#মেঘবৃক্ষ
#সূচনা_পর্ব
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
রিজভী প্রথমবারের মতো হাত ধরে বলল,
“ডিভোর্স পেপারে সাইন না করলেই কি নয়?”
মেঘা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে রিজভীর দিকে। বিগত কয়েক মাস ধরে সে অমানবিক অত্যাচার করেছে মেঘার ওপর। শুধুমাত্র ডিভোর্স পেপারে সাইন করানোর জন্য। আর আজ সেই বলছে, সাইন না করতে! মেঘা বিগলিত হয়ে পড়ল না; বরঞ্চ অতি শীতলকণ্ঠে জানতে চাইল,
“তার কারণ?”
”আমার মনে হচ্ছে আমাদের সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত।”
”সেটা আজই কেন মনে হচ্ছে রিজভী? এতদিন কেন নয়? কোর্ট থেকে এখন নোটিশ এসে পড়েছে।”
”আমি তো আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছি। শেষবারের মতো আমায় ক্ষমা করো। আমরা একসাথে থাকতে চাই। আবার আগের মতো।”
মেঘা রিজভীকে ভালোবাসে। প্রচণ্ডরকম ভালোবাসে। বিয়ের আগে রিজভীও কম ভালোবাসতো না। মেঘার বাবা-মা কোনোভাবেই রাজি ছিল না মেয়েকে রিজভীর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। তখনো দুজনের মাঝে কোনো সম্পর্ক ছিল না। মনে মনে পছন্দ করত তারা। রিজভী যখন ভালোবাসার কথা জানায় মেঘা তখন বলেছিল,’আমি কোনো রিলেশনে যেতে পারব না। আপনি যদি আমায় সত্যিই ভালোবেসে থাকেন তাহলে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। আর নয়তো কখনো আমার সামনে আসবেন না।’
রিজভী রাজি হয়েছিল। সে ছিল তখনো বেকার। মেঘার পরিবার রাজি হবে কি, রিজভীর পরিবারই রাজি ছিল না। ছেলের পাগলামির কাছে হার মেনে ওনারা রাজি হয়। মেঘার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। মেঘার বাবা-মা, ভাই কেউই রাজি ছিল না। রিজভীর পাগলামির কাছে হার মানতে বাধ্য হয় মেঘাও। শান্তশিষ্ট স্বভাবের মেঘা লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে জানিয়েই দিয়েছিল, বিয়ে করতে হলে সে রিজভীকেই করবে। বড্ড আদরের মেয়ে ছিল সে। মেঘার পরিবারও রাজি হয়। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর দুজন এক হয়। বিয়ের পরপরই রিজভী ছোটোখাটো একটা চাকরী পেয়ে গিয়েছিল। এরপরের বছরে বেশ ভালো মানের একটা চাকরী হয়ে যায়। আর আজ বিয়ের তিন বছর চলছে। অন্যদিকে রিজভীর মাঝেও পরিবর্তন এসেছে মাস সাতেক হবে।
মেঘা পুরনো কথা স্মৃতিচারণ করে দীর্ঘশ্বাস নিল। উকিল তাকিয়ে আছেন ওদের দিকে। ডিভোর্সের কথা দুই পরিবারের এখনো কেউ জানে না। রিজভীর মা আর ছোটো ভাই ছাড়া এখন আর কেউ নেই। চিন্তিত মেঘাকে দেখে উকিল পরামর্শ দিলেন আরেকটা সুযোগ দেওয়ার জন্য। সংসার ভাঙার যন্ত্রণা বড্ড ভয়াবহ। মেঘা রাজি হয়ে যায়। সে আবারও রিজভীর সাথে বাড়িতে ফিরে আসে। নিজের সাজানো সংসারে। মেঘাকে বিছানার ওপর বসিয়ে রিজভী বসে ফ্লোরে। মেঘার কোলের ওপর মাথা রেখে দু’হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমায় কখনও ছেড়ে যাবে না তো মেঘা?”
মেঘা নিরুত্তর। রিজভী আবার বলল,
“বিশ্বাস করো আমি তোমায় অনেক বেশি ভালোবাসি। মাঝখানে যে আমার কী হয়েছিল! মোহে আটকে গিয়েছিলাম আমি। আর এখন নিজের ভুলটাও বুঝতে পারছি। তুমি আমার জীবনে থাকবে না এটা ভাবতেই আমার দম আটকে আসে।”
মেঘা কেঁদে ফেলে। এতদিন আল্লাহ্-র কাছে সে এটাই তো চেয়েছিল রিজভী পরিবর্তন হয়ে আবারও ফিরে আসুক। আল্লাহ্ তার বান্দাকে কখনো নিরাশ করে না। মেঘাকেও করেননি।
ফু্ঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনে রিজভী মাথা তুলে তাকায় মেঘার দিকে। দু’হাতে মেঘার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“এই পাগলি তুমি কাঁদছ কেন? তোমায় আর কখনো কাঁদতে দেবো না।”
সে মেঘাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতে মেঘার কান্নার দমক আরও বেড়ে যায়। সে আষ্টেপৃষ্ঠে আরও শক্ত করে রিজভীকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলল,
“তোমায় ছাড়া আমি নিজেও ভালো থাকতে পারতাম না রিজভী। নিজের চেয়েও বেশি যে আমি তোমায় ভালোবাসি।”
রিজভী আদুরে হাতে মেঘার চুলে হাত বুলাল। তারপর মেঘাকে ছেড়ে দিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে, এক এক করে শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। মেঘা তখনো ফোঁপাচ্ছিল। রিজভী এগিয়ে যায় মেঘার দিকে। দুজনের মাঝে এখন কিছুটা মাত্র দূরত্ব। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে দুজনেরই। মেঘা বাঁধা দেয় না রিজভীকে। রিজভী কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“বাবা কবে হব আমি মেঘা?”
মেঘা লজ্জায় জবাব দিতে পারেনি। মুখ লুকিয়েছে রিজভীর বুকে।
____
তিনটা মাস মেঘার অতি সুখে কাটে। রিজভীর এতদিনের অপমান, অত্যাচার সব সে তার ভালোবাসা দিয়ে মেঘাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। সময়টা এখন ঠিক আগের মতো মনে হয়। বিয়ের পর প্রথম প্রথম যেরকম অনুভূতি হতো ঠিক সেরকম। রিজভীর মা রেহেনা বেগমও ছেলে আর বউয়ের খুশি দেখে বেজায় খুশি। ঘরের মধ্যে এতদিন কোলাহল দেখে তিনি গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতেন। ছেলে তার কোনো কথাই শুনত না। রিজভী অফিসে চলে যাওয়ার পর চিন্তিত মুখে বসে ছিল মেঘা। রেহেনা বেগম মেঘাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
”কী হয়েছে মা?”
শাশুড়িকে দেখে মৃদু হাসার চেষ্টা করল মেঘা। বসার জায়গা করে দিয়ে বলল,
“বসুন মা।”
তিনি বসলেন। মেঘার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন,
“রিজভী কি আবারও তোকে কিছু বলেছে?”
”না, মা। এখন রিজভী অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।”
”তাহলে মন খারাপ করে বসে আছিস কেন?”
”মন খারাপ না। কয়েক মাস ধরে পিরিয়ড হচ্ছে না তাই চিন্তা হচ্ছে।”
রেহেনা বেগমের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। তাকে কিছুটা উচ্ছসিতও দেখায়। তিনি মেঘাকে শান্ত করে বললেন,
“একবার ডাক্তারের কাছে যা। পরীক্ষা করে দেখ।”
শাশুড়ি কী বোঝাতে চাচ্ছে সেটা মেঘা বুঝতে পেরে কিছুটা লজ্জাও পেল। শাশুড়ির প্ল্যান মোতাবেক রিজভীকে কিছু না জানিয়েই বান্ধবী মাহবুবাকে নিয়ে সে ডাক্তারের কাছে যায়। রিপোর্ট দেবে পরেরদিন। রিজভীকে সে এই বিষয়ে এখনই কিছু জানাল না।
রাতে বাড়ি ফেরার পথে পকেটে করে বেলী ফুলের মালা নিয়ে আসে রিজভী। ডিনারের পর সব কাজ শেষ করে মেঘা যখন ঘরে আসে তখন হেঁচকা টানে তাকে বুকের কাছে নিয়ে আসল। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“রাতেও তুমি এত ব্যস্ত থাকো?”
”কোথায় এত ব্যস্ত দেখলে? টেবিল গুছালাম, খাবারগুলো ফ্রিজে রাখলাম আর কয়েকটা এঁটো থালা-বাসন ছিল সেগুলোই ধুলাম।”
”এগুলো কি কম নাকি? কত বলি একটা কাজের লোক রাখি। তুমি তো শোনোই না।”
”রাতুল তো হোস্টেলেই থাকে। মাত্র তিনজনের সংসার। এরজন্য আবার কাজের লোক লাগবে নাকি? আমার সংসার আমিই সামলাতে পারব।”
”আমি জানি ম্যাম, আপনি যে পারবেন। কিন্তু এইযে কাজ করতে গিয়ে আমায় যে সময় দিচ্ছেন না।”
”তুমি যে সারাদিন অফিসে থাকো আমি কি কিছু বলি?”
”তোমার সঙ্গে কথায় পারব না। মাফ চাই। এখন চোখ বন্ধ করো তো।”
”কেন?”
”আগে তো করো।”
মেঘা চোখ বন্ধ করার পর বেলী ফুলের মালা সামনে রেখে বলল,
”এবার তাকাও।”
মেঘা ফুল দেখে খুশি হয়ে গেল। মিষ্টি করে হেসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ।”
”শুধু থ্যাঙ্কিউ?”
”তবে আর কী?”
”ভালোবাসা চাই।”
”ভালো তো বাসিই।”
”মুখে বললে তো হবে না। আমার তো প্র্যাক্টিক্যালি চাই।”
কথা বলতে বলতে রিজভী মেঘাকে সুড়সুড়ি দিতে থাকে আর মেঘা খিলখিল শব্দ করে হেসে ওঠে।
দুজনের ভালোবাসাময় রাত্রি কাটার পর আরো একটা সুন্দর সকাল দেখার সৌভাগ্য হয় মেঘার। সে গোসল করে ফজরের নামাজ আদায় করে নিল। সকালের নাস্তা একাই বানায় সে। আগে শাশুড়িও সাহায্য করার জন্য উঠত। কিন্তু মেঘার কড়া নিষেধ আছে। তাই রেহেনা বেগম এখন শুধু নামাজ পড়েই শুয়ে থাকেন। রিজভী সাতটার দিকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে অফিসে চলে গেল। দশটার দিকে মেঘাও হাসপাতালে যায় রিপোর্ট আনার জন্য। রিপোর্ট দেখে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। আনন্দের অশ্রু তার চোখে। রিপোর্ট পজিটিভ! মাহবুবা মেঘাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কংরাচুলেশন দোস্ত।”
মেঘাও মাহবুবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“‘থ্যাঙ্কিউ দোস্ত।”
”ভাইয়াকে এবার খবরটা দে।”
”ভাবছি ওর অফিসে গিয়েই দেই?”
”এটা ভালো আইডিয়া। তুই কি একা যেতে পারবি?”
”কেন?”
”আসলে আমার শাশুড়ি কিছুটা অসুস্থ।বেশি দেরি করলে বুঝিসই তো! তার মধ্যে ভাইয়াকে এত বড়ো সুখবর দিবি তোদের আলাদা একটা স্পেস প্রয়োজন।”
মাহবুবার দুষ্টু কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারে মেঘা। কাঁধে চাপড় দিয়ে বলল,
“তুই আর ভালো হবি না।”
মাহবুবা হাসল। এরপর সে চলে গেল তার বাড়ির দিকে আর মেঘা গেল রিজভীর অফিসে। তবে রিজভী অফিসে ছিল না। কোথায় গেছে জিজ্ঞেস করলে পি.এ জানায়, রিজভী কিছুটা অসুস্থবোধ করায় কোয়াটারে গিয়ে রেস্ট নিচ্ছে। ধন্যবাদ জানিয়ে মেঘাও ফিরে আসে। অফিস থেকে কোয়াটার দিলেও সেখানে ওরা কেউ থাকে না। মাঝে মাঝে মেঘাকে নিয়ে এসে দু, একদিন থেকে যেত শুধু।
কোয়াটারে গিয়ে দেখতে পায় দরজা ভেতর থেকে লক করা। নক করতে যাবে তখন ভেতর থেকে চাপা শব্দ ভেসে আসে। সে আর নক করল না। জানালার কাছে গেল। জানালাটা একটু ফাঁকা ছিল। সে ঐখানেই দাঁড়িয়ে পর্দাটা সরায়। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। রিজভী অন্য একটা মেয়ের সাথে ইন্টিমেট অবস্থায়! চোখ ফেঁটে পানি আসছে মেঘার। সে কিছুতেই অন্য মেয়ের সাথে রিজভীকে সহ্য করতে পারছে না। কাল রাতে একইভাবে রিজভী মেঘাকেও ভালোবাসা প্রদান করেছে। আর আজ সে অন্য একটি মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায়!
চলবে…
