#সীতাহার
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
#সপ্তম_পর্ব
কলমে অনিন্দিতা
” কি রে খুব বলছিলি কালিয়াগঞ্জে আসাটা বেকার হলো ! দেখলি তো একটা সুরাহা হলো ! লোকটার বাড়ি মাঝামাঝি একটা জায়গায় কালিয়াগঞ্জ আর রায়পুরের ! কাজটা মিটিয়ে গেলে কাল আর আসতে হবে না !” – অর্ণব হাঁটতে হাটতেই পিঙ্কিকে বললো। মিতুল পেট ভরে ভাত খেয়ে এখন ঝিমোচ্ছে !দাদুর ওই নরম খাটটা বড্ডো ডাকছে ! চোখ দুটো বুজে আসছে ! ওরা যে কি বলছে ওরাই জানে ! আসলে সবটাই ওদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলো মিতুল। ডিমের ঝোল উফ অপূর্ব।
দাদুর প্রেসক্রিপশনের ঠিকানায় কালিয়াগঞ্জ কথাটা দেখে অর্ণব আর পিঙ্কি ঠিক করে নিয়েছিল আগে কালিয়াগঞ্জে নামবে ! তাই তো মালদা টাউন থেকে সোজা কালিয়াগঞ্জ সেখান থেকে রায়গঞ্জ যাবে !আসলে এই সুবীরকে কোথায় গেলে পাবে বুঝতে পারছিলো না ওরা । হোটেলটা রায়পুরে বুক করলো ওরা কালিয়াগঞ্জ হয়ে যাবে !
পিঙ্কি বারবার বলছিলো কালিয়াগঞ্জে আসাটা বেকার হলো ! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কোনো কিছুই বেকার নয়। বুদ্ধি করে কাজ করলে কিছুই বেকার না। একটা অটো বুক করে বীরপাড়ায় নামলো ওরা। যেমনটা বলেছিলো ওই দোকানের কর্মচারিটা।ঘড়িতে ছটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকী। মোড়ের চায়ের দোকানে ঢুকে গেল অর্ণব, -দাদা চা দেবেন তিনটে।
“আমি খাবো না “- মিতুল বলতেই চোখ টিপলো অর্ণব ।” ছোট নাকী বড়ো “” – দোকানদার জিজ্ঞেস করতেই অর্ণব বললো তিনটেই বড়ো। সাথে সিগারেট।
প্রিয়াঙ্কা! অর্ণব জিজ্ঞেস করতেই পিঙ্কি বললো হুম একটা টান না দিলে মাথা খুলবে না । পিঙ্কি কথাটা ওলেই মোবাইলে ঢুকে গেল। গুগল ম্যাপ নিয়ে এদিক ওদিক করছে। হঠাৎ কানে আসলো ” এখান থেকে
একটা রিক্সা নিন! বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবে!”
পিঙ্কি বুঝলো চা সিগারেট তো শুধুই ছুতো এই ভাবটাই দরকার! সত্যি একই বয়সী হয়েও অর্ণব অনেক বুদ্ধি রাখে। পিঙ্কি যখন গুগল ম্যাপ বের করে খুজছে অর্ণব পঞ্চাশ টাকা খরচ করে সবটা মুঠোয় করে নিয়েছে
সিগারেট টা টেনে ছাড়তে আরাম লাগছে। চা টাও আরাম দিলো চোখ দুটো বুজে আসছে পিঙ্কির। এখন খিদেটা টের পাচ্ছে ও । ভরা বিকেলে ভাত খেতে পারেনা পিঙ্কি । না করেও শোনেনি। অগত্যা ফেলতে হলো! নিয়ম মানে নিয়মই। এর বাইরে যাওয়া যাবে না।
পিঙ্কি দেখলো একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে বসে পড়েছে অর্ণব আর ওর দেখাদেখি মিতুল। সিগরেট টা অর্ধেক শেষ করেছে মাত্র ফেলেই উঠে গেল রিকশায়। রাস্তা টা মোটেই ভাল না। এবড়ো খেবড়ো রাস্তা টপকে একটা ভাঙাচোরা এক তলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো রিক্সা টা।
দরজাটা ভেতর থেকে আধখোলা ছিল।
অর্ণব হালকা ঠেলতেই কঁক করে শব্দ করে খুলে গেল।ভেতরে ঢুকতেই একটা গুমোট গন্ধ—পুরোনো ওষুধ, ধূপ আর বাসি ঘামের মিশ্রণ।মিতুলের বুকটা হালকা চেপে ধরল।এমন জায়গায় দাদু এসেছিল?কোল ইন্ডিয়ার ডেপুটি ম্যানেজার ছিলেন দাদু। দুর্গাপুরেই জীবন কেটেছে যেখান থেকে এই অন্ধকার গলি! দরজা দিয়ে ঢুকেই পাতা চৌকি তে আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে একজন বৃদ্ধ। চোখদুটো কেমন ফাঁকা, কিন্তু তীক্ষ্ণ।পাশে একটা লোক—সম্ভবত তার ছেলে।
পিঙ্কি এগিয়ে গিয়ে বলল—“আমরা একটু কথা বলতে এসেছি। এটা…”প্রেসক্রিপশনটা বাড়িয়ে দিল।দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কাগজটা হাতে নিয়েই ভদ্রলোক কে পড়ে শোনালো।বয়স্ক কুঁচকে যাওয়া চামড়া তেও রাগ স্পষ্ট বোঝা গেল।থমকে গেলেন ভদ্রলোক।
বুজে যাওয়া চোখদুটো জ্বলে উঠল।বুকটা ওঠানামা করছে। ভেতরের উত্তেজনাটা স্পষ্ট ।
“এইটা… এইটা কোথায় পেলে ?কেন এসেছো আবার! এবার আমায় মুক্তি দাও!”আমি আমার সব মিটিয়ে দিয়েছি ” — গলা কাঁপছে।রীতিমত হাঁফাচ্ছেন উনি । পরিচয় না করালেও বুঝতে অসুবিধা হলো না ইনিই সেই ভুয়ো সুবীর।
মিতুলের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“আমার দাদুর জিনিস…”
এই কথাটা শুরু করতে যাবে তার আগেই পাশ থেকে একটা মহিলা—সম্ভবত ছেলের বউ—ঝট করে এগিয়ে এল।কাগজটার দিকে একবার তাকিয়ে বলল—
“এখানে এসব কথা বলা যাবে না। আপনারা এখনই বেরিয়ে যান।উনি অসুস্থ। উত্তেজনা ওঁনার জন্য ক্ষতি!”আলো আঁধারি ঘরে এঁদের প্রত্যেক কে কেমন অশরীরী আত্মার মত লাগছে।
পিঙ্কি কড়া গলায় বলল—“আমরা এতদূর এসেছি কিছু জানতে।না জেনে যাবো না।”সেটা শুনে মহিলার মুখ শক্ত হয়ে গেল—“আমি বলছি, বেরিয়ে যান।”
ঘরের ভেতর বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
মিতুলের মনে হচ্ছিল—কিছু একটা লুকানো হচ্ছে।
অর্ণব এবার এগিয়ে এল—
“দেখুন, আমরা কোনো ঝামেলা করতে আসিনি। শুধু জানতে চাই একটা সীতাহার ওটার মালিক কে খুঁজছি ! আপনারা সাহায্য করলে আমরা দায় মুক্ত হবো ”
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।কিন্তু অর্ণব দেখলো সবার চোখ গুলোই কেমন চিকচিক করে উঠলো। টোপ টা কাজে লেগেছে। মিতুল কে ইশারা করে বললো হারটা সাবধানে রাখতে। বৃদ্ধের ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বললো —
“আসুন । ভেতরে ।”
ওই বারান্দা পেরিয়ে ওদের একটা ছোট ঘরে নিয়ে যাওয়া গেল।ঘরটা আরও অন্ধকার। একটা টেবিল, কয়েকটা পুরোনো খাতা স্তূপ করে রাখা।সুইচ টিপে একটা হলুদ আলো জ্বালালো।
তারপর লোকটা আলমারি ঘেঁটে একটা পুরোনো খাতা বের করল।পাতাগুলো হলদে, কোণাগুলো ছেঁড়া।তারপর বিরক্ত মুখে বললো -“তারিখ টা বলো।”
পিঙ্কি প্রেসক্রিপশন দেখে বলতেই লোকটা খাতা উল্টাতে লাগল।হঠাৎ একটা জায়গায় থেমে গেল।
“এইটা…”বলেই ওদের সামনে ঘুরিয়ে দিল খাতাটা।
মিতুল ঝুঁকে পড়ল।পিঙ্কি আর অর্ণবও।
হেডিংয়ে লেখা—“প্রতাপ নারায়ণ – খাতালপুর”
নিচে—
“অত্যাচারী, বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক। কমলার সঙ্গে বিয়ে। ওঁর দ্বিতীয় বউ!”কমলা নামটা দেখে মিতুলের চোখ থেমে গেল।
কমলা।আবার সেই নাম।পড়তে থাকল—
“দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা—প্রায় ২২ বছরের ছোট। শিশুসুলভ, আবদারপ্রবণ।”“একবার সীতাহার চেয়েছিল।”মিতুলের বুক ধড়াস করে উঠল।
পরের লাইনটা যেন চোখে বিঁধল—“আবদার বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়—
সুরায় আসক্ত প্রতাপ নারায়ণ রাগের মাথায় গলা টিপে হত্যা করে।”মিতুলের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু এঁরা কারা! কে এই প্রতাপ নারায়ণ !
নিচে লেখা—“এরপর প্রতাপ নারায়ণও বেশিদিন বাঁচেনি।”আরও নিচে—
“প্রতিকার:”
“২৫ বছরের নিচে কোনো মেয়েকে একটি হার দান করলে পূর্বজন্মের পাপ থেকে মুক্তি।”
সবচেয়ে নিচে একটা নাম—“তরণী বসু”
ঠিকানা—১১২, ঠাকুর কলোনি, রায়গঞ্জ (রানী ভিলা)
মিতুল স্থির।মাথার ভেতর ঝড় বইছে।
তরণী বসু—এটা তো দাদুর নাম।মিতুলের দাদু।
মানে…দাদু এখানে এসেছিল।নিজের পূর্বজন্ম জানতে?কিন্তু এটা কার ঠিকানা!
কিন্তু পূর্বজন্মই বা কেন?মিতুলের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
মনে হচ্ছে—সব জোড়া লাগছে, আবার কিছুই লাগছে না।কমলা…পূর্বজন্মের স্ত্রী…তাহলে রানী?
তাহলে কি—রাণীই কী কমলা? ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট লাগছে।দম বন্ধ হয়ে আসছে।মিতুল ধীরে বলল—
“আমি… একটু বাইরে যাই…”
বাইরে এসে হাঁফ ছাড়ল।অর্ণব ওই খাতার সামনে পিছনের ছবি তুলে বেরিয়ে এলো। পিছন পিছন পিঙ্কি ও।রাস্তায় বেরিয়ে তিনজনেই চুপ।শুধু হাঁটার শব্দ হচ্ছে ।অর্ণব বলল—
“আজ রায়গঞ্জে হোটেলে ফিরি। কাল সকালে প্ল্যান করে এগোবো।”পিঙ্কি ধীরে বলল—
“পরের গন্তব্য আমরা জানি।”
মিতুল আস্তে বলল—“১১২… ঠাকুর কলোনি…”
হাওয়া বইছে।দূরে কুকুর ডাকছে।মিতুলের গলা খুব আস্তে কাঁপল—“রানী ভিলা…”
কাল সকাল।সত্যিটা আর লুকিয়ে থাকবে না।
অর্ণব কিছু বলছে না ও শুধুই শুনছে।হয়তো আরও কিছু প্ল্যান চলছে
চলবে।
