#ব্যাকবেঞ্চার (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
ফারিশ পা বাড়িয়ে দেয় ছাদের বাহিরে। সেই মূহুর্তে ফারাজ তার কোমর ধরে টেনে ছাদের কিনারা থেকে দূরে নিয়ে আসে। তবে ব্যালেন্স রাখতে না পেরে দু’জনে পড়ে যায়। কিন্তু ছাদ থেকে নিচে নয় বরং ছাদেই। ফারিশ কয়েক মূহুর্তের জন্য অন্য জগতে চলে যায়। সে নিজের জ্ঞানে নেই। ফারাজ নিজেকে সামলে ভাইকে বুকে জড়িয়ে নেয়। উদ্বিগ্ন গলায় বলে,“ভাই ঠিক আছিস? এটা কি করতে যাচ্ছিলি তুই?”
ফারিশ জবাব দেয় না। সে জবাব দেবার মতো পরিস্থিতিতে নেই। ফারাজ কিছুটা তার মনের অবস্থা বুঝতে পারে। সে ফারিশকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তার কপালে, গালে আদর করে দেয়। আর বারবার বলে,“ভাই। আমার ভাই। আমার সোনা ভাই।”
ফারাজের এমন ভালোবাসায় এবার হুহু করে কেঁদে দেয় ফারিশ। সেও ভাইকে জড়িয়ে ধরে। নিজেকে সামলাতে না পেরে ফারিশ হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আর বলে,“ভাইয়া আমি.. আমি…।”
কান্নার জন্য কথা বলতে পারছে না। ফারাজ পরম যত্ন নিয়ে ভাইয়ের চোখের পানি মুছে দেয়। অতঃপর বলে,“তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন ভাই? আমি আছি তো।”
একটু থেমে আবার বলে,“এখন থেকে আমি তোকে পড়াবো। তুই পাশ না করে যাস কই, দেখবো আমি।”
“পাশ করলে বাবা খুশি হবে?”
ফারিশের এমন কথায় চুপ হয়ে যায় ফারাজ। এই প্রশ্নের জবাব দেবার মতো ভাষা তার জানা নেই। তার বাবার যে মানের ভয় বেশি। তার সন্তান বহু চেষ্টা করে পাশ করছে, এটা তার জন্য জরুরি নয়। তার কাছে তার সবার চেয়ে ভালো করাটা জরুরি। নয়তো সে সারাজীবন তার কাছে অপদার্থ হয়েই থাকবে। তার সব পরিশ্রম, চেষ্টা কোনটার মূল্যই থাকবে না। ফারাজ এসব জানে তাই ভাইকে বলে,“আগে পাশ কর। একবার সব বিষয়ে পাশ করতে পারলে, পরে সর্বোচ্চ মার্কও তুলতে পারবি। তুই পারবি। এটা আমার বিশ্বাস।”
ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ভরসা পায় ফারিশ। তার কিছুক্ষণ পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে। এখন তার ম রতে ইচ্ছা করছে না। নিজেকে আরও একবার সুযোগ দিতে মন চাচ্ছে। এটাই তো চায়। একটুখানি ভরসা, অনুপ্রেরণা। ফারিশ চোখের পানি মুছে বলে,“ভাইয়া তুমি সত্যি আমায় পড়াবে?”
“হ্যাঁ।”
ফারাজ নরম গলায় জবাব দেয়। ফারিশ খুশি হয়ে বলে,“আমি এবার আরও চেষ্টা করবো। আমি আমার বাবার মান ফিরিয়ে দিবোই। খুব চেষ্টা করবো আমি এবং সফলও হবো।”
এতটুকু বাচ্চার মুখে এতবড় কথা হয়তো মানায় না। কিন্তু ফারিশ তার এই ছোট জীবনে তার বাবার মানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। সেজন্য তার কাছে এই বাক্যটা খুবই সহজ। তবে ফারাজ খুশি হয়। তার ছোট ভাইকে বোঝাতে পেরে তার ভালো লাগছে। খুশি হয় সে। অতঃপর ফারিশকে নিয়ে বাসায় আসে। এই পুরো বিল্ডিংটা তাদের। তারা তিনতলায় থাকে, বাকিটা ভাড়াটিয়ার স্থান। এসব ভাড়াটিয়ারাও মস্তবড় ঝামেলা, তারা রোজ কোন না কোন বাহানায় ঘরে আসবে। অতঃপর ফারাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে। আর ফারিশকে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করবে। তাদের এই দুঃখ প্রকাশ যে ইরফানের রাগ বাড়িয়ে দেয় তারা সেটা বোঝার চেষ্টা করে না। হয়তো বুঝতে চায় না। কারণ অন্যের ঘরে অশান্তি দেখলে বাঙালি খুব পছন্দ করে। তাদের বেশ ভালোই লাগে।
বাঙালির বিশেষ গুনের মাঝে একটি অন্যতম গুন, দু’জন ব্যক্তির ঝগড়া লাগলে তারা সেটা উপভোগ করতে গোসল খাওয়া বাদ দিয়ে ছুটে আসে। তারা আসবেই। পারলে তো নখে নখ টাকায়। কারণ তারা বিশ্বাস করে নখে নখ টাকালে ঝগড়া আরও বৃদ্ধি পায়। তারা সেটাই চায়। তবে এই বাঙালি আবার নিজের সঙ্গে অন্যের ঝগড়া পছন্দ করে না। তখন দোয়া দরুদ পড়ে বলে,“আল্লাহ ঝগড়া যাতে না হয় সেটা তুমি দেখো।”
নিজের বিপদ সবাই ভয় পায়। তবে অন্যের বিপদ উপভোগ্য। এটা খুব মজাদার। তবে হ্যাঁ সবার জন্য কথাটি প্রজোয্য নয়।
____
ফারিশের মা তাকে বুকের মাঝে শক্ত করে ধরে রাখে। ইতিমধ্যে সে ফারিশের কর্ম সম্পর্কে জেনে গিয়েছে। সে ছেলেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,“আমাকে কথা দাও, আর কখনো এমন করবে না।কখনো না।”
ফারিশের মা উদ্বিগ্ন হয়ে একই কথা বারবার বলতে থাকে। কয়েক মূহুর্তের ব্যবধানে তার সন্তান তার কাছ থেকে হারিয়ে যেতো বুঝতে পেরে সে ভীষণ ভয় পায়। এটা তার সন্তান। তার বুকের ধন। তার জন্য তার দু’টো ছেলেই সমান। যেকোন একজনকে হারালে তার পক্ষে বাঁচা যে সম্ভব নয়। ফারিশ মায়ের এমন ভালোবাসায় অবাক হয় না। তার মা তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। তাদের সময় দিতে না পারলেও, যতটা সময় তাদের পাশে থাকে ততটা সময় তাদের অনুভব করায় তার গভীর ভালোবাসা। ফারিশ তার মায়ের এই ভালোবাসা ভুলে জীবন দিতে যাচ্ছিলো। তবে সেটা তো তার মায়ের জন্যই ছিলো। তার মায়ের সুখের জন্য। কিন্তু তার মা তো এখন বলছে, তাকে ছাড়া তার মা নিঃস্ব হয়ে যাবে। তার মায়ের সুখ তারা দুই ভাই। সত্যি তাই। ফারিশ তার মাকে কথা দেয়, সে একই ভুল কখনো করবে না। আর নয়। বরং সে এখন আরও মনোযোগী হবে। ভীষণ মনোযোগী হবে। সে তার বাবার মনের মতো হবেই।
সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলেও ফারিশ পড়তে থাকে। সে বারবার একই পড়া পড়ছিলো। একটা সময় নিজের মাথা টেবিলে টাক দিয়ে বলে,“তোর মাঝে এত গোবর কেন? কেন তুই মনে রাখতে পারছিস না? কেন এত ভুলে যাস? কেন? কেন?”
ফারাজ সবে চোখ বন্ধ করছিলো। কিন্তু ঘুমাতে পারলো না। তার ভাইয়ের এসব পাগলামি দেখে তার ঘুম আসছে না। সে উঠে আসে। ভাইয়ের কাধে হাত রাখতে ফারিশ চমকে পিছনে তাকায়। ফারাজকে দেখে স্বাভাবিক হয়। ফারাজ শান্ত গলায় বলে,“অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘুমিয়ে পড়বি চল।”
“না। আমাকে এটা মুখস্থ করতে হবে। এটা মুখস্থ হলে তবেই ঘুমাবো।”
ফারিশের জেদ দেখে ফারাজ কিছুটা রাগ দেখায়। সে সকালে দ্রুত উঠে পড়ার জন্য বলে। কিন্তু না। ফারিশ রাজি না। অবশেষে তার জেদের কাছে হার মানতে হয় ফারাজকে। তাই বাধ্য হয়ে বলে,“এভাবে রাত জেগে পড়লে অসুস্থ হয়ে যাবি, তখন আবার পড়া কয়েকদিন পিছিয়ে যাবি। এটা ভালো হবে? হবে না। তাই বলছি, এখন ঘুমাতে আয়।”
“না। আমি অসুস্থ হবো না। চিন্তা করো না।”
ফারিশ তার জেদে অটুট। এটা বুঝতে পেরে ফারাজ আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। ফারিশ পড়তে থাকে। পড়ার মাঝে প্রায়ই মাথায় কলম দিয়ে আঘাত করছে, হাত দিয়ে থাপ্পড় মা রছে, কখনো বা মাথা টেবিলে আস্তে করে টাক দিচ্ছে। তবুও পড়াটা মনে থাকছে না। এই মুখস্থ করছে, দশ মিনিট পড় অর্ধেক পারছে বাকিটা নাই। পরবর্তীতে আবার শেষ অংশ মনে থাকছে, প্রথম অংশ নয়। অথচ এই পড়াটা কাল দিতেই হবে। তার বয়স দশ, এই বয়সে সে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। এটা নিয়ে রোজই তাকে সহপাঠীদের কথা শুনতে হয়। শিক্ষকও কম যায় না। সে পড়া না পারলেই এটা নিয়ে খোঁটা দেয়। বাবার টাকা রয়েছে বলে, এমন ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারছে। কোনরকম ক্লাস উপরে উঠছে। নয়তো তার এখনো প্রথম শ্রেনীতে থাকতে হতো। শিক্ষকের এমন কথা শুনে সহপাঠীরা হাসে। ফারিশের নিজেকে জোকার মনে হয়। নয়তো সে অন্যদের হাসির কারণ হবে কেন? যদিও এটা নিয়ে একদিন ফারাজের সঙ্গে কথা হয়েছিলো। ফারাজ তাকে খুব সুন্দরভাবে বোঝায়,“এটা তো ভালো। হাসির অর্থ আনন্দ, তুই অন্যদের আনন্দের কারণ হচ্ছিস এটা তো ভালো।”
একটু থেমে মিষ্টি করে বলে,“অন্যদের কাঁদানো খুব সহজ ভাই। কিন্তু হাসানো কঠিন। তুই সেই কঠিন কাজটা করছিস। এটা খুবই চমৎকার।”
ফারাজ যথেষ্ট সুন্দর কথা বলেছে। তার বলার ভঙ্গিও বেশ ভালো ছিলো। তবে ফারিশ ততটা অবুঝ নেই। তার বয়সটা কম হতে পারে কিন্তু তার বুঝটা কম নয়। তার ভাগ্য তাকে অনেক বুঝদার বানিয়ে দিয়েছে। এসব ভেবে আবার কেঁদে দেয় ফারিশ। ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়ে বলে,“আম্মু বলে তুমি সব পারো। বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, মেধা সব তোমার হাতে। তুমি সবাইকে দাও। তাহলে আমায় দিচ্ছো না কেন? আম্মু বলে দুষ্টুদের তুমি শা স্তি দাও। কিন্তু আমি তো দুষ্টু ছেলে নই। আমি তো কারো সঙ্গে দুষ্টুমি করি না। আমি তো সবার ভালো চাই। সবার কাছে ভালো হতে চাই। তবে আমায় কেন শা স্তি দিচ্ছো? কেন?”
’
’
চলবে,
