#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#পর্ব_০২
______________
২.
পাড়ার মোড়ে ছোট্ট এক টিনের দোকান। সকাল-সন্ধ্যা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে জমে উঠে গল্পের আসর। কৃষক, দিনমজুর, বুড়োরা—সবাই একসাথে বসে নানান গল্পে মেতে উঠেন, নিজেদের সুখ-দুঃখের আলাপ করে করে ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়। সে-সব গল্পের নীরব সাক্ষী হয়ে বসে থাকেন হালিমা বেগম। স্বামী মারা যাওয়ার পর তার ব্যবসাটাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরেন তিনি। কাঠকয়লার আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন দিব্যি। এই জীবনের প্রতি কোনো আফসোস নেই তার। যত আফসোস শুধু মেয়েটার নিয়ে। জোয়ান বয়সেই স্বামী হারা হয়েছে। সাথে একটা নাতনিও আছে। সেদিকটা চিন্তা করতে গেলে পাগল হয়ে যান হালিমা বেগম। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন মেয়ে আর নাতনিকে ফেলবেন না। কিন্তু চোখ বুঁজলে। তখন কী হবে? হালিমা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। জীবন বড়োই অদ্ভুত। বিকেল হলেই চায়ের দোকানে ভিড় জমে। জমজমাট হয়ে উঠে চারদিক। হালিমা বেগম রেডিও ছেড়ে দেন তখন। এরইমধ্যে দোকানে এসে হাজির হলো সৌরভ মাস্টার। তাকে দেখে হাসলেন হালিমা বেগম। সৌরভকে বসতে বলে তিনি কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘চা খাইবেন তো মাস্টার?’
সৌরভ আশপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে বলল, ‘চাচি, আজ চা খেতে আসিনি। আলোর বিষয় নিয়ে একটু কথা বলতে চাই।’ সৌরভ একটু থেমে আবারও বলল, ‘দোকানে তো অনেক মানুষ। আপনি একটু বাইরে আসলে খুব ভালো হতো।’
হালিমা বেগম দু-হাত কাপড়ের আঁচলে মুছে বললেন, ‘তুমি যাও। আমি এই চা টা দিয়া আসতেছি।’
সৌরভ মাথা নাড়ল। মৃদুস্বরে বলল,
‘আচ্ছা চাচি।’
সৌরভ বাইরে এসে দাঁড়াল। তখনই তার চোখে পড়ল। মাঠের দিকে। নানান বয়সের ছেলেপুলেরা খেলা করছে সেথায়। মেয়েরা মাটির উপর দাগ টেনে কি এক অদ্ভুত খেলা খেলছে, মুখ দিয়ে শুধু কুতকুত শব্দ করছে আর দাগের উপর চারা ফিক্কা মারছে। একটু দূরেই আরেকটু বড় ছেলে মেয়েরা একসাথে দাড়িয়াবান্ধা খেলা খেলছে তার পরেই কিছু ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে, এদের মাঝে আলো নেই। সে তার বয়সী বাচ্চাদের সাথে খেলা করছে কিংবা বাসায় আছে। হাসির শব্দ, দৌড়ঝাঁপ, আনন্দের হুল্লোড়ে ভরে ওঠেছে খেলার মাঠ। এমন সময় আলোকে দেখল সৌরভ। নারিকেল গাছের পাতার ওপর বসে আছে। আর তিনজন ছেলে পাতার সামনের দিক ধরে টেনেটুনে তাকে নিয়ে যাচ্ছে। আলো খিলখিল শব্দ করে হাসছিল। তার মুখে হাসি দেখে হেসে ফেলল সৌরভ। সে-সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন হালিমা বেগম। নাতনির হাসিমুখ দেখে তিনি বললেন, ‘মাস্টার মশাই।’
সৌরভ ঘুরে তাকাল। অতন্ত্য নম্র গলায় বলল,
‘হুট করে এসে আপনার কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। তার জন্য অনেক দুঃখিত আমি।’
হালিমা হাত নেড়ে বললেন,
‘আমি কিছু মনে করিনি বাবা। তোমার যখন ইচ্ছা তখন আমার দোকানে আসতে পারো। আমার কোনো সমস্যা নাই। তা হঠাৎ আসছো— আলো কোনো অপরাধ করছে নাকি বিচার নিয়ে আসছো? বুঝোই তো বাবা, বাপ মরা মেয়ে। কখন কি দুষ্টুমি করে ফেলে বলা মুশকিল। তবে তুমি আমার কাছে সব কও। আমি ওকে বোঝাব।’
সৌরভ মাথা নাড়ল। বলল,
‘তেমন কিছু না চাচি। আলো অনেক ভালো মেয়ে। এতটুকু বয়সে অনেক বুঝদার সে। ও কোনো অন্যায় করেনি আমার কাছে। আমি এসেছি অন্য এক কারণে।’
‘কি কারণ বাবা?’
হালিমা বেগম উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন। সৌরভ কিয়ৎক্ষণ ঠোঁট কামড়াল। তারপর বলল, ‘আমি এসেছি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’ হালিমা বেগম চোখ বড়ো বড়ো করে চাইলেন। বিয়ে? কার বিয়ে? কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। সৌরভ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সমানে ঘামছে সে। কিভাবে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবে? সেটাই বুঝতে পারছে না। সৌরভ লম্বা করে নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর সকালের ঘটনা হালিমা বেগমকে ধীরে ধীরে শোনালো। সব শুনে চকিত তাকালেন হালিমা বেগম। তার নাতনি। সত্যি অনেক বুঝদার হয়েছে। নয়তো এটুকু বয়সে এতকিছু চিন্তা সে কখনোই করতে পারতো না। হালিমা বেগম তাকালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখন কি চাও মাস্টার?’
সৌরভ বলল,
‘আমি আপনার মেয়ে আয়েশাকে বিয়ে করতে চাই। চাচি, আপনি জানেন আমার এই পৃথিবীতে কেউ নাই। তাই! আমার দিক থেকে প্রস্তাব নিয়ে আসারও কেউ নাই। আলোর কথা আমি গভীর ভাবে চিন্তা করেছি। ওর জায়গায় ও ঠিক আছে। আয়েশা ও আলোর দায়িত্ব আমি নিতে চাই। আমার মেয়ের মতো থাকবে আলো। বাকিটা আপনার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলাম।’
হালিমা বেগম হালকা হেসে বললেন, ‘আমি যে আয়েশার বিয়ের কথা চিন্তা করি নাই তা কিন্তু না মাস্টার। আমি অনেকবার ওকে বিয়ের কথা বলেছি কিন্তু মেয়ে আমার বিয়ে করবে না। সেই এক কথা বলে বসে থাকে। আমি বুড়া মানুষ। কখন মরে যাই তার নাই ঠিক। এমতাবস্থায় জোয়ান মাইয়া আর ছোট নাতনির জন্য কিছু করে রেখে না গেলে আমি যে শান্তি পাবো না। তুমি সরাসরি কথা বলেছো তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা আমার নাই। তুমি চিন্তা করিও না বাবা। আমি আলোর মাকে যেমনে হোক। রাজি করাবো। তোমার মতন পাত্র সারা গ্রাম খুঁজেও কেউ পাইবে না। তুমি চিন্তা করো না। আমার দিক থেকে বিয়ে পাকা। আমি আজই বাসায় গিয়ে আয়েশার সাথে এই বিষয়ে কথা বলব।’
সৌরভ মৃদু হেসে বলল,
‘তাহলে চাচি—আমি এখন যাই?’
‘এক কাপ চা খেয়ে যেতে?’
‘না চাচি, অন্য একদিন। এখন মাতব্বরের বাসায় যেতে হবে। ওনার ছেলেকে আবার আমি টিউশন পড়াই।’
হালিমা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন,
‘কী শন?’
‘কী শন না চাচি ওটা টিউশন মানে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াই।’
‘ওহ আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে যাও। সাবধানে যাবে কিন্তু বাবা।’
‘আচ্ছা চাচি।’
৩.
দীঘির ঘাটে বসে বসে থেকে থালাবাসন ধুয়ে উঠে এলো আয়েশা। বাড়ির দিকে যেতে যেতে পথেই দেখা হয়ে গেল প্রতিবেশী জসিম ভাইয়ের সাথে। তিনি এদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন পথিমধ্যে আয়েশাকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। জসিম ভাই ডেকে বললেন, ‘এই আয়েশা… শুনো।’
আয়েশা থেমে গেল। জসিম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘জি জসিম ভাই। কিছু বলবেন?’
জসিমের চোখ কুঁচকে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। সে রুক্ষ গলায় বলল, ‘ভাই? আমি আবার কোন জন্মের ভাই তোমার? যাইহোক, সেইসব কথা বাদ দাও। তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো। তা তুমি কি চিন্তা করছো আমাকে নিয়া? মন স্থির করছো? তোমার বাসায় বিয়ার প্রস্তাব কী পাঠামু? তুমি তো জানো সেই ছোটো থেকে তোমাকে আমার পছন্দ। তোমার বিয়ে হয়েছিল একটা বাচ্চা আছে। আমার কোনো আপত্তি নাই তাতে।’
আয়েশা দাঁতে দাঁত কটমট করে। রাগ সংযত করে বলল, ‘জসিম ভাই, আমি আপনাকে আগেও বলেছি আর এখনও বলছি, আপনি আমার পেছন পেছন ঘুরবেন না। আমার আপনাকে পছন্দ না। আমি সারাজীবন একা থাকবো তবুও আপনাকে বিয়ে করব না। আর আপনার লজ্জা করে না? ঘরে বউ-বাচ্চা ফেলে আমাকে এইসব কথা বলেন?’
‘লজ্জা করব কেন? পুরুষ মানুষের চায় বিয়া করা জায়েজ। আমি চার বউ পালতে পারুম। আমার সেই ক্ষমতা আছে তাহলে লজ্জা পাবো কেন? তুমি যতোই নাখরা দেখাও আয়েশা বিয়ে আমি তোমাকে করমুই।’
আয়েশা আর এক মূহুর্তও দাঁড়াল না। হনহনিয়ে চলে গেল জায়গা ছেড়ে। জসিম নিঃশব্দে পিছু নিচ্ছিল তার। পথে দুজন লোককে দেখে পেছন থেকে চলে গেল। সাত বছর ধরে ওই বদমাশ লোকটা জ্বালিয়ে মারলো আয়েশাকে। আয়েশা ধুপধাপ পা ফেলে বাড়িতে এলো। দুই ডিসিম জমির ওপর ছোট এক টিনের ঘর, ঘরের চারপাশে বড় বড় আম কাঁঠাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। উঠোনের দক্ষিণ কোণে পাতা আছে একখানা চৌকিখাট। খাটের ওপর থালাবাসন গুলো রেখে এক মিনিট বসল আয়েশা। শরীরটা দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভালো লাগে না কিছুই এখন। মনে চায় সারাদিন শুয়ে থাকি। কিন্তু শুয়ে-বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না। রাতের জন্য রান্না করতে হবে। আয়েশা জলদি জলদি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সন্ধ্যা হওয়ার আগে রান্না শেষ করে ঘরে চলে যাবে। এরই ফাঁকে উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে হাঁক ছেড়ে ডাকে আলোকে।
‘আলো.. ওই আলো! বাসায় আয়। পড়তে বসবি।’
আলো কি আর শোনে তার মায়ের কথা? সে তখন বড়দের খেলায় অংশ নিয়ে হয়েছে দুধভাত। হালিমা বেগম মেয়ের গলার স্বর শুনতে পেলেন। দোকান থেকে উঁকি দিয়ে আলোকে ডেকে তাড়াতাড়ি বাসায় পাঠালেন তিনি। আলো সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। মা তখন লাকড়ি চুলার মুখে দিয়ে আগুন ধরাচ্ছে। আলোকে দেখে বলল, ‘হাত মুখ ধুয়ে আয়। পড়তে বসবি।’
আলো বলল,
‘আমার আজ পড়তে ইচ্ছা করছে না মা। আজকে না পড়ি?’
আয়েশা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আজকে রাতে তোকে ভাত খেতে দেবো না। ঠিক আছে? চলবে?’
আলোর মুখটা একটুখানি হয়ে গেল। খাবারের কথা আসলে যেমন মন ভালো হয় তার ঠিক তেমনি খাবার পাবে শুনে মন খারাপও হয়ে যায়। একবেলা খাবার না খেয়ে থাকলে পেটে কি জ্বালা করে। আলো খাবারের কথা মাথা রেখে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসে গেল। আয়েশা একদিকে রান্না করছে আর আরেকদিকে মেয়েকে পড়াচ্ছে। এভাবেই রাত হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন সম্ভবত আটটা বাজে। দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফিরে আসেন হালিমা বেগম। আলো ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। তিনি হাতমুখ ধুয়ে এসে ঘুমন্ত নাতনির কপালে চুমু দিয়ে খেতে বসলেন। আলুর শাঁক ভাজি, মাছ ভাজা ও ভাত দিয়ে পেট ভরে খেয়ে উঠলেন হালিমা বেগম। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সারাদিন যা বেচাকেনা হয় তা নিয়ে বিস্তার আলাপ করেন মেয়ের সঙ্গে। সেই আলাপ করতে বসে, আয়েশাকে বিয়ের কথা বললেন হালিমা বেগম। হালিমা বেগম বললেন, ‘জীবনে কম কষ্ট তো করিস নাই। এখন একটু সুখের দেখা পেলে ক্ষতি ক? আমরা গরিব মানুষ দিন আনি দিন খাই। একবেলা খেলে পরের বেলা কী খাবো সেটা নিয়ে ভাবতে হয়। তুই তো কম কষ্টে বড় হসনি। সে ছোট থেকে কষ্ট করে বড় হয়েছিস। খিদের জ্বালায় পেটে গামছা বেঁধেছিস। এখন সেসব অতীত। কিন্তু মিথ্যে নয় কিছুই। তুই যা কষ্ট সহ্য করেছিস সেসব তোর মেয়েও করুন। তুই কী তাই চাস?’
আয়েশা মাথা নাড়ল। বলল,
‘না, মা। আমি যা কষ্ট করেছি সেই কষ্ট আমার মেয়ে কখনো না পাক। আমি যে সহ্য করতে পারব না ওর কষ্ট।’
হালিমা বেগম মেয়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, ‘সেজন্য একটা কথা বলতে চাই। রাগ করিস না। তুই আবার বিয়ে কর। সংসারী হো। এতে তোর আর আলো দুইজনেরই মঙ্গল হবে। আজ তোর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আমি রাজি। এবার তুই রাজি হলেই চার হাত এক করে দেবো। ছেলে খাঁটি সোনা। লাখে একটা। আমাদের সৌরভ মাস্টার। তোকে বিয়ে করতে চান। তুই না করিস না মা। নিজের না হোক মেয়ের ভবিষ্যতের কথা একটু চিন্তা কর। আর গ্রামের অবস্থা তো দেখিস কতগুলো শকুন হা করে বসে আছে তোকে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য। আমি তোকে জোর করব না। তুই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর। তারপর তোর মতামত জানাবি আমাকে। শেষ একটা কথাই বলব যোগ্য পাত্র সব সময় পাওয়া যায় না। যখন পাওয়া যায় তখন হাতছাড়া করতে নেই। মাস্টার কে তুই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা আমি। আলোও তাই চায়।’
আয়েশা চোখ তুলে তাকাল। আলোও তাই চায়? এর অর্থ কী? সে চায় তার মা ওর মাস্টার কে বিয়ে করুন। কিন্তু ও তো ছোটো। বিয়ের কি বুঝে সে? আয়েশা অনেক ভাবলো। আজকের বিকেলের ঘটনা মাথায় রেখে ও আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে সে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল। আয়েশার সামনে যখন কেউ তার মেয়েকে এতিম বলে তখন তার কষ্টে বুক ফেটে যায়। আলোর বাবা প্রয়োজন। সবদিক চিন্তা করে আয়েশার সপটচোস্ত জবাব,
‘আমি রাজি।’
চলবে……
