#মেঘবৃক্ষ
#পর্ব_২
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
_______________
শরৎ এর যেই সুখময় ফুলের কলি কেবল ফুটতে শুরু করেছিল মেঘার ভেতর, সেই ফুল কলি অবস্থাতেই মা’রা গিয়েছে। সে যে কীভাবে কোয়াটার থেকে বাড়ি ফিরেছে সে নিজেও জানে না। বাসায় এসে ওয়াশরুমে গিয়ে ইচ্ছেমতো মুখে পানির ছিটা দিয়েছে। পুরো শরীর তার ভিজে গেছে পানিতে। হাত-পা ক্রমান্বয়ে কাঁপছে শুধু। প্যানিক করছে একটু পরপর। কল ছেড়ে সে নিচেই বসে পড়েছে।
রিজভী বাড়িতে ফিরল সন্ধ্যার সময়। হাতে তার বেলীফুলের মালা। মেঘা শুয়ে ছিল লাইট বন্ধ করে। রিজভীর পায়ের শব্দ সে চেনে। বুকের ভেতর আবারও সেই অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত। রুমের লাইট জ্বালিয়ে রিজভী কাছে গেল মেঘার। খাটের ওপর বসে মেঘার গায়ে হাত রেখে ডাকল,
“ঘুমিয়েছ মেঘ?”
মেঘা জবাব দিল না। রিজভী এবার মেঘার হাত ধরে টেনে ওর দিকে ঘোরাল। কান্না করে মেঘার চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। রিজভী আতঙ্কিত কণ্ঠে জানতে চাইল,
“কী হয়েছে তোমার? কাঁদছ কেন এভাবে?”
মেঘা অঝোরে কাঁদছে তখনো। ঘেন্না লাগছে রিজভীকে দেখে। এত অভিনয় আর সে সহ্য করতে পারছে না। রিজভী ওকে ধরে উঠিয়ে বসাল। গালে দুহাত রেখে বলল,
“বলো না আমায়, তোমার কী হয়েছে জান?”
মেঘার দুঃখগুলো ক্রমশ রাগে পরিণত হলো। সে নিষ্পলক কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সজোরে থা’প্প’ড় বসাল রিজভীর গালে। রিজভী গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে মেঘার দিকে। মেঘা হিঁচকি তুলে কাঁদছে। রিজভী কিছু বলার পূর্বেই মেঘার ফোনটা বেজে উঠল। মাহবুবার কল এসেছে। মেঘা কোনো রেসপন্স দেখাল না। রিজভী কী মনে করে যেন ফোন রিসিভ করল। ওপাশ থেকে মাহবুবার ঝলমলে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“কীরে মেঘু? ফোন ধরিস না কেন? ভাইয়াকে খবরটা দিয়েছিস?”
“আমি রিজভী।”
“ওহ ভাইয়া! মেঘা কোথায়? ওকে সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছি, মেসেজ দিচ্ছি ধরছেই না।নাকি আপনাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে?”
রিজভী চতুরতার সহিত বলল,
“মেঘা ঘুমিয়ে ছিল। কীসের খবরের কথা বলছিলে তুমি?”
“সেকি! মেঘা বলেনি আপনাকে?”
“না তো!”
“তাহলে আমি আর কিছু না বলি। ও-ই আপনাকে সুখবরটা দেবে।”
“মাহবুবা, কল কেটো না। মেঘা আমার সাথে রাগ করে বসে আছে। কী হয়েছে কিছুই বলছে না। তুমি কি কিছু জানো?”
মাহবুবা বেশ অবাক হলো। এমন খুশির সময়ে মেঘার রাগ করার কারণ কী থাকতে পারে? নাকি সারপ্রাইজ দেবে বলে রাগের অভিনয় করছে? মেয়েটা এমন কেন? ফোনও ধরেনি, কিছু বলেওনি। এখন সে কী করবে? সত্যটা বললে তো সারপ্রাইজটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
“কী হলো বলো?” রিজভী ফের তাড়া দিল।
মেঘা এবার রিজভীর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কল কেটে দিল। দুহাতে চোখের পানি মুছে জানতে চাইল,
“কেন ঠকালে আমায়?”
রিজভী হতবিহ্বল হয়ে বলল,
“ঠকিয়েছি মানে? কী বলছ এসব?”
“আল্লাহর দোহাই লাগে রিজভী! আর অভিনয় কোরো না আমার সাথে।”
“তুমি কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
মেঘা এবার রিজভীর শার্টের কলার চেপে ধরে বলল,
“অন্য মেয়ের সাথে যখন তোমার সম্পর্ক আছেই, তাহলে কেন আমায় ডিভোর্স দিতে নিষেধ করেছ?”
“তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমার কারো সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।” শার্টের কলার থেকে মেঘার হাত সরিয়ে বলল রিজভী।
মেঘা এবার অতি কষ্টে উদ্ভ্রান্তের মতো হাসতে হাসতে বলল,
“তাই? তাই বুঝি? কোয়াটারে আজ কার সাথে ইন্টিমেট হয়েছিলে?”
রিজভীর মুখের রঙ পাল্টে গিয়েছে। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। মেঘাও বিছানা থেকে নেমে বলল,
“কী হলো? মুখ লুকাচ্ছ কেন এখন?”
রিজভী থতমত খেয়ে বলল,
“কী যা তা বলছ!”
“যা তা বলছি আমি? যা তা?”
মেঘা এবার ফোন থেকে ইন্টিমেটের একটা ছবি বের করে দেখিয়ে বলল,
“এখনো বলবে যা তা বলছি আমি?”
রিজভী ছবিটি দেখে থ বনে গেছে। তার আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আর না আছে মিথ্যা বলার সুযোগ। মেঘা কাঁদতে কাঁদতে ফের বলল,
“চুপ করে আছো কেন? জবাব দাও।”
“আর কী জবাব দেবো? সব তো জেনেই গেছো।”
“কে এই মেয়ে?”
“তা জানা কি জরুরী?”
“জরুরী নয় বলছ? কেন করছ আমার ওপর এরকম মানসিক অত্যাচার? আমি তো মনকে বুঝিয়ে নিয়েছিলাম, তোমাকে ডিভোর্স দিতেও রাজি হয়েছিলাম। তাহলে কেন আমাকে আটকালে? কেন ভালোবাসার অভিনয় করলে? কী চাও তুমি আমার কাছে?”
“বাচ্চা।”
মেঘা বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছে। কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে সে। রিজভীও তার ভালো মানুষের মুখোশ খুলে আসল রূপে ফিরে এসে বলল,
“আমার একটা বাচ্চা চাই, মেঘা। তুমি শুধু আমাকে একটা বাচ্চা দাও। এরপর তোমার মুক্তি। তুমি যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পারো।”
মেঘার কথা বলার মতো ভাষা নেই। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে সে চিনতে পারছে না। এটা কি ওর চিরপরিচিত সেই রিজভী?
“মাহবুবা তখন কীসের সুখবরের কথা বলছিল? তুমি কি প্রেগন্যান্ট?” জানতে চাইল রিজভী।
মেঘা চুপ করে আছে। রিজভী আবারও বলল,
“বলো?”
মেঘা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সে কী করবে, কী বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। বাচ্চার জন্য রিজভী মেঘাকে ডিভোর্স দেয়নি?
মেঘা চোখ-মুখ শক্ত করে পালটা প্রশ্ন করল,
“তোমার তো সম্পর্ক আছেই। তাহলে তুমি আমার কাছে কেন বাচ্চা চাইছ? ঐ মেয়ে কি মা হতে পারবে না?”
“বুদ্ধিমতি মেয়ে। ধরে ফেলেছ ব্যাপারটা। ভালোই হলো। তোমাকে অযথা ব্যাখা করে আমার সময় নষ্ট করতে হলো না। এখন তাহলে আর ঝামেলা কোরো না কেমন?”
মেঘার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সামনে দাঁড়ানো রিজভীকে এখন আর ওর মানুষ মনে হচ্ছে না। মানুষরূপী একটা নরপি’শা’চ যেন দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। কিন্তু মেঘা এখন কী করবে?
চলবে…
