#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#পর্ব_০৬
______________
৭.
দু’বছর হয়ে গেল আলো ও আদনানের পরিচয়ের। প্রথম আলাপে যে অস্বস্তি ও লজ্জা অনুভব সে করেছিল, তা কেটে গেছে বছর দুয়েক আগেই। এখন যেন আদনান নামক মানুষটাই আলোর সবচেয়ে প্রিয়জন হয়ে ওঠেছে। যদি কেউ আলোকে জিজ্ঞেস করে, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কে? আলো উত্তর দেবে তার মাস্টার মশাই। যদি আবার জিজ্ঞেস করা হয়, এরপর কে? তাহলে আলো বলবে আদনানের কথা। হ্যাঁ। আদনানের সাথে আলোর রক্তের সম্পর্ক নেই। আছে শুধু আত্মার সম্পর্ক। রক্ত ও আত্মার সম্পর্কের মাঝে পার্থক্য বহুত—মানুষ রক্তের সম্পর্ক ছাড়তে পারলেও আত্মার সম্পর্ক ছাড়তে পারে না। আদনান হলো আলোর মনের মানুষ। অনেক আগেই দেওয়া নেওয়া হয়েছে মন। মধুময় প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে দুজন। দু’জন দু’জনার সাথে সময় কাটায়, একসাথে শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়ায়, ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করে, আবার কখনো কখনো হাতে হাত রেখে দীর্ঘ পথ হাঁটে—সব মিলিয়ে যেন জীবনের সবচেয়ে মধুর সময় কাটাচ্ছে আলো। সেদিন বিকেলের কথা। দু’জন বের হয়েছিল হাঁটতে। পাশাপাশি চলতে চলতে ওরা পৌঁছে গেল এক পার্কে। চারদিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো সব কড়ুইগাছগুলো; গাছের ছায়ায় বসে আছে ফুচকাওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা আর বাদামওয়ালা। গাছের নিচের একটি বেঞ্চে বসে ওরা। আদনান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল আলোর দিকে। আদনান ধীরে ধীরে আলোর হাতটা ধরে। তারপর বলল, ‘আলো, তুমি জানো না… তোমাকে পাশে পেলে মনে হয় আমি বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ। তোমার হাসিটা যেন আমার বাঁচার কারণ হয়ে গেছে।’
আলো চোখ নামিয়ে লাজুক হাসল। ওর গাল দুটো হালকা গোলাপি হয়ে উঠেছে। আলো দুই হাতের আঙুল জড়ানো অবস্থায় নড়াচড়া করছিল। হঠাৎ আলো একটু ঝুঁকে আদনানের কাঁধে মাথা রাখল। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আদনান এভাবে থাকি কিছুক্ষণ?’
আদনানের হৃৎস্পন্দন থেমে গিয়ে আবার যেন চলতে শুরু করল। সে আলোর মাথার ওপর হাত রেখে খুব শান্ত স্বরে বলল, ‘থাকো আলো… যতক্ষণ তুমি চাও।’
পার্কের ওদিক থেকে বাদামওয়ালার মৃদু ডাক ভেসে এলো, বাতাসে ভাসছে বাদাম ভাজার গন্ধ। আদনান আলোকে বসিয়ে রেখে বাদাম কিনতে গেল। দশ টাকার বাদাম নিয়ে এলো সে। বাদাম খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। আলো পা দুলাতে দুলাতে আদনানের দিকে মুখ তুলে তাকায়। কণ্ঠস্বর নরম করে খুব ধীরে ধীরে আলো বলল, ‘জানো আদনান… তুমি সাথে থাকলে মনে হয় আমার পৃথিবী রঙীন হয়ে ওঠে। আর যখন থাকো না—তখন সব অন্ধকারে ডুবে থাকে।’ বলেই হাসল। ‘তুমি সব সময় আমার সাথেই থেকো।’
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে আলোর। আগামীকাল হোস্টেল ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে হবে তাকে। তাই আজ আদনানের সাথে দেখা করতে এসেছে সে। মনের সব কথা খুলে বলবে আজ। বিয়ের কথাও বলবে। মনে মনে খুব খুশি সে। লাল রঙের শাড়ি পরে এসেছে আলো, ওর চুলের খোঁপায় কৃষ্ণচূড়া কাছ থেকে এক থোকা ফুল ছিড়ে গেঁথে দিয়েছে আদনান। আলো গভীর দৃষ্টিতে আদনানের মুখের দিকে তাকাল। কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে। মনে হচ্ছে কোনো বিষয় নিয়ে খুব পেরেশান সে। আলো বোঝার চেষ্টা চালালো আদনানের মনে কী চলছে। অনেকক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন করবে করবে করেও করা হয়নি। হঠাৎ সে প্রশ্নটা করে ফেলল আলো, ‘তুমি আমায় ভালোবাসো?’
‘হু!’
‘কেনো?’
আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর শ্বাস ফেলল মানুষটা, তারপর মাথা নিচু করে একপলক দু’পলক দেখল সে আলোকে। তার ডাগরডাগর গভীর আঁখিতে চোখ রেখে নির্বিকার গলায় বলল, ‘কোনো কারণ নেই!’
‘সত্যি নেই?’
‘হয়তো আছে। আমার জানা নেই।’
খানিকক্ষণ মৌন থেকে আলো বলল,
‘বিয়ে করবে আমায়?’
‘নাহ।’
পাশে বসা সু পুরুষটির মুখে প্রত্যাখ্যান শুনে কপালে চার ভাজ পড়ল আলোর। ভ্রু কুঞ্চিত করে, সঙ্গে সঙ্গে সে প্রশ্ন করল,
‘কেনো?’
আদনানের সপটচোস্ত জবাব,
‘বউ-বাচ্চা আছে আমার।’
৮.
বর্ষণের রাত। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির জন্য উঠোনের আম গাছটাও দেখা যাচ্ছে না। এসময় একজন পুরুষ লোক হাতের থলে মাথার ওপর ধরে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে উঠল এক বাড়ির বারান্দায়। ঠান্ডা বাতাস ও বৃষ্টিতে ভিজে শিরশির করে কাঁপছে লোকটা। দু-হাত বুকের ওপর ভাজ করে শীতে কাঁপছিল। দাঁতে দাঁত কটমট করছে। সহসা দরজা খোলার শব্দে ঘুরে তাকাল সে। অন্ধকারে তেমন কিছুই দেখা গেল না। তবু তাকিয়ে রইল লোকটি। একজন মধ্য বয়স্ক বেরিয়ে এলেন। অন্ধকার চিরে ভেসে এলো সে মধ্য বয়স্কের কণ্ঠ, সে বলল, ‘এই বৃষ্টির রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো।’
লোকটি বুঝলো। অন্ধকারে থাকা মানুষটা একজন মধ্য বয়স্ক তাই তার বাড়িতে অতিথি হতে আপত্তি নেই ওর। এই গাঁ হিম করা ঠান্ডা থেকে তাকে বাঁচাতে আল্লাহ এই মধ্য বয়স্ককে পাঠিয়েছেন। মধ্য বয়স্কের ঘরের মাঝখানে একটা কুপি জ্বলছে, বাতাসে টিপটিপ করছে ওটা। মধ্য বয়স্ক মানুষটা তাকে বসতে দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। একটু পরেই একটা গামছা, লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি নিয়ে ফিরে এলেন তিনি। অপরিচিত মানুষের প্রতি এত সহৃদয় হতে আজকাল আর দেখা যায় না। মধ্য বয়স্কের হাত থেকে কাপড়গুলো নিয়ে জামাকাপড় বদলে নেয়। একটু পরেই ওর পরিচয় জানা গেল। ছেলেটার নাম ওয়াহাজ হাসেম। এই গ্রামে নতুন এসেছে। রাস্তাঘাট তেমন চেনে না। বৃষ্টির মধ্যে ভুল করে এদিকে চলে এসেছে। তাকে আশ্রয় দেখা মধ্য বয়স্ক মানুষটা। ওয়াহাজ ভেবেছিল, মধ্য বয়স্ক মানুষটা এই এতবড় বাড়িতে একাই থাকে। কিন্তু না। একটু পর ওর ভুল ভাঙলো। মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি বলল, ‘বৃষ্টিতে ভিজেছো। তোমার ঠান্ডা লাগছে নিশ্চয়ই। একটু অপেক্ষা করো বাবা, আমার মেয়ে চা বসিয়েছে। এখনই হয়ে যাবে।’ সে থেমে থেমে বলল, ‘ও চা খুব ভালো বানায়। ওর হাতের চা একবার খেলে তুমি চায়ের প্রেমে পড়ে যাবা।’
ওয়াহাজ অপ্রস্তুত ভাবে হাসল। এই ঝড়বৃষ্টির রাতে হঠাৎ একজনের বাড়িতে এসে ঢুকেছে সে আর লোকটাও তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেমন অস্বস্তি লাগতে লাগল। মোড়ায় বসা ওয়াহাজ থরথর করে কাঁপছে দেখে মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি ভেতর ঘরে গেল। হাতে করে একটা মোটা শাল নিয়ে এলো সে। ওটা ওয়াহাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা গায়ে জড়িয়ে নাও। ঠান্ডা কম লাগবে।’
ওয়াহাজ তাই করল। শালটা গায়ে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। খানিকক্ষণ পরে ভেতর ঘরের দরজার সামনে একজন মেয়েলোক এসে দাঁড়াল। দরজায় লাগানো পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে। কুপির আলোয় তার পা দেখল ওয়াহাজ, ফর্সা ত্বক, আলতা রাঙা পায়ে আবার নুপুর পরেছে, হাঁটার সময় ছনছন শব্দ হয়। ওয়াহাজ মাথা নিচু করে ফেলল। পর্দার আড়ালে থেকে রমণী দুই কাপ চা ট্রে সহ বাড়িয়ে দেয়। ট্রে-টা নেয় মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি। তারপর ওয়াহাজের কাছে এসে বসে তিনি। এককাপ চা ওয়াহাজকে দিয়ে দ্বিতীয় কাপটা নিজের জন্য তুলে নেন। ওয়াহাজ চা কাপ হাতে নিয়ে বসে রইল। খাবে কী খাবে না ভাবতে লাগল সে। রমণী ধীরে ধীরে পর্দা একটু সরিয়ে বসার ঘরে দৃষ্টি ফেলল। আজ আবার কাকে অতিথি আপ্যায়ন করছে মাস্টার মশাই? দেখতে হচ্ছে তো। পর্দার ফাঁক গলে একপলক পুরুষ লোকটিকে দেখল আলো তারপর নুপুরের ছনছন শব্দ তুলে দরজার আড়াল থেকে চলে গেল। যতটা ভেবেছিল ততটা সুন্দর না। কণ্ঠস্বর সুন্দর; মুগ্ধ করার মতো কিন্তু চেহারা না। আরেকটু পর আবার নুপুরের আওয়াজ কানে এলো ওয়াহাজের। বুঝতে বাকি নেই। মেয়েটি দরজার সামনে থেকে সরে গেছে। আলোর চা বানানোর হাত দারুণ, ঠিক ওর নানীর মতোই স্বাদ হয়। কুপির টিপটিপে আলোয় লোকটাকে ভালো লাগে নি বললে ভুল হবে। বরং সে ভালো করে দেখেইনি। একপলকে একজন মানুষকে ভালো করে দেখা যায় নাকি? উঁহু! যায় না। ভালো করে দেখার জন্য বারবার দেখতে হয়। কিন্তু সে তো একপলক দেখেই চলে এসেছে। সুন্দর না কীভাবে বুঝলো? লোকটার মুখ তো শাল দিয়ে ঢাকা ছিল। উঁহু! আলো ডানে-বামে মাথা নাড়ল। উঠে দাঁড়াল সে। আবার হেঁটে হেঁটে বাসরঘরের সামনে এলো সে। কৌতুহল মেটানোর জন্য। লোকটা সুন্দর কি সুন্দর না দেখতেই হবে। পর্দা সরিয়ে আবার উঁকি দেয় সে। কী আশ্চর্য! লোকটা নেই। তবে কি চলে গেল? মাস্টার মশাই বা কোথায়? আলো পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। বসার ঘরে পা ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে। বৃষ্টি তখনো হচ্ছে। লোকটা কি চলে গেছে? ইসস! একটুর জন্য দেখতে পেল না তাকে। কেমন ছিল লোকটা জানা হলো না আর। আলোর মনে মনে আফসোস হতে লাগল।
‘কাউকে খুঁজছেন?’
সহসা কারো অযাচিত কণ্ঠে ঘাবড়ে গেল আলো। পেছনে ঘুরতে চমকে উঠল সে। কুপি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াহাজ। কুপির হলদে-সোনালি আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার মুখটা। কি সুন্দর চোখ, ঠোঁট, নাক, চোখের ভ্রু, সৃষ্টি কর্তা কী নিখুঁতভাবেই না তাকে বানিয়েছেন। চোখের পলক পড়ল না আলোর। লোকটার ত্বক তামাটে বর্ণের—তবে সুন্দর বলতে গেলে সে সুদর্শন যুবক, বলিষ্ঠ দেহ, সুন্দর চেহারা আর কি চাই একজন পুরুষের? আলোর হুঁশশ ফিরল। সে দ্রুত ভেতর ঘরের দিকে ছুটে গেল। তখনও তার পায়ের নুপুর ছনছন-ঝনঝন শব্দে বাজতে লাগল। বৃষ্টির শব্দের সাথে নুপুরের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
চলবে……..
