Saturday, June 6, 2026







চন্দ্রবিন্দু পর্ব-০৮

#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৮_

ক্লাস শেষ হওয়ায় জনাকীর্ণ ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে। স্নেহা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ভার্সিটির মূল গেট পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই হঠাৎই থমকে যায়। রাস্তার ওপারে, সাদা গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে, দুই হাত বুকের ওপর গোঁজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রাহুল। তার স্থির দৃষ্টি সোজা স্নেহার মুখে গিয়ে ঠেকে।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ে। তারপর স্নেহা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করে।
রাহুল ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে না। এক লম্বা, তীক্ষ্ণ শ্বাস নিয়ে রাস্তা দ্রুত পার হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্নেহার হাত চেপে ধরে থামায় তাকে। স্নেহা বিরক্ত হয়ে বলে,
–” রাহুল! কি করছো তুমি? হাত ছাড়ো।”

রাহুলের কণ্ঠ নিচু, তীব্র।
–” তুমি নাকি তৃধাকে আর পড়াতে যাবে না।”

–” হ্যা!”
স্নেহা থমথমে স্বরে জবাব দেয়।

–” গত কয়েকদিন ধরে আমার কল ধরছো না। মেসেজের রিপ্লাই দাও না। কেন?”

–” আমার ইচ্ছে।”

রাহুলের চোখে গাঢ় ক্ষোভ জমে ওঠে।
–” তোমার ইচ্ছে?”

–” হ্যা!”

আর কোনো শব্দ না করে রাহুল হাত শক্ত করে টান দেয়। স্নেহা পিছিয়ে আসে না, কিন্তু বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করে না। প্রথমত, এটা ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তা, অনেকেই দেখছে। সে সিন ক্রিয়েট করতে চায় না। চিৎকার করেও নিজেকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারছে না। রাহুল তাকে প্রায় জোর করেই গাড়িতে বসায়। নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। স্নেহা এক নজর তার দিকে তাকায়। রাহুলের চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো রাগে তীক্ষ্ণ, তার আসল মেজাজটা আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না। গাড়ি ছুটতে থাকে অস্বাভাবিক দ্রুততায়। শহরের ভিড়, শব্দ সব পেছনে ছুটে যায়। স্নেহা ঠান্ডা হয়ে বসে থাকে, কিছু না বলে।

প্রায় আধঘণ্টা পরে গাড়ি থামে নদীর কুলে। একটা শুনশান জায়গা। রাহুল গাড়ি থেকে নেমে যায়। দুই হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে নদীর দিকে তাকিয়ে। স্নেহা কিছুক্ষণ নীরবভাবে বসে থেকে দরজা খুলে নেমে আসে। ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ায় তার পাশে।
স্নেহা জিজ্ঞেস করে,
–” কেন এনেছো আমাকে এখানে?”

রাহুল মুহূর্তখানেক নীরব থাকে। তারপর নিচু গলায়,
–” আমাকে এভয়েড করার মানে কি?”

–” তুমি কেন আমাকে তোমার দিদার সাথে দেখা করিয়েছিলে? কেন তিনি আমাকে তোমার নাতবউ ভাবছিলেন আমাকে? মানে, তুমি কতোটা এগিয়ে গেছো।”
স্নেহার কণ্ঠে তীক্ষ্ণ ঠান্ডা ভাব। রাহুল এবার তাকায় তার দিকে। দৃষ্টিটা নরম, কিন্তু ক্ষ’তবি’ক্ষ’ত।
–” এটা কি আমার অন্যায়?”

–” আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো পারি না?”

স্নেহার মুখ শক্ত হয়ে ওঠে।
–” না! পারো না।”

–” কেন?”
রাহুলের কণ্ঠটা এবার ভেঙে যায় প্রায়। স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। নদীর স্রোতটাই যেন তার কথা বলার সাহস জোগায়। তারপর ধীরে বলে,
–” কারন, আমার একটা অতীত আছে। এমন অতীত, যেদিকে তাকালেই ভালোবাসা, কমিটমেন্ট, এই শব্দগুলোই আমাকে ভ’য় পাইয়ে দেয়।”

রাহুল বিস্ময়ে স্থব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
–” মানে?”

স্নেহা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। তারপর ধীরে, থেমে থেমে বলতে থাকে তার গল্প। নেহাল নামের এক মানুষের সাথে পরিচয়, প্রথম প্রেমের মিষ্টতা, অসীম বিশ্বাস, তারপর ভ’য়ঙ্ক’র প্রতা’র’ণা, বেই’মা’নির মতো বি’ষ যা তাকে আজও সাপের মতো কামড়ায়। স্নেহা সব বলে থেমে গেলে আশেপাশের নীরবতাও যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাহুলের মুখ শক্ত হয়ে গেছে, দৃষ্টি নদীর পানিতে আটকে আছে। যেন কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। স্নেহার চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু। সে তাড়াতাড়ি হাতের পেছন দিয়ে পানি মুছে নেয়। তারপর খুব শান্ত গলায় বলে,
–” আমার বাসায় যাওয়া প্রয়োজন। প্লিজ, চলো।”

পেছন ফিরেই হাঁটে স্নেহা। রাহুল দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস, ভারী কষ্টের, অসহায়তার। এরপর ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগোয়।
ফেরার পথে দুই জনের কেউ একটাও শব্দ করে না। গাড়ির ভিতরে নিঃশব্দ চাপা অস্থিরতা জমে থাকে। স্নেহাদের গলির সামনে গাড়ি থামে। স্নেহা চুপচাপ নেমে যায়, দরজা বন্ধ করে। রাহুলের দিকে একবারও তাকায় না। রাহুল স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসে থাকে অনেকক্ষণ। মাথা নামানো। চোখের সামনে শুধু ভাসে স্নেহার চোখে জমে থাকা সেই অশ্রু, এবং সেই অতীত যা তাকে আজও তাড়া করে।

জারিফার সাথে আরোহির সময় কাটছে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। প্রায় প্রতিদিনই জারিফা আরোহিকে নিয়ে কোথাও না কোথাও বের হয়, কখনো পার্কে, কখনো আইসক্রিম খেতে, কখনো রোডে হাঁটতে। দুজনের হাসির শব্দে যেন পুরো বাড়িটাই একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠে। আরোহির ছোট্ট পৃথিবীতে জারিফা এক অনিবার্য আনন্দ হয়ে উঠেছে।

রাত গভীর। ঘরে নীলচে হালকা আলো জ্বলছে। বিছানায় বসে আরাফ মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আরোহির চোখ ঘুমে ভারী, কিন্তু মনটা যেন কথায় ব্যস্ত।

–” পাপা!”
আরোহি ফিসফিসিয়ে ডাকে। আরাফ নরম স্বরে জবাব দেয়,
–” হুম, মা! বলো।”

–” আমার মাম্মাম চাই।”

কথাটা শুনে আরাফ এক মুহূর্তে আঁতকে ওঠে। মেয়েকে কোলে থেকে সরিয়ে সামনে বসায়।
–” এইসব কি বলছো তুমি, মা?”

আরোহি চোখ মেলে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
–” আমি জালিফা আন্টিকে মাম্মাম বানাতে চাই।”

আরাফ কিছুক্ষণ নির্বাক। প্রশ্নটা অবশেষে মুখ দিয়ে বের হয়,
–” আন্টি আবার মাম্মাম হয় কিভাবে?”

আরোহি যেন খুব চেনা কোনো সত্যি কথা বলছে,
–” তুমি আন্টিকে বিয়ে কললো, আন্টি আমাল মাম্মাম হয়ে যাবে।”

আরাফের বুকের ভেতরটা কেমন আঁটসাঁট হয়ে আসে।
–” কে বলেছে তোমাকে এই কথা?”

–” দিদা বলেছে।”

দীর্ঘ, ক্লান্ত এক নিঃশ্বাস ফেলে আরাফ। যেন এমোন কিছু সে আগেই আন্দাজ করেছিলো। আরোহি আবার বাবার হাতে হাত রেখে অনুনয় করে,
–” প্লিজ, পাপা প্লিজ! তুমি জালিফা আন্টিকে বিয়ে কলো। তাহলে, আমি মাম্মাম পাবো। আন্টি আমাকে অনেক আদল কলে। আন্টি মাম্মাম হলে সব সময় আমাল সাথে থাকতে পালবে।”

আরাফ হালকা রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করে।
–” চুপ করো, মা! আসো ঘুমাও।”

কিন্তু আরোহি ছাড়তে চায় না।
–” বলো না, পাপা! আন্টিকে বিয়ে কলবে তুমি।”

–” এইসব পচা কথা, মা। এইসব বলতে হয় না। আসো ঘুমাও।”

আরোহি গোমরা মুখে বলে,
–” ইশশশ! পচা কথা হলে দিদা আমাকে বলতো না কখনো। আল মাম্মাম পাওয়া তো ভালো কথা।”

আরাফ এবার একটু কঠোর হয়।
–” অনেক হয়েছে। এবার ঘুমাবে। আর কোনো কথা নয়।”

–” কিন্তু, পাপা!”

–” আমি রেগে যাচ্ছি, মা! এসো।”

শেষ পর্যন্ত আরোহি অনিচ্ছায় চুপ হয়ে আসে। আরাফ তাকে শুইয়ে দেয়, নরম করে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আরাফ। অদ্ভুত ভ’য়ের মতো একটা অনুভূতি বুকের ভেতর বাড়তে থাকে। যে ভ’য়টা তাকে সবসময়ই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। সেই কারণেই সে চাইছিল জারিফাকে মেয়ের থেকে একটু দূরে রাখতে। কিন্তু আরোহির জেদের কাছে সেটাও সম্ভব হয়নি।

আরোহির ছোট্ট মুখটা শান্ত ঘুমে ঢাকা। গালদুটো গোল, শ্বাসটা মৃদু। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা এটাই। আরাফ ঝুঁকে মেয়ের কপালে একটা নরম চুমু খায়। তারপর আলতো করে তাকে বুকে টেনে নেয়। আরোহিকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে, যদিও নিজের ভিতরের অস্থিরতা তাকে ঘুমোতে দেয় না। রাতটা যেন খুব দীর্ঘ হয় আরাফের কাছে।

আজ ছুটির দিন। আরাফের অফিস নেই, আরোহিরও স্কুল বন্ধ। পুরোদিনটায় আরোহি বাবার গায়ে গা লাগিয়ে কাটিয়েছে, কখনো গল্প শুনে, কখনো খেলতে খেলতে, কখনো হাসিতে গুলিয়ে। বিকেলটা ছুঁইছুঁই করতে জারিফা আসে। আরোহি আনন্দে খিলখিল করে ওঠে, যেন জারিফার আগমনে তার ছোট্ট দুনিয়া আরও রঙিন হয়ে যায়। ছাদের মোলায়েম বাতাসে দুই জনের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, আর গল্পে যেন চারপাশ ভরে থাকে। আরাফ তখন নিচে ঘরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।

জারিফা বসে আছে ছাদের এক কোণে, কোলে আরোহিকে নিয়ে ধীরে ধীরে একটা গান গাইছে। আরোহির মাথা তার বুকের ওপর নরম করে রাখা, মুখে রোদের লালচে ছটা। সেই ছন্দময় সুরের মাঝেই হঠাৎ আরোহি মাথা তুলে জিজ্ঞেস করে,
–” তুমি আমাল মাম্মাম হবে?”

জারিফা থমকে যায়। তার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। কথাটা শোনার পর কয়েক সেকেন্ড সে যেন ঠিক করে উঠতে পারে না, হাসবে না অবাক হবে।

–” কি বললে?”
জারিফার গলায় বিস্ময়, আর অল্প একটা শ্বাসকাটা টান। আরোহি হাসিমুখে, নির্দোষ চোখে আবার প্রশ্নটা বলে,
–” তুমি আমাল মাম্মাম হবে?”

জারিফা ধীরে জিজ্ঞেস করে,
–” কিভাবে মাম্মাম হবো আমি?”

–” তুমি পাপাকে বিয়ে কললেই আমাল মাম্মাম হয়ে যাবে।”

একটা হালকা, অনিশ্চিত হাসি বেরিয়ে আসে জারিফার ঠোঁটে। যদিও হাসির আড়ালে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ খুব তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে।
–” কে বলেছে তোমাকে এইসব?”

আরোহি খুব গর্বের ভঙ্গিতে বলে,
–” দিদা বলেছে।”

জারিফার ভ্রু ধীরে ধীরে উঠে যায়।
–” তাই?”

–” হুমমম! আল আমি পাপাকেি বলেছি।”

এই কথাটা শুনতেই জারিফার ভিতরটা সত্যি সত্যি কেঁপে ওঠে। যেন কেউ তার বুকের ওপর হাত রেখে হঠাৎই চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাশভারী, ধীর, কঠিন মানুষটা, আরাফ। এই কথা শুনে কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটা ভাবতেই জারিফার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।

–” কি বলেছো তোমার পাপাকে?”
জারিফার গলা মৃদু কাঁপে। আরোহি নির্দ্বিধায় বলে ওঠে,
–” তোমাকে বিয়ে কলে আমাল মাম্মাম বানাতে।”

জারিফা চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিশ্বাস নেয়। সে জানে, বাচ্চারা যাই বলুক, এই কথার ভেতরে থাকা ওজন বড়দের জগতে ভয়ঙ্কর জটিলতা তৈরি করে।
–” তোমার পাপা কি বলেছে?”

আরোহি ঠোঁট বাঁকায়, একটু অভিমানী স্বরে,
–” পাপা বলেছে, এইসব নাকি পচা কথা।”

ঠিক সেই মুহূর্তে জারিফার মুখে ফিক করে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু হাসিটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। কারণ, পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরাফ। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, নিস্তব্ধ, কঠিন। যেন সে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছে। আরোহির হাসিও মিলিয়ে যায় বাবার মুখ দেখে। সে একটু গুটিয়ে যায়, ছোট্ট শরীরটা সটান হয়ে আসে। আরাফ এগিয়ে এসে একটাও কথা না বলে আরোহিকে তার কোল থেকে তুলে নেয়। জারিফার নিঃশ্বাস আটকে যায় বুকের মধ্যে। আরাফ নিচু গলায় বলে,
–” আমি ওকে নিয়ে একটহ বাইরে যাবো।”

জারিফা জোর করে স্বাভাবিক হাসি আনে মুখে।
–” অবশ্যই! আরোহি! আজ আসি আমি। তুমি পাপার সাথে ঘুরে আসো, কেমন?”

আরোহি মাথা নাড়ে, তবে স্বরটা আগের মতো উচ্ছ্বসিত নয়,
–” ওকে, আন্টি!”

জারিফা চলে যায়। আরাফ নিচে নেমে মেয়েকে রুমে যায়। আরোহিকে নিজের হাতে রেডি করে, তারপর নিজেও শান্ত মুখে প্রস্তুত হয়। কিছুক্ষণ পর দুই জনেই বেরিয়ে যায়।

পুরো সন্ধ্যা ঘুরিয়ে আরোহিকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসে আরাফ। বাইরে খাওয়া, খেলা, সব মিলিয়ে আরোহি আজ যেন একটু বেশিই ক্লান্ত। তাই দশটা বাজতে না বাজতেই বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়ে ও। আরাফ নিঃশব্দে মেয়ের গায়ে চাদর টেনে দেয়, কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে উঠে আসে মাঝের রুমে। রুমে ঢুকতেই সে দেখে, মধ্যের সোফায় পাশাপাশি বসে গল্পে মশগুল তার মা আর বোন। স্নেহার মন খারাপ, তবু গল্পে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে মেয়েটা। আরাফ এসে নীরবে বসে পড়ে পাশের সোফায়। তার বসতেই সায়েরা খাতুন মুখ তুলে তাকায়।

–” আরোহি ঘুমিয়ে গেছে?”
সায়েরা খাতুনের নরম কণ্ঠ। আরাফ মাথা ঝাঁকায়।
–” হ্যা, আম্মা!”

স্নেহা হালকা হাসে।
–” আজ আরোহি অনেক ক্লান্ত। আর হবে না কেন? সারা বিকাল জারিফা আপুর সাথে খেলেছে। তারপর ভাইয়ার সাথে এতো ঘুরাঘুরি। ক্লান্ত না হয়ে পারে?”

কথাগুলো শুনে আরাফ একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
–” আম্মা! আজ সারাদিন তোমার সাথে ঠিকমতো কথা হয়নি। আসলে, আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে।”

সায়েরা খাতুন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়।
–” হ্যা! বল বাবা।”

কিছুক্ষণ চুপ থাকে আরাফ। চোখের ভেতর জমাট বিরক্তি, ঠোঁটের কোণে টান। তারপর ধীরে, কিন্তু খুব স্পষ্ট কণ্ঠে বললো,
–” তুমি আমার মেয়েকে এইসব কি শিখাচ্ছো, আম্মা?”

কথাটা শুনতেই সায়েরা খাতুন সামান্য ভ্রু কুঁচকে ফেলেন।
–” কি শিখাচ্ছি মানে?”

আরাফ এবার আর চেপে রাখতে পারে না।
–” তুমি ওর মাথায় আমার সাথে জারিফা নামের মেয়েটার বিয়ের কথা ঢুকাচ্ছো কেন?”

পুরো ঘর থম মেরে যায়। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে থাকে সায়েরা খাতুন ও স্নেহা। তারপর সায়েরা খাতুন শান্তভাবে বলে,
–” ঠিকই করেছি।”

–” ঠিক করেছো মানে?”

সায়েরা খাতুন দৃঢ় গলায় বললো,
–” তোর না হয় বউয়ের প্রয়োজন নেই, কিন্তু আরোহির একজন মায়ের প্রয়োজন আছে। আর জারিফা? সে আরোহিকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে, আগলে রাখে। আরোহিও ওকে একদম মায়ের মতো ধরে রাখে। তাই আমি ওকে শুধু রাস্তা দেখিয়েছি। ভুল কিছু বলিনি।”

আরাফের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
–” এইসব কি করছো তুমি, বুঝতে পারছো, আম্মা?”

এবার স্নেহা কথা বলে ওঠে, তার গলায় খানিকটা ক্লান্ত ক্ষো’ভ,
–” তুমি শুধু শুধু আম্মার উপর চিৎকার করবে না, ভাইয়া! আম্মা যা বলছে, ভুল কিছু না। একটা মেয়ের একজন মায়ের খুব দরকার। আর এখানে জারিফা আপুর থেকে ভালো কেউ হবে না।”

আরাফ রাগে গর্জে ওঠে,
–” তুইও পাগলের মতো কথা বলছিস?”

স্নেহা শান্ত, কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
–” পাগলের মতো না, ভাইয়া! আরোহির কথা ভাবো একবার। দেখো কতোটা মায়া জমেছে জারিফা আপুর প্রতি। একজন মা, একজন বাচ্চার জীবনে কি মানে রাখে সেইটা বুঝতে চাইলে আরোহির চোখের দিকে একবার তাকাও।”

ঘর যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে। আরাফ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে।
–” ধুর!”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আরাফ সোজা নিজের রুমের দিকে চলে যায়। দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা মুহূর্তে ঘন নীরবতায় ডুবে যায়। স্নেহা আর সায়েরা খাতুন চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আরাফের চলে যাওয়ার দিকটায়। দুজনের মুখেই একই অভিব্যক্তি,
অসহায়তা।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ