#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#নবম_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
থানার সামনে দাঁড়িয়ে একটু থমকাল মিতুল। পুরোনো লাল রঙের বিল্ডিং, দেওয়ালে চুনকাম উঠে গেছে, সামনে দুটো সাইকেল আর একপাশে জিপ দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে টাইপ করার শব্দ, সঙ্গে কাগজ ওল্টানোর আওয়াজ। ওপরে জ্বলজ্বল করছে—”রায়পুর পুলিশ আউটপোস্ট!”
অর্ণব দা, এটা আবার কী গো! আউটপোস্ট!
মিতুলের কথায় অর্ণব মাথা নেড়ে বলল,— “এটা পুরো থানা না। বড় থানার অধীনে ছোট একটি পুলিশ ইউনিট, যাকে বাংলায় পুলিশ ফাঁড়ি বলা হয়। স্থানীয় এলাকায় পুলিশি উপস্থিতি বজায় রাখা, ছোটখাটো সমস্যা সামলানো—এই কাজগুলো করে। বড় কোনো মামলা হলে সেটা বড় থানায় ট্রান্সফার হয়। এটা কোন থানার আন্ডারে পড়ে বলতে পারবো না।”
অর্ণব আর মিতুল কথা বলতে বলতে পিছিয়ে গেল। পিঙ্কি এগিয়ে যাচ্ছে।
অস্থির লাগছে পিঙ্কির। এ কী করে সম্ভব! সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিষ্কার ঘর ছিল। ঘুম ভেঙে দেখল অর্ণব রেডি হচ্ছে। মর্নিং ওয়াকে যাবে। এটা ওর একটা অভ্যেস। ঘুম ভেঙে গেছে যখন, পিঙ্কিও একটু হেঁটে আসবে ঠিক করলো , সাথে কেসটা নিয়ে একটু আলোচনা করে তাড়াতাড়ি শেষ করবে।
পিঙ্কি ভেবেছিল ছোট একটা কেস। রাণী না কমলাকে সে যেই হোক তার হার তাকে দিয়ে ফিরে আসবে! কিন্তু এ তো রোজ রোজ জড়িয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার ঘর থেকে বেরোল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নাকি ঘর লন্ডভন্ড! ডায়েরির পাতা জুড়ে লেখা। নিজেও দেখেছে পিঙ্কি—ডায়েরিতে কিচ্ছু লেখা ছিল না। এগুলো কী ভূত-প্রেতের ব্যাপার, নাকি শয়তানি!
ছোটবেলায় কিছু বোকা বোকা ভূতের গল্প পড়েছে পিঙ্কি। মামদো ভূত, পেত্নী, এরো ভূত! এই দাদু মানুষটাকে কে কিসে ফেলবে বুঝতে পারে না। পিঙ্কি ভেবেছিল হারটা ফেরত দিয়ে এলে বোধহয় সব সমস্যা মিটে যাবে!মাসিবাড়িতে এই দাদুকে অনেকবার দেখেছে পিঙ্কি! ওঁনার তলে তলে যে এত কিছু! সোনার হার বানিয়েছিস, প্রেমিকার জন্য দিয়ে আয়—আলমারিতে রেখে কাজ বাড়ানোর কী দরকার ছিল! বিরক্ত লাগছে পিঙ্কির। কাল থেকে আবার কলেজে ক্লাস, সামনে সেমিস্টার। মিতুল ছেলে মানুষ, এত লড়ছে, তাই একটু সাহায্য করতে চেয়েছিল।
— “কাকে চাই?”
পিঙ্কিকে পথ আটকে জিজ্ঞেস করল একটা লোক।
পিঙ্কি একটু রেগেই বলল, “যে সাহায্য করবে তাকে!”
পিঙ্কি সকাল থেকেই থম মেরে আছে! বিশেষ করে লেখা ভর্তি ডায়েরি দেখে। ও এখন তেরা-ব্যাঁকা উত্তর দেবে, তাই অর্ণব এগিয়ে এসে বলল—
— “আমাদের কিছু খবর জানতে হবে! কার সঙ্গে কথা বলবো?”
লোকটা কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— “এখানে ছোটখাটো ব্যাপার দেখা হয়। বড় কিছু হলে কালিয়াগঞ্জ থানায় যেতে হবে।”
মিতুল আর অর্ণব একবার একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর মিতুল ধীরে ধীরে বলল—
— “আমরা… একটা পুরোনো ঘটনার খোঁজ করতে এসেছি… রায়পুরেই…”
হাওয়া যেন হঠাৎ একটু ঠান্ডা হয়ে গেল। রাণী ভিলা সম্পর্কে! নামটা শুনেই ভুরু কুচকাল ভদ্রলোক। তারপর ইশারা করে দেখিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে।
পিঙ্কি এগিয়ে গেল প্রথমে। অর্ণব আর মিতুল পিছনে।
ডেস্কের ওপারে বসে থাকা অফিসার চশমার ফাঁক দিয়ে একবার তাকাল—
“হ্যাঁ? কী চাই?”
পিঙ্কি ভদ্রভাবে বলল—
“আমরা একটু ইনফরমেশন চাইছিলাম… একটা পুরোনো কেস নিয়ে…”
অফিসার ভুরু কুঁচকে বলল—
“কত পুরোনো?”
অর্ণব শান্ত গলায় বলল—
“প্রায় পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে… রায়গঞ্জের একটা বাড়ি—রানী ভিলা…”
কথা শেষ হতেই অফিসার হালকা হেসে চেয়ারে হেলান দিল—
“দেখুন, এত পুরোনো কেস ঘেঁটে লাভ নেই। এখনকার কাজেই সময় পাই না। আপনারা এলেন পুরোনো কসুন্দি ঘাঁটতে।ওতো সময় নেই।”
মিতুলের বুক ধক করে উঠল। এতদূর এসে যদি কিছুই না পাওয়া যায়!পিঙ্কি আবার বলল—
“স্যার, ব্যাপারটা খুব জরুরি—”
কথার ফাঁকেই অর্ণব বাইরে বেরিয়ে গেল!
অফিসার এবার একটু বিরক্ত—
“আমি বললাম না? পুরোনো ফাইল খোঁজা, বের করা—এগুলো এত সহজ না। আপনারা বরং বাড়ি যান।”
অর্ণব ফিরে এসে চুপ করেই বসেছিল। হঠাৎই পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। নম্বর ডায়াল করে শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ মামু… একটু কথা বলবে?”
কয়েক সেকেন্ড শুনে নিয়ে ফোনটা অফিসারের দিকে এগিয়ে দিল—”একবার কথা বলুন… সুবীর কাঞ্জিলাল—কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপি।”
নামটা শুনেই অফিসারের মুখের ভাব পাল্টে গেল। হাত কেঁপে উঠল প্রায়। তাড়াতাড়ি ফোনটা কানে তুলল—”ইয়েস স্যার… ইয়েস স্যার… না স্যার, ওরা বলেনি আপনার লোক… জি স্যার… আচ্ছা… আচ্ছা… আমি দেখছি… হ্যাঁ স্যার, কালকেই আসতে বলছি…”
ফোনটা নামাতেই লোকটার চোখমুখ একেবারে বদলে গেছে। একটু আগের বিরক্তি কোথায় যেন উধাও। অর্ণব হালকা মুখ টিপে হাসল।
অফিসার এবার নিজেই বলল—
“বসুন… বসুন… বলুন, কী জানতে চান? চা খাবেন?”
অর্ণব মাথা নেড়ে না বলল, তারপর বলল—
“আমরা রাণী ভিলা নিয়ে জানতে চাই।”
অফিসার অবাক হয়ে দেখছে তিনজনকে! যেন ওরা মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছে। একটু থেমে আবার বলল—
“তবে একটা কথা… হঠাৎ এই রাণী ভিলা নিয়ে আগ্রহ কেন? সাধারণত কেউ যায় না ওইদিকে… জায়গাটা… ভালো না।”
মিতুলের বুকটা কেঁপে উঠল। ও বলতে যাচ্ছিল—
“ওই বাড়ির মেয়েটা কি—”
তার আগেই অর্ণব চোখের ইশারায় থামাল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল—
“আসলে আমার দাদুর এক বন্ধু ছিলেন… রুদ্রবাবু। উনি বলতেন ওদের গ্রামের ওই বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। আমরা ভাবছিলাম… যদি জায়গাটা নিয়ে কিছু করা যায়। আমি কলকাতায় প্রোমোটিং করি…”
অর্ণবের কথা শেষ হওয়ার আগেই পিঙ্কি তাকাল ওর দিকে। প্রোমোটিং! অফিসার চোখ সরু করে তাকাল। সন্দেহ করছে—বোঝা যাচ্ছে ।
চশমাটা নাকের ওপর তুলে নিয়ে বলল—
“হুঁ… ঠিক আছে। পুরোটা জানি না… তবে কিছুটা শুনেছি।”
সবাই চুপ। অপেক্ষা করছে পরের কথাগুলোর জন্য ”
অফিসার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
“ওই বাড়ির মালিক একজন বড় ব্যবসায়ী ছিল। মাছের ব্যবসা—অনেক টাকা। একটাই ছেলে ছিল, কোল ইন্ডিয়ায় চাকরি করত। ছেলের অনেক বছর পর একটা মেয়ে হয় ওদের। বয়সে অনেক ছোট, প্রায় পনেরো বছরের ছোট… সে আবার জন্ম থেকেই অসুস্থ।”
ওরা সবাই চোখ গোলগোল করে শুনছে। যেন কোনো ভয়ের সিনেমা চলছে।
“লোকজন বলত… মেয়েটা নাকি অদ্ভুত সব কথা বলত। ও নাকি অতীত দেখতে পায়! ওই জন্মে ও নাকি খুন হয়েছিল। বাড়ির লোক লজ্জা পেত। ছেলে—মানে মেয়েটার দাদা—সব ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। বিয়ে করে, সংসার করে। কিন্তু জাত সেয়ানা—নিজের আখেরটা ঠিক গুছিয়ে নিয়েছে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা প্রোমোটারের কাছে বিক্রি করে টাকা-পয়সা নিয়ে চলে গেছে!”
পিঙ্কি আস্তে বলল—
“মেয়েটার কী হয়েছিল?”
অফিসার এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাই করছিল। তারপর নিচু গলায় বলল—
“লোকজন বলে মেয়েটা নাকি বেশিদিন বাঁচেনি। অল্প বয়সেই মারা যায়।”
মিতুলের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
অফিসার আবার বলল—
“আমি তো নতুন। আগের জন যাওয়ার আগে এই অঞ্চলের কেস হিস্ট্রি ব্রিফ দেওয়ার সময় এইটুকুই বলেছিল। পাড়ার ছেলে-ছোকরারা বলে, মেয়েটাকে নাকি সাদা শাড়ি পরে ঘুরতে দেখা যায়! প্রোমোটাররা অনেকবার বাড়ি ভাঙতে গিয়েছিল, কিন্তু মেয়েটার ভূত ওদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওর আত্মা নাকি ওই বাড়ির উঠোনেই থাকে! ওই অঞ্চলে এখন বসতি অনেক কম। সব ফ্ল্যাট কিনে কিনে চলে গেছে।”
এতটুকু বলেই কাঁচের গ্লাস থেকে জল খেলেন। বোধহয় ভয় পেয়েছেন।
লোকটাকে দেখে এতো হাসি পাচ্ছে! এতো বোকা! গুগলে সার্চ করে কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপির নাম জেনে পলাশকে জয়েন্ট সিপি সাজতে বলল। আর ওর নামটা “মামু” দিয়ে সেভ করল। ভয়ে ছিল যদি ধরা পড়ে যায়! আসলে বিশ্বাস ছিল—লোকটা নতুন এসেছে, হয়তো একটু ভীতু হবে। টোপটা খেয়েছে।
“বলি কী! বয়স তো বেশি না। এইসব রাণী ভিলা নিয়ে প্রোমোটিং করার দরকার কী! কলকাতায় তো ভালো লেনদেন এই ব্যবসাতে। আর এখানকার প্রোমোটাররা এতো দামী প্রপার্টি ছাড়বে না। ওরা অলরেডি ইনভেস্ট করে বসে আছে।”
অর্ণব বুঝল উনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। তাই দৃঢ়ভাবে বলল—
“আজ উঠি, কাল আসব। ফাইলটা খুঁজে বের করে রাখবেন।”
অর্ণব বেরিয়ে গেল, পিছন পিছন মিতুল আর পিঙ্কি।
চলবে।
