#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#সূচনা_পর্ব
১.
১১ বছর বিলেতে থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছে সৌরভ। পুরো নাম তাহসিন হাওলাদার সৌরভ। জমিদার বংশের একমাত্র উত্তরসূরী সৌরভ নিজে। নব্বই দশকে যত সম্পত্তির মালিক তার দাদা-পিতা হয়েছিলেন তা এখন কল্পকাহিনী বললে ভুল হবে না। সম্পত্তি শুধু পেলেই হয় না, তা ধরে রাখতে জানতে হয়। বসে বসে খেলে তো রাজার হালও একদিন ফুরিয়ে যায়। সৌরভের দাদাজান আরাম-আয়েশ করে খেয়ে গেছেন। তার বাবাও একই কাজ করেছেন। জায়গা-জমি যা ছিল অল্প অল্প করে বিক্রি করে খেয়ে গেছেন। এখন শুধু আছে পুর্বপুরুষের রেখে যাওয়া দুইতলা জমিদার বাড়ি—একটা পুকুর ও দুটা চাষের জমি। জমিদার বাড়ির দুই তলা জুড়ে শুধু সৌরভের পায়ের ধ্বনি বাজে। তার পরিবারের কেউ আর বেঁচে নেই। ৭ বছর আগে সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে গ্রামের অনেকেই মারা গেছে। ঘরে ঘরে ছিল মরা কান্না, ক্ষুধার যন্ত্রণা। অসুস্থ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে মানুষ। কেউ কেউ দীর্ঘ দিন খেতে না পেয়ে লোকজন মারা যাচ্ছিল। গ্রামের জমিগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। সেখানে ফসল ফলেনি কয়েক বছর। কৃষকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। একদিকে ফসল ফলছে না, অন্য দিকে পরিবার প্রিয়জনের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল তারা। সারাদিন পর ঘরে এসে যখনই দেখে সন্তানেরা কাঁদছে খিদের যন্ত্রণায়। ইসস! বুকের ভেতর কি সে যন্ত্রণা। আহা! দুমড়ে মুচড়ে উঠতো তখন। বৃদ্ধ বাবা-মার কঙ্কালসার হয়ে গেছে শরীর। কোথাও একটুখানি খাবার নেই। গাছের পাতা ঝরে পড়েছে, গাছ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মাটি ফেটে চৌচির। চারিদিকে মানুষের আহাজারি শুধু। ইসস! কি ভয়ানক দিন ছিল সেগুলো। ভাবতেই—শরীরে কাটা ফুটে, হাতের পশম দাঁড়িয়ে যায়, গলা শুকিয়ে আসে। সৌরভ তখন বিলেতে। এইসব ঘটনা রেডিওতে শুনেছিল। বিলেতে দুর্ভিক্ষ ছুঁতে পারেনি তাকে। কিন্তু ছুঁয়েছিল তার পরিবার-প্রিয়জনদের। এক এক করে সবাইকে গিলে খেয়েছিল দুর্ভিক্ষ। অসহায় ছিল সে। বসে বসে শুধু দিন গুনেছে। কে কখন মারা গেছে তার হিসাব রেখেছে। শেষ বার একখানা চিঠিপত্র পাঠিয়েছিল তার মা—এরপর আর কোনো চিঠি আসেনি। শেষ! সৌরভের পরিবার মাটির সাথে মিশে যায়। ১৯৯৪ সালে। একটা চিঠি পাঠিয়েছিল সৌরভ। তার উত্তর এখনো কেউ দেয়নি। দিবেই বা কে? কেউ যে আর বেঁচে ছিল না। ততদিনে তার পুরো পরিবার মরে গেছে। একদিকে রোগ অন্য দিকে দুর্ভিক্ষ বাঁচার কোনো পথ ছিল না। অনেকেই সে-সময় মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে আবার অনেকে এই গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে গেছে। আবার এমনও হয়েছে—অন্য গ্রাম থেকে এই গ্রামে থাকতে এসেছিল লোকজন। বাসা বেঁধেছিল নতুন করে। তারপর সাত বছর কেটে গেছে। গ্রামটাও ধীরেধীরে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি পড়ছে, ফসলের জমিতে নতুন নতুন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, কৃষকের চোখ চকচকে মুখে হাসি তাদের পরিবারও খুশি। সব কিছু আগের মতো চঞ্চল হয়ে ওঠেছে। কেবল এরমাঝে কয়েকশো মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। শুধু কী মানুষ, পশুপাখি ও তো আছে। সৌরভ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। এই পৃথিবীতে তার আপনি বলতে কেউ নেই। সে কত একা। এত বড়ো জমিদার বাড়িতে সৌরভ আর একজন কাজের লোক ছাড়া কেউ থাকে না। বিলেতের উজ্জ্বল ভবিষ্যত পায়ে ঠেলে গ্রামে ফিরে এসে সামান্য প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারি করায় লোকে তাকে পাগল বলে। সেসব কথা গায়ে মাখে না সৌরভ। লোকের কাজ কথা বলা। তারা নানান কথা বললেই। তাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। এরচেয়ে ভালো তাদের কথা শুনেও—না শোনার ভান করা। সৌরভ নিজেও জানে, সে এই ছোট্ট স্কুলে পড়িয়ে গ্রামের ভবিষ্যত পাল্টাতে পারবে না। কিন্তু তার দ্বারা একটা ছাত্র-ছাত্রীও যদি অনুপ্রাণিত হয়, পড়াশোনা করে যদি এই ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে গিয়ে শহরের কোনো কলেজে চান্স পায়— তাহলে সে নিজেকে সফল শিক্ষক মনে করবে। তার পরিশ্রম সার্থক হবে। এই স্কুলের প্রতিটি শিশুর চোখে সে স্বপ্ন দেখার আগ্রহ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন শুধু তাদের হাত ধরে একটু এগিয়ে দিতে পারলেই জয় তার নিশ্চিত। সৌরভ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিয়েছে প্রায় এক বছর হয়ে গেল। এরইমধ্যে সবার পছন্দের মাস্টার মশাই হয়ে গেছে সে। আর সবচেয়ে পছন্দের হয়েছে আলোর। ছোট্ট চড়ুইপাখির মতোই সারাক্ষণ কিচিরমিচির করে। আর থেমে থেমে ডাকে, ‘মাস্টার মশাই।’ সৌরভ হেসে ফেলল আপনমনে। গ্রামের সেই কাঁচা মাটির আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে হাঁটছিল সৌরভ, রাস্তার একপাশে ধানের ক্ষেত ও আরেক পাশে ঝোপঝাড়। বাতাসে মিশে আছে মাটি ও গোবরের গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার টুংটাং শব্দ। স্কুল ছুটির পর এ পথ দিয়েই বাড়ি ফেরে সৌরভ। স্কুলের ছোট ছোট শিশুদের কত বকুনি দেয় সে। তবুও কেউ তার কথায় রাগ করে না। নাহ! কেউ করে না বললে ভুল হবে। একজন করে। সে হলো আলো।
সহসা ধ্বনিত হলো একটি কণ্ঠস্বর, ‘মাস্টার মশাই, ও মাস্টার মশাই।’
কারো অযাচিত কণ্ঠ শুনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল সৌরভ। কণ্ঠটা তার বড্ড পরিচিত। হুম! ঠিক ধরেছে। এটা আলোর গলা। কোথায় সে? সৌরভ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। কোই? কোথাও তো নেই সে। তাহলে কী সৌরভের মনের ভ্রম। আলোর কথা চিন্তা করছিল বলেই তার কণ্ঠ শুনতে পেল? এমনটা তো হয় না কখনো। সে ভুল করেছে? ভুল শুনেছে? উঁহু! হতেই পারে না। ওটা আলোই ছিল। সহসা সৌরভকে চমকে দিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো আলো। সঙ্গে সঙ্গে কপালে চার ভাজ পড়ল সৌরভের। মুখখানা পেঁচার মতো করে রেখেছে দেখে হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে যায় আলো। দু-হাতে পেট চেপে ধরে এগিয়ে এলো। হাসতে হাসতে গাল ও পেট দুটোই ব্যথা করছে তার। সৌরভ শক্ত গলায় বলল, ‘ঝোপঝাড়ের আড়ালে কী করছিলে? যদি সাপে কামড়াতো?’
আলো বলল,
‘ওখানে সাপ নাই। সাপ তো ওই বাঁশ ঝাড়ের পেছনে থাকে।’
‘অনেক পাকা পাকা কথা শিখেছো, দেখছি।’
আলো আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন মাস্টার মশাই অনেক মজার কৌতুক বলেছেন। আলো তার ছোট ছোট আঙুল দিয়ে সৌরভের তর্জনী চেপে ধরে। এক কদম দুই কদম এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘মাস্টার মশাই। ও মাস্টার মশাই।’
তার ডাকে অদ্ভুত এক মাধুর্য আছে। শুনলেই মোমের মতো গলে যায় সৌরভের মন। সৌরভ কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে পড়ল। আলোর কপালে টোকা দিয়ে বলল, ‘এত মিষ্টি করে ডাকো কেন? মায়ায় পড়ে যাই তো। আমি এক নিঃস্ব মানুষ; এত মায়া নিয়ে কোথায় ঠাই হবে আমার?’
আলো আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। ৩৫ বছর বয়সী সৌরভের কথার অর্থ ৮ বছরের আলোর বোধগম্য হবে না। স্বাভাবিক। সে এমনিতেই হাসে। যেন হাসির ব্যামো হয়েছে। তার হাসিমাখা মুখটা দেখে সৌরভও হেসে ফেলল। দু-জনেই হাসতে হাসতে হাঁটতে লাগল। এসময় সৌরভ বলল, ‘যদি সঠিক সময়ে বিয়ে করতাম তাহলে আজ তোর মতন একটা মেয়ে থাকতো আমার।’
আলো পিটপিট চোখে তাকায়। সে কি ভেবে হুট করে বলল, ‘মাস্টার মশাই।’
সৌরভ ভ্রু উঁচু করে বলল,
‘হু? কিছু বলবি?’
‘হু।’
‘বল না, তোর কথা শুনতে আমার বেশ ভালো লাগে।’
আলো চিন্তা করতে লাগল। সে কি বলবে? এদিকে আলো কিছু বলছে না দেখে সৌরভ নিজেই বলতে লাগল, ‘মানুষ মনে করে আমি পাগল। এত বছর বিলেতে পড়াশোনা করেছি—সেখানে চাকরি বাকরি না নিয়ে গ্রামে চলে এসেছি। আর এখানে এসেই স্কুলে পোলাপান পড়াচ্ছি। তাই। তারা আমাকে ছোটো চোখে দেখে। তাতে অবশ্য আমার কিছুই যায় আসে না। তারা তো আর জানেনা শহরের চাকরির থেকে এই গ্রামের মাস্টারি করায় কত সুখ-শান্তি লুকিয়ে রয়েছে। সকালে ঘণ্টা বাজলেই মাঠের ওপারে ছেলেমেয়েদের দৌঁড়ে স্কুলে আসা দেখতে ভীষণ মজা লাগে। ওদের নিষ্পাপ হাসি, মাটির গন্ধে ভরা পা, কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ— সব মিলিয়ে যে শান্তি পাই, অন্য কোথাও তা পাইনা। ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে বাইরে যখন তাকাই—দৃষ্টি ছুটে যায় দূরের তালগাছের মাথায় বসে থাকা বকপাখির দিকে। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথে পাখির ডাক, মাঠের হালচাষের শব্দ, আর স্কুলের ঘণ্টার আওয়াজ— এই তিনটাই এখন আমার জীবনের শেষ সম্বল।’
আলো এতক্ষণ চুপচাপ তার মাস্টার মশাই -এর কথাগুলো শুনছিল। যদিও সে কিছুই বুঝতে পারেনি। তবে এতটুকু বুঝেছে যে, তার মাস্টার মশাই যাই বলছিল ভালো বলেছে। মাস্টার মশাই -এর একটা কথাই আলোর মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার। ‘যদি সঠিক সময়ে বিয়ে করতাম তাহলে আজ তোর মতন একটা মেয়ে থাকতো আমার।’
আলো হুট করে বলে ওঠল, ‘মাস্টার মশাই! আপনি আমার মাকে ভালোবাসেন?’
হঠাৎ এমন কথায় থমকে দাঁড়াল সৌরভ। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে তাকাল। ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক হয়ে গেল। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে যেন তার। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয় সৌরভ। বাচ্চা মেয়ে ভেবে কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। সৌরভ ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ভ্রু কুঁচকে করে জিজ্ঞেস করল, ‘এই কথা তোমায় কে শিখিয়েছে আলো?’
আলো ঠোঁট উল্টিয়ে ফেলল। একটু পরেই নিজ থেকে বলল, ‘টেলিভিশনে দেখেছি। যখন কেউ কাউকে ভালোবাসে তখন তারা বিয়ে করে নেয়। মাস্টার মশাই আপনি আমার মা-কে বিয়ে করে নেন। তাহলে আমরা একসাথে থাকব সবসময়।’
সৌরভ চোয়াল শক্ত করে। শক্ত গলায় বলল,
‘আজ থেকে তোমার টেলিভিশন দেখা বন্ধ। আমি আজই তোমার মায়ের কাছে নালিশ দেবো। যাতে তোমাকে আর টেলিভিশন দেখতে যেতে না দেয়।’
আলো ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। মাকে সে খুব ভয় পায়। সঙ্গে সঙ্গে আলোর চোখ দিয়ে টপটপ করে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে মায়া লাগল সৌরভের। সে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা আর কাঁদতে হবে না। মায়ের কাছে বিচার দেব না। কিন্তু তুমি কথা দাও। এমন কথা আর বলবে না।’
আলো হেঁচকি তুলে বলল, ‘কেন? এই কথা গুলো কি পঁচা?’
‘হু। অবশ্যই পঁচা। এসব বড় মানুষের কথা আর তুমি এখনো খুব ছোটো। তাই এমন কথা তুমি আর বলবে না। ঠিক আছে?’
আলো ঘাড় কাত করে। সে আর কখনো এমন কথা বলবে না। রাজ্যের মন খারাপ নিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে আট বছরের ফুটফুটে মেয়েটা। চোখ দুটো বড় আর গভীর, বড় বড় কালো পাপড়ি—পলক ফেলছে একটু পরপর, নাকটা সরু, ছোট মুখের সাথে দারুণ মানিয়েছে। ঠোঁট দুটি হালকা গোলাপি, বিকেল বেলার রোদ ঝরে পড়ছে তার চোখেমুখে, নরম দুটো গাল— ঘাড় পর্যন্ত চুল বাতাসে উড়ছে মৃদু, গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটি নেড়ে দুটো কথা বলেই গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌরভের মুখের দিকে। সে বয়সে ছোট হলে কি হবে? খুব চালাক। সৌরভ তার মন খারাপ দেখতে পারে না। আলোর মন ভালো করার জন্য সৌরভ বলল, ‘তোমার মা তো আর আমাকে পছন্দ করে না আলো। আমি একা পছন্দ করলে তো আর বিয়ে হয়ে যাবে না।’
আলো তার হাত থুতনিতে রাখে। ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাটির দিকে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো গভীর চিন্তায় মগ্ন আছে। সৌরভ ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল। এত অল্প বয়সে এত বুঝদার হয়েছে মেয়েটা। মাশা আল্লাহ। তার কথাবার্তা শুনে বোঝার উপায় নেই তার মাত্র ৮ বছর বয়স। যেমন সুন্দরী দেখতে—বড় হলে তেমন বুদ্ধিমতীও হবে। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত শুধু মায়া। একবার তাকালে শুধু তাকিয়ে থাকতেই মনে চায়। কথা বলা শুরু করলে শুধু শুনতেই ইচ্ছা করে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে—গরীবের ঘরে রাজকন্যার জন্ম! এই বাক্যটা অতি অবলীলায় আলোর দিকে ছুড়ে দেয়া যায়। সৌরভ বুক ভরে শ্বাস নিলো। মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছে হয়, সে ভাবে— যদি আলো সত্যিই তার মেয়ে হতো। তখন? সে কী করতো? খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতো নাকি পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো। মেয়েটার প্রতি বড্ড মায়া হয় তার। কেন এত মায়া হয়? কেমন চোখ দুটো গোলগাল করে তাকিয়ে থাকে। সে দৃষ্টি তীরের মতো বুকে এসে বিঁধে। ভাঙা ভাঙা সুরে কথা বলে, তার সবকিছুই ভালো লাগে সৌরভের। আলো তার মায়ের রং পায়নি। ওর ত্বক ফর্সা আর ওর মায়ের ত্বক একটু চাপা, তবে সে শ্যামাঙ্গিনী হলেও আলোর মতোই সুন্দরী। সৌরভ মাথা ঝাঁকাল। কী ভাবছে সে? মাথাটা কি একেবারে গোল্লায় গেল তার? আলো মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না। বুঝতে বাকি নেই মেয়েটার ভালোই মন খারাপ হয়েছে। সৌরভ শীতল কণ্ঠে বলল, ‘আলো। এই আলো শুনছো?’
আলোর ধ্যান ভাঙলো এতক্ষণে। সে নাকমুখ ফুলিয়ে, বুকে দু-হাতের ভাজ ভেঙে বলল, ‘মাস্টার মশাই আপনি আমার মা-কে বিয়ে করবেন?’
আলোর এ কথায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে সৌরভ। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না সে। আলো ম্লান কণ্ঠে আবারও বলল, ‘আমি কখনোই বাবার আদর পাইনি। মাস্টার মশাই, আপনি আমার বাবা হবেন? আমি মা-কে দেখেছি। রোজ রাতে কান্না করে। বলে, আমি না থাকলে মা কবেই মরে যেতো। এতো কষ্ট নাকি তার সহ্য হয় না। নানিও মাকে অনেক কথা শোনায়। মা তখনও শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। আপনি আমার মা-কে বিয়ে করুন না মাস্টার মশাই, তাহলেই তো আমি আপনার মেয়ে হয়ে যাই। আপনার আর মেয়ে লাগবে না তখন।’
সৌরভ মৃদু হাসল। সে সস্নেহে আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমার নানির সাথে আমি এই বিষয়ে কথা বলব। দেখবে, তখন তোমার মা-কে আর কেউ বকবে না।’
আলো মুখ ভার করে নিচু গলায় বলল,
‘আপনি আমার মা-কে বিয়ে করবেন না, মাস্টারমশাই?’
সৌরভ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আলোর চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল, ‘করব, আলো। তবে তোমার মা যদি রাজি হন তবেই।’
চলবে….
