#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২১
শুভ্রর মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনার পর থেকে গল্প যেনো হাওয়ায় উড়ছে। চারপাশটা তার কাছে কেমন জানি ফুলেল লাগতে শুরু করছে। গল্পর এমন উড়ুউড়ু ভাব দেখে তুশি তাকে তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে বলল,
‘কিরে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে তো মুখটা এমন করে রেখেছিলি যেনো; মনে হচ্ছিল তর মাথায় আমি বন্ধুক টেকিয়ে তারপর নিয়ে যাচ্ছি। আর এখন রেস্টুরেন্টে থেকে ফিরে এতো খুশি যে মনে হচ্ছে –কেউ তোকে একটা বিশাল রাজ্য তর নামে করে দিয়েছে।’
গল্প বিছানায় চার হাত-পা মেলে দিয়ে উদাসী গলায় বলল,
‘তার থেকেও বেশি কিছু রে।’
তুশিও গল্পর পাশে শুলো। তার দিকে কাত হয়ে বলল,
‘তাই? তো শুনি সেটা কি?’
‘বলব না সিক্রেট।’
তুশি এবার গল্পর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল। তাকে বলবে না মানে? আজ পর্যন্ত এমন কিছু নেই যেটা গল্প তুশিকে বলেনি। এটাও বলবে তুশি নিশ্চিত। তবে এবার তার চোখ গেলো গল্পর ঠোঁটের দিকে। তুশির স্পষ্ট মনে আছে বের হওয়ার আগে সে তার ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে দিয়েছিল, আর এখন সেটা গায়েব! গল্পকে একটু খুঁচানোর ভালো একটা ওয়ে পেয়ে তুশি কুটিল হাসল।
‘ওকে বলিস না। কিন্তু এক সেকেন্ড; তর ঠোঁটের লিপস্টিক কোথায় রে? তর তো রেকর্ড আছে খাবারের সাথে কখনোই লিপস্টিক ভ্যানিশ করিস না। তবে?’
কথাটা বলেই তুশি ভ্রু নাচালো। গল্পর হাত ততক্ষণাৎ আপনা-আপনি ঠোঁটে চলে গেলো। বোকা বোকা হাসি দিয়ে বললো,
‘এবার ভুল করে খেয়ে ফেলেছি রে। একদমই খেয়াল ছিলো না।’
তুশি অনেক কষ্টে তার হাসি চেপে রাখল। বলল,
‘ও তুই খেয়ে ফেলেছিস? আমি ভাবলাম অন্য কেউ খেয়ে ফেলেছে।’
গল্প চোখ বড় বড় করে তুশির দিকে তাকাতেই তুশি হো হো করে হেসে ফেললো। তুশির ওই হাসিতে গল্পর মেজাজ হারালো। পাশ থেকে একটা কুশন নিয়ে তুশিকে মারতে মারতে বলল,
‘ফাজিল মেয়ে। তুই এতো অসভ্য! দাঁড়া বলছি দাঁড়া।’
তুশি গল্পকে ক্ষেপাতে পেরে বেজায় আনন্দ পেলো। গল্প হাত থেকে বাঁচতে সারা ঘরময় ছুটতে লাগলো আর তার পিছু পিছু গল্পও ছুটতে লাগলো।
__________________________
শাওন দেশে এসেছে আজ নিয়ে তিনদিন হলো। ছোট ছেলের আগমনে জাহানারার হাসি যেনো মুখ থেকে সরছেই না; এতোদিন পর ছেলে দেশে ফিরেছে মা তো খুশি হবেই। তাছাড়া শাওন ভীষণ চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে এসে থেকে বাড়িটা একাই মাতিয়ে রাখেছে। তবে শাহিনুজ্জামান তার কনিষ্ঠ পুত্রের প্রতি বেশ রুষ্ট। তার রুষ্ট হওয়ার মূল কারন হলো শাওনের হেয়ার স্টাইল। বেয়ারা ছেলেটা ঘাড় অব্ধি চুল রেখেছে আর তারচেয়েও বড় কথা –শাওন তার চুল গুলোকে কালার করিয়েছে তাও আবার লাল তবে তা পুরোপুরি লাল না কি যেনো একটা কালার! এয়ারপোর্টে যখন তার আদরের পুত্রেকে এমন বাদুড়ের হালে দেখেন তখনই তার মেজাজ তুঙ্গে উঠে। সেজন্য ছেলেকে তিনি এয়ারপোর্টে কিছু না বললেও বাড়িতে এসে ইচ্ছে মতো তুলোধুনো করেছেন। জাহানারা কোনোমতে স্বামীকে থামিয়ে ছিলেন। এই বয়সে ছেলেমেয়েরা ওমন একটু বেয়ারা কাজ-কর্ম করেই থাকে, তাতে দোষের কিছু নেই বুঝিয়ে বললেই হয়। শুভ্রও বাবাকে বুঝাতে চেয়েছে কিন্তু শাহিনুজ্জামান যখনই শাওনের ওমন আগুন চুল দেখছে তখনই রাগে তার চোখ খিঁচে আসছে।
এইযে বর্তমানে তিনি কি খোশমেজাজ নিয়েই না নিচে নামলেন সকলের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবেন বলে; কিন্তু টেবিলে তার ছোট পুত্রের ওমন বাবরি চুলের বাহার দেখে তার মেজাজ তুঙ্গে উঠলো নিমিষেই। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি রাগ সংবরণ করলেন। শুভ্র কিছুক্ষণ আগেই ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছে তার আবার আজকে ভার্সিটিতে ক্লাস আছে। শাহিনুজ্জামান খেতে খেতে কথা পারলেন,
‘এসে থেকে তো নিজের মন মর্জি মতোই চলছো। সারাদিন শুধু বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডায় মশগুল থাকার জন্য নিশ্চয়ই তোমাকে আমি বিদেশে কারি কারি টাকা খরচ করে পড়াশোনা করতে পাঠাইনি! কাজের কাজও কিছু করো। আজই আমার সাথে অফিসে বসবে; খেয়ে রেডি হয়ে এসো।’
জাহানারা একটু নরম স্বরে বললো,
‘ছেলেটা তো সবে এসেছে আর দুটো দিন যাক; তারপর নাহয় অফিসে যাবে। তাছাড়া আজ গল্পও আসবে আমি গাড়ি পাঠিয়েছি।’
শাহিনুজ্জামান গল্পর কথা শুনে একটু নরম হলেন। তবে জাহানারার ওমন বাদুড় ছেলের পক্ষে বলা আহ্লাদ টুকু তার সহ্য হলো না,
‘ছেলেকে আর লাই দিয়ো না জাহান। তোমার অত্যাধিক লাইয়ে আদরের ছেলে কেমন লাল বাদুড় হয়ে দেশে ফিরেছে তার নমুনা তো সামনেই দেখতে পারছো। এর বেশি লাই দিলে দেখবে লাল বাদুড় থেকে লাল মহিষ হয়ে মানুষকে গুতাবে।’
শাওনের গলায় খাবার আঁটকে গেলো বাবার ওমন কথায়। কি আশ্চর্য! সে কি একাই এমন হেয়ার করেছে যে এই লোক তাকে এসে থেকে শুধু খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথাই শুনাচ্ছে। এবার সে একটু প্রতিবাদী হয়ে বলল,
‘শুনো বাবা, হেয়ার কালার করাটা এখনকার সময়ে খুবই নরমাল একটা বিষয়। তুমি এটা এ্যভনরমাল কেনো করছো সেটাই আমার বুঝে আসছে না।’
শাহিনুজ্জামান ছেলেকে ধমকে বলেন,
‘রাখো তোমার নরমাল-এ্যভনরমাল! নিজেকে আয়নায় দেখেছো ভালো করে? লাগে তো একদম লাল ঝুঁটি ওয়ালা মোরগের মতো। তারপর আবার কাঁধ অব্ধি চুল! শুনো অফিসে জয়েন হওয়ার আগে চুল ছোট করবে এই বলে দিলাম।’
তীক্ষ্ণ মেজাজে কথাগুলো বলেই শাহিনুজ্জামান চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। শাওন হতবিহ্বল হয়ে বাবার কথা গুলো শুনে গেলো। কানাডায় ভার্সিটিতে পড়াকালীন মেয়েগুলো তার চুলের উপর একপ্রকার ফিদা ছিলো। আর তার বাবা কিনা বলছে –তাকে লাল ঝুঁটি ওয়ালা মোরগের মতো লাগছে? সিরিয়াসলি? শাওন এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তুমি এই লোকটাকে কি দেখে বিয়ে করেছিলে আম্মু? সারাক্ষণ মেজাজ তুঙ্গে তুলে ঘুরাফিরা করে। নানাভাই বেঁচে থাকলে আমি এখুনি জিজ্ঞেস করতাম কন্যা দান করার জন্য আর কোনো পাত্র ছিলো না?’
জাহানারা ছেলের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে শাসালেন,
‘ফাজিল ছেলে চুপ কর। তর এই বাদড়ামির জন্যই তুই এতো বকা খাস বাবার কাছে।’
‘সে যাইহোক; তুমি তোমার বরকে বলে দিও অফিসে আমি যাবো ঠিকই কিন্তু আমার হেয়ার কাটিং আমি একটুও চেইঞ্জ করতে পারব না। আমার কতো শখের চুল! আর তার কিনা বারোটা বাজানো –নো ওয়ে!’
শাওন কথা গুলো শেষ করেই শিষ বাজাতে বাজাতে উপরে উঠে গেলো। জাহানারা কি বলবেন কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে তিনি নিশ্চিত শাহিনুজ্জামান এটা নিয়ে আরও একদফা হাঙ্গামা করবেন।
_______________________
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর গল্প আর শাওন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে সাথে অবশ্য জাহানারাও আছেন। গল্প কয়েক দফায় অবাক হয়েছে এটা ভেবে যে শাওন শুভ্রর-ই ভাই। তাদের এতো ডিফারেন্ট! শুভ্র খুবই চুপচাপ আর কিছুটা গম্ভীর স্বভাবের হলেও শাওন যেনো তার পুরো বিপরীত। ছেলেটা এতো চঞ্চল আর মজার যে গল্পর অল্পক্ষণেই তার সাথে বেশ ভাব জমেছে। এর মধ্যেই শাওন এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলো,
‘অ্যাম অ্যাই রিয়েলি লুক লাইক এ্যা লাল ঝুঁটি ওয়ালা মোরগ, ভাবি? প্লিজ অনেস্টলি অ্যানসার করো সুইট ভাবি।’
শাওনের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে গল্পর চোয়াল ঝুলে পড়লো। এটা আবার কি ধরনের প্রশ্ন?
‘কিহ! লাল ঝুঁটি ওয়ালা মোরগ? এটা আবার কি? আর তোমাকে তার মতোই বা দেখতে লাগবে কেনো?’
‘কজ তোমার শ্বশুর মশাই আমাকে তাই বলেছে। কেনো জানো?’
গল্প বোকা বোকা গলায় বললো,
‘কেনো?’
শাওন তার চুলগুলো ব্রেকব্রাশ করতে করতে বলল,
‘কারন, আমি আমার হেয়ার কালার করেছি তাই। এন্ড অ্যাই নো অলসো হি ইজ জেলাস; নিজে তো করতে পারলো না তাই।’
শাওনের কথা বলার ভঙ্গিতে গল্প হো হো করে হেসে ফেললো। হাসতে হাসতেই বলল,
‘সিরিয়াসলি লাল ঝুঁটি ওয়ালা মোরগ? ইটস টু ফানি ভাই!’
শাওন মুখ গোমড়া করে বলল,
‘হেসো না তো ভাবি। উনি আমাকে রীতিমতো অপমান করেছে কিন্তু।’
গল্প হেসেই যাচ্ছে। জাহানারা এবার হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে বলল,
‘শাওন, বাবা তর বড় মামা একটু আগেই ফোন দিয়েছিল। বলল তারা নাকি ঢাকা মেডিকেলে এসেছে তর মামীকে ডাক্তার দেখাতে। চল তো বাবা যাই দেখে আসি।’
শাওন মাকে অস্থির হতে দেখে কোনোমতে বলল,
‘আচ্ছা যাবো রিল্যাক্স। কিন্তু ভাবি?’
জাহানারা এবার গল্পর দিকে খেয়াল আসতেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললো,
‘মা রাগ করো না তোমাকে একা রেখে যাচ্ছি বলে। শুভ্র কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। তুমি ততক্ষণ থাকো ও এসে তোমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিবে কেমন!’
গল্প মৃদু হেসে বলল,
‘ওহো মা চিন্তা করবেন না একদম। আপনারা রিল্যাক্সে যান।’
_________________________
জাহানারা-রা বের হওয়ার আধঘন্টা পরেই শুভ্র আসে। গল্প তখন বাগানে ঘুরাফিরা করছিল। কিছুক্ষণ বাদে বাগান থেকে আসতেই শেফালী (সারভেন্ট) চটজলদি বলল,
‘ভাবি ভাইজান বাসাত আইছে।’
গল্পর মনটা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। শুভ্রকে বেশ সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। বলল,
‘কখন এসেছে শেফালী? আর কিছু বলেছে?’
‘হগলেই আইছে আর কইসে এক মগ কফি দিয়া আইতে। আমি এখুনি বানাইয়া দিতাছি।’
গল্প মাথা নেড়ে বলল,
‘তুমি অন্য কাজে যাও। কফিটা আমিই বানিয়ে নিচ্ছি কেমন।’
‘কিন্তু ভাবী বড়আম্মা যদি জানে আপনি কামে হাত দিসেন তয় আমারে বকবো।’
গল্প আশ্বাস দিয়ে বলল,
‘কেউ কিছু বলবে না শেফালী। তুমি যাও আমি সামলে নিবো। আর কাজ না থাকলে গিয়ে বিশ্রাম করো কেমন।’
শেফালী মাথা নেড়ে হাতে থাকা ডিটারজেন্টের বৈয়ম টা বেখায়লে শেল্ফে রেখে দুধ, চিনি কোথায় আছে দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলো। একটু আগেই সে একগাদা কাপড় ধুয়েছে যদিও তা ওয়াশিংমেশিনে কিন্তু এখন সেগুলো ছাদে শুকাতে দিতে হবে।
গল্প মন মতো এক কাপ কফি বানিয়ে শুভ্রর ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। গল্প ঘরে ডুকার আগে একবার উঁকি দিতেই দেখে শুভ্র এখনো বাহিরের জামা- কাপড় ছাড়েনি কপালে এবং চোখের উপর আড়াআড়ি ভাবে হাত দিয়ে বলিশে হেলান দিয়ে আধশুয়া অবস্থায় আছে।
‘উহুম উহুম…. আসবো জনাব?’
অতি পরিচিত মিহি কন্ঠস্বরের আওয়াজ শুভ্রর কানে যেতেই সে শুয়া থেকে তড়াক করে উঠে বসলো। সামনে থাকাতেই গল্পকে দেখে যেনো বিস্ময়ের মাত্রা ছাড়াল। গল্প শুভ্রকে ওমন ফ্যলফ্যল করে চেয়ে থাকতে দেখে মনে মনে হাসলো একচোট। শুভ্রকে চমকাতে পেরে সে মহাখুশি। কফির মগটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘কি, এভাবে চেয়ে আছেন কেনো? খুশি হন নি নাকি? আচ্ছা এই নিন আপনার কফি আমি বরং যাই।’
গল্প শুভ্রর হাতে কফির মগটা ধরিয়ে দিয়ে পিছনে ঘুরতেই শুভ্র তাকে পিছন থেকেই জড়িয়ে ধরলো। তার থুতনি ঠেকলো গল্প উন্মুক্ত কাঁধে। জড়িয়ে ধরা অবস্থায়ই কফির মগে এক চুমুক দিলো। বলল,
‘উমম… কফিটা তো দুর্দান্ত হয়েছে কিছু মিশিয়েছ নাকি?’
‘সবাই যেভাবে কফি বানায় আমিও তাই করেছি। স্পেশাল কিছু নেই।’
শুভ্র আবারও বিরোধিতা করে বলল,
‘উহু… কিছু তো একটা স্পেশাল আছেই। স্বাদটা তো আর এমনই বাড়লো না।’
‘তাই? তা কি স্পেশাল শুনি।’
শুভ্র একটু ভাবুক হয়ে বলল,
‘উমম… মেইবি ভালোবাসা-টালোবাসা হবে। ওটাই স্পেশাল তাই না!’
গল্প লাজুক হাসলো শুভ্রর অগোচরে। শুভ্র এবার গল্পকে ছেড়ে দাঁড়াল। হাতের কফির মগটা ড্রেসিংটেবিলের সামনেই রাখল। শুভ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই গলার টা-ই টা খুলছে। গল্প এবার পুরো মনোযোগ দিয়ে শুভ্রকে পরোখ করল। এই ক্লান্ত এলোমেলো চুলেও শুভ্রকে তার কাছে অত্যন্ত সুদর্শন ঠেকলো। গল্প মনে মনে বলল— ইশ শুভ্র আপনি এতো কিউট কেনো? হুয়াই?
তার বধূ মনে হঠাৎই একটু হিংসুটের ভাব এলো বলল,
‘আপনি এভাবে মাঞ্জা দিয়ে ভার্সিটিতে ক্লাস নিতে যান? এজন্যই তো মেয়েরা আপনাকে চোখ দিয়ে গিলে খায়।’
শুভ্র ভ্রু কুচকে বললো,
‘হোয়াট? মাঞ্জা? এসব কোন ধরনের ওয়ার্ড ইউজ করো তুমি তাহিয়াত!’
গল্প পাল্লা দিয়ে বললো,
‘ওও এখনই আমার ভাষা আপনার পছন্দ হচ্ছে না? দুদিন পর তো বলবেন আমাকেই আপনার পছন্দ নয়।’
শুভ্র বিপাকে পরল বলল,
‘কি মুশকিল! আমি আবার তা কখন বললাম?’
গল্প এবার হাহাকার করে উঠলো,
‘কি এখন আমি আপনার কাছে মুশকিল? হায় আল্লাহ এ আমি কার পাল্লায় পড়লাম? দুদিন যেতে না যেতেই বউকে কিনা বলছে মুশকিল!’
শুভ্র হকচকিয়ে উঠলো। গল্প তো তার সব কথারই উল্টো মিনিং বের করছে। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,
‘ধুরর…!’
শুভ্র পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই গল্প চেতে উঠে বলল,
‘কিহ! ধুররর? ঠিকাছে দূরেই যাচ্ছি। সরুন…’
গল্প ঘুরতেই শুভ্র সুকৌশলে তাকে একদম কাছে টেনে আনে। কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে চুমু দেয় আবেশে। হাস্কি গলায় বলল,
‘আমাকে ট্র্যাপে ফেলা হচ্ছে? বরকে জ্বালানো হচ্ছে বুঝি?’
গল্প হাসি চেপে বললো,
‘ছাড়ুন আমি নিচে যাবো।’
শুভ্র আরেকটু শক্ত করে গল্পর কমোর জড়িয়ে ধরলো। অতঃপর গল্পর তুলতুলে গালে চুমু খেয়ে বলল,
‘উহুম…ছাড়ব না। আমার বউ আমার যতক্ষণ ইচ্ছে ধরে রাখবো।’
শুভ্র কিছু সময় গল্পকে এভাবেই জড়িয়ে রাখল। গল্পও কোনো গাইগুই করল না চুপটি করে বরের বুকে মাথা দিয়ে পড়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর গল্প ছাড়া পেতেই হায়হায় করে উঠলো,
‘কফিটা তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে শুভ্র। আপনি তো খান নি। আচ্ছা আমি আবার বানিয়ে আনছি।’
শুভ্র গল্প কে আঁটকে দিলো। বলল,
‘কোনো প্রয়োজন নেই। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে নিজেই কফি বানাবো। ততক্ষণ তুমি এখানেই থাকো; একদম বের হবে না কিন্তু!’
শুভ্র ওয়াশরুমে ডুকতেই গল্প তার ঘরের বারান্দায় গেলো। বারান্দায় তখন শেষ বিকেলের আধো আধো রোদ ঝলকাচ্ছিল। বারান্দার আধ রেলিঙে জড়িয়ে আছে একটা টুকটুকে বাগানবিলাস। ইশশ কি সুন্দর লাগছে এতে করে। পাশে আবার বেতের দুটো চেয়ারও আছে। এই সবগুলো মিলেমিশে পুরো বারান্দাটা এতো আদর আদর লাগলো গল্পর কাছে যে সে মুহুর্তের মধ্যেই মনে মনে একটা কল্পনা করে বসলো। তাদের বিয়ের পর সে আর শুভ্র সারাদিনের কাজকর্মের পর এই বাগানবিলাসে আবৃত আদর আদর বারান্দাটায় বসে তাদের –সারাদিনের জমানো কথাবার্তা সারবে দু কাপ ধোঁয়া উঠা গরম চায়ের কাপের সাথে। নরম জোস্না রাতে কোমল চাঁদের আলো আর সঙ্গে শুভ্র আর কি চাই!!
‘কি ব্যাপার গিন্নি? এখানে দাঁড়িয়ে বুঝি আমাদের ভবিষ্যত সংসার নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে?’
শুভ্রর গলার আওয়াজে গল্পর ধ্যন ভাঙলো। পিছন ঘুরতে দেখে শুভ্র একটা টাউজার পড়ে খালি গায়ে গলায় আবার সাদা একটা তোয়ালে ঝুলানো তার দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। উফফ গল্প আবারও ঘায়েল হলো শুভ্রর উপর।
‘আপনার বারান্দাটা অনেক সুন্দর। আর বাগানবিলাস তো আমার অনেক প্রিয়।’
শুভ্র একটু এগিয়ে গল্পকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। বলল,
‘তাই? তবে তো ভালোই হলো। রোজ কাজ শেষে রাতের বেলায় এই বাগানবিলাসের ছায়ায় বসে নাহয় দুজন মিলে সারাদিনের আলাপ সারব। তোমার প্রিয় বাগানবিলাস আর আমার প্রিয় তুমি সঙ্গে দুকাপ চা। ব্যাস হয়ে গেলো।’
গল্প মুগ্ধ হয়ে শুনলো তার আর শুভ্রর চিন্তা গুলোর কতো মিল। তার খুব বলতে ইচ্ছে হলো –”শুনন শুধু বাগানবিলাস না আপনিও আমার প্রিয়। ভীষণ ভীষণই প্রিয়।” কিন্তু বলল না কিছুই। শুধু শুনে গেলো।
শুভ্র এবার তাড়া দিয়ে বলল,
‘আচ্ছা গিন্নি এসব প্ল্যানিং পরে। এখন চলুন নিচে যাই; মনে আছে তো আমি কফি বানাবো। চলুন চলুন।’
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২২
গল্প সোফায় বসে টিভি দেখছে। তাকে শুভ্র একপ্রকার জোর করেই এখানে বসিয়ে কিচেনে ডুকেছে কফি বানাতে। এবং গল্পকে বলে গেছে একদম কিচেনের কাছে না ঘেঁষতে এখন; কেননা একটু আগেই সে একটা ছোটো-মটো অঘটন ঘটিয়েছে আর তা হলো –বেখায়ালে কিচেনে রাখা বটিতে পা দিতে গিয়েছিল। যদিও শুভ্র তৎক্ষনাৎ দেখে ফেলায় ব্যাথা পায়নি তবুও শুভ্র বেশ মেজাজ দেখিয়েছে গল্পর এতো অসাবধানতার জন্য।
শুভ্র কফি করা শেষে যখন অল্প একটু চিনি দিয়ে নাড়লো তখন লক্ষ্য করে কফিটার উপর কেমন জানি সাবানের ফেনার বুদবুদের মতো হচ্ছে। কি আশ্চর্য সে তো এমন কফি আর বানায় নি এর আগেও সে বহুবার কফি বানিয়েছে –কিন্তু এরকম আশ্চর্য তো হয়নি। সে বেশিকিছু তলিয়ে ভাবলো না। কাপ দুটো নিয়ে গল্পর কাছে গিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘তাহিয়াত দেখো তো কফিটা এমন দেখাচ্ছে কেনো?’
শুভ্র যখন এভাবে ঠোঁট উল্টিয়ে কথা বলে গল্প তখন ঘায়েল হয়ে যায় –ইশশ এতো কিউট কেনো তার বর টা! শুভ্র আবারও তাড়া দিতেই গল্প তার থেকে একটা কাপ নিয়ে দেখে; আসলেই কেমন জানি কফিটা। আরেকটু কাছে নিয়ে নাক বরাবর শুকলো, এবং তৎক্ষনাৎ হায় হায় করে উঠলো,
‘আপনি কফিতে ডিটারজেন্ট মিশিয়েছেন!’
শুভ্র বিস্মিত হলো। বলল,
‘কিহ! ডিটারজেন্ট? কিচেনে ডিটারজেন্ট আসবে কোথ থেকে?’
গল্পর তৎক্ষনাৎ মনে পড়লো শেফালী তখন ভুলে ডিটারজেন্ট এর বৈয়ম টা কিচেনে রেখে গেছিলো।
‘ওহো এটা তো শেফালী বোধ হয় ভুলে রেখে গেছিলো। কিন্তু আপনি চিনি আর ডিটারজেন্টের পার্থক্য বুঝলেন না! শেষে কিনা ডিটারজেন্ট দিয়ে কফি বানালেন!’
কথাটা বলেই গল্প হেসে গড়িয়ে পড়লো। শুভ্র তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো সেদিকে। তখনই শেফালী আসলো এদিকে শুভ্রর মেজাজ বিগড়াল,
‘এইযে ম্যাডাম এদিকে আসুন।’
শেফালী প্রথমে ভরকে গেল শুভ্রর এমন গম্ভীর ডাকে তবে কাছে এগিয়ে বলল,
‘কিছু কইবেন ভাইজান?’
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘নাহ! তোকে কিছু বলে লাভ আছে? প্রতিদিন একটা না একটা আকাম করিস।’
শেফালী ইনোসেন্ট ফেস করে বলল,
‘আজকে তো কিছু করি নাই ভাইজান!’
‘তাই তাহলে ডিটারজেন্ট টা কিচেনে কেনো রেখেছিলি তাও আবার চিনির বৈয়ামের পাশে। আবার বটি টাও জায়গা মতো রাখিস নি কেনো? আবার বলছিস কিছু করিস নি!’
শেফালী দাঁত দিয়ে জ্বিব কাটলো। নরম স্বরে বলল,
‘ছরি ভাইজান। আর এমন হইবো না।’
‘ওটা ছরি না সরি হবে; কতোবার বলেছি। আচ্ছা এখন যা এখান থেকে।’
গল্প তখনও মুখ চেপে হেসেই যাচ্ছে। শুভ্র বেজায় গলায় বলল,
‘এবার একটু থামুন। আমি ইচ্ছে করে করেনি ওটা।’
গল্প কোনোমতে হাসি চেপে বলল,
‘আমার সারা জীবন মনে থাকবে শুভ্র আপনার বানানো প্রথম কফি যেটা আমার জন্য বানিয়েছেন সেটা ছিলো একদম খাস কফি। খাস তো হবেই তাই না, ডিটারজেন্ট দিয়ে যে বানানো।’
বলেই গল্প আবারও হাসলো একচোট। শুভ্র হতাশ চোখে তাকাল তার দিকে।
গাড়িতে উঠেও গল্প ওই কফিকে কেন্দ্র করে হেসেই যাচ্ছে। যদিও শুভ্র তাকে এই মাত্র একটা ক্যাফে থেকে স্পেশাল একটা কফি খাইয়ে এনেছে তারপরও এই মেয়ে তার বানানো আশ্চর্য কফি নিয়েই পড়ে আছে। গল্প এবার খুশি খুশি গলায় বললো,
‘শুনন শুভ্র, আমি কিন্তু এই স্পেশাল কফির কথা আমাদের নাতি-নাতনীদের কাছেও বলবো। তখন দেখবেন ওরা কেমন হাসে।’
শুভ্রর ঠোঁটে এবার দুষ্ট হাসি খেলে গেলো। বলল,
‘তাই নাতি-নাতনীদেরও বলবেন! ছেলে-মেয়েদের বলবে না?’
গল্প বেখেয়ালে বলে,
‘হ্যাঁ অবশ্যই বল….’
এটুকু বলেই গল্প থেমে যায়। শুভ্রর দিকে তাকাতেই দেখে ও তার দিকে চেয়ে কেমন দুষ্ট হাসছে। বুঝে গেলো ভুল জায়গায় বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে। শুভ্র আবারও টিপ্পনী কেটে বলল,
‘তাই? আমার ছেলে-মেয়ের মা হওয়ার এতো তাড়া তোমার –যে একেবারে নাতিনাতনি অব্ধি চলে গেলে।’
গল্পর গাল গুলো লজ্জায় গরম হয়ে যায় কান দিয়ে মনে হচ্ছে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ততক্ষণে তাদের গাড়িটাও গল্পর হোস্টেলের সামনে এসে থামে। গল্প তাড়াহুড়ো করে সিট বেল্ট খুলতে নিলে শুভ্র আটকে বলে,
‘আমি খুলে দিচ্ছি।’
‘সবসময় তো আমিই খুলি, পারব।’
শুভ্র ইনোসেন্ট ফেস করে বলল,
‘একদিন নাহয় আমিই দিলাম। দেই না; দিলে কি হয়!’
গল্প কিছু বলল না। শুভ্র সিট বেল্ট খুলার বাহানায় গল্প অনেকটা কাছাকাছি চলে গেলো। শুভ্র ঢিলেমি করছে ইচ্ছে করে গল্প এবার বলল,
‘কি হচ্ছে শুভ্র? একটা সিট বেল্ট খুলতে এতোক্ষণ লাগে?’
শুভ্র সিট বেল্ট টা খুলে গল্পর কানের লতিতে বেশ আশ্লেষে চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘এইবার কিছু হলো।’
গল্প শুভ্রর দিকে মেকি রাগ নিয়ে চাইতেই শুভ্র দূরে সরে বলল,
‘আরে বাবাহ এতো রাগছেন কেনো? সিট বেল্ট খুলে দিয়েছি তো।’
গল্প সরু চোখে চেয়ে বললো,
‘আপনি ভীষণই ধুরন্ধর শুভ্র, ভীষনই।’
বলে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। শুভ্র তখন শব্দ করে হেসে ফেললো। গল্প সেটা শুনলো সে নিজেও তখন হেসে ফেললো তবে সেটা শুভ্রর অগোচরে।
___________________________
তখন প্রায় মধ্যে দুপুর। শুভ্র নেমেঘেয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছে। জাহানারা এই অবেলায় ছেলের আগমন দেখে বেশ অবাক হলেন। হাতের কাজ ফেলে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কিরে বাবা তুই এই সময়? কোনো সমস্যা?’
শুভ্র গলার টা-ই ঢিলে করতে করতে বলল,
‘উফ…আর বলো না আম্মু; সকালে অফিসে যাওয়ার সময় ভুল করে একটা ফাইল রেখে গিয়েছিলাম –এখন আবার ওটাই দরকার। তাই নিতে এসেছি।’
জাহানারা হাসি মুখে বলল,
‘এসেছিস যখন তখন দুপুরের খাবার টা খেয়েই তারপর যা। তোকে তো ছুটির দিন ছাড়া আবার দুপুরের খাবারের টাইমে পাওয়া যায় না। আমি এখুনি ভাত ভারছি।’
শুভ্র তার মাকে আঁটকে দিলো বলল,
‘আমি অফিস থেকে লাঞ্চ করে এসেছি আম্মু। এখন কিছু খাব না।’
শুভ্র কথা গুলো বলেই উপরে উঠে গেলো। জাহানারা দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে হাঁটলেন ভাত না খাক; এতো গরম থেকে এসেছে ছেলেটা একটু ঠান্ডা সরবত তো খাবে!
মিনিট পাঁচেক পর শুভ্র নিচে নামতেই জাহানারা তার দিকে সরবতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলো। শুভ্রও আর দ্বিমত করলো না বরং মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে পুরো গ্লাসটা শেষ করলো।
জাহানারা কিছু বলবে তার আগেই শুভ্রর পকেটে থাকা তার সেলফোন টা স্বশব্দে বেজে উঠলো। শুভ্র ফোন তুলতেই তুশির নাম্বার দেখে কপাল কুঁচকে ফেলল। এই অবেলায় তুশি কেনো তাকে ফোন দিচ্ছে? তবে মনের প্রশ্ন দামিয়ে সে কল রিসিভ করলো। তৎক্ষনাৎ ওপাশ থেকে কান্না জড়ানো গলায় ভেসে আসলো ভাঙা ভাঙা কিছু কথা,
‘শুভ্র ভাইয়া, গ…গল্প…. ’
তুশির কথা থেমে যায় আর এদিকে শুভ্রর হার্টবিট ক্রমশ বাড়তে শুরু করে অজানা ভয়ের আশঙ্কায়। শুভ্র ভিতু গলায় বলল,
‘কি হয়েছে তুশি? গল্প… গল্পর কি হয়েছে? ও ঠিকাছে তো? কথা বলছ না কেনো? আরে কিছু তো বলো!’
শুভ্রর অস্থিরতা বাড়ছে সাথে বাড়ছে বুকের ধুকপুক শব্দটা। তুশি এবার বলে যায়,
‘ভাইয়া… গল্পর একটা ছোট এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমরা এখন হসপিটালে।’
শুভ্র সোফায় বসে ছিলো, কথাটা শুনেই তাড়াক করে উঠে দাঁড়াল। মনে হলো কেউ তার কলিজায় কামচে ধরেছে। একপ্রকার চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘কিহ! এক্সিডেন্ট?’
এক্সিডেন্ট শব্দটা শুনে পাশে থাকা জাহানারাও ভিতু হলেন। তুশি আবারও বললো,
‘আসলে ওর শরীর খারাপ লাগছিল বলে; ও হোস্টেলে চলে যেতে চায়। আমিই ওকে রিক্সায় তুলে দিয়েছি কিন্তু রিক্সা চালুর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ও হুট করে মাথা ঘুরে চলন্ত রিক্সা থেকে পড়ে যায়। ভাগ্য ভালো যে রিক্সাটা তখনো স্লো-ই ছিলো তাই বেশি ব্যাথা লাগেনি।’
শুভ্র কথা বাড়ায় না শুধু বলে,
‘এখন কোথায় আছো এড্রেস টা ড্রপ করো।’
শুভ্র ফোন রাখতেই জাহানারা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
‘কি হয়েছে শুভ্র? কার এক্সিডেন্ট এর কথা বলছিলি?’
শুভ্রর ফোনে তখন তুশির ম্যাসেজের নোটিফিকেশন টি বেজে উঠলো। এড্রেসটা সেন্ড করেছে। ততক্ষণে শাওনও বাহির থেকে আসলো। শুভ্র জাহানারাকে সবটা বলতেই তিনি আঁতকে উঠলেল। সাফ সাফ বললেন তিনিও সঙ্গে যাবেন। শুভ্রও দ্বিমত করেনি। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশে দরজাটা খুলতেই শাওন দৌড়ে এসে বলল,
‘ভাইয়া আমি ড্রাইভ করছি, তুই বস। তর এখন মাথা ঠিক নেই।’
শেষ কথাটা শাওন বিরবিরিয়ে বলে। শুভ্র ভাইকে কিছু বলতে চেয়েও পারলো না। কারন এখন একটা কথা বলেও সে সময় নষ্ট করতে চাইছে না। চুপচাপ গম্ভীর মুখে পাশে বসলো। জাহানারা পিছনে বসলেন। তিনি নিজেও খুব চিন্তিত গল্পর জন্য গত পরশুই তো ভালো দেখল মেয়েটাকে। আজ হঠাৎ করেই কি হয়ে গেলো। শাওন গাড়ি স্টার্ট করলো; ভিতরে সবাই নিরব। শুভ্র এর মধ্যে দুবার তুশিকে কল করে ফেলেছে গল্পর অবস্থা জানতে। তার সারা শরীর কেমন জানি হাসফাস করছে স্বস্তিতে একটু শ্বাসও নিতে পারছে না –কেমন জানি গলা চেপে আসছে। জাহানারা ছেলের অস্থিরতা বুঝে বললেন,
‘চিন্তা করিস না বাবা, ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।’
চলন্ত গাড়িতেই জাহানারার মনে হঠাৎ করেই উদয় হলো এক নতুন চিন্তা। শুভ্র তো বলল গল্প মাথা ঘুরে পড়েছে আচ্ছা গল্প কি কোনোভাবে প্রেগন্যান্ট? কথাটা মনে আসতেই জাহানারার মনটা কেমন চলকে উঠলো; হয়তো কিছুটা সংশয় কিংবা অজানা খুশিতে। শুভ্রর কাছে কথা টা বলবে কিনা এখনো বুঝতে পারছে না। কীভাবেই বলবে? সন্তান বড় হলে বাবা-মারও কিছু বিষয়ে কথা বলতে অস্বস্তি হয় –তারউপর ছেলে হলে তো আরও বেশি তা।
জাহানারা বেশকিছু সময় ইতিউতি করে অবশেষে শুভ্রর কাছে কথা টা পরলেনই। গলা ঝেড়ে বলল,
‘শুভ্র বাবা শুন না; একটা কথা আসছিল মনে।’
শুভ্র পিছন ঘুরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আসছে যখন বলেই ফেলো।’
জাহানারা এবার ছেলের থেকে একটু সাহারা পেয়ে বলল,
‘আচ্ছা গল্প কোনোভাবে… ’
এটুকু বলেই থেমে গেলেন তিনি। শুভ্র বলে,
‘পুরো কথা শেষ করো আম্মু। এভাবে অর্ধেক কথা বলে থেমে যাও কেন?’
জাহানারা এবার সোজাসাপ্টা বলল,
‘গল্প কোনোভাবে প্রেগন্যান্ট নয় তো? না, তুই বললি না মাথা ঘুরে পড়ে গেছে তাই।’
মায়ের কথায় শুভ্র যেনো হুঁচোট খেল। শাওন সিরিয়াস সিচুয়েশনেও দাঁত বের করে হেসে বলল,
‘এ্যাই ভাইয়া সত্যিই আমি চাচ্ছু হতে যাচ্ছি? তুই এতো ফাস্ট আমাকে চাচ্ছু বানিয়ে দিলি! ওহ গ্রেট ভাইয়া।’
শাওনের কথায় শুভ্রর মেজাজ খারাপ হলো। দিলো এক দমক,
‘শ্যাট আপ শাওন। তোকে এতো ফাস্ট ভাবতে কে বলেছে? আর আম্মু এটা কি তোমার বাংলা সিনেমা পেয়েছো যে কেউ মাথা ঘুরে পড়ে গেলেই সে প্রেগন্যান্ট?’
জাহানারা এবং শাওন দুজনেই চুপ হয়ে গেলো। শাওন যদিও মিটিমিটি হাসছে ভাইয়ের রাগ দেখে।
ঘন্টা খানেকের মধ্যেই শুভ্ররা হসপিটালে পৌঁছল। গল্প কেবিনে ছিলো তাকে সেলাইন দেয়া হয়েছে।তার হাতের কনুইয়ে আর কপালের একপাশে ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ। রিক্সা টা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করায় ভাগ্যক্রমে সে কমই ব্যাথা পায়। গল্প শ্বশুর বাড়ির লোকজন দেখে অবাক। নিশ্চয়ই তুশি খবর দিয়েছে ইশ শুধু শুধু চিন্তা করলো সবাই। জাহানারা দ্রুত গল্পর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে মায়া মায়া গলায় আফসোস ঝাড়লেন,
‘ইশশ…কি অবস্থা হয়েছে! খুব বেশি ব্যাথা করছে?’
গল্প মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বললো,
‘না। ঠিক আছি মা।’
‘তা দেখতেই পাচ্ছি কেমন ঠিক আছো। আচ্ছা এখন চুপ থাকো কেমন! নয়তো মাথা ধরবে।’
তার মধ্যেই ডক্টর কেবিনে প্রবেশ করলো। গল্পকে আরেকবার চেক-আপ করলেন। শুভ্র জিজ্ঞেস করলো,
‘কি হয়েছে ডক্টর? এ্যানি সিরিয়াস? হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়লো?’
‘আপনি উনার কে হন?’
‘হাজব্যান্ড।’
ডক্টর অসন্তোষ নিয়ে বললেন,
‘হাজব্যান্ড! আচ্ছা, উনার প্রেশার তো মারাত্মক ফল করেছে। ওয়াইফের খেয়াল রাখবেন। আর কিছু মেডিসিন দিয়েছি এগুলো খেলেই ব্যাথা টা সেরে যাবে।’
শুভ্র আবারও বলল,
‘আজ কি হসপিটালে থাকতে হবে নাকি ডিসচার্জ করে দিবেন?’
‘না না থাকতে হবে না। কয়েকঘন্টা বাদেই ডিসচার্জ পেয়ে যাবেন।’
কথাটা বলেই ডক্টর বেরিয়ে গেলো। শুভ্র এবার তুশিকে জিজ্ঞেস করলো,
‘তুশি আজ সকালে কি -ও কিছু খেয়ে ভার্সিটিতে গিয়েছিল?’
তুশি যেনো নালিশ করার একটা সুযোগ পেলো,
‘একদমই না ভাইয়া। ও প্রায় সময়ই খাবার নিয়ে অনিয়ম করে; বিশেষ করে যখন এক্সাম থাকে তখন তো বেশি।’
শুভ্র এবার কটমট করে চাইলো গল্পর দিকে। শুভ্রর ওই চাউনিতে গল্প মিইয়ে গেলো। জাহানারার বলল,
‘আম্মু তুমি দুপুরের মেডিসিন না নিয়েই এখানে চলে এসেছো, এখন বাড়িতে যাও আমি আছি।’
জাহানারা আপত্তি করলেন যেতে কিন্তু শুভ্রর জেদের কাছে হার মেনে অবশেষে যান। তবে যাওয়ার আগে গল্পর কপালে চুমু খেয়ে গেলেন। মেয়েটাকে তিনি বড্ড আদর করেন এতো আদুরে একটা মেয়েকে আদর না করে থাকা যায় নাকি!
শুভ্র তার মায়ের সঙ্গে তুশিকেও পাঠিয়ে দেয় তুশি প্রথমে যেতে চায়নি কিন্তু শুভ্র জোর করায় যায়। মেয়েটা অনেক করেছে। শুভ্র অবশ্য শাওনকে বলেছে তুশিকে হোস্টেলে নামিয়ে তারপর বাসায় যেতে।
প্রায় আধঘন্টা পর সেলাইন টা শেষ হয়। শুভ্র এখনো পর্যন্ত গল্পর সাথে একটা কথাও বলেনি। গল্প এটা নিয়ে বেশ চিন্তিত আপাতত। একজন নার্স এসে গল্পর জন্য এক বাটি স্যুপ, একটা কলা, আর একটা ডিম দিয়ে গেলো। শুভ্র খাবারের ট্রে টা গল্পর সামনে নিয়ে বসলো। শুভ্র এক চামচ স্যুপ গল্পর সামনে ধরতেই ও এবার বলল,
‘শুভ্র আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেনো? এসে থেকে একটা কথাও বলেননি! আপনি কি কোনো কারণে রাগ করেছেন?’
শুভ্র এবার গল্পর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো। গম্ভীর গলায় বললো,
‘তোমাকে আমি কি বলবো তাহিয়াত? কিছু বলার আছে? তোমাকে বারবার বলেছি খাবার-দাবারে অনিয়ম না করত। শুনেছো আমার কথা? তাহলে এখন কি বলবো আমার তো চুপ থাকাই ভালো।’
শুভ্র যে রেগে বম গল্প সেটা ভালোই আন্দাজ করতে পারছে। ধীমি গলায় বলল,
‘সরি…. ’
শুভ্র এবার আরও ক্ষেপলো। বলল,
‘হোয়াট সরি তাহিয়াত, হোয়াট? তুমি জানো তুশি যখন আমাকে ফোন করে বলল যে তোমার এক্সিডেন্ট হয়েছে তুমি রিক্সা থেকে মাথা ঘুরে পড়ে গেছো। তখন আমার কি অবস্থা হয়েছিল জানো তুমি? বুঝো সেটা? এতো কেয়ারলেস হলে হয় না তাহিয়াত।’
গল্প সিটিয়ে রইলো। নাদান গলায় বলল,
‘আমি তো এখন অসুস্থ শুভ্র। আপনি জানেন না অসুস্থ মানুষের সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে হয়। এভাবে বকতে নেই।’
শুভ্র গল্পর ওমন চাহনি আর আদো আদো কথায় গলে গেলো। এই মেয়ে ভালোই তাকে ট্র্যপে ফেলতে পারে। তবে সেটা গল্পকে বুঝতে দিলো না। স্যুপ টা আস্তে করে খাইয়ে দিতে লাগলো। গল্প অল্প খেয়েই বলল,
‘আর খাব না, ভালো লাগছে না।’
শুভ্র গম্ভীর গলায় বললো,
‘এটা আপনার মুখের স্বাদের জন্য না, শরীরের সুস্থতার জন্য দেয়া হয়েছে। চুপচাপ শেষ করবে।’
শুভ্রর ওমন ভরাট চাহনি আর গম্ভীর গলার স্বর শুনে গল্প আর গাইগুই করলো না। চুপচাপ পুরো খাবার গুলো শেষ করলো অবশ্যই সেটা না পেরে।
#চলবে
