#ব্যাকবেঞ্চার ( শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
“আমি তোমাকে পছন্দ করি না ফারিশ। আমাদের বন্ধুত্বটা এখানেই শেষ করা উচিত।”
জয়ার কথা শুনে ফারিশের হৃদয় ভেঙে যায়। তার মনটা কেমন করে ওঠে, একমাত্র সেই বুঝতে পারে। তবুও সে নিজেকে সামলে বলে,“তুমি বিয়ে তো সেই কোন অচেনা ছেলেকেই করবে। সেখানে সেই মানুষটা আমি হলে, সমস্যা কোথায়?”
“এটা বিয়ে ফারিশ। ছেলে খেলা নয়। বিয়ে নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। তাছাড়া আমি যেমন পাত্র চাই তুমি তেমন নও। তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু তুমি আমার সেরকম মানুষ নও, যাকে আমি বিয়ে করতে পারি।”
“তোমার চাওয়ার সেই পাত্রটা কেমন?”
ফারিশ শান্ত গলায় জানতে চায়। জয়া খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,“আমি আরও পড়ালেখা করতে চাই। তাই সেরকম পাত্র খুঁজছি যে আমাকে পড়াশোনা করাবে। আমি জানি, এই কথায় তুমিও রাজি হবে। কিন্তু এটা সম্ভব নয় ফারিশ। তোমার তেমন অবস্থা নাই যাতে তুমি আমার পড়ালেখা সহ আমার দায়িত্ব নিতে পারো। হ্যাঁ তোমার বাবা, মা অনেক ধনী। তবে তাদের সঙ্গে তোমার প্রচুর দূরত্ব। তাছাড়া আমি এমন একজন স্বামী চাই যে উচ্চশিক্ষিত হবে এবং এমন অবস্থানে থাকবেন যেখানে থাকলে তার একটা পরিচয় দেওয়া যায়। যেমন আগামীকাল আমাকে দেখতে আসছে। এই দেশ থেকে এমবিবিএস পাশ করে এখন ইউরোপ কান্ট্রিতে রয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানের নাগরিক হয়ে যাবে। এর সঙ্গে আমার সব চাওয়া মিলে। হয়তো এই বিয়েটা হয়েই যাবে ফারিশ। আমার ছেলের সবকিছুই পছন্দ হয়েছে। আর এমন ছেলেই আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। আমি তোমাকে….।”
ফারিশ চুপচাপ ফোনটা কেটে দেয়। তার যা জানার জানা হয়ে গিয়েছে। এই মেয়েটা একসময় জ্ঞান দিতো, পড়ালেখা দিয়েই যে সব করা যায় তেমন নয়। তোমার মধ্যে অন্য মেধা রয়েছে। তুমি তোমার সেই মেধাটা খুঁজে বের করো। সেটা না পেলেও তুমি যেমন তেমনটাই ঠিক আছে। এটাই তোমার স্বকীয়তা। এটা নিয়েই সবাই তোমাকে গ্রহণ করবে। অথচ তারও চাই তার ভাই ফারাজের মতো ছেলে। তার ভাই তো ইন্জিনিয়ারিং শেষ করে বিদেশে যাবে। তার মতো ছেলেই সবাই চায়। সবাই পছন্দ করে। জয়াকে ভিন্নরকম ভাবছিলো ফারিশ। কিন্তু না। সেও সেরকমই।
তবে এখানে তাদের কারোরই দোষ নেই। এটাই হয়তো বাস্তবতা। যে বাস্তবতাটা ফারিশের বিপক্ষে। ফারিশ ফোন কেটে থ মেরে বসে থাকে। হয়তো আজ ফারিশ তার বাবার ব্যবসায় বসলেও জয়া তাকে মেনে নিতো। কিংবা এটা যদি জয়া জানতো যে তার বাবা তাকে তার সম্পদের ভাগ দিবে। তার বাবা যে এসব দিবে না। সব ফারাজ এবং ফাইজার জন্য রাখতে চাচ্ছে, এসব কথা বলে জয়ার মনটা হয়তো সেই ভেঙে দিয়েছে।
ফারিশ নিজের ভাবনার উপর নিজেই হাসে। একটা অনুভূতির জন্য সে এখন পাগল হয়ে গেছে। উল্টাপাল্টা ভাবছে। জয়ার মতো ভালো মেয়েটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খারাপ বানাতে চাচ্ছে। জয়া তো তার অবস্থানে ঠিকই আছে। ফারিশ ভুল। হ্যাঁ ফারিশই ভুল। তার অন্যের থেকে কোনকিছু আশা করা উচিত নয়। কাউকে ভালো লাগা উচিতই ছিলো না। সে ভালো লাগিয়েছে, এটা তারই ভুল। তাছাড়া তার মতো উদ্দেশ্যহীন জীবনে কে বা নিজেকে জড়াবে। কেউ না। এসব ভেবে ফারিশ কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনেক বছর পর সে আবার কাঁদছে। খুব কাঁদছে। একটা সময় সব সহ্য হয়ে গিয়েছিলো। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিলো। সেটা আর পড়েনি। আজ আবার সেটা পড়ছে। ফারিশের হৃদয়টা যে আবার ভেঙেছে।
★
ফারিশ একটা সময় শান্ত হয়। কান্না থামিয়ে সে নিজেকে শান্ত করে। অতঃপর কিছু একটা ভেবে মস্তবড় এক সিদ্ধান্ত নেয়। এটা তার অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিলো। হয়তো অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। তবে সবটা ফুরিয়ে যায়নি। তাই ফারিশ এবার এই সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয়। সে নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি ছাড়ে। সারাজীবনের জন্য বাড়ি ছাড়ে। শুধু বাড়ি নয়, এই শহরও ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় ফারিশ। সে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠে পড়ে।
______
সেই ঘটনার পর অনেক বছর পেরিয়ে যায়। ফারিশের কোন খোঁজ মেলে না। তার পরিবার, পরিজন কখনো জানতে পারে না তারা কোথায় গিয়েছে। তার বাবা এখন অনুতপ্ত। খুব অনুতপ্ত। সে বিছানায় শুয়ে কাঁদে। ফারিশের জন্য কাঁদে। সেদিন যখন ফারিশের চিঠি পায় তারা তখন তার বাবা বিশ্বাস করেনি। তার মনে হয়েছে, ফারিশ রাগ করে চলে গিয়েছে। আবার ফিরে আসবে। তার এসব অর্থ বিত্ত ভোগ করার মায়া ছাড়তে পারবে না ফারিশ। তার তো যোগ্যতাও নাই ভালোভাবে জীবন গড়ার। ফ্রী এসব পাচ্ছে, এখানে দু’দিন পর আসবে। তবে মায়ের মন। সে তো ঠিক অনুভব করেছে, তার বাচ্চা হারিয়ে গেছে। বহুদূরে হারিয়ে গেছে। সেজন্য তার বাবার এমন কথা শুনে সে প্রথমবারের মতো স্বামীর গালে থাপ্পড় বসায়। তাও পরপর চারটা। অতঃপর রাগান্বিত গলায় বলে,“তোমার জন্য হয়েছে সব। তোমার জন্য হয়েছে। তোমার জন্য আমার সন্তানের সারাটা জীবন কষ্টে কেঁদেছে। তোমার জন্য। আর আজ যখন সে চলে গেলো তখনও তুমি তাকে বকছো? ভুলবাল কথা বলছো। কিসের এত দম্ভ তোমার? কিসের দম্ভ? কিসের অহংকার?তোমার দম্ভ, অহংকার এতই বড় যে তুমি নিজের সন্তানকে সহ্য করতে পারোনি। ছি। কত নিকৃষ্ট বাবা তুমি জানো? তোমার জন্য আমিও খারাপ মা হয়ে গিয়েছি। সারাদিন তোমার সাথে অশান্তি নিতে না পেরে আমি আমার কষ্টে থাকা ছেলেটাকে কষ্ট দিয়েছি। আমিও খারাপ মা হয়ে গিয়েছে। তোমার জন্য। সব তোমার জন্য হয়েছে।”
ফারিশের মা কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্না করে দেয়। এসব শুনে তার বাবা রাগান্বিত গলায় কিছু বলতে নিলে ফারাজও এবার মুখ খোলে। সে বলে,“বাবা তুমি জানো তুমি কত খারাপ বাবা? হ্যাঁ মানছি, তুমি আমাদের জন্য বেষ্ট বাবা। কিন্তু ফারিশের কাছে তুমি খারাপ বাবা। তুমি শুধু খারাপ নও, খুবই জঘন্য। তুমি জানো, তোমার জন্য কতবার ফারিশ আত্ম হত্যা করার চেষ্টা করেছে? তুমি জানো?”
ফারাজ একটু থেমে আবার বলে,“স্যরি বাবা। এতদিন চেয়েও তোমায় এসব বলতে পারিনি। আমি যে বড্ড স্বার্থপর। এসব বলার পর তোমার খারাপ ছেলে হয়ে যাবো যে। তোমার চোখে খারাপ হতে চাইনি বাবা। একদম খারাপ হতে চাইনি। তাই তো সারাজীবন ভাইয়ের প্রতি হওয়া অন্যায় চুপচাপ সহ্য করে গেলাম। কখনো কিছু বলিনি। কিন্তু আজ বলতে চাই।”
অতঃপর ফারাজ এবং তার মা তার বাবাকে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়। তার বাবা ছোটবেলা থেকে ফারিশকে কতটা যন্ত্রণা দিয়েছে? তার মুখে সারাদিন ফারিশের বদনাম শুনতে শুনতে, একটা সময় অশান্তি নিতে না পেরে তার মায়ও তাকে বিরক্তিকর হিসাবে দেখতে শুরু করে। ফারিশ তো কিছু চায়নি। সে ভালো সন্তান হতে চেয়েছিলো, ভালো ভাই হতে চেয়েছিলো। কিন্তু তারা তাকে হতে দেয়নি। বিশেষ করে তার বাবা। তার বাবার জন্য তাদের সংসারে কখনো সুখ ছিলো না। তাদের সংসারটা হতে পারতো খুব সুখের। কিন্তু তা হয়নি। তার জন্য হয়নি। ফাইজা কিছু বলে না। তবে ফারিশের ছোটবেলায় লেখা ডায়েরিটা তার বাবাকে দেয়। অতঃপর যে যার ঘরে চলে যায়। এখানে ফারিশের বাবা কোন কথা বলতে পারে না। সে এরপরও শুধরায়নি। সে ডায়েরিটা না পড়ে ঘরের কোনে ফেলে রাখে। তবে তার হুঁশ জ্ঞান ফিরে তখন যখন সকালে ফারাজ ঘর ছেড়ে চলে যায়। সে এটা দেখে অবাক হয়ে যায়। ফারাজকে আটকাতে নিলে ফারাজ বলে,“তুমি আমার বাবা। তুমি আমাকে আমার চাওয়ার আগেই সব দিয়েছো। তুমি আমার জন্য বেষ্ট বাবা। তাই আমি চাইলেও তোমার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে পারবো না বাবা। কিন্তু আমি একজন ব্যর্থ ভাই। বড় ভাই হিসাবে আমার অনেক দায়িত্ব ছিলো, আমি সেটা পালণ করিনি। তাই এতটুকু শা স্তি আমার প্রাপ্য। যে ঘরে আমার ভাইয়ের জায়গা হলো না। যে ঘরে আমার জীবন স্বর্গের মতো আর আমার ভাইয়ের জীবন নরকের মতো কেটেছে সেই বাড়িতে আমি আর থাকতে চাই না। প্লীজ বাবা আমাকে বাধা দিও না।”
এটা বলে ফারাজ চলে যায়। তার বাবা বাধা দিতে পারে না। তিনদিন ধরে ফারিশের কোন খোঁজ না পেয়ে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। ফাইজাও বাবার সঙ্গে সেভাবে কথা বলে না। সবাই পর করে দেওয়ায় ফারিশের বাবা কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে। সত্যি তাই? সে সত্যি তার সন্তানের সঙ্গে ভুল করেছে?
★
অতঃপর অনেক ভেবেচিন্তে ফারিশের বাবা তার ডায়েরিটি মেলে। সেটা পড়া শুরু করে। সেখানে ফারিশ লিখেছে,“আমি ফারিশ সিকদার। আমি আমার বাবাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি চাই আমার বাবা মনের মতো হতে। কিন্তু পারি না।আমি ব্যর্থ। এজন্য বাবা আমাকে খুব ঘৃণা করে। কিন্তু আমি আমার বাবাকে তবুও ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি।”
“ইচ্ছে করে ম রে যাই। আমার বাবা আমার জন্য সবসময় অসম্মানিত হয়। তাই ইচ্ছে করে ম রে গিয়ে তাকে শান্তি দেই।”
এমন অনেক কথা লেখা। তবে বেশ কিছু জায়গায় বানান ভুল। আগে তার বাবা এসব দেখলে বানান ভুল বলে বকতো। তবে আজ পারে না। এখানে ফারিশ তার কষ্টের সব কথা লিখেছে। একই ঘরে তার ভাই রাজকুমার আর সে কাজের ছেলের মতো ব্যবহার পায়। সবশেষে তবুও সে তার বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। তার বাবার মন জয় করতে চায়। এখানে ফারিশ মোট বারোবার আত্ম হত্যা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলো। কিন্তু শেষমেশ হয়নি। সেটাও লিখে রাখা রয়েছে৷ সবশেষে লেখা,“আমি আমার বাবার প্রিয় হওয়ার জন্য অনেককিছু করেছি। কিন্তু পারিনি। যে ভুল আমি করলে আমি অনেক বড় অপরাধী।সেই একই ভুল আমার ভাই করলে সেটা খুব সামান্য বিষয়। এখানে বিষয়টা ভুলের নয় মানুষটার। আমি মানুষটা বাবার অপছন্দের। আর মানুষ তার অপছন্দের জিনিস সবসময় ঘৃণার নজরে দেখে। বাবাও তাই। তাই আমি ভুল মানুষের মন জয় করার স্বপ্ন দেখছি। আমার এই স্বপ্নটাও বৃথা। আজকাল বাবাকে একটা প্রশ্ন করতে খুব মনে চায়। আচ্ছা বাবা মান বড় না সন্তান? আমি তোমার সন্তান তো? আমাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে আসোনি তো? কিন্তু পারি না। বাবাকে ভীষণ ভয় হয়। এসব জানতে চাইলে যদি মা রে। আবার বাবা, মা ঝগড়া করে। তাই জানতে চাওয়া হয় না। তবুও বলবো বাবা আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। মা তোমাকেও ভালোবাসি। ভাইকেও ভালোবাসি, বোনকেও। খুব ভালোবাসি।”
এসব জানতে পেরে ফারিশের বাবা অনুতপ্ত হয়। তার করা সমস্ত ভুল তার চোখের সামনে ফুটে ওঠে। সে দ্রুত ফারিশের খোঁজ লাগায়। কিন্তু লাভ হয় না। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মা গুড়িয়ে বছর, বছর গড়িয়ে বছর কেটে যায়। ফারিশের বাবা এত ধনী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাবলে তার সন্তানকে খুঁজে বের করতে পারে না। এভাবে দশটা বছর কেটে যায়। ফারিশকে খুঁজে না পেয়ে তার মা পাগলপ্রায়। এখন সে কিছুই মনে রাখতে পারে না। সারাদিন শুধু ফারিশকে চায়। তার বাবাকে ঘৃণা করে। এসব বলে যায়। ফারিশের বাবা এসব দেখে আরও ভেঙে পড়ে। এখন তার বন্ধুরা ফারিশকে খুঁজে না পাওয়ার জন্য সান্ত্বণা দেয়। অথচ একদিন তারাই বলতো,“ওরম অপদার্থ আমার সন্তান হলে আমি তাকে খু ন করতাম।”
ফারিশের বাবা সব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গত দশ বছরে কম চোখের পানি ফেলেনি। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়েছে। অনেকের ধারণা ফারিশ আত্ম হত্যা করেছে। তবে তার বাবা এটা মানে না। মানতে চায় না। এখন তার পিতৃত্ব জেগে উঠেছে। সে কিছুতেই মানতে চায় না। তার সন্তান নাই। তার সন্তান রয়েছে। সে সবসময় এখন এই দোয়াই করে। থাকুক তার সন্তান। তার কাছে না থাকুক, বেঁচে থাকুক, সুস্থ থাকুক।
ফারিশকে ফিরে পেতে তার বাবা অনেক টিভি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিয়েছে। নিজের অপকর্ম বলেছে, ছেলেকে বারবার অনুরোধ করছে ফিরে আসতে। সেই টিভি চ্যানেলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ফারিশের বাবা বলেছে,“তুমি আমার সন্তান। তুমি অপদার্থ নও। বাবার কাছে সন্তান অপদার্থ হতে পারে না। আমার ব্যবসায়ী মন যেটা বলেছে, আমার পিতৃত্ব সেটার বিরোধিতা করছে। জানি এটা ভুল সময়। আমার আরও আগে বোঝা উচিত ছিলো। তবুও বলবো আমি মাফ চায়। আমার ফারিশ সোনা ফিরে আসো। আমার ফারিশ বাবা।”
কিন্তু না। তার কথা শুনেও ফারিশ আসে না। সে একেবারে হারিয়ে যায়। এভাবে কেটে যায় আরও পাঁচ বছর। গত পনেরো বছরেও ফারিশের খোঁজ মেলে না। ইতিমধ্যে তার মা সন্তান হারানোর শোক, নিজের ভুলের গ্লানি নিতে না পেরে মা রা যায়। ফারাজ এখন বিদেশে স্যাটেল। ফাইজার খুব ভালো বিয়ে হয়েছে। সেও স্বামী নিয়ে বিদেশে। এই দেশে পড়ে রয়েছে শুধু ইরফান সিকদার। তাদের বাবা। তাকে ফারাজ নিজের কাছে নিতে চাচ্ছিলো। কিন্তু সে যায়নি। তার ছোট ছেলে যদি কখনো ফিরে আসে এই আশায়। তাছাড়া এই ঘরটা সে তার সন্তানের জন্য নরক বানিয়ে দিয়েছিলো। তাই এই নরকে থেকে তাকে তার ভুল, তার অন্যায় মনে করতে হবে। সারাজীবন অনুশোচনা করতে হবে। তবে যদি তার ভুলের ক্ষমা হয়। তাছাড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি পড়ে রয়েছেন এখানে।
পরিশেষে,
সবাই সবার মতো ভালো রয়েছে। ভালো নেই ফারিশের সেই পাষন্ড বাবা। আজ তিনি পুত্রের জন্য পাষন্ড থেকে মানুষ হয়েছেন। অনুশোচণা ভুগছেন। কিন্তু সময়টা ভুল। এই অনুশোচনা সঠিক সময় হলে হয়তো আজ তাদের সুখের সংসার থাকতো। ফারিশ তার বুকে থাকতো। আজ ফারিশের বাবা শেষ যাত্রার আগে শুধুমাত্র তার অপদার্থ ছেলেটাকে এক পলক দেখার আর্জি জানাচ্ছে উপরওয়ালার কাছে। তার অপরাধটা কত বড় ছিলো জানা নেই, তবে শা স্তিটা খুব বেশিই হয়ে যাচ্ছে। সে এটা বলে মাফ চায়। তার সন্তান ফিরে পেতে যায়। ঘরের মাঝে একা থাকায় এখন বইপড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে ফারিশের বাবার। বেশ বই পড়ুয়া হয়েছে। বই পড়ে সব ভুলে থাকতে চায়। তেমনই একদিন একটা বই পড়ে অবাক হয়েছে যায়। বইয়ের নাম ‘ব্যর্থ জীবনের গল্প’। যেই গল্পটা পুরোপুরি ফারিশের মতো। কেউ একজন ফারিশের জীবন হয়তো তুলে ধরেছে। চোখের সামনে ফারিশের পুরোটা সময় ভেসে ওঠে তার বাবার চোখে। সে বইটা পড়া বাদ দিয়ে তার লেখকের নাম দেখে। লেখক, মেহতাব শেখ। না নামটা ফারিশ নয়। তবে এটা ফারিশের গল্পই। হঠাৎ ফারিশের বাবার চোখে আশার আলো ফুটে ওঠে। তার মনে হয়, এই মেহতাব হয়তো ফারিশ। তার সন্তান। নয়তো এ জানে ফারিশ কোথায়। ফারিশকে চিনে এ। ফারিশের বাবার চোখেমুখে খুশি ফুটে ওঠে। সে হয়তো এত বছর পর তার সন্তানকে ফিরে পেতে যাচ্ছে। এটা ভেবে সে এই লেখকের ঠিকানা খোঁজ করতে লেগে পড়ে। অতঃপর…..
(সমাপ্ত)
