#মেঘবৃক্ষ
#পর্ব_৫ (অন্তিম পর্ব)
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
________________
প্রীতির বিয়ের আজ চারদিন। ছেলে প্রবাসী। অনেক টাকার মালিক। বয়স কিছুটা বেশি অবশ্য। তাতে সমস্যা নেই। টাকা আছে, পাওয়ার আছে। প্রীতির এখন এগুলোই প্রয়োজন। রিজভীকে আবেগের বশে ভালোবাসতে গিয়ে ভীষণ বড়ো ঝামেলায় পড়তে গিয়েও সে বেঁচে গিয়েছে। বলা ভালো, ওর স্বামী ওকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। পুলিশি ঝামেলা প্রীতিকে মূলত স্পর্শ করতে পারেনি ওর স্বামীর টাকার জন্যই।
প্রীতি যখনই জানতে পেরেছে, রিজভীর নামে মামলা করা হয়েছে তখন থেকেই সে পিছিয়ে গিয়েছে। এসব নাই ঝামেলায় জড়ানোর কোনো মানেই হয় না। ওর কপাল ভালো যে, কিছুদিন আগেই এই বিয়ের প্রস্তাবটা এসেছিল। প্রীতি ঐসময়ে খুব একটা রাজি ছিল না। কিন্তু পরে ভেবে দেখল, এর থেকে ভালো প্রস্তাব তো আর হয়ও না। তাই আর সময় নষ্ট না করে সে বিয়ে করে নিয়েছে। ভীষণ সুখেও আছে সে। রিজভী যখন মামলায় জড়িয়ে বারবার হেনস্তা হচ্ছিল, প্রীতি যখন স্বামীর প্রণয়ে মগ্ন হচ্ছিল।
***
কোর্ট থেকে মাত্র বাড়িতে ফিরেছে রিজভী। দুদিন সে জেলেও ছিল। মা, ভাই কিংবা প্রীতি কেউই যায়নি দেখা করতে। অবশ্য রাতুল এবং রেহেনা বেগম যে থানায় রিজভীকে দেখতে যাবে এই আশাও রিজভী করেনি। যেই মা আর ভাই নিজে পুলিশ নিয়ে আসতে পারে তারা কি আর কখনো যাবে রিজভীকে দেখার জন্য? এসব ঝামেলায় পড়ার পরে প্রীতির সঙ্গেও আর যোগাযোগ হয়নি। প্রীতি নিজেও একটাবার চেষ্টা করেনি। রিজভী পকেট থেকে ফোন বের করে প্রীতিকে কল করল। রিং হচ্ছে না। ব্যস্ত বলছে। আবার কল দিল রিজভী। এবারও ব্যস্ত বলছে। কারো সাথে কথা বলছে ভেবে ফোন রেখে দিল রিজভী। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ভারী দীর্ঘশ্বাস নিল। পুরো বাড়িটা ফাঁকা এখন। রাতুল তো এমনিতেও থাকত না। মা এবং মেঘা থাকত। দুজন মানুষই পুরো বাড়িটা একদম মাতিয়ে রাখত তখন। কিন্তু এখন কেউই নেই। রাতুল হোস্টেলে, মা হয়তো মামার বাড়িতে। আর মেঘা? ওর কী খবর? মেঘার কথা ভাবতেই সে আবারও দীর্ঘশ্বাস নিল। সে কখনোই কল্পনা করতে পারেনি যে, মেঘার জন্য তার এতটা ভোগ পোহাতে হবে!
রিজভী এবার রেহেনা বেগমের নাম্বারে কল করল। তিনবার রিং হওয়ার পর রিসিভ করলেন রেহেনা বেগম। গম্ভীরকণ্ঠে বললেন,
“হ্যালো?”
রিজভী এপাশ থেকে মলিন কণ্ঠে জানতে চাইল,
“কোথায় আছো তুমি?”
“তা জেনে তুই কী করবি?”
“মামার বাড়িতে?”
রেহেনা বেগম চুপ করে রইলেন। যতই ছেলে অন্যায় করুক, তিনি তো মা তাই তারও কষ্ট হয়। বুক ভারী হয়ে আসে কষ্টে। গলা ধরে আসে। কান্না আটকাতে পারেন না তিনি। তবে এও সত্য যে, তিনি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। আজও দেবেন না। যেই ভুল তার ছেলে করেছে, এর শাস্তিও তো ওকে পেতেই হবে।
রিজভী দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“কীভাবে পারলে মা? কীভাবে নিজের ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারলে? আমি কি আসলেই তোমার নিজের ছেলে? আজ কেন জানি বিশ্বাস করতে পারছি না!”
“আমিও বিশ্বাস করতে পারিনি যে, আমার পেটের সন্তান এরকম জঘন্য কোনো কাজ করতে পারে। আমি যা করেছি, তোর মা হয়ে করিনি। একজন নারী হয়ে করেছি। তুই মেঘার সাথে অন্যায় করেছিস। যেই অন্যায়ের কোনো ক্ষমা হয় না। আমার মাতৃমন তোকে ক্ষমা করতে পারলেও, নারীসত্তা কখনো ক্ষমা করতে পারবে না।”
এখন রিজভী চুপ করে আছে। রেহেনা বেগম ফের বললেন,
“তুই না মেঘাকে ভালোবাসতি, রিজভী? তোর মনে আছে ওকে বিয়ে করার জন্য কত পাগলামি করেছিলি তুই? একটাবারও কি তোর এসব কিছু মনে পড়েনি?”
“তুমি বাড়িতে ফিরে এসো।”
“বাড়িতে ফিরে যাব? ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় রেখেছিস তুই? সমাজে মুখ দেখাতে পারছি না। এলাকার মানুষ ছি, ছি করে। তোর মা আমি এর থেকে লজ্জাজনক অনুভূতি এখন আর আমার জন্য নেই।”
“আমার ভীষণ একা লাগছে, মা!”
“একা লাগছে কেন? তোর প্রীতি আছে না? যা গিয়ে কল কর ওকে। বিয়ে করে ওকে নিয়ে সুখে থাক। আমাকে আর ফোন করবি না।”
রিজভীকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না তিনি। ফোন রেখেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাবতে লাগলেন, কেন তার ছেলেটা এমন অ’মানুষ হয়ে গেল!
কল কাটার পর অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল রিজভী। কী করবে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। প্রীতির সাথে দেখা করাটা এখন ভীষণ প্রয়োজন। সে আবারও প্রীতিকে কল করল। এখনো ফোন ব্যস্ত বলছে। এতক্ষণ ধরে প্রীতি কার সাথে কথা বলছে? রিজভী কী মনে করে যেন ফেসবুকে গেল। কিন্তু প্রীতির আইডি খুঁজে পাচ্ছে না। হোয়াটসএপে গিয়ে দেখল মেসেজ সেন্ড হচ্ছে না। কলও যাচ্ছে না। প্রোফাইল পিকও শো করছে না। ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ করতে গিয়ে রিজভী শিওর হলো যে, প্রীতি তাকে সবকিছু থেকে ব্লক করেছে। কিন্তু কেন? রিজভী এতদিন কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি তাই? নিশ্চয়ই রাগ করে আছে! রিজভী উঠে পড়ল। প্রীতির বাসায় যেতে হবে।
সে তখনই বাড়ি থেকে বের হলো প্রীতির বাসায় যাওয়ার জন্য। বাসা থেকে বের হয়ে গলির মোড়ে হাঁটছিল সে। সামনে থেকে রিকশা নিতে হবে। গলির দুইপাশেই দোকান। চায়ের দোকানে, মুদি দোকানে সবখানেই মানুষ অদ্ভুতভাবে দেখছে রিজভীকে। কারো চোখে-মুখে ঘৃণার প্রতিচ্ছবি। কেউবা খুব মজা পাচ্ছে ওকে দেখে। কেউ কেউ কানাঘুষা করছে। আবার কেউ কেউ ওকে দেখে হাসাহাসি করছে। সবার মধ্য থেকে সালাম মিয়া বেরিয়ে এলেন চায়ের দোকান থেকে। একই এলাকায় থাকেন। রিজভীকে ভীষণ স্নেহ করতেন তিনি। মাঝেমধ্যেই টাকা-পয়সা ধারও নিতেন। সেই ধারের অনেক টাকাই এখনো বাকি পড়ে আছে। শোধ করেননি। রিজভীও চক্ষুলজ্জায় চায়নি কখনো।
সালাম মিয়া পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলেন,
“কই যাইতাছো?”
রিজভী হাসার চেষ্টা করে বলল,
“এইতো চাচা, একটু সামনে যাচ্ছি।”
“খাইছ কিছু?”
“না।”
“চলো হোটেলে যাই। খাওয়াই তোমারে।”
“না, চাচা। ক্ষুধা নাই এখন এমনিও। খাব না।”
“ওহ। পুলিশের ঝামেলা মিটছেনি?”
“না, চলছে এখনো।”
“মেঘার লগে কথা হয় না?”
“না।”
“ওহ। আবার বিয়া করতাছ কবে?”
এই পর্যায়ে রিজভী চুপ করে রইল। তিনি বললেন,
“বিয়া কইরালাও। তোমার মা-ও তো তোমার লগে এখন থাকে না। একলা একলা কেমনে আর থাকবা? এলাকার মানুষ অনেক রকমের কথা কয় বুঝলা। মজা নেয়।”
রিজভী নিশ্চুপ। তিনি বললেন,
“কামডা কিন্তু ভালাও করো নাই। এত ভালা একটা মাইয়ারে ঠকাইলা। নতুন প্রেমিকা কি বেশি সুন্দরী? নাকি ম্যালা ট্যাকা?”
রিজভী চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,
“চাচা, আমি আসি এখন। পরে কথা হবে।”
রিজভী কোনো রকম এড়িয়ে গিয়ে একটা রিকশায় উঠে পড়ল। ও চলে যাওয়ার পর সালাম মিয়া একদলা থুথু ফেলে খুব বিশ্রি একটা গা’লি দিলেন রিজভীকে উদ্দেশ্য করে।
রিকশা এসে থেমেছে প্রীতিদের বাড়ির সামনে। ভাড়া মিটিয়ে রিজভী বাড়ির দারোয়ানের কাছে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, প্রীতি আছে বাড়িতে?”
দারোয়ান সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কে?”
রিজভী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“আমি ওর পরিচিত। ভেতরে যাওয়া যাবে?”
দারোয়ান গেইট খুলল না। যেতে নিষেধও করল না। শুধু বলল,
“প্রীতি বাড়িতে নাই।”
“কোথায় গেছে?”
“শ্বশুরবাড়ি।”
রিজভীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! সে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল,
“শ্বশুরবাড়িতে মানে! প্রীতির বিয়ে হয়ে গেছে?”
দারোয়ান বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলল,
“বিয়া না হইলে শ্বশুরবাড়ি গেল কেমনে?”
“আপনি কি আমাকে মিথ্যা বলছেন?”
“আপনারে মিথ্যা কথা বইলা আমার লাভ কী? যান এখন বাড়ির সামনে থেইক্যা।”
রিজভী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দিকদিশা হারিয়ে এদিক-সেদিক হাঁটছে। কিছুতেই সে এটা মানতে পারছে না যে, প্রীতি বিয়ে করে নিয়েছে। যার জন্য সে এতকিছু করল এখন কিনা সেই মেয়েই ওকে ধোঁকা দিল! এই প্রথমবারের মতো রিজভীর মনে হতে লাগল, সে সত্যিই একা।
সে বাড়িতে গিয়ে একটা বন্ধ সীম খুঁজে বের করে কল করল প্রীতিকে। এই নাম্বার প্রীতি চেনে না। রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কল রিসিভ করল প্রীতি। সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম।”
রিজভী কোনোরকম ভনিতা করা ছাড়াই বলল,
“কল কাটবে না। নয়তো তোমার শ্বশুরবাড়ির সামনে গিয়ে সিনক্রিয়েট করব!”
থ্রেড এবং রিজভীর কণ্ঠ শুনে হেসে ফেলল প্রীতি। হাসতে হাসতে বলল,
“ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে? আমি এমনিও কল কাটতাম না। বলুন আপনার কী বলার আছে? আর হ্যাঁ, ফাঁকা বুলি আমাকে আর দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনার ব্যাপারে আমার স্বামী সবই জানে।”
“আমার সঙ্গে যে রুমডেট করেছ এটাও জানে?”
প্রীতির দম্ভ যেন মুহূর্তেই শেষ। রিজভী বলল,
“কী হলো? চুপ করে আছো কেন এখন?”
“আজে-বাজে কথা বলবেন না।”
রিজভী হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,
“হাহা! আজে-বাজে কথা? এখন আমি আজে-বাজে কথা বলছি? যখন আমার সাথে রাত কাটিয়েছ তখন বাজে লাগেনি?”
“মুখ সামলে কথা বলুন।”
রিজভী এবার চেঁচিয়ে গা’লি দিয়ে বলল,
“চুপ কর মা*গি! আমার জীবন নষ্ট করে, আমার সাজানো সংসার নষ্ট করে এখন তুই জামাই নিয়া সুখে সংসার করতেছিস?”
“একদম গা’লা’গা’লি করবেন না। আমি বলেছিলাম সংসার ভাঙতে? আপনি যেচে এসেছেন বউ থাকতেও আমার কাছে।”
“আসবই তো। তুই তো ছলনাময়ী, প’তি’তা। রূপ আর শরীর দেখিয়ে আমাকে ভুলিয়েছিস। তোকে তো আমার তখনই চিনে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু চিনতে পারি নাই। অন্ধ হয়ে গেছিলাম আমি তোর প্রেমে। তুই তো বে’শ্যার থেকেও খারাপ।”
প্রীতি নিজের রাগ আর কন্ট্রোল করতে না পেরে বলল,
“আর তুই কী রে জানোয়ার? আমি বে’শ্যা হলে তুই বে’শ্যার দালাল। তুই কি তুলসী পাতা? শুইলে আমি তোর সাথেই শুইছি। ঘরে বউ থাকতেও তোর শরীরের জ্বা’লা মিটে না। বাইরেও মেয়ে লাগে তোর কু’ত্তা’র বা’চ্চা।”
গালি শুনে রিজভীর মাথা আরো গরম হয়ে যায়। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“বে’শ্যার বাচ্চা, তোরে যদি আমি সামনে পাই কখনো তাইলে কসম খু’ন করে ফেলব। আমার জীবন তুই জা’হা’ন্নাম বানিয়ে দিছিস না? তোর জীবনও আমি জা’হা’ন্নাম বানাই দিব মনে রাখিস। তখন কান্না ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না তোর।”
“আরে যা! যা পারিস কর। রাস্তায় গিয়ে ম’র তুই জা’নো’য়া’রের বা’চ্চা। আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করবি না।”
প্রীতি কল কেটেই নাম্বার ব্লক করে দিল। রাগে-জিদ্দে হাত-পা থরথর করে কাঁপছে রিজভীর। মাথার চুল টেনে ধরে বসে আছে সে। প্রীতিকে সামনে পেলে নির্ঘাত সে খু’ন করে ফেলত।
রিজভী উ’ন্মা’দ থেকে এখন আরো বেশি উ’ন্মা’দ হতে লাগল। নিজের করা অন্যায়, ভুলগুলো কুঁকড়ে কুঁকড়ে খাচ্ছে তাকে। মেঘার কথা মনে পড়ছে। কিন্তু কোন মুখে সে মেঘার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? কীভাবেই বা ক্ষমা চাইবে? মেঘা কি আদৌ ক্ষমা করবে তাকে? করবে না। সে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। এই ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না। রিজভীর নিত্যসঙ্গী এখন নেশা। ঘরের এককোণে পড়ে থাকে। অফিসেও যায় না। কতদিন সে নিজেকে এভাবে ঘরবন্দি করে রেখেছে সেই হিসাব হয়তো তার নিজেরও নেই।
প্রায় দুমাস পার হয়ে গিয়েছে রিজভীর সাথে কারো যোগাযোগ নেই। রেহেনা বেগমের মন ভীষণ অস্থির থাকে সর্বদা। খুব ইচ্ছে করে রিজভীর সাথে কথা বলতে। কিন্তু তার ইচ্ছেকে সে দমিয়ে রাখে। অন্যায়কে তো প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না কোনোভাবেই। কিন্তু আজ তাকে বাধ্য হয়েই বাড়িতে আসতে হয়েছে। সাথে রাতুলও আছে।
বাড়ির অবস্থা ভীষণ নাজেহাল। বস্তির মতো অবস্থা। সোফায় হাত-পা ঝুলিয়ে শুয়ে ছিল রিজভী। রেহেনা বেগম ডেকে ওঠালেন। নে’শা’য় জড়গ্রস্ত হয়ে রিজভী ঠিকমতো তাকাতেও পারছে না। রেহেনা বেগম কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। রাতুলেরও খারাপ লাগছে রিজভীর এই অবস্থা দেখে। শত হোক ভাই তো!
রিজভী আবছায়া দৃষ্টিতে মা ও ভাইকে দেখে বলল,
“তোমরা এসেছ! কেন এসেছ?”
রেহেনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“তোর এই হাল কেন?”
রিজভী হেসে বলল,
“কর্মের ফল, মা। মেঘাকে ঠকিয়েছি না আমি? যার জন্য ঠকিয়েছি, সেও আমাকে ঠকিয়েছে।”
একটু থেমে সে রেহেনা বেগমের হাত ধরে বলল,
“মা, ও মা, মা গো মেঘাকে এনে দেবে আমায়? মা, আমি মেঘার কাছে যাব। ওর পা ধরে মাফ চাইব আমি।”
রেহেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
“মেঘা তোকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে। এজন্যই আজ এসেছিলাম আমি।”
রিজভী বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলল,
“কীহ্! এটা কীভাবে সম্ভব? আমি মানি না। মা, চলো আমরা মেঘার কাছে যাই? মা, চলো যাই? মা চলো না!”
রিজভী বাচ্চাদের মতো বায়না করছে। রাতুল অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আচ্ছা যাব। কিন্তু তোমার এই অবস্থায় কীভাবে সম্ভব? আগে ফ্রেশ হও তুমি। গোসল করো।”
রিজভী খুশি হয়ে বলল,
“ঠিক বলেছিস।”
ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে আগে ব’মি করল রিজভী। শেভ করল। ভালোমতো গোসল করল সাবান দিয়ে। কতদিন যে হয়েছে সে গোসলও করে না। রেডি হয়ে এসে বলল,
“এখন চল।”
রাতুল প্রলম্বিত শ্বাস নিল। সে জানে, খুব একটা লাভ হবে না। কিন্তু তবুও যাচ্ছে শুধু রিজভীকে শান্ত করার জন্য। মানুষ ভুল করে, ভুল বোঝে কিন্তু বড্ড দেরিতে। মা এবং রিজভীকে নিয়ে মেঘাদের বাড়িতে গেল রাতুল।
.
.
মেঘাদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছে সবাই। মেঘার বাবা-মা শুরুতে রিজভীকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে চায়নি। মেঘার জন্য দিতে হয়েছে। তবে মেঘা সামনে আসেনি। সে তার রুমে বসে আছে। রেহেনা বেগম এবং রাতুল চুপ করে বসে ছিল। রিজভীর পক্ষ নিয়ে কথা বলার মতো মুখ তাদের নেই। রিজভী নিজেই উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মেঘা কোথায়?”
মেঘার বাবা দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
“মেঘাকে কী দরকার তোমার?”
“ওকে ডাকুন। ওর সাথে আমার কথা আছে।”
“মেঘা তোমার সাথে দেখা করবে না।”
“কেন করবে না? ও আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে কেন? আমি ডিভোর্স পেপারে সাইন করব না।”
“খবরদার বলতেছি, একদম নাটক করবে না। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো একদম। তুমি যা করেছ এরপরও এখানে এভাবে বসে থাকতে পারছ শুধুমাত্র আমার মেয়ের জন্যই।”
রিজভী এবার অনুনয় করে বলতে লাগল,
“একটাবার শুধু মেঘাকে ডাকুন। আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই। প্লিজ! আপনার পায়ে পড়ি আমি।”
রিজভী সত্যিই পায়ে ধরল। তিনি পা ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন,
“পা ছাড়ো। দূরে থাকো। মেঘা আসবে ন…”
তিনি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মেঘা ওর রুম থেকে বেরিয়ে এলো। বাবা-মায়ের পাশে বসে শান্তকণ্ঠে বলল,
“বলুন।”
রিজভী কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল চুপ করে। মেঘাকে ভীষণ অন্যরকম লাগছে দেখতে। কীরকম পার্থক্য তা ঠিক বুঝতে পারছে না। মেঘা ফের বলল,
“যা বলার দ্রুত বলুন।”
“মেঘা, আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
“তারপর?”
“আমি ভুল করেছি। জানি ক্ষমা করতে তোমার কষ্ট হবে। কিন্তু তবুও একটা শেষ সুযোগ চাচ্ছি আমি তোমার কাছে। আমার দ্বারা আর কখনো কোনো ভুল হবে না। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও প্লিজ!”
“প্রীতির বিয়ে হয়ে গেছে বলে আপনি আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন? নাহলে তো বুঝতেন না।”
“আমি সব ভুল করেছি মেঘা সব। অন্ধ হয়ে গেছিলাম আমি। আমি ঠিক-বেঠিক বুঝতে পারিনি।”
“আমিও এতদিন অন্ধ ছিলাম। কিন্তু এখন ঠিক হয়ে গেছি। সুস্থ হয়ে গেছি। তাছাড়া সব ঠিক করব মানে কী? ডিভোর্স লেটার পাননি আপনি?”
“বাচ্চাটার কথাও কি তুমি ভাবছ না, মেঘা?”
“যেই বাচ্চাই নেই সেই বাচ্চার কথা কীভাবে ভাবব?”
কথাটা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে মেঘার। চোখ টলমল করছে। কিন্তু সে কান্না করতে চাচ্ছে না। অন্তত রিজভীর সামনে তো নয়-ই।রেহেনা বেগম, রাতুলও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রিজভী বিস্ময় নিয়ে বলল,
“বাচ্চা নেই মানে?”
এরপর থেমে বলল,
“তুমি বাচ্চা নষ্ট করে ফেলেছ!”
মেঘা চিৎকার করে বলল,
“আপনার মতো অ’মানুষ মনে করেন আমাকে? আপনি মানুষ ঠকাতে পারেন, মানুষ খু’ন করতে পারেন। কিন্তু আমি পারি না। আমার বাচ্চা আমি নষ্ট করব কীভাবে ভাবলেন আপনি এটা?”
“তাহলে?”
এই পর্যায়ে মেঘার মা বললেন,
“তুমি তো আমার মেয়েটাকে একা মা’রো’নি। বাচ্চাটাসহ মে’রে’ছ। মানসিক রোগি হয়ে গেছিল আমার মেয়ে। সব হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে গিয়েছিল।”
“বাচ্চার কী হয়েছে বেয়াইন?” জানতে চাইল রেহেনা বেগম।
“মিসক্যারেজ।” বলল মেঘা।
চোখ থেকে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। চোখের পানি মুছে নিয়ে মেঘা বলল,
“আমার আর হারানোর কিছু নেই। ফিরে পাওয়ারও কিছু নেই। আপনি প্লিজ এখান থেকে চলে যান। পুরনো ক্ষত আমাকে আবারও পোড়াচ্ছে। আপনাকে দেখলেই আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, কত বাজেভাবে আমাকে ঠকিয়েছেন আপনি। আপনার জন্য আমার বাচ্চাটা সুস্থভাবে দুনিয়াতে আসতে পারেনি। আপনি চলে যান আমার চোখের সামনে থেকে। চলে যান। সহ্য করতে পারছি না আর।”
মেঘা নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিয়েছে। রিজভীও পিছু যেতে চাইলে মেঘার বাবা পথ আটকে দাঁড়ালেন। হুংকার দিয়ে বলেন,
“এখনই আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আমার মেয়ের ত্রিসীমানায় তোমাকে আর দেখতে চাই না।”
রাতুল রিজভীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রিজভী বারবার বলছে,
“আমি আবারও আসব, মেঘা। তুমি যতক্ষণ না ক্ষমা করবে ততক্ষণ আমি তোমার পিছু ছাড়ব না।”
মেঘা দরজার ওপাশ থেকে রিজভীর কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে। সে কাঁদছে অঝোরে। কিন্তু রিজভীর জন্য নয়। বাচ্চাটির জন্য, নিজের জন্য, ভুল মানুষকে ভালোবাসার জন্য। রিজভী তখনো বারবার বলছিল, সে আবারও আসবে। আসবে হয়তো ঠিকই কিন্তু মেঘার সাথে ওর কখনোই দেখা হবে না। আজ রাতেই মেঘার ফ্লাইট। কানাডায় যাবে চাচ্চুর বাসায়। আপাতত সে টুরিস্ট ভিসায় গেলেও, খুব দ্রুত সে দূরদেশেই পাড়ি জমাবে। এই দেশে সে মুক্তভাবে বাঁচতে পারবে না। দম আটকে আসে তার।
ধোঁকা খুব ভয়ানক। কর্ম যেমন, ফলও তেমন। রিজভী যেমন নিজেও সুখে নেই, তেমনই সুখে নেই প্রীতিও। বিয়ের এক মাস না যেতেই স্বামীর সকল কুকীর্তি সামনে চলে এসেছে। বিয়ের আগে অজস্র মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পরও সেসব সম্পর্ক বহাল আছে। প্রীতি সব জেনেও কিছু করতে পারছে না। নিরবে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অতীতের কর্মের কথা ভেবে রাত পার করে।
________
পরিশিষ্ট: কানাডার এয়ারপোর্টে নেমে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে মেঘা। কেউ নেই। মেজ চাচ্চুর ছেলে নাদিমের আসার কথা রিসিভ করতে। কোথায় আছে সে?
“মেঘবতী?”
মেঘা ভয় পেয়ে ভীত চোখে পেছনে তাকাতেই হাসি-খুশি নাদিমকে দেখতে পেল। সেই কত ছোটোবেলায় দেখেছিল! কানাডায় শিফ্ট হওয়ার পর নাদিম কখনোই আর বাংলাদেশে যায়নি। এমনকি বেড়াতেও না। এত বছরেও মানুষটা একটুও বদলায়নি। আগের মতোই আছে। না, একটু বদলেছে। আগের থেকে আরো বেশি সুন্দর এবং হ্যান্ডসাম হয়েছে। গালের টোল আরো বেশি ভিজিবল এখন।
মেঘা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো ভাইয়া?”
“আমি তো ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
মেঘা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আছি আরকি!”
নাদিম ওর হাত থেকে লাগেজ নিয়ে বলল,
“আছি, আছি বললে হবে না। ভালো থাকতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ্ বলতে হবে। আল্লাহর রহমত নিয়ে সুখে থাকতে হবে। মেঘবৃক্ষের মতো বাড়তে হবে।”
“মেঘবৃক্ষ?”
“হুম, মেঘবৃক্ষ। মেঘ দিয়ে বানানো গাছ।”
মেঘা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নাদিম বলল,
“বুঝতে পারছিস না?”
“না।”
“মেঘ কোথায় থাকে?”
“আকাশে।”
“রাইট। মেঘ কি কেউ ছুঁতে পারে?”
“না।”
“একদম। তুই হবি সেই মেঘের বৃক্ষ, যাকে কোনো অসৎ, খারাপ লোক ছুঁতে পারবে না। শুধু তুই যাকে ভালো মনে করবি তার ওপরেই বৃষ্টি হয়ে বর্ষিত হবি। গাছে পানি দিলে যেমন গাছ বাড়ে, ভালো থাকে। তুইও যত্নে বাড়বি, জীবন্ত থাকবি।”
মেঘা না চাইতেও হেসে ফেলল। গাড়িতে উঠে বসে বলল,
“কী যে উদ্ভট কথা বলো তুমি!”
নাদিম পাশের সিটে বসে বলল,
“উদ্ভট কথা বলছি নাকি? বললে বলেছি। তবে কথা কিন্তু ঐটাই।”
“কোনটা?”
“এখন থেকে তুই মেঘবৃক্ষ।”
মেঘা হাসল। হেসে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা তুলোর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। টুকরো টুকরো মেঘগুলো একত্রিত হয়েই কি আস্ত একটা গাছের মতো হবে? যাকে নাদিম ভাইয়ের ভাষায় বলে, মেঘবৃক্ষ?
(সমাপ্ত)
