#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৯
শুভ্রর বুক এখনো ধুপধুপ করে কাপঁচে। কপাল বেয়ে সুক্ষ্ম ঘামটাও চোখে পড়ার মতো। হুট করেই কিছু একটা মনে হতেই তার পাশে ফিরতেই দেখে গল্প পাশে নেই। ভয়টা আরও ঝেঁকে ধরলো হাত-পা গুলোও ক্রমশ অসার হয়ে আসছে যেনো। মেয়েটা এতো সকাল সকাল কোথায় গেলো? তার গলা শুকিয়ে আসছে। ফোন করলো কিন্তু ফোনটা গল্পর বালিশের পাশ থেকেই ভো ভো শব্দ করে ভাইব্রেট হচ্ছে। বিরক্তিতে নিশ্বাস আটকে আসছে তার; মেয়েটা এতো কেয়ারলেস কেনো ফোনটা অন্তত সাথে করে নিয়ে যেতো! কি মনে করে যেনো কেয়াকে কল লাগালো কারন গল্পর তো আবার হুটহাট যখন খুশি কেয়ার সাথে আড্ডায় মশগুল হওয়ার অভ্যাস হয়েছে। কল হতেই ওপাশ থেকে ঘুমঘুম গলায় কেয়ার আওয়াজ ভেসে আসলো,
‘হ্যাঁ, বল এতো সকালে আমার ঘুম ভাঙানোর কারন!’
‘গল্প কোথায়? ও কি তর কাছে গেছে?’
‘তর বউ কোথায় সেটা আমি কীভাবে জানব ভাই। আর ও এতো সকাল সকাল আমার কাছে কেনো আসতে যাবে!’
‘ওকে খুঁজে পাচ্ছি না তাই।’
কেয়ার ঘুমটা একটু সরলো; ভ্রু কুচকে বললো,
‘খুঁজে পাচ্ছিস না মানে? তর বউ আর তুই জানিস না ও কোথায়!’
কেয়ার আর কিছু বলবে তার আগেই শুভ্র ফোনটা কট করে কেটে দিলো। হুট করেই যেনো তার মনে অজানা ভয়টা চলে আসলো, ওই… ওই স্বপ্ন না না ওটা দুঃস্বপ্ন ছিলো –ওটা মাথায় আসতেই তার বুকটা অসম্ভব রকমের কেঁপে উঠছে।
শুভ্র আর দাঁড়াল না রাতে পরা টিশার্ট আর টাউজার পরেই পাগলের মতো হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বের হলো।
গল্প তখন মনের সুখে বিচের দ্বারে পাথরের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। পাথরের উপর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জোরে জোরে এসে সমুদ্রের ঢেউ তার পায়ে লাগতেই সে চঞ্চলা কিশোরীর মতো খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে –সাথে সমুদ্রেরর পারের বাতাসে তার চুল এলোমেলো হচ্ছে, গায়ে জড়ানো ওড়না টাও অবাধ্যতার সহিত উড়ছে। সঙ্গে গুনগুন করে কি যেনো একটা গান গাইছে।
শুভ্র আশপাশ এতো খুঁজেও যখন গল্পর দেখা পেলো না তখন তার অবস্থা পাগলপ্রায়। নিজের নিশ্বাস টাও যেনো গলার ভিতর কাঁটার মতো বিঁধছে। তখন হুট করেই তার চোখ যায় একটু সামনে শৈলতটের দিকে; যেখানে একটা মেয়ে নীল সেলোয়ার সুট পড়ে পাথরের উপর হাঁটছে। অবশ্য হাঁটছে বললে ভুল হবে -লাফাচ্ছে। মেয়েটি মুখটা ভালো ভাবে দেখা না গেলেও –সে যে গল্পই সেটা শুভ্র ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই নিশ্চিত হলো। ক্ষনিকের জন্য মুগ্ধ হলেও গল্পর নীল ড্রেস দেখে তার সেই ভয়ানক দুঃস্বপ্নটার কথা মনে হয়ে গেলো –স্বপ্নের মধ্যেও তো গল্প নীল রঙা ড্রেস পড়া ছিলো!
আর বাস্তবেও একই ড্রেস! শুভ্র আর কিছু ভাবলো না ছুট লাগালো শৈলতটের দিকে।
গল্পর অন্য কোনো দিকে খেয়াল নেই সে মনের আনন্দেই লাফালাফি করছে। হুট করে কারো হাতের হেঁচকা টানে চমকালো বেশ। লোকটা কে মাথা তুলে চাইবার আগেই তাকে বুকের সঙ্গে পিষে ধরলো শুভ্র; হুট করে এমন হওয়াতে গল্প ভয় পেয়েছে বেশ। কিন্তু মুখ না দেখলেও তার মাথাটা যখন লোকটার বুকে মিশে তখনই বুঝে যায় ব্যক্তিটি শুভ্র ছাড়া আর কেউ নয়। আজকাল গল্প কেমন জানি শুভ্রর আপাদমস্তক ছিনতে সক্ষম হয়ে যাচ্ছে; এইযে শুভ্রর বুকে মাথা ঠেকতেই তার মুখ না দেখেও কেমন নিশ্চিত হয়ে গেলো এটা তার বর শুভ্র।
শুভ্র গল্পকে ক্রমশ নিজের সঙ্গে এতোটাই জোরে ঝাপটে ধরছে যে গল্পর এবার মনে হচ্ছে –তার শরীরের হাড়গোড়ও অসার হয়ে আসছে। হুট করেই শুভ্রর এমন অদ্ভুত আচরণ গল্পর বোধগম্য হলো না। সে এবার শুভ্রর পিঠে আলতো করে হাত রেখে নমনীয় গলায় বলে,
‘আর ইউ ওকে? শুভ্র, কি হয়েছে? আপনি তো ঘুমে ছিলেন!’
শুভ্র এবার মাথা তুললো ঠিকই কিন্তু আরেকদফা পাগলামি শুরু করলো। দু’হাতে গল্পর মুখটা ধরে তাতে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগলো। গল্পর গাল, নাক, কপাল, থুতনি, ঠোঁট সবকিছুতেই শুভ্রর পাগলামির বর্ষন বইছে। শুভ্রর এমন পাগলামিতে গল্প যেনো স্তব্ধ হতেও ভুলে গেলো। করছে টা-কি শুভ্র! এসব কি ধরনের পাগলামি। গল্প অস্পষ্ট আওড়ালো,
‘শুভ্র আপনি এমন অস্থির কেনো হচ্ছেন? কি হয়েছে সেটা তো আগে বলুন।’
শুভ্র এবার থামলো। পরপরই তীক্ষ্ণ চোখে প্রশ্ন করলো,
‘তুমি এই সকাল সকাল বিচে কি করছো তাহিয়াত? তোমাকে তো বলেছিলাম আমাকে না বলে পানির এতো কাছে আসবে না! বলো বলেছিলাম কি-না?’
শুভ্রর একের পর এক প্রশ্নে গল্প হতবিহ্বল। নিজেকে কোনোমতে সামলে বলল,
‘আমি তো সমুদ্রের পারের সকালের এতো সুন্দর ফ্রেশ এয়ার নিতে এসেছিলাম! আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন তাই আর ডাকিনি।’
শুভ্র গল্পকে আবারও নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘আমাকে কি ডাকা যেতো না তাহিয়াত? ডাকলে কি আমি তোমার নামে মামলা দিতাম নাকি! কথা কেনো শুন না তুমি?
একটু থেমে আবারও বলে,
‘আশপাশে কেউ নেই আর তারমধ্যে তুমি এখানে একা একা ধেই ধেই করে লাফাচ্ছ; হঠাৎ করে যদি কোনো একটা অঘটন ঘটে যেতো তখন কি হতো? তুমি তো সাঁতারও জানো না।’
গল্প বুঝল শুভ্রর চিন্তা। মনটা কেমন জানি ফুরফুরে হয়ে গেলো তাতে। তবে হাসি টুকু লুকিয়ে বলল,
‘ঢেউয়ে ভেসে যেতাম কিনা তা-তো জানি না শুভ্র। কিন্তু আপনি যেভাবে নিজের সাথে আমাকে পিষে রেখেছেন তাতে মনে হচ্ছে আমার বুঝি এই শ্বাস আটকালো!’
শুভ্র এবার হাতের বাঁধন শিথিল করে গল্পকে ছাড়াল। একপ্রকার অপরাধবোধ নিয়ে বলে উঠে,
‘সরি। আসলে বুঝতে পারিনি, কষ্ট হয়েছে বেশি?’
গল্প আবারও গলে গেলো শুভ্রর কেয়ারে। এই লোকটা এতোটা কেনো কেয়ারিং? এমন করলে তো গল্পর অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। তারপর তো একটু বেখায়লি হলেই গল্প গাল ফুলাবে –তখন?
তবে তার এই ফুরফুরে মেজাজ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না যখন শুভ্রর একটি ঘোষণা তার কানে আসলো,
‘আচ্ছা এখন রিসোর্টে চলো। আমরা আজই ঢাকা ব্যাক করবো।’
শুভ্রর এমন কথায় গল্প বোকা হয়ে গেলো। আজই চলে যাবে মানে কি! তাদের তো আরও দু’দিন থাকার কথা। তবে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কিহ! আজকেই ঢাকা ব্যাক করবো মানে? আমাদের তো আরও দু’দিন থাকার কথা ছিলো শুভ্র! হুট করে এমন ডিসিশন এর মানে কি?’
শুভ্র অতশত বুঝলো না। সরাসরি উত্তর দিলো,
‘কারন আছে তাহিয়াত অবশ্যই কারন আছে। তাছাড়া তোমার পড়াশোনারও তো বেশ গ্যাপ যাচ্ছে কিছুদিন। সামনে না ফাইনাল এক্সাম!’
গল্প এবার তেতে উঠলো,
‘এতোদিন মনে ছিলো এসব কথা? আর এখানে আসতেই আপনার হুট করে মনে হলো আমার পড়াশোনার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। শুনন, আমার পড়া নিয়ে আপনাকে এতো ভাবতে হবে না; আমি ঠিক ম্যানেজ করে নিবো।’
একদমে কথাগুলো বলে থামলো গল্প। পরপর নমনীয় গলায় বলল,
‘আমি এখানে আরও কিছু সময় কাটাতে চাই শুভ্র। প্লিজ থাকি না; কিইবা এমন হবে।’
প্রথম দিকে শুভ্রর মন গললেও; তারপর হুট করেই যখন সকালের সেই দুঃস্বপ্নটার কথা মাথায় এলো; তখন আবারও তার সব নমনীয়তা হারিয়ে গেলো।
জোর গলায় বলল,
‘বাচ্চামো করো না তাহিয়াত। আমারা আজই ব্যক করছি। তাছাড়া আমার একটা জরুরি কাজও আছে সো আজই ব্যক করতে হবে।’
গল্পর ওমন চাঁদপানা মুখটায় নিমিষেই আঁধারের ঘনঘটা নামলো। সেটা আরও বিস্তৃত হলো তখন; যখন জানতে পারলো আজ শুধু তাঁরাই ব্যক করবে। কেয়ারা সবাই আরও দু’দিন পর যাবে। গল্প ছোটমোটো মনটা থেকে থেকে কেঁদে উঠলো অকারণেই। শুভ্র সেসব দেখেও না দেখার ভান করে রইলো। এখানে থাকা মানেই রিস্ক; আর এতো বড়ো রিস্ক সে কিছুতেই নিতে পারবে না।
শুভ্র চিন্তাভাবনার দিক থেকে খুবই আধুনিকতা পোষণ করে। এসব দুঃস্বপ্ন টপ্নের মতো কুসংস্কারে সে মোটেই বিশ্বাসী নয়। কিন্তু এবার যেনো সবটাই উল্টো ঘটলো। শুধু একটা বাজে স্বপ্নই তো ছিলো ওটা। শুভ্র নাথিং বলে ইগনোর করলেও তো পারতো! কিন্তু শুভ্র কি করলো? ওই বাজে স্বপ্ন টা মনে নিয়ে নিলো এবং সেটাকে ধরে ভেবে নিলো যদি এমন কিছু হয়ে যায় তখন! আর তাই সে গল্পর মন খারাপ তোয়াক্কা না করেই আজই ফিরার তোড়জোড় করছে। আজ শুভ্র একটা বিষয় রিয়েলাইজ করলো –গল্প নামের এই মিষ্টি মেয়েটিকে ছাড়া তার চলবে না একদমই চলবে না। গল্পকে তার ভীষণ প্রয়োজন ভীষণ; যেমনটা প্রয়োজন হয় বেঁচে থাকতে গেলে মুক্ত শ্বাসের। শুভ্রর মনে গল্পকে হারানোর ভয়টা বেশ ভালোই ঝেঁকে বসেছে।
______________________________
‘কিহ! পাগল হয়েছিস তুই? আমাদের তো আরও দুদিন থাকার প্ল্যান হলো কাল রাতেই, তাহলে আজই চলে যাবি মানে টা কি!’
ফাহিমের কথায় শুভ্রর মধ্যে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলো না। সে কক্সবাজার থেকে প্ল্যানের টিকেট কনফার্ম করতে ব্যাস্ত। এবার সাব্বির গলা তুলল,
‘ভাই আমরা তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি। তুই তা না বলে ফোনে এতো কি ঘাটছিস?’
শুভ্র ঠোঁট চেপে আমোদিত গলায় বলল,
‘ইয়েস কনফার্ম।’
আরাফ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
‘কনর্ফাম মানে, কি কনফার্ম?’
‘প্ল্যানের টিকেট পেয়ে গেছি। আজকেই ফ্লাইট। আমাদের কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হতে হবে।’
আরাফ, সাব্বির আর ফাহিম তিনজনই এতোটাই অবাক হয়েছে যে সবাই একসন্বয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘হোয়াট? টিকেট কনফার্ম করেছিস মানে?’
শুভ্র কানে হাত চেপে বললো,
‘আরে ভাই আস্তে। তোদের না –আমার আর গল্পর টিকেট কনফার্ম করেছি। আমরা আজই ব্যক করছি ভাই, তরা দুদিন পর আস।’
আরাফ রাগ দেখালো। বলল,
‘আমরা সবাই একসাথে ট্যুরে এসেছি আর একসাথেই যাওয়ার প্ল্যান। আর তুই কিনা আজই চলে যাবি! মানে টা কি? তর এক্সাক্ট প্রবলেম টা কি সেটা আগে বল। যদি কোনো যথাযত কারন দেখাতে না পারিস তবে যাওয়ার কথা ভুলে যা।’
‘প্রবলেম আছে ভাই, অনেক প্রবলেম। এখানে থেকে যাওয়া মানেই বিরাট রিস্ক নেওয়া, আমি এই রিস্ক টা কিছুতেই নিতে পারব না।’
সবাই তাজ্জব বনে গেলো। ফাহিম অবাক হয়ে বলল,
‘কিহ! রিস্ক হয়ে যাবে মানে? কি উল্টাপাল্টা বলছিস!’
‘উল্টাপাল্টা না, যা ফ্যাক্ট তাই বলছি। এখন সর আমাকে লাগেজ প্যাক করতে হবে।’
এবার সাব্বির শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে বুকে দু’হাত বেঁধে বলল,
‘আচ্ছা আগে শুনি তর ফ্যাক্ট টা। যার কারনে তর মনে হচ্ছে এখানে থেকে গেলে তর রিস্ক হয়ে যাবে; আগে বল আসল কাহিনি তারপর নাহয় ভাবছি।’
সাব্বিরের কথায় সায় দিয়ে সবাই শুভ্রকে ঝেকে ধরলো। শুভ্র ইতস্তত করলেও না বলে উপায় পেলো না।
‘আ…আসলে আমি একটা খুবই বাজে স্বপ্ন দেখেছি। মেইনলি আমি এসব মানি না; কিন্তু এবার ব্যপারটাই অন্য রকম। এটার সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ করতে পারব না। সো লেট মি গো।’
বিনা মেঘে বজ্রপাত পড়লে যেমন সবাই চমকায়। ঠিকে তেমনি শুভ্রর এমন কথায় যেনো ছোট খাটো একটা বজ্রপাতই পড়লো। সবাই অবিশ্বাস্য নয়নে শুভ্রর দিকে। প্রত্যেকেই যেনো কথা বলার খেই হারালো। সাব্বির কোনোমতে বিস্ময় কাটিয়ে বলল,
‘হোয়াট? সিরিয়াসলি শুভ্র; তুই… তুই এসব আজগুবি কথা বার্তা কবে থেকে বিলিভ করতে শুরু করেছিস? সামান্য একটা স্বপ্নের জন্য তুই ট্যুর প্ল্যান ক্যানসেল করছিস! আর ইউ সিরিয়াস?’
শুভ্র কোনো দ্বিধা ছাড়াই জবাব দিলো,
‘ইয়েস আ’ম সিরিয়াস। আমি ওসব বিলিভ টিলিভ করি না। কিন্তু এই বিষয় টা খুবই সেনসিটিভ এটাতে কোনো রিস্ক আমি নিতে পারবো না ভাই। একদমই না।’
ফাহিম তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে শুধালো,
‘আচ্ছা কি সেই সেনসিটিভ বিষয়টা? একটু শুনি, যার জন্য তুই এমন ডেস্পারেট হয়ে যাচ্ছিস!’
শুভ্র একটা শ্বাস ফেললো। পরপরই বলল তার ডেস্পারেট হওয়ার কারন,
‘আকচুয়ালি স্বপ্ন টা গল্পকে নিয়ে ছিলো। আমি… আমি দেখলাম ও সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে ত.. তলিয়ে যাচ্ছে। এতো খুজেও কোথাও পাচ্ছি না। এরপর ঘুম ভেঙে ওকে বেডে না পেয়ে বিচে এসে দেখি ও সেইম কালারের ড্রেসই পড়ে আছে যেটা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। হতে পারে এটা কোইন্সিডেন্স কিন্তু আমি এখানে আর থাকছি না ভাই।’
আরফদের সবার চোয়াল ঝুলে গেলো শুভ্রর এমন যুক্তিতে। সাথে এও বুঝতে পারলো তাদের বন্ধুটি তার বউের প্রতি কি মারাত্মক ভাবেই না ঘায়েল হয়েছে। যার কারনে সামান্য একটা স্বপ্নকে ইস্যু করে কেউ এতোটা ডেস্পারেট হয়! যেখানে শুভ্র নিজেই এসব বিশ্বাস করত না; অলওয়েজ আধুনিক চিন্তাধারা নিয়ে চলে এসেছে। সেখানে এমন একটা সিলি বিষয় নিয়ে কেউ এভাবে রিয়েক্ট করে! করে হয়তো ভালোবাসায় মানুষ হয়তো সব করে –যার চাক্ষুষ প্রমান শুভ্র নিজেই।
শুভ্র আর দাঁড়াল না। তার লাগেজ প্যাক করা এখনো বাকি। গল্প যেভাবে হাত-পা গুটিয়ে মুখ আধার করে বসে আছে তাতে করে শুভ্রর নিজেরটার সাথে গল্পর লাগেজও প্যাক করতে হবে। জলদিই সব গোছগাছ করতে হবে নাহলে তো ফ্লাইট মিস হবে! বউয়ের রাগের সাথে নাহয় পরে মিটমাট করে নিবে শুভ্র –তার নিজ তরিকায়।
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_২০
শুভ্ররা ঢাকায় ব্যাক করেছে আজ নিয়ে দু’দিন হলো। অথচ এই দুদিনে গল্প শুভ্রর একটা ফোনকল কিংবা টেক্সেরও রিপ্লাই দেয়নি। সকাল থেকে ১০১ তম কলটি দিয়ে শুভ্র দাঁতে দাঁত পিষলো। মেয়েটার এতো জেদ, এতো! একটাবার তার কল রিসিভ করারও প্রয়োজন বোধ করছে না!
শুভ্র রাগে তার স্টাডি টেবিলের উপর সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি মারল। সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের উপর থাকা ওয়াটার বোটল টা ঝঙ্কার তুলে নিচে গড়িয়ে পড়লো। চেয়ার থেকে কোর্ট টা নিয়ে বুটের খটখট শব্দ তুলে স্টাডি রুম থেকে বের হলো।
নিচে নামতেই জাহানারা ডাকলেন,
‘এ্যাই শুভ্র তোকে কখন থেকে ডাকছি নিচে এসে নাস্তা করতে; তাড়াতাড়ি আয় খাবার তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
শুভ্র মায়ের কথায় থামলো তবে তীব্র গুরুগম্ভীর ভাবটা বজায় রেখেই বলল,
‘আমি ব্রেকফাস্ট করবো না আম্মু। আজ এমনেতেই লেইট হয়ে যাচ্ছে; অফিসে করে নিবো।’
জাহানারা এবার তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেকে পরখ করলেন। সন্দিহান গলায় বললো,
‘তর কি হয়েছে বল তো শুভ্র? ট্যুর থেকে এসে অব্ধি দেখছি তুই কেমন মনমরা; ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়াও করছিস না। মানুষ ঘুরে এলে মন মেজাজ ভালো হয়; তর ক্ষেত্রে উল্টোটা হলো কেনো?’
শুভ্র উত্তর দিলো না। শুধু বলল,
‘আসি আম্মু, নাউ আ’ম গেটিং লেইট।’
‘দাড়াঁ।’
জাহানারার সন্দেহ এবার পোক্ত হলো। নিশ্চয়ই কিছু একটা গোলমাল আছে। ছেলেকে আরেকটু
যেরা করতে শুধালেন,
‘এ্যাই শুভ্র সত্যি করে বলতো কি হয়েছে? গল্পর সাথে ঝামেলা করেছিস? তোদের ঝগড়া হয়েছে?’
শুভ্র এবার বিড়বিড়িয়ে বলল,
‘ঝগড়া হলেও তো ঝগড়া মিটাতে পারতাম আম্মু। কিন্তু মহারানী তো আমার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগই রাখছে না। আমাকে পোড়াতে নিরবতা বেচে নিয়েছে।’
জাহানারা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
‘এ্যাই কি বিড়বিড় করছিস বল তো?’
শুভ্র এবার হাতের ঘড়ির সময় দেখতে দেখতে বলল,
‘না আম্মু কোনো ঝামেলা হয়নি। ইদানীং কাজের চাপ টা একটু বেশি কিনা তাই এমন আপসেট দেখাচ্ছে হয়তো। তুমি এতো ভেবো না তো, জলদি ব্রেকফাস্ট করে নাও।’
কথাগুলো বলেই শুভ্র জাহানারার কপালে চুমু খেলো। এবং পরপরই দ্রুত পায়ে সদরদরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেলো। জাহানারা ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন অপলক। ছেলেটার কিছু তো একটা হয়েছে কিন্তু সেটা বলছে না। কি এমন হয়েছে যার কারনে শুভ্র এমন ডিস্টার্ব হয়ে আছে। কাজের চাপ তো একটা বাহানা মাত্র সেটা জাহানারার মা মন ঠিকই ধরে ফেলেছে।
_______________________
ক্লাস থেকে বেরিয়ে গল্প মনমরা হয়ে হাটঁছে। তার আজকাল সবকিছুই বিভীষিকাময় লাগছে। শুভ্রর সাথে কথা না বলতে পেরে সে নিজেও চটপট করছে। কিন্তু কোথাও একটা তীব্র অভিমানের তোপে সে শুভ্রর এতো এতো কল কিংবা ম্যাসেজ কোনোটারই অ্যানসার করছে না। কিন্তু এবার আর তার মন মানছে না; অনেক হয়েছে এবার শুভ্র কল করলে সে আর মুখ ফিরিয়ে রাখবে না। কথা বলে সব মিটমাট করে নিবে –যা হয়েছে তা হয়েছে। বেঁচে থাকলে আবারও ট্যুরে যেতে পারবে কিন্তু এখন সেটা নিয়ে রাগারাগি করার কোনো মানে নেই। শুভ্রর কলের আসায় সে ফোন স্কিনে বারবার তাকাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এই বুঝি শুভ্র কল দিলো।
‘কিরে মুখটা এমন লটকিয়ে হাঁটছিস কেনো?’
তুশি হুট করে কোথ থেকে এসে হামলে পড়লো। গল্প বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তো কি ভেটকিয়ে হাঁটব?’
তুশি দাঁত বের করে হাসলো,
‘হাটঁ না, না করেছে কে? ব্যাই দ্যা ওয়ে তর সাথে কি শুভ্র ভাইয়ের ঝামেলা মিটেছে?’
গল্প ঠোঁট উল্টিয়ে মাথা নাড়ালো। তুশি কপাল চাপড়ে বলল,
‘হায়রে ছোট্ট একটা ইস্যু নিয়ে এভাবে কে রাগ দেখায় বেইব? এবার কিন্তু তুই শুভ্র ভাইয়ের উপর অবিচার করছিস, হুহ।’
গল্প কিছু বলবে তার আগেই তার হাতে থাকা সেলফোন টা বেজে উঠলো। শুভ্রর ফোনকল ভেবে গল্প উচ্ছ্বসিত হয়ে ফোনের স্কিন সামনে ধরতেই তার সবটুকু উচ্ছ্বাস মিইয়ে গেলো। কেননা স্কিনে কেয়ার নামটি ঝলঝল করে ভাসছে। তুশিকে কেউ একটা ডাক দিতেই তুশি সেদিকে চলে গেলো।
গল্প ফোন রিসিভ করতেই কেয়ার ঝলমলে গলার আওয়াজ ভেসে আসলো,
‘হ্যালো, গল্প ডিয়ার কেমন আছো?’
গল্প শুকনো হাসার চেষ্টা করে বলল,
‘ভালো আছি আপু। তোমরা কেমন আছো? আর ট্যুর থেকে কবে ব্যাক করেছো?’
‘আমরাও ভালো আছি। আর আমরা তোমাদের ফিরে আসার পরের দিনই তো ব্যাক করলাম। তোমরা চলে আসায় মজাটাই তো মাটি হয়ে গেলো। আমি কতো কিছু প্ল্যান করে রেখেছিলাম। শুভ্রটা যা পাগলামি করলো, উফফ!’
গল্প মন খারাপ করে বলল,
‘সরি আপু আমাদের জন্য তোমাদের আনন্দেও ভাটা পড়লো।’
কেয়া ওসব শুনলো না। বলল,
‘ছাড়ো তো এসব সরি-টরি। সেন্ট মার্টিন তো আরও ঘুরেছি শুধু তোমরা ফিরে এলে বলে মন খারাপ হয়েছিল, এই যাহ। তবে যাইহোক শুভ্র কিন্তু তোমার প্রতি মারাত্মক অবেসসড। আমাদের প্রেম বিরোধী বন্ধুটিকে কীভাবে ঘায়েল করলে যে সামান্য একটা দুঃস্বপ্ন দেখে সেন্ট মার্টিন থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ঢাকায় ব্যাক করলো। হুম হুম!’
গল্প বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গেলো। কেয়া আপু এসব কি বলছে? দুঃস্বপ্ন মানে? শুভ্র কি দুঃস্বপ্ন দেখেছিল যার জন্য এমন ডেস্পারেট হয়ে ট্যুর টাই ক্যানসেল করলো?
‘কি বলছ আপু? দুঃস্বপ্ন মানে?’
কেয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘ওমা তুমি জানো না? ওই বজ্জাত টা তোমাকে বলেনি কিছু?’
গল্প বোকা বোকা গলায় বলল,
‘না তো, কি বলবে? আমাকে তো কোনো কারনেই বলেনি। শুধু বলেছে –তোমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। এই যাহ।’
কেয়া হইহই করে বলল,
‘দেখেছ কতো ধুরন্ধর! নিজের বউয়ের কাছে ঠিকই আসল কথাটা চেপে গেছে। আচ্ছা ও বলেনি তো কি হয়েছে আমি বলছি, ডিয়ার।’
কেয়া সব কাহিনি বলতেই গল্পর চোয়াল ঝুলে পড়লো। অত্যাধিক বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠলো,
‘কিহ! এই কারনে? উনি কি পাগল আপু!’
কেয়া গল্পর একটু মজা নিতে বললো,
‘আগে তো ছিলো না। কিন্তু এবার বোধ হয় বউয়ের প্রেমে পড়ে পাগল হলো বলে –আহারে বেচারা!’
কথাটা বলেই কেয়া ঝঙ্কার তুলে হাসলো যার আওয়াজ গল্পর কানে স্পষ্ট বাজছে। গল্প তখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এই ছিলো তবে ওমন তাড়াহুড়ো করে ট্যুর প্ল্যান ক্যানসেল করার কারন! গল্পর বুঝে এলো না শুভ্র একজন আর্কিটেক্ট হয়েও কিকরে এমন একটা সিলি বিষয় কে কেন্দ্র করে তার স্বাদের ট্যুর প্ল্যানই ক্যানসেল করলো!!!
___________________
গল্প সারা শরীর বিরক্তিতে তিতিয়ে আসছে। ইচ্ছে করছে তুশিকে কয়েকটা জোরে থাপ্পড় লাগাতে। এমনেতেই তার মন মেজাজ তুঙ্গে তার উপর আবার এই বেয়াদবটা জেদ ধরেছে সে নাকি আজ শাড়ি পড়ে বাহিরে খেতে যাবে সঙ্গে তাকেও যেতেই হবে। সে এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তুশি আমার কিন্তু এবার রাগ লাগছে। আমি বুঝলাম না বাহিরে খেতে যাওয়ার সঙ্গে শাড়ি পড়ার কি সম্পর্ক? আশ্চর্য! তুই এমন করছিস যেনো আমাকে কোনো পাত্র পক্ষ দেখতে আসছে।’
তুশি দাঁত খেলিয়ে হাসলো। বলল,
‘সেই সুযোগ তো আর নেই বেইব। এখন যদি অন্য পাত্রের নাম মুখেও আনি তবে তো শুভ্র ভাই আমাকে ধরে ডিরেক্ট গুলি করবে। তখন আমার না হওয়া বরটার কি হবে?’
গল্প সরু চোখে তুশি ড্রামা দেখলো। তুশি গল্পর ওমন চাহনি দেখে বরকে গিয়ে বলল,
‘ আ…আর শুন ফ্রেন্ডদের সাথে মাঝে মধ্যে শাড়ি পড়ে বের হলে মন মেজাজ ভালো হয়, বুঝলি।’
গল্প আর কিছু বললো না। বলেও লাভ নেই এই মেয়ে শুনবে না।
তুশি আর গল্প রিক্সায় করে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে আসল। তুশি নিজেও শাড়ি পড়েছে আজ নাহলে তো গল্পকে শাড়ি পড়িয়ে এখানে আনার প্ল্যান টা সাকসেসফুল হতো না। রেস্টুরেন্ট টা চমৎকার ডেকোরেট করা তুশি ঘো ধরলো তারা রেস্টুরেন্টের রুফটপে গিয়ে বসবে। সেখানে নাকি আরও সুন্দর ডেকোরেট করা। গল্প বিরক্ত হলো এতে তার এসবে মন নেই; একজায়গায় বসলেই তো হয়!
রুফটপে পা দিতেই গল্প একটা ধাক্কার মতো খায়। শুভ্র একটা টেবিলে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে আরাম করে দাঁড়িয়ে আছে; দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। তুশি শুভ্রর সাথে চোখাচোখি করে থাম্বাসআপ দেখিয়ে সুযোগ বুঝে কেটে পড়লো। তুশি যেতেই দরজা টা বন্ধ হয়ে গেলো। শুভ্র এক পা এক পা এগিয়ে আসছে তার দিকে। গল্প পাশে ফিরে তুশিকে খুঁজতে গেলে দেখে তুশি লাপাত্তা। গল্প নিমিষেই বুঝে নিলো এটা শুভ্র আর তুশির ছলচাতুরী ছিলো।
‘হাই আমি শেহজাদ আহমেদ শুভ্র। বাবার নাম শাহিনুজ্জামান আহমেদ, মায়ের নাম জাহানারা বেগম। পেশায় একজন আর্কিটেক্ট পাশাপাশি পার্ট টাইম টিচিং প্রফেশনেও যুক্ত। ম্যারিটাল স্ট্যাটাস –ম্যারিড। আর ওয়াইফের নাম তাহিয়াত আহমেদ গল্প। তো যতদূর মনে পড়ছে সম্পর্কে আপনি আমার বউ হন। অ্যাম অ্যাই রাইট তাহিয়াত?’
গল্প সম্পূর্ণ বোকা বনে গেলো। শুভ্রর সব কথা তার মাথার উপর দিয়ে গেছে। গল্পকে চুপ থাকতে দেখে শুভ্র আরেকটু এগুলো তার দিকে।
‘কি হলো কথা বলছেন না কেনো? অ্যাম অ্যাই রং? চিনতে সমস্যা হচ্ছে কি?’
‘আপনি এমন উইয়ার্ড বিহেভিয়ার কেনো করছেন শুভ্র?’
গল্প আশ্চর্য নেত্রে চেয়ে প্রশ্নটা করলো। কিন্তু শুভ্রর মেজাজ তখন তুঙ্গে। গল্পকে হেঁচকা টানে নিজের নিজের সাথে একদম মিশিয়ে নিলো –তার শক্ত পোক্ত হাত টেকলো গল্পর উম্মুক্ত তুলোর মতো নরম কোমরে। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
‘কজ তুমি আমাকে এমন করতে বাধ্য করছ। লাস্ট ৫২ ঘন্টা অ্যাই রিপিট ফিফটি টু আওয়ারস তুমি আমার সাথে কোনো ভাবেই কমিউনিকেশন রাখো নি। হাজারেরও বেশি কল, ম্যাসেজ কোনোটারই অ্যানসার করছো না। হুয়াই? কারনটা জানতে পারি?’
গল্প এবারেও কোনো কথা বলতে পারলো না। শুভ্রর বুঝি গল্পর ওই নিরবতা টুকু সহ্য হলো না। আবারও বলল,
‘এখনও চুপ কেনো তাহিয়াত? এতো রাগ? এতো অভিমান? ট্যুর প্ল্যান ক্যানসেল করার যথেষ্ট কারন ছিলো তাই করেছিলাম। তাই বলে তুমি আমার সাথে সবরকমের কমিউনিকেশন বন্ধ করে তার শুধ নিবে! এভাবে আমাকে পাগল করার পায়তারা করা হচ্ছে? ইউ নো হোয়াট –গত দুদিন ধরে আমি কোনো কাজেই কনসেনট্রেট করতে পারছি না!’
শুভ্রর গলাটা কেমন জানি কাতর শুনাল। গল্পর এবার একটু মায়া হলো; ইশশ….সে বোধ হয় শুভ্রর সাথে একটু বেশিই রুড বিহেভ করে ফেলেছে। চোখ নমনীয় করে ধীর গলায় বললো,
‘সরি…। আমার সত্যিই এতোটা করা উচিত হয় নি। রিয়েলি সরি।’
‘সরি! ব্যস হয়ে গেলো? লাস্ট এতো গুলো ঘন্টা যে আমাকে পোড়ানো হলো তার হিসাব? আমি…’
শুভ্রর পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই গল্প ঘটিয়ে ফেললো এক বিস্ময়কর কান্ড। শুভ্রর ঠোঁটের কোনায় হুট করেই চুমু খেলো এবং তড়িৎ গতিতে সরেও এলো। শুভ্র একমুহূর্তের জন্য কোনো কথা খুঁজে পেলো না; কিন্তু যখনই বুঝে আসলো ব্যাপারটা কি হলো তখনই তার ঠোঁটে হাসি এলো। গল্পকে একটু খুঁচাতে বলে উঠলো,
‘বাহ! বরের মন গালানোর কায়দা শিখা হয়ে গেছে দেখছি।’
গল্প লজ্জা পেলো বেশ। কিছু বলল না মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখল। শুভ্র গল্পকে তার দিকে ফিরালো। বলল,
‘যাইহোক এই মুহূর্তে তুমি আমার কাছে ঋণী। আমি আবার কারও কাছে ঋণী থাকতে পছন্দ করি না। সুদসমেত ফিরত দেই।’
গল্প শুভ্রর কথা বুঝতে না পেরে বলল,
‘মানে?’
শুভ্র মুখে কিছু বলল না তবে তার ঠোঁট চললো গল্পর ঠোঁটের উপর রাজত্ব করতে। গল্পর চোখ বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে বড় বড় হয়ে গেলো। সে ছাড়া পেতে একটু নড়েচড়ে উঠতেই শুভ্র ছাড়লো তো না-ই বরং আরেকটু দম্ভের সাথে তার ঠোঁটে শাসন বিচরণ করলো।
শুভ্র ছাড়লো কিন্তু ক্ষানিক সময় বাদে। গল্প তখন হাঁপড়ের মতো শ্বাস ফেলতে লাগলো। গল্প বুকে হাত দিয়ে লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেলে কোনোমতে বলল,
‘আপনি কি রাক্ষস! আরেকটু হলে তো আমি মরেই যাচ্ছিলাম।’
শুভ্র গল্প কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো,
‘তাই? আরেকটু হলে তো আমিও মরে যাচ্ছিলাম! এভাবে কেউ কথা বন্ধ করে? রাগ হলে, অভিমান হলে, ঝগড়া করো যতো ইচ্ছে করো। কিন্তু এভাবে চুপচাপ থেকে আমার সাথে কথা বন্ধ করে –আমার নিশ্বাস নেওয়া দুর্বিষহ করে ফেলো না প্লিজ।’
শুভ্র কথাটা বলেই গল্পর গলায় মুখ ডুবালো। গল্পর সারা শরীরে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো ছলকে উঠে। শুভ্রর বুকের কাছটায় শার্টের আংটা কামচে ধরলো। কোনোমতে বললো,
‘কি করছেন শুভ্র? যে কেউ এসে যাবে! প্লিজ সরুন।’
শুভ্র সরলো ঠিকই কিন্তু বলল,
‘আসবে না কেউ। কারন এই পুরো রুফটপ টা আমি বুক করেছি। আচ্ছা এখন চলো বসি।’
শুভ্র চেয়ার টেনে দিয়ে গল্পকে বসতে বলল। গল্প বসতেই শুভ্র তার হাতে একটা রজনীগন্ধার বুকে বাড়িয়ে দিলো। প্রিয় ফুল পেয়ে গল্পর মন আরও ফুরফুরে হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ বাদেই ওয়েটার খাবার সার্ভ করে দিয়ে যায়।
খাওয়ার পর শুভ্র হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে গল্পর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
‘লেটস ডান্স, ওয়াইফি!’
গল্প চোখ গোল গোল করে চাইলো। ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘কিন্তু আমি তো ডান্স পারি না শুভ্র।’
শুভ্র গল্পর হাত ধরে উঠাতে উঠাতে বলল,
‘এখানে তোমার ডান্স জাজ করার জন্য কোনো জাজমেন্টাল নেই। সো রিল্যাক্স এন্ড লেটস ডান্স।’
অল্প ভলিউমে “মেরে হাত মে, তেরা হাত হো” মিউজিক টোনটা বাজছে। শুভ্র খুব ভালো ডান্স করছে সঙ্গে গল্পকেও সামলাচ্ছে। গল্প এবার একটা কথা পারলো,
‘ট্যুর প্ল্যান ক্যানসেল করার মেইন কারন আমি ছিলাম! তাও একটা সামান্য বিষয় নিয়ে আপনি এমনটা কেনো করলেন?’
শুভ্রর গল্পকে নিজের সাথে আরেকটু জোরে চেপে ধরে বলল,
‘ওটা মনে করতে চাই না তাহিয়াত। ঠিকাছে আমরা আবারও কোনো ট্যুর প্ল্যান করব, হু। ওটা বাদ দাও।’
‘আচ্ছা বাদ। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। সামান্য একটা স্বপ্ন দেখে কেনো ওখান থেকে পালিয়ে এলেন?’
‘ এই ফাস্ট এতো ভয় পেয়েছিলাম তাই। অর মেইবি…’
শুভ্র থামে এটুকু বলে। গল্প শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কাতর চোখে শুধালো,
‘মেইবি কি শুভ্র? বলুন?’
শুভ্র এবার গল্পর চোখে চোখ রাখল। গল্পর আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে মোহনীয় গলায় বলল,
‘অর মেইবি ওটা ভালোবাসা ছিলো।’
গল্পর চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পড়লো। এই ছোট্ট একটা স্বীকারোক্তি গল্পর তনু মন শীতল করে দিলো। নিজেকে মনে হলো সে শূন্যে ভাসছে। পরম আবেশে শুভ্রর বুকে ঢলে পড়লো তার নরম হাত দুটো শুভ্রর পিঠের শার্ট টা ক্রমশ মুঠোয় পুরে নিতে থাকলো।
#চলবে
