার । মিতুল যেন কেঁপে উঠলো।কান্না পাচ্ছে বড্ড আর সেটা বুঝেই ভদ্রলোককে একটা জলের বোতল এগিয়ে দিলো ওর দিকে ।তারপর মিতুলের দিকে তাকিয়েই বলল—
“কী দরকার এইসব ক্রিমিনালের পেছনে ঘোরার? কী লাভ? কলকাতায় ফিরে গিয়ে পড়াশোনা করো। তোমাদের কত সুন্দর ভবিষ্যৎ, ডাক্তার হবে সব!”
তিনজনই এইসাথে চমকে উঠল, মুখে কিছু বলল না।কিন্ত হাবে ভাবে আর সেই চালাকি টা আর নেই।অফিসার বলল—
“রেজিস্টারে তোমরা তো শুধু কলকাতা লিখে ছেড়ে দিলে তোমাদের মধ্যে কনিষ্ঠ জন বোকামি টা করে ফেললো। পুরো ঠিকানাটা লিখে দিল ।তারপর তো আছেই CCTV, তোমাদের ছবি নিয়ে খোঁজ লাগলাম।আরে ভাই পুলিশ তো নাকী!”
এইটুকু বলেই সরু চোখে দেখছে ছেলে মেয়ে গুলোকে । বেজায় ঘাবড়েছে । সামলানোর দরকার ভেবে অফিসার বলতে শুরু করলো -“ভেবে দেখো, বাড়ি ফিরে যাও।এই রাণী ভিলা ঘিরে অনেক কুনজর আছে। আর ওই বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই বাড়ির পাগল মেয়ের ভুত। যারা গিয়েছে, সবাই দেখেছে সাদা শাড়ি পরে ঘুরে বেড়ায় ।হরিবল!
তারপর আছে কমলা আর তার টিম—কালিয়াগঞ্জের জ্যোতিষ সুবীর নিজের নামের পাশে হঠাৎ লিখে দিলেন ‘পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ’।কথা নেই বার্তা নেই সে নাকী পূর্বজন্ম দেখতে পায় ।
অফিসারের কথাগুলো যেন একের পর এক ধাক্কার মতো লাগছিল।ঘরের ভেতর হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা নেমে এল।মিতুল, পিঙ্কি, অর্ণব—তিনজনেই চুপ।
অফিসার একটু হেলান দিয়ে বসলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
“এই কেসটা তোমরা যতটা সহজ ভাবছ, ততটা না।
কমলা নামে যে মেয়েটার কথা শুনছ মানে রাণী ওই বাড়ির মেয়ে —সে সত্যিই ছিল। কিন্তু ওর মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না।”
মিতুলের বুক ধক করে উঠল।
“প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। রায়পুরের ওই রাণী ভিলা—ওখানেই থাকত রানি আর তার মা। তারপর আসে কমলা… কাজের লোক হিসেবে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে বাড়ির সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।”
অর্ণব এবার একটু এগিয়ে এল—“মানে?”
অফিসার ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন—
“মানে লোভ। টাকা, সম্পত্তি… আর একটা জিনিস—সীতাহার।”
মিতুলের হাত কাঁপতে শুরু করেছে।
“রানির মানসিক অবস্থা তখন স্থির ছিল না। মাঝে মাঝে আগের জন্মের কথা বলত। সেই সুযোগটাই নেয় কমলা। বাইরে থেকে লোক এনে, জ্যোতিষী সাজিয়ে, রানির মাথায় এসব আরও গেঁথে দেয়।”
পিঙ্কি ফিসফিস করে বলল—“মানে… সবটাই সাজানো?”
অফিসার মাথা নাড়লেন—
“পুরোটাই না। কিছুটা সত্যি, অনেকটাই ব্যবহার করা সত্যি।”
অফিসার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ফাইলটা বন্ধ করে হাত দুটো জোড়া করে টেবিলের ওপর রেখে বললেন—
“ঠিক আছে… এবার তোমাদের পুরো ছবিটা দেখাই।”
তিনজনই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে।
“রানীর মা হঠাৎ মারা যাওয়ার পর… ও পুরো একা হয়ে পড়ে। তখনই ওর দাদা আসে। কিন্তু ওর নিজের সংসার, নিজের দায়িত্ব—সব সামলাতে গিয়ে সে এই বাড়ি আর রানী—দুটোই তুলে দেয় কমলার হাতে, মানে ওই কাজের মেয়ের হাতে ।”
মিতুল ধীরে বলল—“মানে… পুরো দায়িত্ব?”
অফিসার মাথা নেড়ে বললেন—
“শুধু দায়িত্ব না—টাকাও। মোটা অঙ্কের টাকা। নিয়মিত খরচ, আলাদা ভাতা… সব।”
অর্ণব ফিসফিস করে বলল—
“মানে… সোনার ডিম পারা হাঁস…”
অফিসার ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসলেন—
“একদম ঠিক ধরেছো।”
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
“কমলা বুঝে গিয়েছিল—এই মেয়েটা বেঁচে থাকলে ওর আয় চলতেই থাকবে। কিন্তু…”
তিনি একটু ঝুঁকে এলেন—“লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়।”পিঙ্কি আস্তে বলল—“তাই… মেরে ফেলল?”
অফিসার সোজা তাকালেন—
“হ্যাঁ। খুব সম্ভবত সেটাই হয়েছে।”
মিতুলের বুক ধক করে উঠল।
“কমলা ভেবেছিল—রানীর তো কেউ নেই, কেউ প্রশ্ন করতে আসবে না।
তারপর ধীরে ধীরে… বাড়ি থেকে, টাকাপয়সা থেকে… যা পারা যায় সব লুটেছে।”
একটু থেমে আবার বললেন—
“কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না।”
অফিসার ফাইল থেকে একটা ছবি বের করলেন।
“এই ছবিটা দেখো।”
ছবিতে দুজন—
একজন রানি…
আরেকজন—একজন শিক্ষিত, পরিপাটি ভদ্রলোক।
“এই লোকটার নাম—অবনী।”
অর্ণব ভুরু কুঁচকে বলল—“কে উনি?”
অফিসার একটু মুচকি হেসে বললেন—“রানীর প্রেমিক।”তিনজন একসাথে চমকে উঠল—“কি?”
অফিসার যেন একটু মজা পাচ্ছেন—
“হ্যাঁ, অবাক হওয়ারই কথা। যাকে সবাই ‘পাগল’ বলত—তারও প্রেমিক ছিল। আর সে কিন্তু একেবারে শিক্ষিত, ভালো চাকরির মানুষ।”
পিঙ্কি না জানার ভান করে ধীরে বলল—
“উনি জানতেন… রানীর অবস্থা?”
“সব জানতেন।”
অফিসার বললেন—
“তবু ছেড়ে যাননি। দিনের পর দিন ওই বাড়িতে পড়ে থেকেছেন।”মিতুলের গলা শুকিয়ে গেল—“তারপর?”
অফিসার চেয়ারে হেলান দিলেন।
“এবার আসল খেলাটা শুরু হয়।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
“রানি মাঝে মাঝে বলত—অবনী নাকি ওর আগের জন্মের স্বামী। নাম—প্রতাপ। আর সেই জন্মে নাকি অবনী—মানে প্রতাপ—একটা সীতাহারের জন্য নিজের স্ত্রীকে খুন করেছিল।”
অর্ণব আস্তে বলল—
“স্ত্রীর নাম… কমলা?”
অফিসার আঙুল তুলে বললেন—
“একদম।”
ঘরের মধ্যে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
“এই জটিল গল্পটাই কাজে লাগায় কমলা আর তার সঙ্গী—জ্যোতিষ সুবীর।”
পিঙ্কি বলল—
“মানে… পুরো নাটক?”
“নাটক না—প্ল্যানড ম্যানিপুলেশন।”
অফিসার গম্ভীর হয়ে বললেন।
“সুবীর নিজের নামের পাশে ‘পূর্বজন্ম বিশেষজ্ঞ’ লাগায়।তারপর অবনীকে টার্গেট করে।”মিতুল ধীরে বলল—“কি করে?”বুকটা ওঠানামা করছে ওর । ওর দাদুকে ভালো মানুষ পেয়ে কী না করেছে!
“কমলার শেখানো স্ক্রিপ্ট।”অফিসার বললেন—
“সুবীর অবনীর ‘পূর্বজন্ম’ বলে দেয়—সে নাকি নিজের স্ত্রী কমলাকে খুন করেছিল সীতাহারের জন্য।”
অর্ণব ফিসফিস করে—
“মানে… অবনীকে অপরাধবোধে ডুবিয়ে দেওয়া…”
“Exactly।”
অফিসার মাথা নাড়লেন।
“একদিকে রানির কথাবার্তা, অন্যদিকে জ্যোতিষীর ‘প্রমাণ’—সব মিলিয়ে অবনী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
সে বিশ্বাস করতে শুরু করে—সে খুনি।”
ঘরের ভেতর চাপা নীরবতা।
“এই সুযোগে কমলা পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
রানিকে সরিয়ে দেয়…
অবনীকে মানসিকভাবে অচল করে দেয়…
আর বাইরে গল্প ছড়িয়ে দেয়—পাগল মেয়ে, পূর্বজন্ম, অভিশাপ…”
মিতুল ফিসফিস করে বলল—
“দুইয়ে দুইয়ে চার…”
অফিসার তাকালেন—
“না… দুইয়ে দুইয়ে চার না—চারশো।”
মিতুল বললো – ” অবনীর কী হলো!” অফিসার বললো ” তার খবর আর পাইনি!ওর পরিবার ওকে গ্রহণ করেনি হয়তো!করে নাকী! অমন সুখের সংসার ছেড়ে চলে এসেছে।
মিতুল বিড়বিড় করে বললো ” মেনে নিয়েছে তো সবাই! তাই তো আমি এখানে বসে আছি । আমার অস্তিত্ব আছে আমার! ঘটনাচক্রে উনিই আমার দাদু!!”
এবার বোমটা মিতুল ফাটালো।
চলবে।
