#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#দশম_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
আজ দিনটাও কেটে গেল—কিন্তু কিছুই এগোল না।
সময়ের মতোই যেন সবকিছু থমকে আছে।
পিঙ্কি বিরক্ত গলায় বলছিল, “এভাবে আর কতদিন চলবে জানি না ?আমাদের ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল—সব মিস হয়ে যাচ্ছে।”
পিঙ্কির একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে। ও অস্থির হয়ে আছে পিঙ্কি। অথচ বিষয়টা নিয়ে ওর ইন্টারেস্ট সব থেকে বেশি ছিল ।এখন রেগে গেলে হবে! বাচ্চা মেয়ে মিতুল ওকে একা ফেলে রেখে গেলে চলবে না।
অর্ণব একটু চুপ করে থেকে বলল, “আরও একটু সময় দে, প্লিজ… ব্যাপারটা এত সোজা না।”এমন ভাবে বললো যেন অর্ণবের পরিবারের বিষয়। সেটা না হলেও তবে বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং।তাই মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে অর্ণবের ও নেই।
পিঙ্কি ফিসফিস করে বললো ” মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে রে!”
কথাগুলো খুব আস্তে বলা হলেও, ঘরের নিস্তব্ধতায় সবকিছুই পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।
মিতুল খাটে চুপচাপ শুয়ে ছিল। চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। বুকের ভেতরটা কেমন হালকা ভারী লাগছে। মনে হচ্ছে—এই পুরো ঝামেলার জন্য ও-ই দায়ী। ও না বললে পিঙ্কি আর অর্ণবকে এইভাবে পড়াশোনার ক্ষতি করতে হতো না।
ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ‘মা’ লেখা।
পিঙ্কি একবার অর্ণবের দিকে তাকাল। দুজনেই চোখাচোখি করল। তারপর পিঙ্কি ফোনটা ধরল—
“হ্যাঁ মা! ঠিক হয়নি পরিস্থিতি … এখানে লোকাল স্ট্রাইক চলছে… হ্যাঁ, দুদিনের মধ্যে ফিরব…না না ভয়ের কিছু নেই ”
মিতুল দেখলো পিঙ্কির অসহায় মুখটা।একই কথা, একই মিথ্যে—বারবার বলতে বলতে গলাটাও যেন শুকিয়ে আসছে।সেই সকাল থেকে শুরু—মা, মাসি, বাবা—একটার পর একটা ফোন।
প্রতিটা ফোন মানেই নতুন করে একটা মিথ্যে।
একবার তো মিতুল বাবার মুখে এটাও শুনলো –
“এই পিঙ্কি মেয়েটা কিন্তু খুব বেড়ে পাকা । কী দরকার এতো দূর যাওয়ার পিকনিক করতে ! ডাক্তারি পড়ে যেন মাথাটা কিনে নিয়েছে সবার ।”
কথাটা শুনে মিতুলের খুব খারাপ লেগেছিলো ।
ও জানে—পিঙ্কির কোনো দোষ নেই।
ছোটবেলা থেকেই দেখেছে—মা সবসময় বাবার বাড়ির লোকের দোষ খোঁজে, আর বাবা মায়ের বাড়ির।দুই দিকেই টানাপোড়েন, অভিযোগ, অস্বীকার…তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে এমন কিছু মানুষ—যাদের আসলে কোনো দোষই নেই।
পিঙ্কি তেমনই একজন।
ঘড়িতে তখন সাড়ে ছ’টা।
বাইরে আলোটা আস্তে আস্তে নরম হয়ে আসছে।
অর্ণব বলল, “চল না, একটু বাইরে হাঁটতে যাই। মাথাটাও ফ্রেশ হবে।”
পিঙ্কি একটু ভেবে মাথা নেড়ে রাজি হলো।
কিন্তু মিতুল আস্তে বলল, “তোমরা যাও … আমি একটু রেস্ট নেব।”ওর গলায় ক্লান্তি লেগে ছিল।
শুধু শরীর না—মনের ক্লান্তি।
মাঝে মাঝে এমন হয়—কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না, কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না… শুধু চুপ করে থাকতে ইচ্ছে করে। নিজের ভেতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করে।হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এল—
হারটা যদি বাড়ি নিয়ে গিয়ে বাবাকে দিয়ে দেয়!
ওটা বিক্রি করলে হয়তো সংসারের অনেক অভাব মিটে যাবে।
বাবার মুখে একটু স্বস্তি আসবে…ও নিজেও নিশ্চিন্তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারবে…কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুকটা ধক করে উঠল—না… এটা তো বিশ্বাসঘাতকতা।দাদুর রেখে যাওয়া জিনিস, তার মধ্যে এত রহস্য, বিশ্বাস, ভরসা ও সেটা শুধু টাকার জন্য বিক্রি করে দেবে?
পিঙ্কি বাথরুম থেকে বেরোল।
হালকা নীল কুর্তি, সাদা প্লাজো—চুল ভেজা, মুখে কোনো মেকআপ নেই, তবু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
ও শুধু সুন্দর না—মেধাবীও।মামাবাড়ির সবাই ওকে নিয়ে গর্ব করে।মিতুল শুয়ে শুয়ে দেখছে পিঙ্কিকে!
“দেখ মিতুল, থাকতে পারবি তো? ভয় পাবি না তো?”
পিঙ্কির গলায় চিন্তা।মিতুল হালকা হেসে মাথা নাড়ল—
“না রে, ঠিক আছি।”
ওর ভয় যে লাগছে না—তা নয়।কিন্তু তবু ও চায়—ওরা একটু সময় পাক।আর এই সুযোগে… ডায়েরিটাও পড়া যাবে।ওই ডাইরিতে দাদুর হাতের লেখা! বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।
অর্ণব বেরোনোর আগে বলল, “কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করিস। আমরা খুব দূরে যাচ্ছি না।”
দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।ওরা বেরিয়ে যেতেই ঘরটা যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল।
মিতুল তাড়াতাড়ি উঠে দরজাটা ভেতর থেকে লক করল।তারপর ব্যাগ থেকে আস্তে করে বের করল দাদুর ডায়েরিটা।পুরনো কাগজের একটা গন্ধ—
মিশে আছে সময়, স্মৃতি, আর অজস্র না-বলা কথা।
পাতাগুলো ছুঁতেই মনে হলো—দাদুর হাত রয়ে গেছে এর মধ্যে।
মিতুল পড়তে শুরু করল…তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
এই জায়গাটা…এখানেই যেন সবকিছুর মোড় ঘুরছে।
আবার পড়তে শুরু করল—
“কামিনীকে আমি ভালোবাসতাম… আর আজও বাসি। ও-ই আমার স্ত্রী… আমার সন্তানের মা…
খবর পেলাম ও অসুস্থ—আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি।কিন্তু রানি…ও তখন পুরোপুরি আমার ওপর নির্ভরশীল।বাচ্চার মতো… কখনও গায়ে মাথা রেখে বসে থাকত, কখনও আবদার করত—
‘ওটা দাও… এটা দাও…’আর একটু সুযোগ পেলেই—
‘সীতাহার দাও।’
ও আমাকে আগের জন্মের স্বামী ভাবত।হয়তো সেই কারণেই এই অদ্ভুত দাবি।আমি ওকে ভালোবাসতাম কি না জানি না…কিন্তু টান ছিল। খুব অদ্ভুত এক টান।
সব আবদার মেটাতে পারতাম…শুধু ওই সীতাহারটা ছাড়া।কারণ আমার সেই সামর্থ্যই ছিল না।
একদিকে নিজের সংসার—স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে…
অন্যদিকে রানি আর ওর অসুস্থ মা…
দুটো দিক সামলাতে সামলাতে আমি যেন মাঝখান থেকে ভেঙে যাচ্ছিলাম।
শেষে একদিন…রানিকে আর ওর মাকে কমলার ভরসায় রেখে গেলাম…”
এরপরের অংশটা পড়তে পড়তে মিতুলের হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিল।ঘরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠেছে।আবার পড়তে শুরু করলো।
“কমলা…এই নামটা শুনেই রানি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল।চিৎকার করে বলল—
‘আমি কমলা! ও কেন কমলা হবে? আমি কমলা… তুমি প্রতাপ!’তার চোখে তখন এক অদ্ভুত দৃষ্টি…
ভয়, রাগ, অভিমান—সব মিশে।মনে নেই? তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে… কত ধুমধাম করে…
তারপর?আমাকে মেরে ফেললে!
আমি শুধু একটা সীতাহার চেয়েছিলাম… তুমি দিলে না…’
আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।
আর কমলা কাজ করতে এসেছিল এই বাড়িতে। পাশের বাড়িতে বলেছিলাম লোক দেখে দিতে কারণ রানীর মা ও তখন অসুস্থ।”
এইটুকু পড়ে মিতুল থেমে গেল।মনে হচ্ছে—ঘরের মধ্যে কেউ আছে।কারও দৃষ্টি ওর ওপর।
দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে আবার পড়তে শুরু করল—
শেষ অংশটা পড়ে মিতুলের বুক কেঁপে উঠল।
দাদু রায়পুরে গিয়েছিলেন…জ্যোতিষ সুবীরের কাছে…
আর সেই মানুষ নাকি সব বলে দিয়েছিলেন—
হুবহু মিলে গেছে রানির কথার সঙ্গে।এমনকি দাদুর আগের জন্মের বৌয়ের নামও—কমলা।কিন্তু এরপর কী হলো!
হঠাৎ ডায়েরির লেখাও শেষ।আর কিছু লেখেনি দাদু।
তারপর ফাঁকা…আঁকিবুকি কাটা —কিন্তু লেখা নেই।
মিতুলের মনে হলো—এই ফাঁকাটার মধ্যেই সবচেয়ে বড়ো রহস্যটা লুকিয়ে আছে।
ও আস্তে করে বলল—
“দাদু… তোমার কমলাকে আমি কোথায় খুঁজব?”
গলা কেঁপে গেল মিতুলের কেঁদে ফেললো
“আমি আর পারছি না… এই হারটা ফিরিয়ে দিয়ে মুক্তি চাই…কেন আমাকে জড়ালে দাদু?
আমার নিজেরই তো কত দায়িত্ব…তোমার পেনশন আর নেই… বাবার কাজ ঠিক নেই…আমার স্বপ্ন…”
কথাগুলো শেষ করার আগেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।মিতুল মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
মাথা নিচু… কাঁধ কাঁপছে…
হঠাৎ—
চারদিকে এক অদ্ভুত আতরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
গাঢ়… মিষ্টি… অথচ কেমন যেন অস্বস্তিকর।
মিতুল থমকে গেল।
কিন্তু চোখের জল থামল না।
ও শুধু কেঁদেই চলল…
চলবে।
