#মাস্টার_মশাই
#শারমিন_আহমেদ_নৈঋতা
#পর্ব_০৪
______________
৫.
সকাল হয়ে গেছে। পূর্ব আকাশে সূর্য উঠেছে। সূর্য তার কোমল আলো ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে। সেই হলদে-সোনালি রোদ জানালা গলে ঢুকছে ঘরে। খাটের ওপর গভীর ঘুমে ডুবে আছে আলো—এখনো ঘুম ভাঙেনি তার। খোলা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এক চড়ুই পাখি কিচিরমিচির করে ডাকছে, মাঝেমধ্যে লাফিয়ে লাফিয়ে পাল্টে নিচ্ছে নিজের জায়গা—এক সময় তার ছোট্ট ডানা ঝাপটা দিয়ে ওড়ে গেল খোলা আকাশে। ষোলো বছরে পা দিয়েছে আলো। এখন রূপে ও যৌবনে ভরপুর এক তরুণী সে। বয়সের তুলনায় গায়ে-গতরে বড় হয়ে গেছে সপ, যদিও তার বয়স এখনো মাত্র ষোলো, তবু তাকে দেখলে মনে হয় আঠারো বছরের উচ্ছল যুবতী। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে সে। এ-সময় ঘরে প্রবেশ করল সৌরভ। নিশ্চুপ পায়ে হেঁটে গেল খাটের কাছে। তারপর ধীরেধীরে বসল বিছানায়। আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দেয় আলোর মাথায়। মৃদু ও নরম স্বরে ডাকলো তাকে, ‘আলো এই আলো উঠ মা। বেলা হয়ে গেছে তো। ঘুম থেকে উঠ। স্কুলে যাবি না?’
আলো বিশেষ উঠল না। আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘আরেকটু ঘুমোই। স্কুলে পরে যাবো।’
সৌরভ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। আলোর হাত ধরে টেনে তুললো তাকে। তারপর বলল, ‘এখনই উঠ। ফ্রেশ হবি, রেডি হবি তারপর খাবি অনেক সময় ব্যয় হবে তো মা।’
আলো সৌরভের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‘স্কুলে যাবো তো মাস্টার মশাই তার আগে আরেকটু ঘুমোই।’
এটুকু বলে আবারও শুয়ে পড়ল আলো। মূহুর্তে মুখটা কালো হয়ে গেল সৌরভের। আলো বড় হয়েছে কিন্তু সে এখনো সেই ছোটোবেলার মতো তাকে মাস্টার মশাই বলেই ডাকে। সৌরভের কষ্টটা এখানেই। সে চায়। খুব করে চায়। আলো তাকে বাবা বলে ডাকুক। বাবা ডাক শুনতে বড্ড লোভ হয় সৌরভের। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না যে, আলো তুই আমাকে আর মাস্টার মশাই ডাকিস না, তুই বরং এখন থেকে আমাকে বাবা ডাকিস। আমি তোর মুখে বাবা ডাক শুনতে চাই। কিন্তু না। সে এই কথা বলতে পারে না। বলতে গিয়েও কোথায় যেন আটকে যায়। শেষে আর বলতে পারে না। সৌরভ চায় আলো মন থেকে তাকে বাবা ডাকুক। সে কেন বলে দিবে? কোনো কিছু চেয়ে নেওয়ার থেকে না পাওয়াই ভালো। জোর করে কিছুই চায় না সৌরভ। আলো মন থেকে তাকে বাবা বলে ডাকবে—সেই দিনের অপেক্ষায় আছে সৌরভ। নিবিড়ভাবে ডানে-বামে মাথা নাড়ল সে। আলোর দু-হাত ধরে আবারও টেনে তুললো তাকে। তারপর বলল, ‘একদম না৷ এখনই উঠতে হবে। ব্রাশ করে আয়। আমি খাবার বাড়ছি। সময় বেশি নেই আলো।’
সৌরভ রুম থেকে চলে গেল। আলো ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো। নিশ্চল পায়ে হেঁটে ওয়াশরুম গেল সে। ফ্রেশ হয়ে স্কুল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে নিচে নামলো। সৌরভ খাবার টেবিলে বসে আছে। আলো এসে পাশে বসল তার। মফিজ তখন দুজনার প্লেটে রুটি ও সবজি বেড়ে দিতে লাগল। রুটি ছিঁড়ে সবজি দিয়ে খেতে খেতে সৌরভ বলল, ‘এক মাস পরেই তোর পরীক্ষা। এখন এত ঘুমোলে চলবে না। সকাল সকাল উঠে পড়তে বসতে হবে। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হবে তোকে। তুই তো জানিস তোকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন।’ এটুকু বলে থামলো সৌরভ। আলো তখন গিলে যাচ্ছে। সৌরভ আবারও বলল, ‘শুনছিস কি বলছি?’
আলো মাথা নাড়ল। বলল,
‘শুনছি।’
‘এখন থেকে ঠিকমতো পড়বি তো?’
আলো হেয়ালি করে বলল,
‘এতো পড়ে কী হবে মাস্টার মশাই? একদিন তো বিয়ে হয়ে যাবে।’
সৌরভ প্রথম বারের মতো ধমক দিলো আলোকে। সে বলল, ‘আলোহ। তোর মুখে এই কথা আর যেন না শুনি। তোকে আমি অনেক পড়াবো। তুই পড়বি। গায়ের আর পাঁচটা মেয়ের মতন তোর জীবন হবে না। তুই গায়ের স্কুল থেকে পাশ করে ঢাকা শহর যাবি পড়াশোনা করতে। তার জন্য যা করা দরকার আমি তাই করব। কিরে, কথা কান দিয়ে ঢুকলো?’
‘ঢুকেছে।’
খাবার পর্ব চুকিয়ে বাপ-মেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গল্পগুজব করতে লাগল ওরা। সৌরভ নিজের মতো করে একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে, আর আলো তার কথার প্রত্যুত্তরে শুধু মাথা দুলিয়ে হু-হা-না বলে জবাব দিচ্ছে। স্কুলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পড়ালেখার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগল সৌরভ। আলোকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। সে অনেক বড় হবে। এই গ্রাম থেকে বেরিয়ে শহরে যাবে সে পড়তে তারপর বিলেতেও পড়তে পাঠাবে। কত-শত কথার ভাণ্ডার খুলে বসল সৌরভ। কিশোরী মন সে কথায় গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার যে পড়তে ভালো লাগে না মোটেও। মাস্টার মশাই জোর করে পড়তে বসায় বলেই কেবল পড়তে বসে আলো। তা না হলে পড়তো না সে ভুলেও। গতকাল রাতে সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল। তাতেই রাস্তাঘাট কাঁদা কাঁদা হয়ে গেছে। খুবই সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে হাঁটছিল আলো। লাল মাটি। একটু বৃষ্টি হলেই পিছলা হয়ে যায়। এ সময় একটু সাবধানে হাঁটতে হয়, নয়তো ধুপ করে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কাঁদা মাটির রাস্তাটুকু পার করে এলো ওরা। রাস্তার মোড়ের ফুচকাওয়ালার দিকে চোখ আঁটকে গেল সৌরভের। সৌরভ একপলক ওদিকে তাকিয়ে থেকে আলোর উদ্দেশ্য বলল, ‘কিরে, ফুচকা খাবি? তোর তো আবার ফুচকা খুব পছন্দ। খাবি ফুচকা?’
আলো উজ্জ্বল মুখে বলল, ‘হু। খাবো। আমি আর ফুচকা খাবো না এটা কখনো হয়েছে নাকি? দিন রাত ২৪ ঘণ্টা ফুচকা খেতে পারবো আমি।’
সৌরভ হেসে ফেলল। ‘তাহলে চল।’ বলেই আলোর হাত ধরে নিয়ে গেল ফুচকা ওয়ালার কাছে। ফুচকা ওয়ালার পাশে দাঁড়িয়ে। সৌরভ বলল, ‘ভাই, এক প্লেট ফুচকা দেন। ঝাল একটু বেশি করে দিবেন।’
ফুচকা ওয়ালা মাথা নাড়িয়ে বললেন,
‘এখনই দিতেছি। আপনারা বসেন।’
ট্রলের পাশে কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে। সৌরভ আর আলো দুটিতে বসল। একটু পরেই এক প্লেট ফুচকা দিয়ে গেল ফুচকাওয়ালা। আরাম করে খেতে লাগল আলো। সৌরভ বলল, ‘ঢাকা শহর মস্ত বড়ো শহর। ওখানে চার চাকার গাড়ি ও বড় বড় বিল্ডিং আছে। তুই দেখলে চমকে যাবি।অনেক সুন্দর জায়গা। তুই ঢাকা শহর দেখতে চাস না?’
আলো উৎসুকভাবে মাথা দুলালো। একটা জায়গা সম্পর্কে এতো শুনলে দেখার লোভ তো যেকারো হবে। আলোরও হচ্ছে। আলো বলল, ‘আমিও ঢাকা শহর দেখতে চাই।’
এইবার এসেছে লাইনে। সৌরভ ঠোঁট কামড়ে হাসল। এই কথাটাই শুনতে চাচ্ছিল সে। বলল, ‘দেখতে চাই বললেই তো আর দেখা যায় না। ঢাকা শহর দেখতে চাইলে তোকে অনেক পড়তে হবে। বুঝছিস? বেশি বেশি পড়বি —তাহলে রেজাল্ট ভালো আসবে! তবেই না ঢাকা শহরের কলেজগুলোতে চান্স পাবি । ভালো রেজাল্ট না হলে শহর দেখার ইচ্ছা বাদ দিয়ে দে।’
আলো কি যেন ভাবলো তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। আমি ভালো করে পড়াশোনা করব। তারপর তুমি আমাকে শহর দেখাবে তো?’
আলোর কথায় খুশি হয়ে গেল সৌরভ। সে হেসে ফেলল। মাথা দুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ দেখাবো।’
ফুচকা খাওয়া হয়ে গেছে আলোর। এ সময় বেল বাজার শব্দ কানে এলো। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল আলো। টুলের ওপর প্লেটটা রেখে হড়বড়িয়ে বলে ওঠল, ‘বেল দিয়ে দিছে। আমি এখন যাই।’ বলেই স্কুলের দিকে ছুটে গেল। সৌরভ উঠে দাঁড়াল। ফুচকার দাম মিটিয়ে দিয়ে একটু দেরি করেই ফিরলো সে। স্কুলের গেটের কাছাকাছি যেতেই নজর গেল একটা ছেলের দিকে। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিচ্ছে সে। তার দৃষ্টি আলোর দিকে। সৌরভ এগিয়ে গেল। ছেলেটার উদ্দেশ্য বলল, ‘ওদিকে কি দেখছো?’
আশিক তাকাল না। সে না তাকিয়ে, হাতের ইশারায় আলোকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই মেয়েটাকে। কত সুন্দর সে। যেন ডানাকাটা পরী।’
সৌরভ ঠাণ্ডা রাগে বলল, ‘আজকের পর আর যদি তোমাকে এইখানে দেখি তাহলে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেবো।’
সৌরভের কথাটা হুমকির মতো শোনালো। আশিক চোয়াল শক্ত করে তাকাল। সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি কে এই কথা বলার?’
সৌরভ দাঁত কটমট করে বলল, ‘ওর বাপ।’
আশিক হতভম্ব হয়ে গেল। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়, এখানে সেটাই ঘটেছে। আশিক কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতে আমতা আমতা করে বলল, ‘স্যরি আঙ্কেল। ভুল হয়ে গেছে। ‘ বলেই ছুটে পালিয়ে গেল। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল সৌরভ। রাগে বলল, ‘লাফাঙ্গা কোথাকার। আমার সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সাহস নেই, আর এসেছে আমার মেয়েকে পছন্দ করতে হতচ্ছাড়া।’
আশিক কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে। বাংলায় একটা কথা আছে তা হলো যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। আশিক কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতে আমতা আমতা করে বলে, স্যরি আঙ্কেল ভুল হয়ে গেছে। বলে ছুটে পালিয়ে গেল।
সৌরভ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ লাফাঙ্গা । সামনে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সাহস নেই এসেছে আমার মেয়েকে পছন্দ করতে হতচ্ছাড়া।’ বলেই ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল সৌরভ। আর তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল বিরক্তি।
চলবে…..
