#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৭_
রাতটা নিস্তব্ধ। বাড়ির চারপাশে যেন এক অচেনা আবহ, স্থির, ভারী, অনমনীয়। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতর আরাফের মনজুড়ে চলছে এক অন্তহীন অস্থিরতা। দুইদিন ধরে আরোহিকে যেন চিনতেই পারছে না সে। যে মেয়েটা সকাল-বিকেল গল্প করে, হাসে, দৌড়ায়, সেই মেয়েই আজকাল চুপচাপ। স্কুলে যায় নিঃশব্দে, ফিরে আসে নিঃশব্দে, আর সারাদিন যেন বুকে পাথর চেপে বসে থাকে। আরাফ যতবার যেন কথা বলতে চায়, আরোহি ততবার এড়িয়ে যায়।
মনে হতে থাকে, কোথায় যেন ভুল হয়েছে। ভীষণ ভুল।
আরাফ মেয়েকে নিয়ে বিছানায় শোওয়ায়। ঘর অন্ধকার, শুধু ড্রিম লাইটের নরম, ম্লান আলো তাদের দুজনকে স্পষ্ট করে আঁকছে। আরোহি তার বুকে মাথা রেখে চুপচাপ। কিন্তু তার সেই নীরবতা আরাফের হৃদয়কে ছিঁড়ে ফেলছে। আরাফ আলতো করে আরোহির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
–” আরোহি! মা আমার। ঘুমাচ্ছো না কেন?”
মেয়েটা ধীরে ধীরে বাবার দিকে তাকায়। তারপর আবার মুখ গুঁজে রাখে তার বুকের ভাঁজে। আরাফ আরও নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
–” কি হয়েছে আম্মু? এভাবে চুপচাপ কেন?”
হঠাৎই আরোহির ছোট্ট শরীরটা কেঁপে ওঠে। পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। ওর কান্নার শব্দ এতটাই অসহায়, এতটাই ব্যথাভরা যে আরাফের মনে হয় কেউ যেন তার বুক ছিঁড়ে ধরে আছে। সে তাড়াতাড়ি মেয়েকে নিজের সামনে নিয়ে আসে।
–” আরোহি! মা! কি হয়েছে দেখি? তুমি তো এমন করো না।”
মেয়েটা কিছু বলে না। মুখ নামিয়ে ফোঁপাতে থাকে। চোখদুটো কান্নায় ভিজে টলমল করছে। আরাফের বুক তীব্র ব্যথায় চেপে আসে। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
–” মা আমার, তুমি এভাবে কাঁদলে পাপার খুব কষ্ট হয়। কি হয়েছে বলো?”
আরোহি কান্নার মধ্যেই ভাঙা ভাঙা শব্দে বলে,
–” পাপা! তুমি জালিফা আন্টিকে বকা দিলা?”
কথাগুলো শুনে আরাফের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যায়। আরোহি এক দমে বলে যায়,
–” জালিফা আন্টি আল আসে না আমাল কাছে। আমাল কষ্ট লাগতেছে অনেক কষ্ট, পাপা!”
সে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। আরাফ নিঃশব্দে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। হাতের আঙুল দিয়ে মেয়ের পিঠে শান্তির স্পর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতেই বলে ওঠে,
–” আমাল বন্ধুদেল আম্মু তাদেল যেমন আদল কলে, জালিফা আন্টিও আমাল ওলকম আদল কলে। আমাল চুল সুউউন্দর কলে বেধে দেয়। গল্প কলে। তুমি কেন বকা দিলা পাপা? আমি জালিফা আন্টিল কাছে যাবো।”
–” আচ্ছা, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। এখন কান্না থামাও, মা।”
–” না, আমি এখনি যাবো জালিফা আন্টিল কাছে।”
–” এখন তো অনেক রাত হয়ে গেছে, মা। এখন কি করে তোমাকে নিয়ে যাবো? একটু শান্ত হও, মা।”
–” তুমি জালিফা আন্টিল বাসাল সামনে নিয়ে যাও, আমি ডাক দিবো আন্টিকে।”
আরাফ চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। মেয়েটার প্রতিটা শব্দ যেন তাকে বিচার করছে। প্রতিটা কান্না যেন তাকে শাস্তি দিচ্ছে। সে আর কিছু বলে না, শুধু মেয়েকে শক্ত করে ধরে রাখে। আরোহির কান্না আরও জোরে শুরু হয়।
–” পাপা! আমি এখনই জালিফা আন্টিল কাছে যাবো। প্লিজ! আমাল অনেক কষ্ট হচ্ছে।”
ঘড়ির দিকে তাকায় আরাফ, রাত ১১টার কাছাকাছি।
এখন কাউকে ডাকার মতো সময় নয়। এখন বাইরে যাওয়াও ঠিক না। কিন্তু মেয়ের কান্না, তার কান্নার কষ্ট, সেই কষ্টের কাছে কোন যুক্তি টেকে না। আরাফ চেষ্টা করছে অনেকক্ষণ ধরে, কথা বলে, দোলায়, পানি খাওয়ায়। তবুও আরোহি থামছে না। শেষমেশ আরাফ হাল ছেড়ে দেয়। এক হাতে ফোন নেয়, অন্য হাতে মেয়েকে আঁকড়ে ধরে। স্থির সিদ্ধান্তে ভর করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
রুমের বাইরে বেরিয়ে আসে চুপচাপ। বাড়িটার সব রুমের দরজা বন্ধ। মা-বাবার রুমও, স্নেহার রুমও।
ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারে না। কারো কাছে আরোহির কান্না নিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না তার।
পালকের মতো হালকা, অথচ ব্যথায় ভারী মেয়েকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে সে মেইন ডোরের সামনে দাঁড়ায়। মেইন দরজা খুলে দেয়। ঠান্ডা রাতের বাতাস ভেসে আসে ঘরে। আরোহি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।
আরাফ নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় অন্ধকার রাতের দিকে।
…
রাত তখন আরও ঘনীভূত। শহর নিস্তব্ধ, বাতাসে এক অচেনা শীতলতা জমে আছে। সেই নীরবতার মাঝেই আরাফ হাঁটছে, কোলে ঘুমহারা, কান্নায় ভেজা আরোহিকে নিয়ে। মেয়েটার ছোট্ট দেহটা এখনও থরথর কাঁপছে, তার প্রতিটি শ্বাস যেন কান্নার সঙ্গে লড়াই করছে। রহিম মাস্টারের তিনতলা বাড়ির সামনে এসে থামে আরাফ। বাড়িটার সব আলো নিভে আছে, শুধু গেটের সামনে একটা লাইট জ্বলছে, তার নিচে দাড়িয়ে আছে দারোয়ান চাচা। আরাফ এগোতেই চাচা অবাক হয়ে তাকান। দারোয়ান ভ্রু তুলে বলে ওঠে,
–” আরে, আরাফ বাবা! তুমি এইহানে ক্যান এই রাইতের বেলা? আর আরোহি দাদুমনি কান্দে ক্যান? কি হইছে?”
আরাফ ক্লান্তি আর অসহায়তার মিশ্র দৃষ্টি নিয়ে বলে,
–” চাচা! একটু সমস্যা হয়ে গেছে।”
চাচা এগিয়ে এসে আরোহির ভেজা মুখটা দেখে উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
–” কি সমেস্যা?”
আরাফের কণ্ঠ থেমে থেমে আসে,
–” এই বাড়ির ভাড়াটিয়া জারিফাকে আপনি চেনেন?”
কামরুল চাচা মাথা নেড়ে বলেন,
–” হ, চিনুম না ক্যান? ভারি ভালো মাইয়া। শান্ত-শিষ্ট।”
আরাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–” আমার মেয়েটা, ওর জন্য কান্নাকাটি করছে অনেকক্ষণ ধরে। কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না।”
চাচা একটু অবাক। একটু দ্বিধায় পড়ে বলেন,
–” বুঝবার পারতেছি, বাবা। কিন্তু এই রাইতের বেলা এক ফ্লাটে গিয়া একডা মাইয়া মানুষরে ডাইকা কিছু কওন, ঠিক হইব নারে।”
আরাফ ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
–” আমি ফ্লাটে উঠবো না, চাচা। আপনি যদি ওর নাম্বারটা দিতে পারতেন। মেয়েটা যদি একটু কথা বলতে পারে, শান্ত হতে পারে হয়তো।”
চাচা মুহূর্তের জন্য দোটানায় পড়ে তাকিয়ে থাকেন আরোহির দিকে। মেয়েটা বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দৃশ্যটা দেখে কোমল হয়ে যায় চাচার মন।
–” খাড়াও বাবা! নাম্বার আছে। দিতাছি মুই।”
চাচা পকেট থেকে পুরনো বাটন ফোন বের করে নাম্বারটা ডায়াল করে দেয় আরাফকে।
জারিফা নিজের ঘরের আধো-অন্ধকারে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। ঘরটা ভারী নীরবতায় ডুবে আছে। আরোহির সাথে দেখা নেই দুই দিন। পার্কে গিয়েছিলো, পায়নি। বাসার সামনে দাঁড়িয়েছিলো, তাও দেখা হয়নি। সেই দিনের ঘটনা মনে পড়লেই বুকের ভেতর অজানা ভ’য়, লজ্জা, অপমানবোধ, কাজ করে তাই আর যেতে পারেনি।
কিন্তু, আরোহির মুখটা ভুলতে পারে না সে। মেয়েটা যেন তার জীবনে কোথায় যেন এক অদ্ভুত জায়গা দখল করে নিয়েছে নিঃশব্দে। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। অচেনা নাম্বার। এতো রাতে। কে হতে পারে?
জারিফা ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে,
–” হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম?”
ওপাশে মুহূর্তের নীরবতা। তারপর, একটা ভাঙা, কাঁদো কাঁদো, ছোট্ট কণ্ঠ,
–” জালিফা আন্টি!”
অবাক হয়ে চোখ বড় হয়ে যায় তার। এই কণ্ঠ, সে চেনে। চিনেই যায় মুহূর্তে। আরোহি! বুকের ভেতর ধুক করে ওঠে।
–” আরোহি! সোনা মা! কান্না করছো কেন? কি হয়েছে তোমার?”
ওপাশ থেকে অস্পষ্ট কান্নার ফাঁকে আসে,
–” আই মিস ইউ, আন্টি! আমি তোমাল কাছে যাবো।”
জারিফার চোখ ছলছল করতে শুরু করে। শব্দগুলো বুকের কোথাও গেঁথে যায়।
–” মা! এখন তো অনেক রাত। কাল ভোরেই আমি তোমার কাছে যাবো, প্রমিস করছি। ঠিক আছে, মা?”
আরোহির কণ্ঠ আরও ভেঙে যায়,
–” আমি তো তোমাল বাসাল নিচে।”
জারিফা থমকে যায়।
–” বাসার নিচে?”
–” হ্যা! পাপা নিয়ে আসছে। আমাল তোমাকে অনেক মনে পলছে।
জারিফা এক মুহূর্ত কথা হারিয়ে ফেলে। হাত কাঁপতে থাকে। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এই রাতে, এই শিশুটার বুকে এতোটা কষ্ট। ওপাশে আরাফ কিছু বলছে না। নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। ল
দারোয়ান তাকিয়ে আছে আরোহির দিকে। আরোহি কাঁদছে, এখনও কাঁদছে। জারিফা দ্রুত বলে,
–” আমি আসছি, মা! এখনই আসছি।”
ফোন কেটে দেয় সে। উড়নাটা কাঁধে পেঁচিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যায় নিজের ফ্লাট থেকে।
পা দুটো কাঁপছে, উদ্বেগে, আনন্দে, আর কোথায় যেন বুকের খুব গভীরের টানে। রাতের নীরব সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় সে। আরোহির দিকে। ওর কান্নার দিকে। ওর ডাকের দিকে।
…
জারিফা দৌড়ে নেমে আসে। পরনে ঘরের আরামদায়ক কাপড়, কাঁধে উড়না, চোখ দুটো উদ্বেগে বড় হয়ে আছে। নিচে নামতেই তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকে আরোহির ওপর ফোলা চোখ, থরথর ঠোঁট, বাবার বুক আঁকড়ে থাকা অসহায় ভঙ্গি। কান্নায় ক্লান্ত, শরীরটা এখনও থরথর কাঁপছে। জারিফা থামতে পারে না।
সে দৌড়ে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলতে থাকা স্বরে বলে ওঠে,
–” আরোহি! সোনা মা!”
এক মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে নেয় আরাফের কোল থেকে।
আরোহি জারিফাকে দেখেই ঠোঁট উল্টিয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। যেন সব কষ্ট, সব অভিমান ওই মানুষটার কাছে বললেই শেষ হয়ে যাবে। জারিফা শিশুটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ফিসফিস করে,
–” কাঁদে না, মা! এইভাবে কান্না করতে হয় না। দেখো, আমি আছি।”
কথাটা যেন জাদুর মতো কাজ করে। আরোহির কান্না ধীরে ধীরে থেমে আসে। সে মুখ গুঁজে দেয় জারিফার কাঁধে। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট বুকটা ওঠানামা ধীর হয়ে যায়, আর কান্নার পরিশ্রান্তিতে সে আস্তে আস্তে ঘুমে চলে যায়।
রাস্তাটা নিঝুম। বাতাসে হালকা ঠাণ্ডা। জারিফা কোলের শিশুটাকে এক হাতে আলতো দোলাতে দোলাতে হাঁটছে ধীর পায়ে। দূরে রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে ম্লান হলুদ আলোয়। আরাফ কিছুটা পিছনে দাড়িয়ে, চুপচাপ, স্থির, বিস্মিত দৃষ্টিতে। এই প্রথম তার মনে হলো, সে যতই চেষ্টা করুক, যতই ভালোবাসা ঢেলে দিক, মা নামের সেই উষ্ণতা আরোহির ভেতর কোথায় যেন শূন্যতা হয়ে জমে আছে। এতো বছর সে একাই সামলেছে। জন্মের মুহূর্তেই হারিয়েছে আরোহির মা। শেষ নিশ্বাসের আগেও সে আরাফের দিকে তাকানোর সময় পায়নি। কিন্তু আরাফ প্রতিজ্ঞা করেছিলো, যে করেই হোক মেয়েকে আগলে রাখবে, তার কোনো কষ্ট হতে দেবে না।
কিন্তু আজকের রাত তাকে বুঝিয়ে দিলো, একজন বাবা যতই শক্তিশালী হোক, মা এর অভাব শিশুর ভেতরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে যায়। আরোহির বিন্দু মাত্র কষ্ট আরাফ হতে দেয় না। তাও দিনশেষে আরোহি মায়ের ভালোবাসা চায়। তা নাহলে, এইযে জারিফা, যার সাথে কিছুদিনের পরিচয় আরোহির। কিন্তু, তার মায়ের মতো ভালোবাসা আরোহিকে এতোটাই প্রভাবিত করেছে, যে এই রাতের বেলা আরোহিকে সামলাতে পারেনি আরাফ। যে আরোহি আরাফকে পেয়ে সব সময় শান্ত, আজ সেই মেয়েকে শান্ত করতে পারেনি আরাফ। অথচ এই জারিফা নামক মেয়েটি কিছুক্ষণের মাঝে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে এইটাই কি বলে, মেয়ে বলতেই মায়ের জাত?
কিছু দূর এগিয়ে এসে জারিফা একবার পিছন ফিরে তাকায়। আরাফ তাদেরই দিকে তাকিয়ে, কেমন এক গভীর, নিরুপায় দৃষ্টিতে। জারিফা ধীরে কাছে আসে।
আরাফ দুই হাতে ঘুমন্ত আরোহিকে আবার নিজের কোলে নেয়। শিশুটার মাথা তার বুকের ওপর গা ঘেঁষে পড়ে। আরাফ নরম কণ্ঠে বলে,
–” ধন্যবাদ, আপনাকে। আর সেইদিনের জন্য, সরি।”
জারিফা মাথা নেড়ে মৃদুস্বরে বলে ওঠে,
–” আরোহির একজন মায়ের খুব প্রয়োজন।”
আরাফ এক পলক তাকায় তার মুখের দিকে। চোখে ক্লান্তির মতো কিছু মিলেমিশে আছে। জারিফা শান্ত গলায় আবার বলে,
–” আপনি একজন বাবা হিসেবে নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তবে, একজন মা কে আপনি কীভাবে পূরণ করবেন? সেই জায়গাটা কি কখনো পূরণ হয়?”
আরাফ চোখ নামিয়ে ফেলে। উত্তর নেই তার কাছে।
কিছুক্ষণ পরে ধীরে বললো,
–” বিয়ে তো চাইলেই করা যায়। কিন্তু, সবাই কি আর আমার মেয়েকে গ্রহণ করতে পারবে? অথচ সে তো আমার প্রথম শর্ত থাকবে।”
জারিফা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
–” আপনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু, আপনি ভুল জায়গা থেকে চিন্তা করছেন। আপনি বিয়ে করে আরোহির জন্য মা আনবেন না। বরং, আরোহির মাকে আপনি বিয়ে করে আনবেন।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ। রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়। আরাফ তাকায় জারিফার দিকে, একদম সোজা, তীক্ষ্ণ, স্থির দৃষ্টিতে। জারিফা চোখ নামিয়ে ফেলে। তারপর নরম স্বরে বলে ওঠে,
–” ওকে বাসায় নিয়ে যান। শুইয়ে দেওয়া দরকার।”
আরাফ সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নেড়ে বলে,
–” জি! তাহলে আসছি। ভালো থাকবেন।”
সে ঘুরে যেতে নেয়। ঠিক তখনই জারিফা ডেকে ওঠে,
–” একটা কথা, কাল থেকে আমি কি আপনার বাসায় যেতে পারবো? আরোহির কাছে?”
আরাফ থেমে যায়। ধীরে ঘুরে তাকায়, ভ্রু একটু উঁচু করে।
–” লজ্জা দিতে চাইছেন আমাকে?”
জারিফা মাথা নাড়ে।
–” না! অনুমতি চাইছি।”
আরাফের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে বললো,
–” যারা মায়ের ভূমিকা পালন করে, তাদের অনুমতির প্রয়োজন হয় না।”
এই বলে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে রাস্তার অন্ধকারের দিকে, কোলে ঘুমন্ত আরোহিকে আরও আঁকড়ে ধরে।
জারিফা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঠোঁটে এক নিঃশব্দ, উষ্ণ, অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠে। যা যেন দীর্ঘদিন পরে প্রথমবার তার হৃদয়কে আলোয় ভরিয়ে দেয়।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
