#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#পঞ্চম_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
“মিতুল চল না! পরীক্ষা শেষ আজ একটু মোমো খেতে যাই! ” – স্কুলের বেরোবার গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে অমৃতা আর সুপ্রিয়া।মিতুল পরীক্ষা শেষ করে একটু আলগোছেই বেরিয়ে আসছিলো। কারণ আজকের দিনে যে এরকম ডাক আসতে পারে ও বেশ জানে! আর সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় আজ অন্তত নেই মিতুলের।
সুপ্রিয়া আর অমৃতা সরু চোখে দেখছে মিতুলকে। মিতুল আর ভনিতা না করেই বললো ” না রে আজ একটু কাজ আছে। শরীরটাও সেরকম ভালো নেই!” অমৃতা ব্যাস্ত হয়ে বললো ” কেন রে? শরীর খারাপ কেন? পরীক্ষা ভালো হয়নি!”
পরীক্ষার কথা মাথায় আসতেই থমকালো মিতুল। কী যে পরীক্ষা আর কী যে পড়া। এই কদিন কিচ্ছু পড়তে পারে নি। বসলেই মাথায় হাজার চিন্তা। কমলা, শেষের কবিতা, দাদুর চিঠি,ঠাকুরঘরের সুড়ঙ্গ, রায়গঞ্জ , ঠাম্মার সুইসাইড।কামিনী যে সুইসাইড করেছে এটা মায়ের থেকেই জেনেছে মিতুল । কারণটা অনেক বার জিজ্ঞেস করেছে মিতুল। হৈমন্তী জানেনা বলে এড়িয়ে গেছে বারবার !আর মিতুলও বেশি ইন্টারেস্ট দেখায় নি মায়ের সামনে।পাছে বুঝে যায়! তবে কারণটা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছে মিতুল।
কারণ ওই কমলাই! দাদু যদিও চিঠিতে লিখেছে কমলা ওঁর পূর্বজন্মের বউ! সেটা খুব অবাক করেছে মিতুলকে। ফিজিক্স, কেমেস্ট্রির মাঝে শুধু হিসেব মেলাতে বসেছে! কোনো একটা যোগসূত্র যদি পাওয়া যায়! কমলার জন্য যদি ঠাম্মা আত্ম*হত্যা করে তাহলে ধরে নিতে হবে কমলার সাথে দাদুর ভালো সম্পর্ক ছিল।
আর সেই পরকীয়া কে প্রকাশ্যে আনতে এইসব জন্ম জন্মান্তরের গল্প কী ফেদেছিলো দাদু। লোকটা কী তাহলে ভালো মানুষ নয়! ধুর কী যে ভাবছে মিতুল! মিতুলের কাছে দাদু ভগবানের থেকেও বেশি। পরীক্ষার আগে সেভাবে পড়তেই পারেনি মিতুল। কিন্তু পরীক্ষার হলে বসে দেখেছে সবটাই জানা মিতুলের ।অসাধারন পরীক্ষা দিয়েছে ও । মিতুলের আত্মবিশ্বাস টা যেন আরও বেড়ে গেছে যখন প্রতিটা পরীক্ষার সময় হল থেকে ল্যাভেন্ডার আতরের গন্ধ পেয়েছিলো মিতুল।
দাদু ভুত কীনা জানেনা মিতুল তবে বেশ ক্ষমতাবান। সারাবছর পড়াশোনা করে মা সরস্বতী কে ডেকেও এতো লাভ হয়নি যত টা লাভ এবার না পড়ে হয়েছে । ভগবানের থেকে বোধহয় ভুতের ক্ষমতা বেশি ! ভেবেই মুখ টিপে হাসলো মিতুল। আর সেটা চোখ এড়ায় নি সুপ্রিয়ার।
” চল রে অমৃতা মিতুল যাবে না মোমো থেকে। ম্যাডামের বোধহয় বয়েজ স্কুলের দীপায়নের সাথে!” বলেই মিটিমিটি হাসতে হাসতে চলে গেল অমৃতা আর সুপ্রিয়া। দীপয়ন যে মিতুল কে পছন্দ করে সেটা বোধহয় বয়েজ থেকে গার্লস সব স্কুলের ক্লাস ইলেভেনের সবাই জানে।
সুপ্রিয়ার কথায় মিতুল মুচকি হেসে সাইকেলে উঠলো। সামনে অনেক কাজ। এখন মোমো খেতে যাওয়ার সময় নেই।আজ অনেক টা সময়। মা আসলে মাসি বাড়ি যাবে। সেটা অবশ্য পিঙ্কি দিদি প্ল্যান করেছে।মিতুলের মাসির মেয়ে। মা কে ডেকে ব্রেন ওয়াশ করবে। একটা ছোট খাটো ট্যুর করবে পিঙ্কি দিদি বন্ধুদের সাথে। সেখানে নিয়ে যেতে চায় মিতুলকে।আসলে পিঙ্কির এই প্ল্যান মিতুলের জন্যই। আসলে মিতুল নিজেও জানেনা ওকে এর জন্য আসলে ঠিক কোথায় যেতে হবে! কিছুই বুঝতে পারছিলো না মিতুল।
প্রায় দিশেহারা হয়ে সবটা জানিয়েছে পিঙ্কি দিদিকে। পিঙ্কিকেই ভরসা করেছে মিতুল কারণ হৈমন্তীও যে নিজের দিদির মেয়েকে বড্ড ভরসা করে। করবার মতোই তো! এক বার পরীক্ষা দিয়েই ডাক্তারি তে চান্স পেয়েছে পিঙ্কি । মাত্র তিন বছরের বড় হলেও খুব বন্ধুত্ব ছিল না দুই বোন – মিতুল আর পিঙ্কির। একরকম হিংসাই ছিল। কারন হৈমন্তী মিতুল কে সারাক্ষন পিঙ্কির উদাহরণ দিত! আর সেটাই সহ্য হতো না মিতুলের।
যখন দাদুর বিষয়টা নিয়ে আর ভাবতে পারছিল না, না পড়তে পারছিল,না, ঘুমাতে পারছিলো।বিশেষ করে পূর্বজন্মের বউ! এই শব্দটাই বড্ড তাড়া করছিল মিতুলকে।কিন্তু কাকে বলবে সে কথা! এই বাড়ির কারোকে বলা যাবে না।
অনেক ভেবে পিঙ্কি দিদিকে মেসেজ করেছিলো মিতুল -পুনর্জন্ম বলে কিছু হয়? অনেক রাত তখন কিছুতেই মন বসছিল না। তাই বাধ্য হয়েই প্রশ্নটা করেছিল পিঙ্কিকে ।পিঙ্কি ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবেছিল মিতুল। ভাবেনি ওই রাত দুটোতেই ফোন করবে।
” কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই মিতুল গড়গড় করে সব বলে দিলো। হয়তো কারোকে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু পিঙ্কিকে ভরসা করতে ভয় পাচ্ছিলো। পাছে মাকে বলে দেয়! কিন্তু না ভুল ছিল মিতুল! পিঙ্কি দিদি আর ওঁর বয়ফ্রেন্ড অর্ণব দা দুজনেই মহুলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সুন্দর করে বুঝিয়েছে জাতিস্মর কী! পূর্ব জন্ম কী! বলেছে –
“দেখ মিতুল, ‘জাতিস্মর’ বলে একটা ধারণা আছে ঠিকই—মানে কেউ কেউ নাকি আগের জন্মের কিছু স্মৃতি মনে রাখতে পারে। কিন্তু এটা প্রমাণিত বিজ্ঞান না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো মানসিক, আবেগের, আর পরিস্থিতির মিশ্রণ।
শুধু তত্ত্ব না মিতুল, এমন কিছু ঘটনাও আছে যেগুলো শুনলে একটু হলেও ভাবতে হয়…”
পিঙ্কি দিদি একটু থেমে বলেছিল—
“তোকে একটা ছেলের গল্প বলি—নামের ছিল তিতু সিং, উত্তরপ্রদেশের। খুব ছোটবেলায়, তিন-চার বছর বয়স থেকেই সে নাকি বলত—ওর আসল বাড়ি এইটা না। ওর অন্য একটা বাড়ি আছে, অন্য নাম আছে।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল বাচ্চার আজগুবি কথা। কিন্তু ধীরে ধীরে সে যে নাম, জায়গা, পরিবারের কথা বলতে শুরু করলো—সেগুলো সত্যি একটা লোকের জীবনের সাথে মিলে যায়।
সে নাকি বলত, তাকে গুলি করে মারা হয়েছিল। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সত্যিই সেই নামের একজন মানুষকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল।
সবচেয়ে অদ্ভুত কী জানিস?
ছেলেটার শরীরে জন্মদাগ ছিল—যেখানে নাকি ওই লোকটার গুলি লেগেছিল।এই কেসটা নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে। একেবারে প্রমাণ হয়ে গেছে—এমন বলা যায় না। কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না।
এমন আরও কিছু কেস আছে, যেখানে বাচ্চারা এমন তথ্য বলেছে যেগুলো তারা জানার কথাই না।”
পিঙ্কি দিদি ধীরে বলেছিল—তাই বলে এটা ধরে নেওয়া ঠিক না যে সবকিছুই পুনর্জন্ম। কিন্তু এটাও ঠিক—সবকিছু আমরা এখনও ব্যাখ্যা করতে পারিনি।
তোর দাদুর গল্পটা… হয়তো সত্যি, হয়তো না।
কিন্তু তুই যেটা অনুভব করছিস, সেটাকে অস্বীকার করার দরকার নেই।”
সেই রাতে পিঙ্কি দিদির কথা গুলো খুব ভেবেছে মিতুল। কত কিছু আছে দুনিয়ায় অথচ ও জানে না।মিতুল সাইকেল চালাতে চালাতে খেয়াল করেনি ও বড়ো রাস্তায় নেমে গেছে। এই সময় একটু সতর্ক হতে হয়। আশপাশে দেখে সাইকেল চালাতে হয়। আর সেটা দেখতে গিয়েই নজরে পড়লো দীপায়ন কে। ছেলেটা কী চায় কে জানে! প্রেম করতে কী! মাঝে মাঝে মিতুলের ইচ্ছে করে প্রেম করতে ঘুরে বেড়াতে!
আচ্ছা দীপায়ন কে ডেকে কথা বলবে আজ? আজ তো অনেক সময় বাড়িতে মা নেই। পরীক্ষা শেষ। মিতুলেরও মাঝে মাঝে আবেগে ভাসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যখনই মনে পড়ে অভাব, অভিযোগ, মায়ের খিটখিটানি! ব্যাস।
দীপায়ন দেখছে মিতুলকে। বুকের ভেতর দিয়ে কী একটা যেন নেমে গেল ওর! এটাই কী প্রেমের অনুভূতি! বয়েজ আর গার্লস স্কুলের অনেকেই চায় ওদের জুটি টা বেড়ে উঠুক। দীপায়নও চায়। শুধু মিতুল রাজি হলেই! ব্যস।
মিতুল বুঝতে পারছে ওর ফোনটা বাজছে। তাড়াতাড়ি একটু সাইড হয়ে সাইকেল থেকে নেমে ফোনটা বের করতেই দেখলো পিঙ্কি দিদি।
” কী রে বাড়ি ঢুকলি? মাসি তো আমাদের বাড়ি এসে গেছে। মোটামুটি রাজি করিয়ে এনেছি প্ল্যান টাতে। তুই শুধু বাড়ি গিয়ে আলমারিটা ঘেঁটে ফেল। কিছু একটা ক্লু না পেলে পুরো রায়গঞ্জ দুর্গাপুর ঘুরে বেড়াতে হবে, তাও কিছু হবে না “”
পিঙ্কির ফোন রেখেই সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে এগোলো মিতুল। প্রেম ভালোবাসা দীপায়ন সব ভুলে গেল এখন শুধুই মিশন সীতাহার।
চলবে।
