#মেঘবৃক্ষ
#পর্ব_৪
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
রেহেনা বেগম গালে হাত দিয়ে সোফায় বসে আছেন। দুশ্চিন্তায় হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে তার। ঘড়ির কাটায় সময় দেখলেন দুপুর বারোটা পার হয়েছে। রাতুলকে তিনি সেই কখন কল করেছেন! এখনো ছেলেটার বাড়িতে আসার কোনো নাম নেই। ওদিকে ঘরের দরজায় বারংবার ধাক্কা দিচ্ছে মেঘা। কান্না করতে করতে মেয়েটার কণ্ঠও যেন ভাঙতে বসেছে। দরজার এপাশ থেকে তিনি কোনো সান্ত্বনাও দিতে পারছেন না। মেঘা কোনো কথাই শুনতে চাচ্ছে না। অবশ্য পরিস্থিতিও তো তেমন নেই।
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রিজভী বলে গেল, কোনোভাবেই যেন ঘরের দরজা খোলা না হয়। অবশ্য তালা মেরে সে চাবিটাও সাথে করে নিয়ে গেছে। নিচে গিয়ে আবার কিছু সময়ের মধ্যেই দোকান থেকে একগাদা খাবার এনে ঘরে রেখে গেছে। সেই সাথে দুপুরের খাবারটাও। কী হচ্ছে না হচ্ছে রেহেনা বেগম কিছুই বুঝতে পারছেন না। রিজভীকে প্রশ্ন করেও কোনো লাভ হয়নি। মেঘা সম্ভত তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাই কোনো সাড়াশব্দও পাননি তিনি। সকাল নয়টার পরই মেঘার ডাক শুনতে পান তিনি রুম থেকে। বাইরে আসার জন্য মেয়েটা ছটফট করছিল। কিন্তু সে কী করবে? তার কাছে তো কোনো চাবি নেই। উপায়ান্তরহীন হয়ে তিনি ছোটো ছেলে রাতুলকে বাড়িতে আসতে বলেছেন।
রেহেনা বেগমের দুশ্চিন্তার আদি-অন্ত শেষ হওয়ার মধ্যিখানেই বাড়ির কলিংবেলটা বেজে উঠেছে। তিনি দরজা খুলে দেখতে পান, ঘর্মাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রাতুল। ভেতরে ঢুকে সোফায় গা এলিয়ে বসল।
“কীরে বাবা? ঠিক আছিস?” জানতে চাইলেন রেহেনা বেগম।
“আমি ঠিক আছি। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম ছিল। তাই নেমে অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছি।”
রেহেনা বেগম এক গ্লাস পানি এনে পাশে বসলেন। ঘরের দরজায় আবারও ধাক্কাধাক্কির শব্দ। রাতুল পানি পান করতে গিয়েও থমকে গেল। বিস্ময় নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“ঘরে কে?”
রেহেনা বেগম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে জবাব দিলেন,
“মেঘা। তোর ভাইয়া সকালে অফিসে যাওয়ার সময় তালা দিয়ে গেছে।”
“কেন?”
“জানিনা আমি কিছুই। আমাকে কিছু বলেনি। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। তাই তোকে কল করেছি। তুই তাড়াতাড়ি তালাটা ভাঙার ব্যবস্থা কর তো।”
রাতুল পানিটুকু পান করে রান্নাঘর থেকে নোড়া এনে তালায় বারি দিয়ে তালা ভাঙল। দরজা খু্লে দেখতে পেল মেঘা ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফ্লোরে শুয়ে আছে। ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা। রেহেনা বেগম এগিয়ে গিয়ে মেঘাকে ধরে উঠে বসালেন। রাতুলকে বললেন পানি আনতে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলেন,
“কী হয়েছে মা?”
মেঘা অস্পষ্ট কণ্ঠে ভেঙে ভেঙে বলল,
“ও মা…নু..ষ না। আপ…না…র ছেলে মানু…ষ না, মা।”
মেঘাকে ধাতস্থ হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিলেন রেহেনা বেগম এবং রাতুল। মেঘা ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে যা যা বলল তা শুনে একই সাথে মেঘার প্রতি কষ্টে এবং রিজভীর প্রতি ঘৃণায় মনটা বিষিয়ে যাচ্ছিল ওদের। কোনো মানুষ এতটাও নিচে নামতে পারে! মেঘার ফোনটাও পর্যন্ত নিয়ে গেছে, যাতে করে কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ করতে না পারে। রেহেনা বেগম কান্না করে ফেললেন। মেঘার হাত ধরে বললেন,
“আমাকে ক্ষমা করে দিও, মা। আমি ওকে সত্যি মানুষ করতে পারিনি! কিন্তু তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। রাতুল গিয়ে তোমাকে তোমার বাসায় দিয়ে আসবে। ওর মতো জা’নোয়ারের সাথে তোমার থাকতে হবে না, মা।”
রাতুল ওর মায়ের কথামতোই মেঘাকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ল। মেঘাকে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইল, ওর বাসায় কারো সাথে ফোনে কথা বলবে কিনা। মেঘা ইশারায় নিষেধ করল। বাড়ির সামনে গিয়ে মেঘা অস্পষ্ট কণ্ঠে, রাতুলকে চলে যেতে বলল। কারণ রিজভীর প্রতি রাগ যদি বাবা-মা, ভাইরা ওর ওপর দেখিয়ে ফেলে! কিন্তু রাতুল মেঘাকে এই অবস্থায় ফেলে চলে যেতে অপারগতা প্রকাশ করল। মেঘারা থাকে তিন তলায়। বাসায় কোনো লিফ্ট নেই। এই অবস্থায় সিঁড়ি ভেঙে মেঘার তো একার পক্ষে কোনোভাবেই যাওয়া সম্ভব নয়। রাতুল নিজেই ওকে কোলে তুলে বাড়ির তিন তলা পর্যন্ত নিয়ে গেল।
.
.
রিজভীর বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেছে। সে বেশ প্রফুল্ল মনে বাড়ি ফিরলেও যখন দেখল মেঘা নেই, তখন তার প্রফুল্লতাও উবে গেল। মাকে ডেকে মেঘার কথা জিজ্ঞেস করলে, গালে সজোরেে থা’প্প’ড় বসালেন রেহেনা বেগম। ছেলের এমন অপকর্মে লজ্জায় তার মাথা নুয়ে যাচ্ছে। চোখে পানি টলমল করছে। ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টিতে রিজভীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর মতো একটা অ’মানুষকে আমি পেটে ধরেছি বিশ্বাসই করতে পারছি না, রিজভী! তুই আমার ছেলে হওয়ারও যোগ্যতা রাখিস না; সেখানে একটা মেয়ের স্বামী হওয়া তো দূরে থাক।”
রিজভী দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“সব জেনে গেছ তাহলে!”
“সত্য কতদিন লুকিয়ে রাখতি তুই?”
“মেঘা কোথায়?”
রেহেনা বেগম নিশ্চুপ। রিজভী ফের জানতে চাইল,
“মেঘা কোথায়?”
“ওর বাপের বাড়ি।”
রিজভী ডাইনিং টেবিল থেকে একটা গ্লাস নিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে মেরে বলল,
“কেন যেতে দিয়েছ ওকে! ওর গর্ভের বাচ্চাটাকে আমার চাই, মা!”
“জা’নোয়ার! আয়নায় দেখেছিস একবার নিজেকে? মানুষের মতো দেখতে হুবুহু একটা অ’মানুষে রূপান্তর হয়েছিস তুই। কী বলছিস আর কী করছিস জানিস তুই?”
“না, জানিনা। আর জানতেও চাই না। শুধু জানি, তুমি যা করেছ একদম ঠিক করোনি। এই বাড়িতে আর তোমার জায়গা জুটবে না। তোমার সাথে আর থাকব না আমি।”
রেহেনা বেগম কিছু বলার পূর্বেই রিজভী রুমে চলে গেল। খাটে দপ করে বসে মুখ ঢাকল দুহাত দিয়ে। এই মুহূর্তে তার কী করণীয়? মেঘা বাপের বাড়ি চলে গেছে মানে অনেক কিছুই তার হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে গেছে। ঐ বাচ্চা সে পাবে কিনা তা তো অনেক দূরের কথা, এখন তার নিজের জন্যই কিছুটা সংশয় হচ্ছে। মেঘা যদি কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়? মেঘা ওকে ছেড়ে দিলেও ওর পরিবার নিশ্চয়ই রিজভীকে ছেড়ে দেবে না!
এত ভাবনা-চিন্তা করেও যখন কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না রিজভী, তখন কল করল প্রীতিকে। দুবার রিং হওয়ার পর প্রীতি কল রিসিভ করল। রিজভী হন্তদন্ত হয়ে বলল,
“সর্বনাশ হয়ে গেছে, প্রীতি!”
এ কথা শুনে প্রীতিও কিছুটা ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে?”
“মেঘা পালিয়েছে।”
“পালিয়েছে মানে? আপনি না বলেছিলেন ঘরে তালা দিয়ে রেখে এসেছেন?”
“হ্যাঁ। মা তালা ভেঙে ওকে বের করে দিয়েছে। এখন আর কোনো কিছু আমাদের হাতের মুঠোয় আছে বলে মনে হয় না। হয়তো বাচ্চাটিকেও আমরা আর পাব না।”
প্রীতি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“কেন? তখন তো খুব বড়ো বড়ো কথা বলেছিলেন। আপনি সব সামলে নিবেন। এই করবেন, সেই করবেন। এখন কোথায় গেল আপনার সেই দাপট?”
“প্রীতি, আমার পরিকল্পনামাফিক সব হলে আমি ঠিকই সব সামলে নিতে পারতাম। কিন্তু আমার মা! ঐ মহিলা সবকিছু ঘেঁটে দিয়েছে। আমি কি জানতাম নাকি নিজের মা-ই আমার সাথে এমন করবে? ঘরশ’ত্রু বিভীষণ!”
প্রীতি অশ্রাব্য ভাষায় একটা গা’লি দিয়ে বলল,
“ধ্যাত! আমারই ভুল হয়েছে আপনার সব কথায় অন্ধের মতো বিশ্বাস করা।”
রিজভী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,
“প্রীতি, পুরো দুনিয়া আমার বিরুদ্ধে চলে যাক। যা খুশি হয়ে যাক, কথা দাও তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না?”
প্রীতি মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“এই বাল! এখন কি আবেগি কথাবার্তা বলার সময়? কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবেন এখন সেটা দেখেন।”
“আমি সবকিছু সামলে নেব তুমি দেখো…”
“রিজভী?”
কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই রেহেনা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে ডাকতে লাগলেন। রিজভী বিরক্তিকর চাহনি মেলে বলল,
“কী সমস্যা?”
“ড্রয়িংরুমে আয়।”
“কোথাও যেতে পারব না এখন। আমার চোখের সামনে থেকে যাও তুমি।”
রেহেনা বেগম ঠান্ডা গলায় জবাব দিলেন,
“পুলিশ এসেছে।”
পুলিশের কথা শুনেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে রিজভীর। ফোনের এই প্রান্তে প্রীতি তখনো কলে ছিল।
“পুলিশ! কেন?” ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইল রিজভী।
রিজভী ঘরের বাইরে আসছিল না বিধায় পুলিশ নিজেই ঘরের সামনে চলে এলো। রেহেনা বেগমের উদ্দেশে বলল,
“কী ম্যাডাম, আপনার ছেলে আসতে চাচ্ছে না?”
এরপর রিজভীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার যখন এতই কষ্ট হচ্ছে রুম থেকে বের হতে। তখন আমরাই না হয় রুমে চলে আসি। কী বলেন? ভয় পাবেন না। আগে কথাবার্তা বলে, জিজ্ঞাসাবাদ করে তারপর ডিসিশন নেব যে, আপনাকে ঠিক কীভাবে আপ্যায়ন করা যায়।”
রিজভী অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পুলিশের সাথে রাতুলকেও দেখে। এদিকের পুলিশের কণ্ঠ ও কথা শুনে কল কেটে দিয়েছে প্রীতি।
চলবে…
