#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৮
মেহেরুন্নেসা আয়জাকে নিয়ে আসেন। আয়জাকে তাদের সামনে একটি চেয়ারে বসানো হয়। সাফওয়ানও বোনের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে। আয়জা আসার পর থেকেই সাইফ আড় চোখে তাকে কিছুক্ষণ পর পর দেখছে। সুফিয়া বেগম আয়জাকে টুকটাক প্রশ্ন করলে আয়জা সেগুলোর উত্তর দিচ্ছে। সুফিয়া বেগম তাকে তাদের সাথে নাস্তা করতে বললে সে সাথে সাথে নাস্তার প্লেট থেকে নাস্তা নিয়ে খাওয়া শুরু করে দেয় এবং সাফওয়ানকেও নাস্তা এগিয়ে দেয় খাওয়ার জন্য। এই দৃশ্য দেখে সাইফ ভ্রু কুঁচকে ফেলে। সে মনে মনে ভাবে,
এ আবার কেমন মেয়ে? নাস্তা খেতে বললো কই লজ্জা পাবে না না করবে? এসব কিছু না করে কি সুন্দর নাস্তা নিয়ে খাচ্ছে। নিজে খাচ্ছে তো খাচ্ছেই আবার ছোট ভাইকেও এগিয়ে দিচ্ছে। কি আজব!
খাওয়ার মাঝে কেউ এভাবে তাকিয়ে থাকলে কেমন অদ্ভুদ লাগে। আয়জা খাওয়া বন্ধ করে সামনে তাকায়। তার এবং সাইফের চোখাচোখি হয়ে যায়। এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এবার সে সাইফকে ভালোমতো খেয়াল করে। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং, বাদামী টানাটানা চোখ এবং চোখের পাপড়ি গুলো ঘন। মাথা ভর্তি কুচকুচে কালো চুল যেগুলো ফ্যানের বাতাসে এলোমেলো হয়ে কপালে আছড়ে পড়ছে। নেভি ব্লু শার্টের সাথে সাদা প্যান্ট যেনো তার সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। তার হাতের ঘড়ি যেনো তার হাতের সোভা বাড়িয়ে তুলছে। আয়জা যেনো প্রথম দেখায় তার বাদামী চোখের মোহে পড়ে যায়। আয়জা পলকহীন ভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার আশেপাশে যে এত মানুষ সে কথা যেনো তার মাথা থেকেই বের হয়ে গেছে। সাইফের কাশির শব্দে সে বাস্তবতায় ফিরে আসে। এতক্ষণ একটি ছেলের দিকে সে হা করে তাকিয়ে ছিলো ভাবতেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে আয়জা। সে তার আম্মার থেকে শুনেছে আসার সময় এটা ছেলের খালাতো ভাই। ছেলের পরিবার তাকে নিয়ে কি ভাববে সে যে ছেলের খালাতো ভাইয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে ছিলো? ছিঃ ছিঃ ভেবেই মাথা নিচু হয়ে আসছে তার। কিন্তু পরক্ষণেই সে মনে মনে ভাবে,
এই ছেলেটাই যদি তার পাত্র হতো কতই না ভালো হতো। সবাই আরহানকে প্রচন্ড সুন্দর বলতো। আসলেও আরহান দেখতে খুবই সুন্দর ছিলো। কিন্তু এই ছেলের সামনে তার সৌন্দর্য কিছুই না। এই ছেলের সৌন্দর্য সব ছেলেদের সৌন্দর্যকে হার মানাবে। একটা মানুষ এত সুন্দর হয়?
সাইফ যে বারবার আয়জার দিকে তাকাচ্ছে সেটা নজর এড়ায় নি মেহেরুন্নেসার। সেই প্রথম থেকেই তার মনে সন্দেহ এটাই হয়তো পাত্র। তারা মিথ্যা কথা বলছে। সাইফের তাকানো সেটা আরও প্রমাণ করে দিচ্ছে। কারণ ছেলের খালাতো ভাই ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে এসে বারবার সেই মেয়ের দিকে নিশ্চই তাকাবে না?
সাইফ পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে তার ফুপুর হাতে দেয় এবং ইশারা করে টাকাগুলো আয়জার হাতে দিতে। তিনি আয়জার হাতে টাকাগুলো দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এরপর তিনি বলেন,
আচ্ছা আজ আসি তাহলে।
উনারা উঠে দাঁড়ালে মেহেরুন্নেসা সুফিয়া বেগমের হাত ধরে সাইফের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করেন,
সত্যি করে বলেন তো আপা এটাই পাত্র তাই না?
সুফিয়া বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না উনি মুচকি হেসে ফেলেন এবং সেখান থেকে চলে যান। আয়জা যখন জানতে পারে সেই বাদামী চোখের অধিকারী ছেলেটেই পাত্র সে খুশি হয়ে যায়। সে সাইফের যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। সাইফ খুব লম্বা যা দেখে আয়জা আরও অবাক হয়। একটা ছেলে সব দিক থেকে পারফেক্ট হয় কীভাবে?
~~~~~~~~~~~
আয়জাদের বাসা থেকে বের হয়ে সাইফরা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলো। গাড়ি আসলে সাইফ তাদের বাসার ঠিকানা বললে সুফিয়া বেগম জিজ্ঞেস করেন,
বাসার ঠিকানা বললি কেনো? আমাদের না আরেকটা মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা?
_হুম কথা ছিলো কিন্তু যাবো না।
_ কেনো?
_ কারণ আমার আর কাউকে দেখার ইচ্ছা নেই।
এই কথা বলে সাইফ গাড়িতে উঠে বসে। বাধ্য হয়ে বাকিদেরও উঠতে হয়। বাসায় পৌঁছানোর পর রাবেয়া বেগম জিজ্ঞেস করেন,
মেয়ে দেখে এসেছিস?
হ্যাঁ।
পাশ থেকে আফসানা বলে উঠে,
ও তো একটা মেয়ে দেখেই চলে আসলো। আরেকজনকে তো দেখতেই গেলো না।
রাবেয়া বেগম ছেলেকে জিজ্ঞেস করে,
আরেকজনকে দেখতে যাস নি কেনো?
_ কারণ যাকে দেখে এসেছি তাকে পছন্দ হয়ে গিয়েছে।
মাহবুব আলম বলেন,
সেটা নাহয় বুঝলাম কিন্তু আরেকজনকেও দেখতে । তাকেও তো পছন্দ হতে পারে।
_ আমি আর কাউকে দেখতে ইচ্ছুক না বাবা। বিয়ের জন্য এই প্রথম একজনকে দেখেছি । তাকেই পছন্দ হয়ে গিয়েছে। বিয়ে করলে তাকেই করবো আর কাউকে দেখবো না।
_ কিন্তু….
_ কোনো কিন্তু না । যে মেয়েকে দেখে এসেছি তার সাথে বিয়ে দিলে দাও নয়তো আমি ছুটি বাদ দিয়ে আবার চলে যাবো ।
_ আচ্ছা ঠিক আছে ।
সাইফদের পক্ষ থেকে আয়জাদের বাসায় খবর পাঠানো হয় তারা আয়জাকে পছন্দ করেছে। তারা আয়জার পরিবারের মত জানতে চায়। আয়জার পরিবার থেকে সাইফদের বাসায় যায় আয়জার আত্মীয়রা। তারাও ছেলে দেখে পছন্দ করে। এলাকায় খবর নেওয়া হয় সাইফের সমন্ধে। সবাই সাইফের নামে খুবই প্রশংসা করে। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের দুইজনের এনগেজমেন্ট করানো হয় এবং ঠিক তার পনেরো দিন পর বিয়ের তারিখ ফালানো হয়।
দুই পরিবারেই ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে। সাইফদের বাসায় প্রথম ছেলের বিয়ে তাই বেশ হইহুল্লোড় অন্যদিকে আয়জাদের বাসায় মেহেরুন্নেসা এবং জাওয়াদ আহমেদের প্রথম সন্তানের বিয়ে তাই হইহুল্লোড় লেগে রয়েছে। জাওয়াদ আহমেদের সাথে তাহমিদ সব আয়োজন করছে। সাইফ নিজে পছন্দ করে তার বউয়ের জন্য মার্কেট করছে। এই সময় প্রায় সবাই বিয়েতে লাল টুকটুকে শাড়ি দেয় কনেকে । কিন্তু সাইফ ছিলো ভিন্ন। সাইফ খুবই সুন্দর এবং ভারী কাজ করা গোলাপী এবং আকাশি রং মিক্স একটি শাড়ি কিনে বিয়ের জন্য। সে এই শাড়ি পছন্দ করার পর পাশ থেকে তার আত্মীয়রা বলে উঠে,
এটা কেমন রঙের শাড়ি কিনলে তুমি? বউ মানুষ পড়বে লাল টুকটুকে শাড়ি।
_ আমার লাল রঙ পছন্দ না।
_ কিন্তু সব বউরাই তো বিয়েতে লাল পড়ে।
_ সবাই পড়লেও আমার বউ পড়বে না। সে পড়বে ভিন্ন বাকিদের থেকে আলাদা।
বউয়ের জন্য স্বর্ণের গহনা কেনার সময় দোকানদার তাকে অনেকগুলো ডিজাইন দেখায়। সেখান থেকে একটি সেট তার বেশ পছন্দ হয়। সেটটিতে স্বর্ণের পরিমাণ ছিলো বিশ ভরি। সে সেটি কিনে নেয়। তার আত্মীয়রা বলে,
এত টাকা দিয়ে এত ভরি গহনা কেনার কি দরকার? পাঁচ সাত ভরি দিলেই তো হয়ে যায়।
_ আমাকে আল্লাহ সামর্থ্য দিয়েছে কেনার তাহলে কিনবো না কেনো? আমি তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত আমার মনের মতো করে সাজাবো।
সাধারণত বিয়েতে ছেলের পরিবার এবং ছেলে মিলে খরচ করে। কিন্তু সাইফের বিয়ের যাবতীয় সকল খরচ সে নিজেই চালাচ্ছে। বিয়ের শাড়ি গহনা থেকে শুরু করে সব খরচ তার নিজস্ব। বছরের পর বছর প্রচুর পরিশ্রম করে সে এই পর্যায়ে এসেছে যেনো নিজের মতো করে সব করতে পারে। সাইফের বিয়ের আয়োজন দেখে পুরো এলাকাবাসী এবং আত্মীয়স্বজনরা অবাক হয়ে যায়। এত বিলাসবহুল আয়োজন তারা আগে কখনো দেখি নি। বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই বাড়িসহ পুরো এলাকা রঙিন আলোয় রাঙিয়ে তুলেছে সাইফ। বিয়েতে খাবারের মেন্যু কি হবে সেগুলোর তদারকিও সে নিজে করছে। কোনো দিক থেকে কোনো কিছুর কমতি রাখছে না সে।
জাওয়াদ আহমেদ মেয়েকে দেওয়ার জন্য ফার্নিচার বানাতে দিয়েছেন। যদিও সাইফ তাদেরকে কিছু দিতে মানা করেছে কিন্তু জাওয়াদ আহমেদ তার কথা শুনেন নি। তার একমাত্র মেয়ে আয়জা। বাবা হিসেবে মেয়েকে নিয়ে তার ভীষণ স্বপ্ন রয়েছে। সে ভালোবেসে তার মেয়ের সংসারটি সাজাতে চান।
দেখতে দেখতে তাদের বিয়ের দিন এগিয়ে আসে। গত দিনগুলো দুই পরিবার খুবই ব্যস্ততার সাথে পাড় করেছে। আজ আয়জার গায়ে হলুদ। তাদের বাড়ি রঙিন আলোয় আলোকিত করা হয়েছে। বাড়ির সামনে বাশ এবং কাপড় দিয়ে বিয়ের গেট সাজানো হয়েছে। বাড়ির ছাদে কাপড় দিয়ে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে । ছাদের একপাশে হলুদের স্টেজ এবং বাকি খালি জায়গাগুলোতে মেহমানদের খাওয়ানোর জন্য টেবিল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাশ এবং কাপড়ের তৈরি স্টেজটিতে হাঁটু মুড়ে বসতে হয়। হলুদ গাঁদা ফুল দিয়ে পুরো স্টেজ সাজানো হয়েছে। স্টেজের ঠিক মাঝ বরাবর রঙিন কাগজে চুমকি দিয়ে লিখা ” আজ আয়জার গায়ে হলুদ ” । স্টেজের সামনে নানা ধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং কাঁচা হলুদ বাটা একটি বাটিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
সাইফদের বাসা থেকে আয়জাকে হলুদ দিতে আসবে একশ জন। যার জন্য দুটি বাস ভাড়া করেছে সাইফ। সবাই হলুদ রঙের শাড়ি পড়ে হলুদের ডালা নিয়ে বাসে করে আয়জাদের বাসায় পৌঁছায়। আয়জাদের বাড়ির গেইটে আয়জার আত্মীয়স্বজন ফুল এবং মিষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাত্রপক্ষের লোকদের বরণ করার জন্য।
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৯
সাইফের বাড়ির লোক এক এক করে আয়জাদের বাড়ির গেইট দিয়ে ঢুকছে এবং তাদের উপর ফুল ছিটানো হচ্ছে। প্রত্যেকের হাতে একটি করে রজনীগন্ধা ফুল দেওয়া হচ্ছে এবং মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে। সাইফের বাড়ির লোকজন ছাদে গিয়ে স্টেজের উপর প্রত্যেকটি ডালা সাজিয়ে রাখে। শাড়ির ডালাতে রয়েছে পঞ্চাশটি হলুদ শাড়ি যেগুলো আয়জার পরিবারের বড় ছোট সবার জন্য ছিলো। আরেকটি ডালাতে আয়জার হলুদের শাড়ি এবং রজনীগন্ধা এবং গোলাপের সংমিশ্রণে তৈরি করা কাঁচা ফুলের গহনার সেট। ডালাগুলোর মধ্যে থেকে একটি ডালায় বিভিন্ন খাবারের আইটেম ও ছিলো। আয়জার কাজিন আয়জার জন্য আনা শাড়ি নিয়ে যায় ঘরে এবং সেখান থেকে তাকে শাড়ি পড়িয়ে স্টেজে নিয়ে আসে। আয়জার ভাবি এবং কাজিনরা মিলে তাকে মেকাপ করে দিয়েছে। আয়জা স্টেজে হাঁটু মুড়ে বসে। আয়জাকে এক এক করে ফুলের গহনা গুলো পড়ানো হয়। প্রথমে মেহেরুন্নেসা এবং জাওয়াদ আহমেদ আয়জাকে হলুদ দেন এরপর ছেলেপক্ষের সবাই এক এক করে হলুদ দিতে আসে। ছেলে পক্ষের হলুদ দেওয়া শেষ হলে আয়জার পরিবারের সবাই এক এক করে হলুদ দিতে শুরু করে। এরই মাঝে প্রত্যেক টেবিলে খাবার দেওয়া হয়। ছেলে পক্ষের সবাই খেতে বসে এবং মেয়ে পক্ষের সবাই তাদের খাবার বেড়ে খাওয়াচ্ছিলেন। খাওয়া দাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর ছেলে পক্ষের সবাই আবার বাসে করে চলে যায়। আয়জার খালা আয়জাকে খাইয়ে দিতে চাইলে আয়জা বলে,
আমি খাবো না।
_ কেনো?
_ দুই পরিবার মিলে হলুদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ মিষ্টি খাইয়েছে পেটে আমার আর জায়গা নেই। এত মিষ্টি খাওয়া যায়? এখন আমার ভীষণ বমি পাচ্ছে।
_ আচ্ছা থাক। যখন ক্ষুধা লাগে আমাকে বলো আমি খাইয়ে দিবো।
_ আচ্ছা।
আয়জা সব গহনা খুলে, শাড়ি পাল্টে, মুখ ধুয়ে আসে। এবার সে একটি বেগুনি রঙের থ্রিপিস পড়ে আছে। চুলগুলো বেণী গেঁথে এসেছে। তার কাজিনরা এবার তাকে হাতে মেহেদী দিতে শুরু করে। মেহেদী দিতে দিতে রাত প্রায় একটা বেজে যায়। এর মাঝে আয়জার খালা তাকে এসে খাইয়ে গিয়েছেন। সব কাজ শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে আয়জাদের রাত দুইটা বেজে যায়।
~~~~~~~~~~~~~
সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়জা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হয়ে যায়। এর আগেও সে বহুবার হাতে মেহেদী পড়েছে কিন্তু এত গাঢ় রঙ কোনো দিন আসে নি। তার হাতের মেহেদির গাঢ় রঙ দেখে তার ভাবীরা এবং কাজিনরা তাকে ক্ষেপিয়ে যাচ্ছে। তার এক ভাবি তাকে বলে,
বাবাহ্! কি গাঢ় রঙ হয়েছে মেহেদীর। স্বামী অনেক ভালবাসবে আমাদের আয়জাকে।
আয়জা লজ্জায় সেখান থেকে চলে যায়। তাকে চলে যেতে দেখে বাকিরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। সন্ধ্যায় আয়জার বাড়ির মানুষ সবাই তৈরি হয়ে সাইফের হলুদে যাচ্ছে। আয়জার বাড়ি থেকেও একশ জন মানুষ যাচ্ছে সাইফদের বাসায় বাসে করে। সাইফদের বাড়িতেও আয়জার বাড়ির লোকদের ফুল ছিটিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় গেইট থেকে। প্রত্যেকের হাতে দেওয়া হয় টুকটুকে লাল গোলাপ ফুল। সাইফের বাসার ছাদেও একইভাবে স্টেজ করা হয়েছে । স্টেজে আয়জাদের বাড়ি থেকে আসা ডালা গুলো সাজিয়ে রাখা হয়। কিছুক্ষণ বাদে সাইফ এসে স্টেজে হাঁটু মুড়ে বসে। সে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পড়েছে। চুলগুলো টেবিল ফ্যানের বাতাসে এলোমেলো হয়ে কপালে বারবার আছড়ে পড়ছে তার । সেগুলোকে একটু পর পর হাত দিয়ে ঠিক করছে সে। প্রথমে রাবেয়া বেগম এবং মাহবুব আলম তাকে হলুদ ছোঁয়ান এরপর আয়জার পরিবারের সকলে একে একে হলুদ দিতে আসে । তাদের দেওয়া শেষ হলে সাইফের আত্মীয় স্বজনরা তাকে হলুদ দেয়। সব শেষে আসে তার বন্ধুরা। তারা স্টেজে তার পাশে বসেই হইহুল্লোড় শুরু করে দেয় এবং সকলে মিলে হলুদ সাইফের মুখে এবং শরীরে লেপ্টে দেয়। সাইফও কম কিসে? সেও কাউকে ছাড়ছে না ধরে ধরে হলুদ লেপ্টে দিচ্ছে।
সকলকে টেবিলে খেতে দেওয়া হয়েছে। সাইফ এবং তার বন্ধুরা স্টেজে বসে খাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া শেষে আয়জার পরিবারের সবাই সেখান থেকে চলে আসে। সাইফের বন্ধু এবং কাজিনরা মিলে কিছুক্ষণ হইহুল্লোড় করে এরপর সকলে ঘুমিয়ে পড়ে যেহেতু আগামীকাল দুপুরে বিয়ে।
~~~~~~~~~~~~~~~
জাওয়াদ আহমেদ এবং তাহমিদ মিলে খাবারের আয়োজন তদারকি করছেন। আয়জাকে পার্লারে নেওয়া হয়েছে। মেহেরুন্নেসা আত্মীয়স্বজনদের কার কি লাগবে সেসব দিকে খেয়াল রাখছেন। দুপুর দেড়টায় আয়জা পার্লার থেকে এসে পড়ে। তাকে সুন্দর করে মেকআপ করিয়ে চুল খোপা করে আনা হয়েছে । পড়নে রয়েছে তার সুতির শাড়ি। সে তার ঘরে বসে রয়েছে।
সাইফরা বাড়ি থেকে বরযাত্রী নিয়ে বের হয় । সাইফের পড়নে সাদা শেরওয়ানি মাথায় পাগড়ি। সেহেরা দিয়ে মুখ ঢাকা তার। গলায় ফুলের মালা , হাতে ঘড়ি। সে পায়ে পড়েছে নাগরা জুতা। তাদের সামনে এবং পিছনে ব্যান্ডপার্টির লোকজন যারা ঢোল, বাঁশি বাজাচ্ছেন। এলাকার সকলে যার যার বাড়ির ছাদ থেকে আবার অনেকে ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। বিয়েতে এত আয়োজন এই এলাকায় আগে কেউ করে নি। বর যাত্রীর গাড়িটি ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। সেই গাড়িতে সাইফ এবং তার সাথে আরও কয়েকজন বসেছে । বাকি সবাই বাসে করে তার গাড়ির পিছু পিছু আসছে। আজকে তিনটি বাস ভাড়া করা হয়েছে। ব্যান্ড পার্টির লোকজন ট্রাকে করে তাদের পিছু পিছু আসছে। আয়জাদের মহল্লার মানুষ ও সকলে ছাদে উঠে উকি দিয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করছে। সাইফরা আয়জাদের বাড়ির গেইটে দাঁড়ায়। আয়জার কাজিনরা এবং সাফওয়ান মিলে দরজায় ফিতা ধরে। টাকা নিয়ে উভয় পক্ষ অনেকক্ষণ রেষারেষি করে। এরপর সাইফ পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে তাদের হাতে দেয়। তারা খুশি হয়ে সাইফের দিকে কাচি এগিয়ে দেয় যেটি দিয়ে সাইফ ফিতা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। সাইফকে ছাদে স্টেজে বসানো হয়। সাইফের বাড়ির মেয়েরা যায় আয়জার ঘরে। সেখানে গিয়ে তারা লাগেজ দেয় আয়জাকে যেটার ভেতর তার বিয়ের শাড়ি, গহনা এবং যাবতীয় বাকি সবকিছু আছে। আয়জাকে সবাই মিলে শাড়ি পড়িয়ে দেয় এবং এক এক করে গহনা গুলোও পড়িয়ে দেয়। মাথায় ঘুমটা টেনে আয়জাকে বসিয়ে রাখা হয় খাটের উপর। দুই পরিবারের সকলে এক এক করে আয়জাকে দেখে যাচ্ছে । কাজী সাহেব এসে প্রথমে আয়জাকে কবুল পড়িয়ে যান এরপর সে সাইফকে কবুল পড়ান । জাওয়াদ আহমেদ এক কোণায় চেয়ারে বসে কান্না করছেন এবং চোখের পানি মুছছেন। তার অনেক আদরের কন্যা আয়জা। বিয়ে দিয়ে আরেকজনের হাতে তুলে দিচ্ছেন আজ সে । বুকটা ভীষণ ভার হয়ে আছে তার। বিয়ে পড়ানো শেষে সবাইকে খেতে দেওয়া হয়। তাহমিদ এবং সাফওয়ান মিলে কার কি লাগবে সেই দিকে খেয়াল রাখছে। খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষে আয়জাকে ছাদে স্টেজে আনা হয়। স্টেজে একপাশে সাইফ বসে ছিলো। তার ঠিক পাশেই আয়জাকে বসানো হয়। দুইজনকে পাশাপাশি যা মানিয়েছে তা বলার ভাষা রাখে না। যেই দেখছে সেই তাদের জুটির প্রশংসা করছে। সাইফ আয়জাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছে। প্রত্যেকে আয়জার পড়া গহনা গুলো দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছে। এত গহনা আর এত সুন্দর ডিজাইন আয়জার সৌন্দর্যকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলছে। সবাই তাদেরকে মালা বদল করতে বলে। আয়জা নিজের গলা থেকে ফুলের মালাটি খুলে সাইফকে পড়াতে যায়। সে যত মালা এগিয়ে নিচ্ছিলো সাইফ তত নিজের মাথা পিছনের দিকে নিচ্ছিলো যার কারণে আয়জা তাকে মালা পড়াতে পারছিলো না। সাইফ বাকা হাসে। আয়জাও মুচকি হেসে ফেলে। সে উঁচু হয়ে সাইফকে মালা পড়িয়ে আবার বসে পরে। আয়জার কান্ড দেখে সাইফ খিল খিল করে হেসে উঠে। এরপর সে তার গলার মালা খুলে আয়জাকে পড়িয়ে দিতে যায় কিন্তু আয়জাও তার মাথা পিছু করে ফেলে। সাইফ বাকা হেসে আয়জার হাত ধরে টান দিয়ে তাকে সামনে আনে এবং মালা পড়িয়ে দেয়। আশেপাশের সবাই মুদ্ধ হয়ে তাদেরকে দেখছে । তাদের দেখে মনেই হচ্ছে না তাদের যে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। তাদের আগে থেকে চেনা জানা নেই। তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা এতদিন অপূর্ণ ছিলো আজ যেনো একে অপরকে পেয়ে তারা পরিপূর্ণ হলো।
বরযাত্রীর বিদায় বেলা চলে এসেছে। আয়জা তার মাকে এবং ভাইদের জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। আশেপাশে কোথাও সে তার বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তার চোখ শুধু তার বাবাকে খুঁজছে। মেহেরুন্নেসা জানান জাওয়াদ আহমেদ ঘরে আছেন। মেয়ের বিদায় সে দেখতে পারবে না বলেই ঘরে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছেন। আয়জা ঘরে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। সে বলে,
আব্বা আমাকে মাফ করে দিও। আমার সব ভুলগুলোর জন্য মাফ করে দিও।
জাওয়াদ আহমেদ এতক্ষণ নীরবে চোখের জল ফেললেও মেয়ের কান্নায় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তিনিও হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। কিছুক্ষণ পর তিনি একটু স্বাভাবিক হয়ে আয়জাকে সাইফের হাতে তুলে দেন এবং আয়জাকে দেখে রাখতে বলেন। সাইফ তাকে ভরসা দেয় । গাড়িতে করে আয়জা নিজের নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যায়। গাড়িতেও আয়জা গুনগুন করে কান্না করছিলো। সাইফ তার দিকে টিস্যু এগিয়ে দেয় এবং পানির বোতল এগিয়ে দেয়। সাইফের বাসার গেইটে তাদের সবাই ফুল ছিটিয়ে বরণ করে নেয়। আকাশে আতশবাজি ফোটানো হয়। আয়জা এবং সাইফকে পাশাপাশি সোফায় বসানো হয়। সকলে তাদের মিষ্টি মুখ করায়। কিছুক্ষণ পর তাদের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো ঘর ফুলে ফুলে ঘেরা। ঘরে প্রবেশ করে আয়জার মনে হয়েছে সে যেনো ফুলের রাজ্যে প্রবেশ করেছে। দুইজন ফ্রেশ হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তাদের নতুন জীবনের জন্য দোয়া করে। সেই রাত থেকে শুরু হয় তাদের জীবনের একটি নতুন অধ্যায়।
চলবে।
