#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#তৃতীয়_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
স্ক্রিনে এখনও একই লেখা—দাদু টাইপিং…মিতুলের চোখ ধীরে ধীরে সরে এল মোবাইল থেকে।লেখাটা দেখে এখন আর ভয় লাগছে না । বরং বেশ অদ্ভুত লাগছে ।খারাপও লাগছে !দাদুকে শ্মশানে পুড়িয়ে দিয়ে আসার পর মা বলেছিলো মৃত্যু মানেই শেষ। আর চাইলেও দাদু কে দেখতে পাবি না।
দেখতে পাচ্ছে মিতুল। দাদু যেমন হোয়াটস্যাপ লিখতো তেমনই লিখছে কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছে না মিতুল।অবাকও লাগছে মিতুলের।এই সীতাহারটা কত খুঁজেছে সবাই। অথচ এতো কাছেই ছিল।ওদের এমন খোঁজার নেশা আলমারিটাও বন্ধ করেনি! তা কী করে হয় সেজো পিসি নিজে এসে আলমারির চাবি দিয়ে গেছে মিতুলের মায়ের হাতে।
” দেখিস মেজো হারটা খুঁজে পেলে আবার একা ভোগ করিস না!এই বাজারে হারটার দাম কোটি টাকার কাছাকাছি। আমরা পাঁচ ভাই বোন নিয়ে নেবো । ”
মিতুল ভাতের গ্রাসটা সবে মুখে ঢুকিয়েছে। শুনেই রাগ ধরেছিল।
” পাঁচ ভাই বোন মানে বড়ো পিসি মেজো পিসি? ” মিতুলের কথায় খুব রেগে গেছিলো সেজো পিসি ” বাবা মরেছে একবারও এসে দাঁড়িয়েছে তোর বড়ো পিসি মেজো পিসি!”
পরপর দুই বোন তারপর জেঠু তারপর সেজো পিসি, মিতুলের বাবা, ছোট পিসি, কাকাই। সবার সাথে টক মিষ্টি সম্পর্ক হলেও দুই পিসির সাথে যেন কোনো ভাব নেই। অথচ সবাই বলে মিতুল নাকী পুরো বড়ো পিসির মত দেখতে।
দুম করে আওয়াজ হলো! বাজ পড়লো বোধহয়! মোবাইলে দাদু টাইপিং। এবার বিরক্ত লাগছে মিতুলের। সারাদিন পর এই ঘরে ঢুকলে যখন দাদু গো গো করে মিতুলকে ডাকতো এমনই বিরক্ত লাগতো! পাঁচদিন বাকী পরীক্ষার। বইগুলো এখনো খোলা কিন্তু এক লাইনও পড়তে পারছে না।
এখনো টাইপিং হচ্ছে। আরও কীছু বলবে কী! মিতুল তো কীছু বুঝতেই পারছে না। হাতের হারটাকে আরও হাতের মধ্যে জাপটে ধরলো। সোনা নিয়ে লোভ নেই মিতুলের। ওর আঁকড়ে ধরার করণ দাদু। হারটা নিশ্চই দাদুর খুব প্ৰিয় ছিল!
সীতাহারটা অদ্ভুত ঠান্ডা। ধাতু এমনিতে একটু ঠান্ডা হয়! কিন্তু এই ঠান্ডা টা খুব চেনা লাগছে। জেঠু আসার জন্য দাদুর বডিকে বেশ অনেক্ষন রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর যখন সবাই আসার পর যখন শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে দাদুকে মা বললো মিতুল দাদুর পায়ে হাত দিয়ে শেষ প্রণাম টা করো।
হুম তখন দাদুর শরীরে এই ঠান্ডা টাই ছিল। এমনই ঠান্ডা। ভাবনাটা আসতেই হাতের সীতাহারটা ভয়ে দাদুর খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে দিলো মিতুল। আর সেটা করতে গিয়ে নাকে ধক করে একটা গন্ধ আসলো।
না অচেনা নয় বরং বেশ চেনা।এই আতর টাই তো দাদু মাখতো! ভাবনার সাথে সাথে মিতুলের বুকটা কেমন করে উঠল।হঠাৎ মনে হলো—ঘরে ও একা নেই।ঘরের ভেতর নিঃশব্দ।আর সেই নিঃশব্দের মধ্যেই যেন কারও উপস্থিতি।খাটটার দিকে তাকাল মিতুল।
দাদুর খাট।বালিশটা ফেলে দেওয়া হয়েছে। চাদরটাও একটু কুঁচকে আছে…যেন কেউ একটু আগেই উঠেছে খাটে ।মিতুলের গলা শুখিয়ে আসছে। ঢোক গিলল।
“দাদু…?”খুব আস্তে বলল।কোনো উত্তর নেই।অন্য কিছু হলে এতক্ষনে অজ্ঞান হয়ে যেত মিতুল। শুধু দাদু বলে সাহসটা এখনো আছে। মিতুল জানে দাদু আর যাই হোক ওর কোনো ক্ষতি করবে না। যদিও মিতুল গল্পে পড়েছে মানুষ যখন আত্মা হয়ে যায় আর কোনো অনুভূতি আবেগ কাজ করে না। আচ্ছা ঘাড়ে উঠবে না তো দাদু! ভাবতে ভাবতে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো এখনো দাদু টাইপিং…দাদু শব্দটা দেখলেই মনটা সাহসী হয়ে যাচ্ছে ।
মিতুল দুদন্ড ভেবে আবার এগিয়ে এলো আলমারির দিকে।আলমারিটার সামনে গিয়ে আবার তাকাল ভেতরে।এই জায়গাটাতেই ছিল হারটা যেখান থেকে সবাই খুঁজেও দেখতে পায়নি।
কেন? দাদু লুকিয়ে ফেলে নি তো!
” তোরা কী ভাবছিস বুড়ো হারটা আলমারিতে রেখেছে! ওতো বোকা ভাবিস না ওঁকে!” – মিতুর মনে পড়লো সেজো পিসির কথা গুলো। বাবার নামে ছেলে মেয়েরা কিভাবে এইসব কথা বলে বুঝতেই পারে না। মিতুল তো ভাবতেই পারে না বাবাকে বুড়ো বলে ডাকবে। বাবাকেও মিতুল কখনো দেখেনি দাদুর সাথে এভাবে কথা বলতে!
এইসব ভাবতে ভাবতেই হাত ঢুকিয়ে খঁজে চলেছে মিতুল। কী খুঁজছে কেন খুজছে কিচ্ছু যানে না। শুধু জানে দাদু টাইপিং মানে আরও কিছু বলতে চাইছে।
আরেকটু নাড়াচাড়া করতেই কাপড়ের নিচে কাগজের মতো কিছু ঠেকল।মিতুল থমকে গেল।ধীরে ধীরে সেটা বের করল।একটা ভাঁজ করা চিঠি।
।মিতুলের বুক ধড়ফড় করছে।
কাগজটা খুলতেই একটা হালকা গন্ধ এল—পুরোনো আলমারির স্যাতস্যাতে গন্ধ সাথে দাদুর সেই ল্যাভেন্ডারের গন্ধ যুক্ত আতর।খুব সাবধানে কাগজটা খুললো মিতুল। মিতুলের বিশ্বাস এখান থেকে অনেক কিছু জানতে পারবে।ভিতরে খুব চেনা লেখা ।দাদুর হাতের লেখা।কাঁপা কাঁপা অক্ষর।
“এই হারটা যদি কারও হাতে যায়,তবে সেটা যেন মিতুলের হাতে যায়।
কারণ ও ছাড়া কেউ বুঝবে না আমার অনুভূতির কথা ।আমি এটা ওঁকে বলতেই পারিনি যে এই হারটা ওর ঠাম্মার না।কাউকে কোনোদিন বলিনি।
এই হারটার আসল মালিক—কমলা- আমার পূর্বজন্মের স্ত্রী।
মিতুলের ভুরু কুঁচকে গেল।কমলা?পূর্ব জন্ম? দাদুর সিরিব্রালের পর কী মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো! পিঙ্কি দি বলতো মনে পড়লো মিতুলের। তোমার দাদু কী একটা লোহার বাক্স আগলে বসে থাকে। কী সব লেখে আবার আমায় বলে তুলে দে আলমারিতে।পিঙ্কি দির কথা পাত্তা দিতো না ওরা। সারাদিন দাদুকে দেখে রাখতো এই পিঙ্কি।
মিতুল চিঠিটা এগোল—
“অনেক বছর আগে রায়গঞ্জে গিয়ে আবার কমলার সাথে আলাপ হয়। কমলার বাড়িতে উঠেছিলাম। ড়ি জন্মে ওর নাম রানী।হারটা ওর নিজের না—ওর মায়ের।খুব যত্ন করে রাখত।সেদিন…আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি।ও চলে গেল।
কিন্তু হারটা রয়ে গেল।
ওটা ফেরত দেওয়া হয়নি কোনোদিন।আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম।কারও হাতে যেন না পড়ে, বিশেষ করে তোমার দুই পিসি। বড্ড লোভ ওদের। তোমার ঠাকুমার সব গয়না দিয়েছি ওদের তাও ওই হারেই লোভ!”
শেষের লাইনটা প্রায় অস্পষ্ট—
“যদি কখনো ফিরে আসে…ওটা ফিরিয়ে দিও …”
মিতুলের হাত কাঁপছে।ঘরের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে।টুপটাপ… টুপটাপ…মিতুল ধীরে ধীরে মাথা তুলল।মনে হলো—
আলমারির ঠিক পাশে…কেউ দাঁড়িয়ে আছে।দেখা যাচ্ছে না ঠিক।
তবু—একটা উপস্থিতি।চোখ সরাতে পারছে না মিতুল।খাট থেকে সীতাহারটা তুলে নিতেই হঠাৎ ঠান্ডার ছ্যাকা লাগলো।এ যেন সেই মৃত দাদুর ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া।
মোবাইলটা কাঁপল।স্ক্রিনে এখনও—
দাদু টাইপিং…কিন্তু আর ভয় লাগছে না মিতুলের।ধীরে ধীরে হারটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
খুব আস্তে বলল—“আমি দিয়ে দেব…ঠিক জায়গায় দিয়ে দেব…তোমার কমলার জিনিস কমলাকে পৌঁছে দেব ”
বলে তো দিলো মিতুল। আদৌ কমলা বলে কেউ আছে! নাকী সবটাই পাগলের প্রলাপ। হঠাৎ দেখলো মিতুল স্ক্রিন থেকে “টাইপিং…” লেখাটা মিলিয়ে গেল।পুরোপুরি।ঘরটা আবার নিঃশব্দ।
মিতুল বুঝল—দাদু আর কিছু বলবে না।যা বলবার ছিল—সবই বলে দিয়েছে।এখন শুধু সত্যতা যাচাই করার পালা
চলবে।
