#সীতাহার
#দ্বিতীয়_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
হাঁ করে তাকিয়ে আছে মিতুল। দাদু টাইপিং মানে! দাদু নেই ফোনটা চার্জে বসানো! বুকাই সিমটা খুলে নিয়ে যায়নি তো! কী করবে বুঝতে পারছে না মিতুল।
তাড়াতাড়ি ফোন করলো ওই নাম্বারে। বুকাই যদি ফোনটা ধরে আজ ওর কপালে দুর্ভোগের শেষ নেই।
রাগে, ভয়ে অস্থির হয়ে আছে মিতুল। কুক কুক করতে করতে কেটে গেল ফোনটা।আবার করলো মিতুল। এবারও একই। কী করবে বুঝতে পারছে না মিতুল। তখনও একই কুক কুক করছে। ওদিকে
দাদু টাইপিং…..
ঘড়িতে একটা পনের। ওদিকে মেঘ ডাকছে বাইরে। ভূতের গল্পে পড়েছে মিতুল! একেবারে মোক্ষম সময় মোক্ষম পরিবেশ । কিন্তু মিতুলের হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।এরকম আবার হয় নাকী! কিন্তু হচ্ছে তো
টাইপিং করছে তো! স্ক্রিনে তো দাদু নামটাই দেখতে পারছে মিতুল। আবার তাকালো মিতুল দাদুর ফোনটার দিকে। অনেক্ষন চার্জে বসানো। এবার নিশ্চই খুলবে। ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো সাংঘাতিক গরম।কে জানে ফোনটা খারাপ হয়ে গেল না তো!
সে কী করে হয়! গত বছরই তো দাভাই মানে মিতুলের জেঠুর ছেলে চাকরি পেয়ে কিনে দিয়ে গেছে। মিতুল ভালো গান গায় ফোর্থ ইয়ারে তানপুরা লাগতো কিনে উঠতে পারেনি বলে ওকে একটা তানপুরা কিনে দিয়েছে।দাভাই কে ফোন করবে! ধুস ওদের ফ্লাইট বারোটায় পৌছালো। সবে হয়তো বাড়ি ঢুকেছে! তারপর বম্মার যা কথা!
ধুর কিছু ভালো লাগছে না। ওদিকে বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি। উঠোনে প্যান্ডেল থাকলেও ডেকোরেটার্সের চেয়ার, বাসন সব আছে। কে জানে ভিজছে কীনা! কিন্তু সাহস পাচ্ছে না মিতুল বাইরে গিয়ে দেখার!দাদু কী আর এখন মিতুলের দাদু আছে! মৃত্যুর পর মানুষের সাথে মানুষের কোনো সম্পর্ক থাকে না।
আত্মা নাকী কিছুতেই প্ৰিয় মানুষদের ছেড়ে যেতে চায় না।ভাবনাটার সাথে সাথে মিতুলের বুক ধড়ফড় করে উঠলো । হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দাদু ভূত! মানতে পারছে না মিতুল। অনেক্ষন স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে।
দাদু টাইপিং…….
একই লেখা। এক জিনিস অনেক্ষন দেখতে থাকলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে সেটাই হচ্ছে মিতুলের।
মোবাইলটা শক্ত করে হাতে ধরে নিয়ে লিখল—
“দাদু? কিছু বলবে?”কোনো উত্তর নেই।শুধু—
টাইপিং…
মনে হচ্ছে খুব চেষ্টা করছে।কিছু বলতে চাইছে।
কিন্তু পারছে না।ঠিক যেমনটা শেষের দিকে হয়েছিল।
সেরিব্রালের পর দাদু কথা বলার চেষ্টা করত খুব। অনেক কিছু বলতে চাইতো —
ঠোঁট কাঁপত, কিন্তু যে শব্দ বেরোত তাতে শুধুই শব্দ কোনো কথা নেই।
শুধু অস্পষ্ট গোঁ গোঁ…চোখদুটো দিয়ে যেন অনেক কিছু বোঝাতে চাইত। আজ এই টাইপিং দেখে
হুবহু সেই অনুভূতিটা ফিরে এল।সেই সময় দাদুর পাশে বসার সময় ছিল না মিতুলের ! অথচ মিতুলের দাদুর দিকে তাকানোর সময়ই ছিল না।
মিতুলের গলা বুজে এল কান্নায়। সত্যি মানুষ থাকতে তার মর্ম বোঝা যায়না! না আর এড়িয়ে যাবে না মিতুল।তাড়াতাড়ি লিখতে শুরু করল—
“দাদু, কী হয়েছে?”
“আমাকে বলো।”
“তুমি কিছু বলতে চাইছো?”
স্ক্রিনে এখনও—
টাইপিং… টাইপিং… টাইপিং…একটা শব্দও লেখে নি এখনো।মিতুলের চোখে জল এসে গেল।
মনে হচ্ছে দাদুও কষ্ট পাচ্ছে।শেষের দিকে আঙ্গুল গুলো কেমন বেঁকে গেছিলো। ওটা দিয়ে টাইপ করতে কষ্ট হচ্ছে কী! হয়তো অনেক কিছু বলতে চাইছে।
অথচ কিছুই বলতে পারছে না।
মিতুল আবার লিখলো –
“দাদু, তুমি কি ভালো নেই?”
টাইপিং থামল না।মনে হচ্ছে যেন একটু তাড়াহুড়ো আরও বেড়ে গেল।মিতুলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে ।ও আবার লিখল—
“কোথায় তুমি?”
“তুমি কি ঘরেই আছো?”
হঠাৎ টাইপিং থেমে গেল।পুরো স্ক্রিন নিঃশব্দ।
মিতুলের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল প্রায়।তারপর আবার—টাইপিং…
এইবার যেন লেখাটায় আরও অস্থির ভাব ফুটে উঠেছে।মিতুলের মাথায় একটা কথা বারবার ঘুরছে—
দাদু কিছু একটা বলতে চাইছে। টাইপিং লেখাটা যতবার চোখে আসছে দাদুর এই খাটটায় বসে থাকা চেহারাটা মনে পড়ছে। কত কী যে বোঝাতে চাইতো!
তখন যদি একটু কান পেতে শুনতো!
গলায় হাত দিয়ে বারবার কিছু বলতো! গলায় ব্যথা করতো বোধহয়! বারবার দাদুর মুখটা মনে পড়ছে! গলায় কী হয়েছিল কে জানে! হঠাৎ মনে পড়লো মিতুলের — সীতাহার। ভারী অদ্ভুত নাম! সীতাহার।
আজ সারাদিন সবার মুখে শুনে শুনে ক্লান্ত মিতুল। ওটা ঘিরে কখনো ঝগড়া কখনো হাসাহাসি।ছোট পিসি তো বলেই দিলো ওটা বাবার প্রেমিকার।সেই শুনে সবার কী হাসি।
আচ্ছা দাদু বারবার গলায় হাত দিয়ে কী ওটাই দেখাতো! একটু ভেবেই লিখলো মিতুল –
“দাদু… তোমার সীতাহার নিয়ে কিছু বলবে?”
সাথে সাথে টাইপিং থেমে গেল।পুরোপুরি।
স্ক্রিন নিস্তব্ধ।কোনো ডট নেই।কোনো নড়াচড়া নেই।
মিতুলের বুকের ভেতরটা ধক ধক করছে ।
হাতের তালু ভিজে গেছে ঘামে।
এর মানে কী?এটাই কি সেই কথা?যেটা গলায় হাত বলতে চাইছিল?
ও আবার লিখল—
“দাদু?”কোনো উত্তর নেই।ঠিক তখনই—
ঘরের ভেতর খুব হালকা একটা শব্দ হল।কিছু একটা খোলার!মিতুল ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
দাদুর আলমারিটার দিক থেকে শব্দটা এল।তাড়াতাড়ি কাছে গেল মিতুল।
দরজাটা বন্ধ ছিল তো!এখন তাতে এক চিলতে ফাঁক।
মিতুলের গলা শুকিয়ে গেল।চোখ সরাতে পারছে না।
মোবাইলটাও হাতে হঠাৎ হালকা কাঁপল।
স্ক্রিনে আবার—দাদু টাইপিং…কিন্তু এবারও—কিছুই লেখা আসছে না।শুধু সেই অদৃশ্য চেষ্টা।
মিতুল ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।পা দুটো কাঁপছে।
এক পা,দুই পা করে আলমারির সামনে।
মনে হচ্ছে কেউ ভেতর থেকে অপেক্ষা করছে।
কিছু দেখাতে চাইছে।হাত বাড়িয়ে দরজাটা ছুঁতেই—
ভেতর থেকে ঠান্ডা হাওয়া যেন গায়ে এসে লাগলো।এটা যেকোনো পুরোনো বদ্ধ জায়গা খুললেই থাকে। কিন্তু এটাই মিতুলের অন্যরকম লাগছে। গা শিরশির করছে
আর ঠিক তখনই—মোবাইলের স্ক্রিনে টাইপিংটা আচমকা বন্ধ হয়ে গেল।
পুরো নিস্তব্ধ।মিতুল ধীরে ধীরে আলমারির দরজাটা আরও একটু খুললো। দ্বিতীয় তাকে কিছু একটা চিকচিক করছে।
কাপড়ের ভাঁজে হাত ঢোকাতেইআঙুলে ঠেকল ঠান্ডা, শক্ত কিছু।এক টানে সেটা বের করে আনল মিতুল ।
লম্বা ভারী একটা হার ।
মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাসটাই যেন বন্ধ হয়ে গেল মিতুলের।চোখ বড় বড় হয়ে তাকিয়ে রইল।বিড়বিড় করলো মিতুল – এটা সীতাহার! এখানেই ছিল!
এই জায়গাটায় তো সেজো পিসি, বম্মা, ছোট পিসি —সবাই খুঁজেছে।আলমারি প্রায় ওলটপালট করে ফেলেছিল।তবু কেউ পায়নি।কীভাবে সম্ভব?
মিতুলের হাতের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছে হারটা।
ভারী… কিন্তু অদ্ভুত ঠান্ডা।আলোটা একটু সরিয়ে ধরতেই ঝিলিক খেল সোনায়।
নকশাটা এত সূক্ষ্ম, এত নিখুঁত—মিতুল এর আগে কখনও এমন দেখেনি।মাঝখানে ছোট ছোট ফুলের কাজ, তার ফাঁকে লাল-সবুজ পাথর বসানো…
যেন পুরনো দিনের কোনো গল্প গায়ে মেখে আছে।
একবার মনে হলো—এটা শুধু গয়না নয়।
কিছু একটা ধরে রেখেছে।
মিতুল অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে।
মনে হচ্ছে হারটার ভেতরেই যেন কারও নিঃশ্বাস আটকে আছে।হঠাৎ হাতের মোবাইলটা আবার কাঁপল।স্ক্রিনে আবার ভেসে উঠল—
দাদু টাইপিং…
চলবে।
