#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২২ ( অন্তিম পর্ব )
পৃথিবীতে মায়া এক অদ্ভুত জিনিস। সব কিছু ছেড়ে দিতে পারলে কিংবা ভুলে যেতে পারলেও মায়া জিনিসটা ত্যাগ করা অসম্ভব। মায়ার টান খুবই প্রখর যা শেষ হয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। মায়া মানুষকে একত্রে গেঁথে রাখে। সুবহার বয়স যখন দুই মাস সাইফের ছুটি শেষ হয়ে যায় এবং সে জার্মানিতে ফেরত চলে যায়। সাথে করে নিয়ে যায় সুবহার কয়েকটি ছবি যা সে তার খাটের পাশের টেবিলে ফ্রেমে সাজিয়ে রাখে। রোজ কাজে যাওয়ার আগে এবং কাজ থেকে এসে সে ছবিটি দেখে। ছবিটিতে সুবহা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে। ছবিটি সাইফের কাছে বেশ জীবন্ত মনে হয়। তার মনে হয় যেনো সে সরাসরি দেখছে তাকে। সাইফ যখনই ছবিটি দেখে তার বুকে এক ধরনের ব্যাথা অনুভব করে। সে মনে মনে চিন্তা করে, এখন যদি সে তার আদরের মেয়ের কাছে থাকতো তাহলে তাকে কোলে নিয়ে ঘুরতো। কত রাত সে জেগে পাড় করেছে মেয়েকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে। যতদিন সে দেশে ছিলো সুবহা দিনরাত তার কোলেই থাকতো। অন্য কারো কাছে দিলেই কান্না করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলতো। সেই মেয়ে এখন বাবাকে ছাড়া কিভাবে থাকছে? এই কথা ভেবেই চোখে জল এসে পড়ে সাইফের। প্রতিদিন টেলিফোনে মেয়ের গলার আওয়াজ শুনে সে। বাবাভক্ত মেয়েও যেনো বাবার গলার আওয়াজ শুনে ঠান্ডা হয়ে যায়। এভাবে চার মাস অতিক্রম করে সাইফ। কিন্তু এবার সে সিদ্ধান্ত নেয় একেবারে দেশে ফিরে যাবে সে। ছোট্ট মেয়েটাকে না দেখে সে আর থাকতে পারছে না। বিদেশে সব মিটমাট করে একবারের জন্য দেশের পথে পাড়ি জমায় সাইফ । আয়জা এই বিষয়ে কিছুই জানে না। তাকে হঠাৎ এসে চমকে দিবে বলেই জানায় নি সাইফ।
আয়জা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তার পাশে সুবহাও ঘুমিয়ে আছে। বারবার দরজায় টোকা পড়ার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় আয়জার। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত একটা বাজে। এত রাতে কে আসতে পারে? তার কি দরজা খোলা উচিত? দ্বিধায় পড়ে যায় আয়জা । এদিকে দরজায় টোকার আওয়াজ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আয়জা কে কে জিজ্ঞেস করছে কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না। এত আওয়াজে সুবহার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে কান্না শুরু করে। আয়জা তাকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। কোনো উপায় না পেয়ে হাতে একটি লাঠি নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে আয়জা দরজা খুলে। ওপর পাশে কে আছে না দেখেই আয়জা লাঠি দিয়ে আঘাত করতে যায় কিন্তু ওপর পাশের ব্যক্তিটি লাঠি ধরে ফেলে এবং বলে,
মারার আগে অন্তত দেখে তো নেওয়া উচিত যে কাকে মারছি?
পরিচিত আওয়াজ পেয়ে আয়জা সামনে তাকিয়ে দেখে সাইফ দাঁড়িয়ে আছে এবং তার আশেপাশে অনেকগুলো লাগেজ। আয়জা চমকে উঠে প্রশ্ন করে,
আপনি? আপনি আসবেন যে বলেন নি কেনো?
_ আগে বললে তোমাকে এভাবে চমকে দিতাম কিভাবে?
_ আপনি জানেন আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম? এভাবে কেউ ভয় দেখায়?
সাইফ আয়জাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
সরি আমি বুঝতে পারি নি তুমি এতটা ভয় পেয়ে যাবে।
_ আপনার তো এখন ছুটি পাওয়ার কথা না। তাহলে হঠাৎ কীভাবে আসলেন?
_ আমি একেবারে চলে এসেছি। আর যাবো না।
_ কি সত্যিই?
_ হ্যাঁ।
খুশিতে আয়জার চোখে জল চলে আসে। আল্লাহ তার সকল দোয়া গুলো কবুল করে নিয়েছেন। সাইফ ঘরের ভেতরে জিনিসপত্র নিয়ে আসে এবং বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসেই মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে। মেয়েও যেনো বাবাকে পেয়ে দুনিয়া পেয়ে গেছে। আরামে ঘুমাচ্ছে বাবার কোলে। আয়জা ওযু করে এসে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। এরপর মেয়েকে কোলে নিয়ে সারা মুখে চুমু খায়। আয়জার কান্ড দেখে সাইফ প্রশ্ন করে,
কি হলো হঠাৎ ওকে এত চুমু খাচ্ছো কেনো?
_ আল্লাহ আমার জীবনে আমার মেয়েকে রহমত হিসেবে দান করেছেন। ও আমার জীবনে এসে আমার জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। দেখুন না আমি কত আপনাকে চলে আসতে বলতাম কিন্তু আপনি আসতেন না। কিন্তু মেয়ের টানে ঠিকই ফিরে এসেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
~~~~~~~~~~~~~~~
সাইফ দেশে ফিরেছে বেশ কয়েকদিন হলো। সে ঠিক করেছে তার যা টাকা জমানো আছে সেগুলো দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে। এতে করে তার পাশাপাশি আরও অনেকগুলো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ দিন রাত পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানের জায়গা ঠিক করা, লোক জমা করা সব করছে সে। বেশ ব্যস্ত সময় পাড় করছে সাইফ। কাজের মধ্যে কোনরকম ফাঁকি দেওয়া একদমই পছন্দ না তার। যার কারণে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কাজ। একদিন দুপুরে সাইফ মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে আয়জার কাছে আসে। তাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। বেশ সময় ধরে চুপ থাকার পর হঠাৎ করে আয়জা তাকে বলে,
শুনুন,
_হুম।
_ আপনাকে কিছু কথা বলবো।
_ বলো শুনছি।
_ আমি যখন মেট্রিক পরীক্ষা দিবো সেই সময় আমি একজনকে ভালোবাসতাম।
এই কথা শুনে প্রথমে সাইফ স্তব্ধ হয়ে যায় কিন্তু কিছু মুহূর্ত পড়েই নিজেকে স্বাভাবিক করে আয়জার কথায় মনোযোগ দেয়। আয়জা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ঘটনা সাইফকে খুলে বলে। সব কথা শোনার পর সাইফ তাকে প্রশ্ন করে,
এখনো কি তার কথা মনে পড়ে তোমার? তাকে ভালোবাসো?
_ নাহ। একটুও না। এই পৃথিবীতে আমি যদি কাউকে প্রচন্ড ঘৃণা করে থাকি সেই মানুষটি সে। ভালোবাসার তো প্রশ্নই আসে না। আমার পুরোটা জুড়েই আপনি রয়েছেন। আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমার মনে আপনিই থাকবেন।
_ আচ্ছা সেদিনের পর তার সাথে আর কোনো প্রকার যোগাযোগ করো নি? সে এখন কোথায়?
_ না সেদিনের পর আর তার সাথে কোনো যোগাযোগ করি নি। সে কোথায় আছে কি করছে কিচ্ছু জানি না। আর কখনো জানার আগ্রহও করি নি। সেদিন তাকে শেষ দেখেছিলাম।
_ সে তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ করে নি?
_ না। কোন মুখে যোগাযোগ করবে? সে কি কখনো আমার সামনে এসে দাঁড়াতে পারবে? তার কি বিবেকে বাঁধবে না? আমার কাছে এই পৃথিবীতে আরহান নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। তার নামটি শুনলেও ঘৃণা হয় আমার। তার জন্য আমার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথেও আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সে আমার জীবনে একটি অভিশাপের মতো ছিলো যা আমার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো। কিন্তু আপনি আমার জীবনে আল্লাহর দেওয়া রহমত হয়ে এসেছেন যে আমার জীবনটাকে আবার রঙিন করে সাজিয়ে তুলেছেন। এজন্যই বলে হারাম কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। হারামের মধ্যে লুকিয়ে আছে কষ্ট এবং কষ্ট। অন্যদিকে হালাল জীবনে শান্তি নিয়ে আসে, স্বস্তি নিয়ে আসে। হালালের মধ্যে রয়েছে রহমত, বরকত।
_ আজ হঠাৎ আমাকে এগুলো জানালে যে? আমাকে তো না বললেও পারতে ?
_ হুম পারতাম। কিন্তু আমি চাই আমাদের মধ্যে যেনো কোনো গোপনীয়তা না থাকুক। আমি আপনার কাছে একটি খোলা বইয়ের মতো হতে চাই যেটির প্রতিটি পাতা আপনার জানা থাকবে।
_ তোমার ভয় লাগে নি আমাকে বললে আমি কেমন রিয়েক্ট করবো?
_ লেগেছে তাও মনে হলো বলা উচিত তাই বলে ফেললাম। আপনি কি আমাকে ভুল বুঝেছেন?
_ নাহ। তোমাকে কেনো ভুল বুঝবো? এখানে তো তোমার কোনো দোষ নেই। ওই ছেলের পোড়া কপাল যে হীরা ছেড়ে কয়লার কাছে গেছে। কিন্তু ওর জন্য আমি আফসোস করবো না। কেনো জানো?
_ কেনো?
_ কারণ ও তোমাকে পেয়ে গেলে তো আমি তোমাকে পেতাম না। তুমি আমার নসিবে ছিলে বলেই তার না হয়ে আমার হয়েছো। তোমাকে পেয়ে আমি অনেক খুশি। সব সময় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি আমি।
সাইফের প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের নাম সে তার মেয়ের নামে রাখে। তার পরিশ্রম দিয়ে সেটি অনেক ভালো চলতে শুরু করে। দুই বছর পর তাদের একটি ছেলে সন্তান হয় যার নাম রাখা হয় সিফাত। দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে সুখে দিনগুলি পার করেছে আয়জা এবং সাইফ।
_______________
ভালোবাসার মানুষদের দ্বারা ঘিরে থাকলে বুঝি সময়ের টের পাওয়া যায় না। আয়জার বেশ অবাকই লাগে সাইফের সাথে তার বিয়ের তিরিশ বছর পূরণ হয়ে গেছে। এই মানুষটার সাথে কীভাবে যে দিনগুলি পাড় হয়েছে টেরই পায় নি সে। যখন তাদের বিয়ে হয়েছিলো তখন তারা যুবক – যুবতী ছিলো। এখন তারা পাশাপাশি বৃদ্ধ বয়সে পা রেখেছে। দুই ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ফেলেছে তারা। সুবহার জমজ সন্তান হয়েছে গত বছর। একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। প্রায় সময়ই নানা নানীর সাথে দেখা করতে আসে তারা। বাচ্চা দুটো নানা নানি বলতে শিখেছে কয়েক মাস হলো। এ বাড়ি আসলেই তাদের নানা নানি বলে আদুরে গলায় ডাক দেয়। সাইফ আয়জাও নাতি নাতনি বলতে অজ্ঞান। খুবই আদর করে তাদের। সিফাতেরও বিয়ে হয়েছে ছয় মাস হলো। একসাথে দুই যুগেরও বেশি পাড় করেছে সাইফ এবং আয়জা । তাদের বয়স হয়ে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের মধ্যেকার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমে নি বরং বেড়েছে। তাদের দুই ছেলেমেয়ে তাদের অনেক ভালোবাসে এবং খুবই যত্নে রাখে ।
একদিন রাতে সাইফ ঘুমিয়ে ছিলো। ঘুমের মাঝে তার মনে হয় কেমন যেনো একটা আওয়াজ হচ্ছে। আশেপাশে তাকিয়ে সে শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করে কিন্তু পায় না। সে উঠে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দেখতে পায় আয়জা গোঙাচ্ছে। সে দৌড়ে আয়জার কাছে গিয়ে আয়জাকে ডাকতে থাকে কিন্তু আয়জা কোনো উত্তর দেয় না। তার চোখ বন্ধ এবং অনবরত চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সাইফ দৌঁড়ে গিয়ে ছেলে এবং ছেলের বউকে ঘুম থেকে উঠায়। তারা দৌঁড়ে মায়ের কাছে আসে। সিফাত সুবহাকে কল দিয়ে সব ঘটনা বলে। সেও খুব দ্রুত চলে আসে। এসবের মাঝেই আয়জা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। সাইফ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সে অনবরত আয়জাকে ডাকতে থাকে কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পায় না। ডাক্তার এসে তাদেরকে জানান আয়জা আর নেই। এই কথা সাইফ মানতে নারাজ। আস্তে আস্তে খবর পেয়ে সকল আত্মীয়স্বজন তাদের বাড়িতে আসা শুরু করে। সবাই সাইফকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। সিফাত এবং সুবহা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। পরের দিন দুপুরে আয়জার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার লাশের খাট নিয়ে যাওয়ার সময় ও সাইফ পাগলের মতো কান্না করতে থাকে। আয়জাকে কবর দেওয়ার পর সবাই একে একে চলে যেতে থাকে। সাইফ আয়জার কবরের পাশে বসে থাকে। সিফাত অনেক বুঝিয়ে শুনিয়েও বাবাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারছে না। সকাল থেকে না খাওয়া সাইফ। বহু কষ্টে বিকালে তাকে বাসায় নিয়ে আসতে পারে সিফাত। সুবহা বাবাকে খাইয়ে দেয়। তাদের তিনজনেরই মনের অবস্থা ভালো নেই। এই কয়েকদিন এই বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় সুবহা । পরের দিন ফজরের নামাজ পড়ে এসে সিফাত তার বাবার ঘরে গিয়ে দেখে তার বাবা ঘরে নেই। সে বাকিদেরও জিজ্ঞেস করে কিন্তু কেউই জানে না সাইফ কোথায়। সবাই চারিদিকে সাইফকে খোঁজা শুরু করে। আশেপাশে কোথাও না পেয়ে সিফাত বুঝে যায় তার বাবা কোথায় থাকতে পারে। তারা সকলে কবরস্থানে গিয়ে দেখে সাইফ আয়জার কবরের পাশে বসে আয়জার কবরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এবং বলছে,
তুমি কি অন্ধকারে ভয় পাচ্ছো? ভয় পেয়ো না দেখো আমি তোমার পাশে বসে আছি। জানো আমার কাল সারারাত ঘুম আসে নি। আসবে কি করে বলো? তোমাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে আমি খাটে ঘুমাই কি করে বলো?
সাইফ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে,
তুমি অনেক স্বার্থপর জানো? স্বার্থপর না হলে আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে যেতে পারতে না। চিন্তা করো না আমিও আসবো তোমার কাছে। আমিও দেখবো কয়দিন দূরে থাকতে পারো তুমি আমার থেকে। আল্লাহ যদি আমাদের জান্নাতী হিসেবে কবুল করেন আমরা অনন্তকাল একসাথে থাকবো।
কবরস্থানের বাহির থেকে সিফাত এবং সুবহা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের বাবার তাদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখে।
~ সমাপ্ত ~
