#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_অন্তিম_পর্ব_
বিকেলের ধূসর, সোনালি আলো নদীর বুকে নরম ঢেউয়ের মতো খেলে বেড়াচ্ছে। নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়া সূর্যের শেষ আলো যেন চারপাশকে অন্য এক জগতে দাঁড় করিয়েছে, স্থির, শান্ত, অথচ গভীর অনুভবময়। সেই আলো এসে পড়েছে স্নেহার মুখেও। তার চুলের গোড়া, গালের বাঁক, চোখের পাতার কাঁপুনি, সবকিছুতেই এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ফুটে উঠছে।
তবুও, তার ভেতরের অস্থিরতাকে ঢাকতে পারছে না সেই আলো।
স্নেহার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রাহুল। গাঢ় নীরবতা নদীর মতোই তাদের মাঝে বয়ে যাচ্ছিল।
স্নেহাই প্রথম মুখ খুললো, খুব ধীর স্বরে,
–” কেন আনলে আমাকে এখানে?”
রাহুল তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার দৃষ্টিটা গভীর, থিতু।
–” তুমি কি ভেবেছিলে, আমি চলে গেছি? তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি?”
স্নেহা চোখ সরিয়ে নিলো। দুই সেকেন্ড থেমে বললো,
–” হয়তোবা।”
হাওয়ার দোলায় নদীর পানি ঝিকমিক করে উঠে। রাহুল সেই ঝিকমিকের প্রতিফলন দেখলো স্নেহার চোখেও, অস্থির, অনিশ্চয়তায় ভরা। রাহুলের কণ্ঠে ক্ষীণ ক্ষোভ,
–” এতো সহজ নাকি সব? কেন ছেড়ে যাবো তোমাকে? তোমার অতীত আছে বলে? এইটা কোনো রিজন হলো?”
স্নেহা মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে।
–” তারপরও।”
রাহুল এগিয়ে এলো অল্প। স্বর শক্ত করলো,
–” তারপরও কি? তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না? ভাবছো, আমিও নেহালের মতো করবো?”
এক মুহূর্তে স্নেহার চোখ ভরে গেলো জলে। তার গাল বেয়ে নেমে এল নীরব কান্নার রেখা। রাহুল ধীরে বলে উঠে,
–” শোনো, তোমার আমার সাথে সম্পর্ক করতে হবে না। রিলেশন চাই না আমি। কিন্তু, বিবাহিত জীবন কাটাতে, আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।”
স্নেহা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়।
–” মানে?”
রাহুলের চোখে তখন এক নিশ্চিত দৃঢ়তা।
–” মানে, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আমি তোমার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো। আমি তোমাকে আমার এমন এক জায়গায় স্থান দিবো, যেখানে তোমাকে আর কোনো ভ’য় পেতে হবে না।”
–” রাহুল!”
–” দেখো স্নেহা, আমার বাবা মা আলাদা থাকে। তুমি সবটাই জানো। আমি ছোট বেলা থেকে একা একা বড় হয়েছি। নিজের মতো করে। সেখানে আমি একটা সময় এসে তোমাকে পেয়েছি। তোমাকে এখন আর আমি হারাতে চাই না। বিশ্বাস করো।”
স্নেহার চোখ দিয়ে এবার জল গড়িয়ে পড়তেই রাহুল হাত বাড়িয়ে ধীরে মুছে দিলো। তার স্পর্শে ছিল আশ্বাস, ছিল নরম অথচ অবিচল দৃঢ়তা। রাহুল বলল খুব শান্ত স্বরে,
–” স্নেহা! হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান না, তেমনি পৃথিবীর সব মানুষও সমান নয়। নেহাল একজন পুরুষ, আমিও একজন পুরুষ। কিন্তু, তাই বলে, নেহাল যেইটা করেছে, সেইটা আমিও করবো, এইটা ভেবে নেওয়া ভুল।”
স্নেহা ভেজা চোখে তাকিয়ে রইলো। মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু দৃষ্টি বলতে চাইছে অনেক কথা। রাহুল আবার বললো,
–” আমার দাদী যাবে তোমাদের বাসায় প্রস্তাব নিয়ে। তোমাকে আর আমাকে প্রেমের সম্পর্কে যুদ্ধ করতে হবে না। আমরা সরাসরি বিয়ে পবিত্র সম্পর্কে যাবো।”
এই কথাগুলো যেন স্নেহার ভেতরের শক্ত দেয়ালে আ’ঘা’ত করে সেটাকে নরম করে দিল। হঠাৎ সে রাহুলকে জড়িয়ে ধরে। বুকের ভেতর জমে থাকা ভ’য়, জমে থাকা একাকিত্ব আর ব্যথা সব বের হয়ে এল কান্নার স্রোতে। রাহুল হালকা হাসে, খুব মমতায় স্নেহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে। স্নেহার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো,
–” আমি তোমাকে হার্ট করতে চাই না, রাহুল! কিন্তু, বিশ্বাস করো, আমার আর শক্তি নেই নিজেকে আবার ভেঙে ফেলার। আমি আর পারবো না। আমি শেষ হয়ে যাবো তাহলে।”
রাহুল দুই হাতে স্নেহার মুখ তুলে ধরে তার কপালে নরম চুমু দিলো। স্বরে অব্যর্থ অঙ্গীকার,
–” এই কথাটা আর কখনো বলবে না তুমি। আমি তোমাকে ভালোবাসি, স্নেহা! যারা সত্যিকারের ভালোবাসে, তারা প্র’তা’র’ণা করে না। আর তোমাকে রিলেশনে আসতে হবে না। বিয়ে করবো আমি তোমাকে। মিস.স্নেহা থেকে মিসেস.রাহুল বানাবো।”
স্নেহা আর স্থির থাকতে পারে না। আবারও জড়িয়ে ধরল রাহুলকে। নদীর ওপাড়ে সূর্য তখন ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে। গোধূলির মায়াবী আলো এসে পড়ছে দুই জনের উপর। নীরব নদী সাক্ষী রইল তাদের এই নীরব প্রতিশ্রুতির। ভালোবাসা কখনোই হার মানে না,
যদি কেউ সত্যিকারে ধরে রাখতে চায়।
…
বিকেল তখন নরম রোদের সোনালি আলোয় ভরা। শহরের কোণার দিকের এই ছোট্ট মাঠটায় আজ মানুষের ভিড় নেই বললেই চলে। একদিকে কলেজ পড়ুয়া কয়েকটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে, তাদের ব্যাট-বলের শব্দ, মাঝেমধ্যে উল্লাসের চিৎকার, বাতাসে লাফিয়ে লাফিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মাঠের অন্য পাশটা পুরোপুরি ফাঁকা। শান্ত। নির্জন।
এই ফাঁকা মাঠের দিকেই ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে এগিয়ে আসছে আরোহি। গোলাপি ফ্রকটা বাতাসে হালকা দোল খাচ্ছে। আরোহির হাতে একটা লাল গোলাপ, তার নিজের পছন্দ করে বেছে নেওয়া। মুঠিটার ভেতর ফুলটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আরোহির ছোট্ট আঙুলগুলোয় মিশে আছে তার সরল উত্তেজনা।
জারিফা কয়েক কদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে শান্ত হাসি। বিকেলের রোদে তার মুখটা আরও মোলায়েম দেখাচ্ছে। আরোহি গুটি গুটি এগিয়ে এলো। তার কিছুটা পেছনে, পকেটে দুই হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে আরাফ। তার দৃষ্টি পুরোটা আরোহির দিকে।
জারিফা হাঁটু গেড়ে বসলো। দুই চোখে আদরের দীপ্তি।
আরোহি এগিয়ে এসে খুব আস্তে, খুব আন্তরিকভাবে একটা ছোট্ট চুমু দেয় জারিফার কপালে। জারিফা চোখ বন্ধ করে মুহূর্তটা অনুভব করে। যেন এক শিশুর নিষ্পাপ স্নেহ তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব ক্লান্তি মুছে দেয়। চুমু দেওয়া শেষ হতেই আরোহি গোলাপটা বাড়িয়ে দিলো। নরম কণ্ঠে বললো,
–” তুমি কি আমাল মাম্মাম হবে?”
জারিফা কিছু বলতে পারে না। বুকের ভেতর কী যেন কেঁপে উঠলো। আগেও একদিন এই কথাটা আরোহি বলেছিলো। কিন্তু আজকের কথাটার ওজন আলাদা।
আজ প্রতিষ্ঠিত, গভীর, হৃদয়ের ভেতর গেঁথে যাওয়া।
জারিফার চোখ হঠাৎ ছলছল করে উঠে। আরোহি আবার বললো,
–” বলোনা, জালিফা আন্টি! তুমি কি আমাল মাম্মাম হবে?”
জারিফা ধীরে হাত বাড়িয়ে নিলো গোলাপটা।
তারপর টেনে নিলো আরোহিকে নিজের বুকে। এতটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, যেন ভয় করছে ছাড়লে হারিয়ে যাবে। আরোহিও একইভাবে জড়িয়ে ধরলো জারিফাকে। জারিফার বুক ভিজে উঠছে, ভিতরটা কেঁপে যাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলে,
–” আমি কিভাবে তোমার এতো মায়ায় বাঁধা পড়ে গেলাম, মা?”
আরোহি জিজ্ঞেস করে বসলো,
–” তুমি কি বলছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
জারিফা হালকা হাসে। সেই হাসি মায়ায় ভরা, শান্তিতে মোড়া। সে আরোহির দুই গাল হাতে নিয়ে আদর করে। তারপর আরোহির কপালে আরেকটা চুমু দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো। মেয়েটি তার কাঁধে মাথা রেখে খিলখিল করে হেসে উঠে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফ দৃশ্যটা চুপচাপ দেখছিলো। আরোহির ঠোঁটের হাসি, জারিফার বুকের আদর। দুই জনের মাঝে অদ্ভুত এক অবাপ্য বন্ধন।
জারিফা আরোহিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরাফ এক দুই ধাপ এগিয়ে এসে তাঁদের সামনে দাঁড়ালো। জারিফা তার চোখ উঁচু করে তাকালো আরাফের দিকে।
–” আমার মেয়ের মা হবেন, মিস জারিফা?”
গম্ভীর, স্থির কণ্ঠে আরাফ বললো।
জারিফার শরীর কেঁপে উঠলো। আরাফের মতো রাশভারি, গুরুগম্ভীর মানুষের মুখ থেকে এমন প্রস্তাব শুনবে, কখনো কল্পনাও করেনি সে। হৃদয় হঠাৎ অদ্ভুত উত্তেজনায় ধুকছে।
–” এমন প্রস্তাব নাকোচ করার শক্তি কোথায় আমার?”
জারিফার গলা নরম, কিন্তু আবেগে ভরা। আরাফ হালকা হাসে। তার চোখে সন্তুষ্টি ও সন্তুলিত ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল। সে জিজ্ঞেস করলো, ধীরে এবং নিশ্চিতভাবে,
–” কিন্তু আপনার মা-বাবা কি রাজি হবেন?”
জারিফা আরোহির গালে এক ছোট্ট চুমু দেয়। সেই স্পর্শে আরোহির চোখ আনন্দে ঝলমল করলো। জারিফা বললো,
–” সেই দায়িত্ব আমার। আমি আরোহিকে হারাতে চাই না। আমার জীবনে অদ্ভুত মায়ার শক্তি আছে এই বাচ্চাটির প্রতি।”
আরাফ চোখ ভরা দৃঢ়তায় বললো,
–” আপনার এই ধারণা কখনো বদলে যাবে না তো?”
জারিফা আরাফের দিকে তাকায়। আরাফের কণ্ঠে ছিল শেষ চেষ্টা না করার মতো অবিচল সংযম।
–” আমি খুব যত্ন করে আমার মেয়েকে বড় করছি। আমি কখনোই আরোহির প্রতি কোনো অবহেলা, কোনো অযত্ন, কোনো কমতি সহ্য করতে পারবো না।”
জারিফা হালকা হেসে বললো,
–” স্ট্যাম্প পেপারে সই করে যেতে রাজি আমি।”
আরাফ কেবল হেসে নীরবভাবে মাথা নেড়ে বলে,
–” তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বিশ্বাস করি আমার মেয়ের মাম্মামকে।”
জারিফা হালকা হাসে। আরোহি ধীরে জারিফার কোল থেকে নামলো। এক হাতে জারিফার হাত ধরে, আরেক হাত দিয়ে আরাফের হাত ধরলো। তারপর হেঁটে যেতে থাকে রাস্তার দিকে।
সূর্য হেলে পড়ছে আস্তে আস্তে। বিকেলের সেই নরম সোনালি আলো তাদের গায়ে মেখে যায়। আরাফ, আরোহি আর জারিফা, তিনজন ধীরে ধীরে হাঁটছে, হাসছে, এক অদ্ভুত শান্তির আবেশে মগ্ন। আরাফ আস্তে করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
–” মিরা! আমি আমার মেয়েকে মাম্মাম এনে দিয়েছি। তুমি নিশ্চিত থাকো, আমি আমার মেয়েকে কখনো বিন্দু মাত্র অভিযোগ করতে দিবো না।”
………………🌹সমাপ্ত🌹……………….
