#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#চতুর্থ_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
ভিজে উঠোন,কাদামাটির গন্ধ.! মেয়েটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে।চুল ভিজে, কাঁধে লেপ্টে আছে। পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে সীতাহারটা।মিতুল ডাকতে চায় বারবার।
কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না।হঠাৎ মেয়েটা ঘুরে তাকায়—চোখদুটো কেমন যেন… চেনা।
“কী গোঁ গোঁ করছিস! কত রাত অবধি পড়েছিস কাল?বৃষ্টি হয়েছে টের পাসনি?’ উঠে ডেকোরেটার্সের জিনিস গুলো তুলতে পারতিস তো! ভিজে গেছে চেয়ারের কাপড় গুলো। নিতে এসে একগাদা কথা শোনালো। কাল রাতে এমন ঘুমিয়েছি কিচ্ছু টের পায়নি। হবে না! কম খাটনি হলো! সব তো অতিথি হয়ে এসেছে। বাবা যেন আমাদের একার!
মিতুলের মুখের ওপর মুখ এনে যত অভিযোগ, রাগ মেটাচ্ছে হৈমন্তী।মায়ের মুখে কালকের রাত কথাটা শুনে চমকে উঠে বসলো মিতুল।সকাল হয়ে গেছে মানে কালকের রাতটা শেষ।সেই বীভৎস রাত টা শেষ।দাদুর মেজেজ, ওই মহিলা কী নাম যেন কমলা। আর সেই সীতাহার। মনে পড়তেই লাফ দিয়ে উঠলো হারটা কোথায়! খাটেই তো ছিল। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে মিতুল। মা কী দেখে তুলে রাখলো! তাকালো হৈমন্তীর দিকে। মুখটা পড়ার চেষ্টা করছে।হারটা পেলে তো চোখ মুখের ভোল বদলে যেত
তাহলে! চারিদিকে তাকালো মিতুল।টেবিলে খোলা ফিজিক্স বই—আর ঠিক চারদিন পর পরীক্ষা।কমলা, দাদুর মেসেজ এগুলো সব সত্যি নাকী কাল রাতের কোনো স্বপ্ন।সত্যি হলে হারটা কই! বিছানায় তো রেখে ছিল। এমন একটা বিষয় মাকে তো বলতেই পারছে না। তাহলে! আলমারির দিকে তাকালো মিতুল সেটাও বন্ধ। দেখে মনে হচ্ছে চাবি দিয়ে লক করা। তাহলে। পড়তে পড়তে কী ঘুমিয়ে পড়েছিল মিতুল।
দাদু টাইপিং! মনে পড়লো মিতুলের। তাড়াতাড়ি ফোন টা টেনে নিয়ে হোয়াটস্যাপ খুললো।ঢুকে পড়লো দাদুর নাম্বারে।স্থির ছবি। কাল রাতে যে এতো কিছু লিখলো।কিচ্ছু নেই। তাহলে কী সব স্বপ্ন?
” উঠেই ফোন নিয়ে বসে পড়লি? এবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠো! অনেক গায়ে হাওয়া লাগিয়েছো! তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে কাজ বাজ খোঁজো! তোমার বাবার ওই তো দৌড়!” – হৈমন্তী বলেই যাচ্ছে আর সাথে ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে টেবিলের ওপরে রাখা ওষুধরে বাক্স গুলো। ওগুলো অপ্রয়োজনীয় তাও এভাবে ছুড়ে ফেলছে দাদুকে।খুব খারাপ লাগছে মিতুলের। ও বুঝতে পারছে আসলে মাথার ঠিক নেই হৈমন্তীর। দাদুর পেনশনের টাকাটা পুরো বন্ধ হয়ে গেল। বাবার আর কী ইনকাম! মিতুল বুঝতে পারছে মায়ের মানসিক অবস্থা।
মিতুল উঠে পড়লো খাট থেকে। গা হাত পা খুব ব্যথা। জ্বর জ্বর লাগছে। কাল রাতে কী হলো! ভূত ভর করলো! দাদু কী তাহলে ভূত! সেই ছোট্ট বেলার মত ওর ঘাড়ে চাপলো! ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসে বলে কী এইসব স্বপ্ন দেখলো! আর এই কমলা!
ধুর এখন এসব ভাবলে চলবে না।পরীক্ষা সামনে। পড়তে হবে। তাড়াতাড়ি বাথরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিয়েই পড়তে বসবে। এখন অঙ্ক করবে! দুপুরে কেমিস্ট্রি, রাতে আবার ফিজিক্স।
ঘড়িতে এগারোটা পনের। রুটি আর কালকের অনুষ্ঠানের এঁচোড় চিংড়ি খেয়ে বাইরের দরজা বন্ধ করে এলো মিতুল। হৈমন্তী বেরিয়েছে রেশন তুলতে! বাড়িটা এখন ফাঁকা! মন দিয়ে পড়তে বসবে ভেবেই দাদুর ঘরে ঢুকলো। অংকের খাতা খুলেছে ঠিকই কিন্তু বারবার কালকের স্বপ্নটা মনে পড়ছে। এটা সত্যি স্বপ্ন। সত্যি হলেও তো পারতো!
একটা রহস্য, গা ছমছমে ব্যাপার। কত ভালো হতো এইসব নিয়ে পরীক্ষার পর নাড়াঘাটা করতে। অঙ্ক গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু সংখ্যা গুলো যেন তালগোল পেকে যাচ্ছে। আধ ঘন্টা বসে একটা অঙ্কও মেলাতে পারলো না।বারবার মনে হচ্ছে দাদু এভাবে ঠকালো ওঁকে! কালকের স্বপ্ন টা এভাবে মিথ্যে হয়ে গেল।
মিতুল ধুস বলে খাতাটা সরিয়ে রাখলো।ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল এগিয়ে এলো আলমারির সামনে এসে থামল।আলমারিটা লক করা আছে বুঝেও হাতল ধরে ঘোরাতেই খুলে গেল। দ্বিতীয় তাঁকের কাপড়টা এখনো গুটিয়ে আছে। এর তলা থেকেই তো কাল চিঠিটা পেয়েছিলো। তাহলে এটা স্বপ্ন কী করে হয়! আর যদি স্বপ্ন নাও হয় হারটাই বা কোথায় গেল!
হাতটা আরও ঢোকালো মিতুল। যদি হারটা পাওয়া যায়! ঠিক সেই জায়গাটা প্রায় ঘেঁটে ফেললো মিতুল।
হঠাৎ l একটা শক্ত জিনিসে এসে হাতটা ঠেকলো।
একটা বই কী! তাড়াতাড়ি টেনে বের করে আনলো। বইয়ের ওপর মিতুলের আলাদাই একটা টান।কোনো বই দেখলেই পড়তে বসে যায় মিতুল।
বইটা টেনে বের করে দেখলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের—‘শেষের কবিতা’।মিতুল অবাক।এরকম একটা স্পর্শকাতর বই এখানে! দাদু তো খুব একটা গল্পের বই পড়ত না!মিতুল অন্তত দেখে নি।বই তার ওপর রবীন্দ্রনাথ মিতুল বুকের ভেতর কেমন একটা টান অনুভব করল।বইটা খুলল।
প্রথম পাতাতেই লেখা ” ভালোবাসা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!”
বাহ্ বেশ ভালো লাগলো মিতুলের। পাতা উল্টালো মিতুল। ২০ নম্বর পাতায় লেখা “সব গল্পের শেষ হয় না… কিছু গল্প শেষ হওয়ার আগেই থেমে যায়।
বেশ ইন্টারেস্ট লাগছে মিতুলের। ভালোবাসা, প্রেম বেশ লাগে ওর। অনেক বন্ধুরা ওর প্রেম করে। মিতুলকেও অনেকে ভালোবাসি বলেছে। কিন্ত ওর না করে দিয়েছে। আসলে ওর মনে হয় প্রেম করার সময় হয়নি এখনো। কিন্তু বিষয়টা ওর বেশ লাগে!
পাতা উল্টাল।প্রায় প্রতিটা পাতায় কিছু না কিছু লেখা।
“তোমাকে আমি ভালোবাসি—এই কথাটা বলবার জন্যে নয়,
তোমাকে আমি ভালোবাসি—এই কথাটা না বলবার জন্যেই।”
এই লাইন গুলো শেষের কবিতারই সেগুলো পেন্সিল দিয়ে লেখা।তার নীচে লেখা
“আমি পারিনি…”
একজায়গায় লেখা “ওর চোখদুটো আজও দেখি…”
মিতুলের হাত কাঁপছে।একটা একটা করে পাতা উল্টে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে—একটা গল্প নয়,একটা অপরাধবোধ ছড়িয়ে আছে পুরো বইজুড়ে।
মিতুল শেষ পাতায় এসে থামল।পাতাটা একটু ভাঁজ হয়ে আছে।যেন বারবার খুলে দেখা হয়েছে।
ধীরে ধীরে খুলল।ভিতরে—শুধু একটাই লাইন।
“আমার মৃত্যুর দায় শুধুই আমার।”
মিতুল স্থির হয়ে গেল।কার মৃত্যুর দায়! কার লেখা এইগুলো।কার বই। হঠাৎ মনে পড়লো মিতুর বাবা বলে ঠাকুমার নাকী খুব গল্পের বই পড়ার শখ ছিল।তাহলে কী ঠাম্মার!তাঁকে কখনো দেখেনি মিতুল। কিন্তু তাঁকে নিয়ে সেরকম কথাও বাড়িতে আলোচনা হয় না কখনও। শুধু শুনেছে দুর্গাপুরে দাদু চাকরি করতো ওখানেই থাকতো ওরা। তিনদিনের জ্বরে মুখ দিয়ে ফ্যানা বেরিয়ে মারা গেছে। তখন ছোট কাকা ৫ আর ছোট পিসি ৩ আর মিতুলের বাবা নয়।
তাহলে কী ঠাম্মা আত্মহত্যা করেছিল? বিড়বিড় করে বললো মিতুল। হঠাৎ নাকে তীব্র গন্ধ! ল্যাভেন্ডারের আতর। দাদুর গন্ধ। কাল রাতে এই গন্ধ টাও পেয়েছিলো। তাড়াতাড়ি তাকালো খাটে বালিশের তলা থেকে বেরিয়ে আছে হারটা।
মিতুল ছুটে গিয়ে বালিশ সরাতেই দেখলো সেই হার আর পাশে সেই চিঠি।মনটা আনন্দে নেচে উঠলো মিতুলের। কিচ্ছু স্বপ্ন না সব সত্যি।কিন্তু এতো কিছু রাখবে কোথায়! ভাবতে ভাবতেই মনে পড়লো ঠাকুর ঘরের সিংহাসনের নীচের গর্ত।এই কদিন ওকেই পুজো করতে হবে যতই পড়া থাক পরীক্ষা থাক। পিরিয়ডের পাঁচ দিন আসার আগে ঠাকুর ঘরের কোনো গোপন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।অন্তত এক মাস ওখানে রাখতে হবে। পরীক্ষা শেষ হলে শুরু হবে মিশন সীতাহার।
তার আগে অনেক কিছু জানতে হবে কে এই কমলা, বাবা পিসিরা চেনে নাকী! ঠাম্মা কী আত্মহত্যা করেছিল! দাদুর সাথে ঠাম্মার সম্পর্ক কেমন ছিল।
কলিং বেল বাজলো। মা ফিরলো বোধহয়। তাড়াতাড়ি ঠাকুর ঘরে ঢুকলো মিতুল।
চলবে।
