#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২০
বিয়ের পরের দিনই ছিলো ওয়ালিমার অনুষ্ঠান। সেদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচন্ড ব্যস্ত সময় পার করেছে সাইফ এবং আয়জা যার কারণে ক্লান্তিতে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে তারা। পরের দিন সকালে সাইফের ঘুম ভাঙ্গলে সে তার পাশে আয়জাকে দেখতে পায় না। সে প্রথমে উঠে বাথরুমে চেক করে। সেখানেও আয়জাকে না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে যায় সে। সে ভাবে নিশ্চই আয়জা বাহিরে বাকিদের মাঝে আছে। কেবল দুইদিন হলো বিয়ে হয়েছে মেয়েটার। এতগুলো অপরিচিত মানুষের মাঝে নিশ্চই অস্বস্তি বোধ করছে সে? তাই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় সে আয়জাকে সঙ্গ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। বাহিরে গিয়ে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। আয়জা তার পরিবারের সকলের সাথে বেশ হেসে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে। যেনো কত দিনের পরিচয় তাদের সাথে তার। তার মুখে অস্বস্তির কোনো চিহ্ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সাইফ বুকে হাত বেঁধে দেয়ালে হেলান দিয়ে আয়জার গল্প করা দেখছে। আফসানা তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
কিরে এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?
~ এমনি। নাস্তা খেতে দাও।
আফসানা উঠে সবাইকে নাস্তা বেড়ে দেয় । নাস্তা শেষ করে আয়জা এবং সাইফ তাদের ঘরে আসে। সাইফ বিছানায় বসে বলে,
বাহ! ভালোই তো সবার সাথে মিশে গিয়েছো। আমি তো আরও চিন্তা করছিলাম তুমি বোধহয় অস্বস্তি বোধ করছো।
_ আমি সহজেই সবার সাথে মিশে যেতে পারি।
_ হুম সেটা তো দেখলামই। আমি তোমাকে পছন্দ করেছি তোমার মধ্যে এমন গুণ আছে বলেই।
_ তাই?
_ হুম।
_ আমাকে একবার দেখেই আপনি বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেলেন কেনো?
_ আমার চোখে ভালো জিনিসের কদর আছে তাই।
_ আচ্ছা আমাকে আপনি যখন প্রথম দেখেছেন আমাকে নিয়ে আপনার অনুভূতি কি ছিলো?
_ আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা কেমন নাস্তা খেতে বলার সাথে সাথে নাস্তা নিয়ে খাচ্ছে। কত বড় খাদক মেয়েটা।
আয়জা নাক ফুলিয়ে বলে,
এতই যখন খাদক মনে হয়েছে তাহলে বিয়ে করলেন কেনো?
সাইফ খিলখিলিয়ে হেসে আয়জাকে জড়িয়ে ধরে নাকের সাথে নাক ঘষে বলে,
কারণ এই খাদক মহিলাকে পেট ভরে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য আমার আছে।
_ একদম ফাজলামো করবেন না। সত্যি করে বলুন কেনো রাজি হয়েছেন বিয়েতে?
সাইফ আয়জার মাথা তার বুকে রেখে জড়িয়ে ধরে বলে,
তোমাকে প্রথম দেখেই আমার অনেক পছন্দ হয়েছিল। তোমার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিলো না, কোনো নাটক ছিলো না। তুমি যেমন ঠিক তেমন করেই আমার সামনে উপস্থিত হয়েছিলে যা আমার মন কেড়ে নিয়েছে।
আয়জা লজ্জায় সাইফের বুকে মুখ লুকায়।
বিয়ের পর থেকেই আয়জা বোরকা পড়া শুরু করেছে। সাইফ তাকে অনেকগুলো বোরকা হিজাব কিনে এনে দিয়েছে। তার কথা হলো তার বউকে সে একাই দেখবে। অন্যকোনো ছেলের ছায়াও সে সহ্য করবে না। আয়জার বোরকা ছাড়া চলাফেরা একদম নিষেধ। সাইফ আয়জাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময় মতো পড়তে বলেছে। সে বলেছে এই কয়টা জিনিস সে আয়জার কাছ থেকে আশা করে। সাইফ নিজেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময় মতো আদায় করে। আয়জাও তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। বোরকা পড়া আয়জার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এখন বোরকা ছাড়া চলাফেরা করতে সে অস্বস্তি বোধ করে।
আয়জা রান্নাবান্না কিছু পারে না। রাবেয়া বেগম তাকে নিজ হাতে রান্না শিখিয়েছেন। রাবেয়া বেগম যখন রান্না করতেন তখন আয়জা পাশে বসে দেখতো এবং শিখতো। একদিন রাবেয়া বেগম তাকে ভাতের চাল ধুতে দেন। আয়জা চাল ধুতে গিয়ে অর্ধেকের মতো চাল ফেলে দেয়। ভয়ে তার আত্মা কেঁপে উঠে। এই বুঝি মা তাকে বকবেন। তার চিন্তাকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে রাবেয়া বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন,
ভয় পাচ্ছো কেনো? নতুন নতুন চাল ধুতে গেলে এমনটা হয়। আমার সাথেও হয়েছে। ভয়ের কিছু নেই আস্তে আস্তে শিখে যাবে। তার কথায় আয়জা ভরসা পায়। আয়জার দিন বেশ ভালোই যাচ্ছিলো। সাইফ আয়জাকে তার জার্মানিতে তোলা ছবি গুলো দেখায়। আয়জা সেগুলোকে দেখে বলে,
বাহ! জার্মানি দেখতে এত সুন্দর?
_ হ্যাঁ অনেক সুন্দর। তুমি যাবে?
_ আপনি যদি নিয়ে যান তাহলে যাবো।
_ আচ্ছা তোমার পাসপোর্ট বানাতে দেই তাহলে।
_ আচ্ছা।
সাইফ আয়জার সকল কাগজপত্র জমা দিয়ে আসে। সাইফের পরিচিত লোক হওয়ায় এক মাসের মধ্যে পাসপোর্টের কাজ হয়ে যায়। সাইফের বাড়ির লোক যখন জানতে পারে এই কথা তখন বাসায় অশান্তি শুরু হয়ে যায়। সাইফের বাবা বলেন,
বাড়ির বউ বাড়িতে থাকবে তাকে কেন বিদেশে নিয়ে যাবে? বিদেশে নিয়ে গিয়ে বউকে বেহায়া বানাতে চাও?
সাইফ বলে,
কিন্তু বাবা
_ কোনো কিন্তু নয়। আমার মুখের উপর কথা বলার সাহস দেখিয়ো না। এই বাড়ির মুরব্বি আমি এখনো বেঁচে আছি। আমি থাকতে তোমাদের এসব বেহায়াপনা করতে দিবো না।
সাইফের বোন আফসানা বলে,
বাবা তো ঠিকই বলেছে। বউ মানুষ কেন বিদেশে যাবে? বিদেশে তার কি কাজ?
এক কথায় দুই কথায় পরিস্থিতি আরও বিগড়াতে শুরু করে। সাইফের কথাকে তার বাবা পাত্তাই দিচ্ছেন না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যেতে দেখে আয়জা সাইফের হাত ধরে আস্তে করে বলে,
থামুন আপনি। আমি যাবো না কোথাও।
_ কিন্তু
_ কোনো কিন্তু না। এমনিও আমার বাহিরের দেশে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। আমি এখানেই ঠিক আছি। আপনি দয়া করে আর কথা বাড়িয়েন না। বাবা অনেকক্ষণ ধরে চিল্লাচিল্লি করছেন উনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আপনি ঘরে চলে আসুন।
সেদিনের ঘটনার পর আয়জা আর বিদেশে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে নি। তার পাসপোর্টটি আলমারির ড্রয়ারের এক কোণায় পড়ে থাকে।
সাইফের ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে জার্মানিতে চলে যায়। তার কিছুদিন পরই রাবেয়া বেগম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার কারণে সংসারের সকল দায়িত্ব এসে পড়ে আয়জার ঘাড়ে। একা হাতে পুরো সংসারটি সামলাতে হয় আয়জার। আফসানা এবং লাবিবা কেউ তার কোনো সাহায্য করে না। রাবেয়া বেগম মেয়েদের অনেক বকেন এবং আয়জাকে সাহায্য করতে বলেন কিন্তু তারা সেই কথা শুনে না। তিন বেলা রান্নাবান্না করে ঘামে সারাক্ষণ ভিজে থাকে আয়জা । সে যদি তার বাবার বাড়ি গিয়ে দুই দিনের বেশি থাকে তাহলেই ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। সাইফদের বাড়ি থেকে ঝামেলা করা শুরু করে। তেমনি একদিন সাইফের বাবা আয়জাদের বাসায় টেলিফোন করেন। মেহেরুন্নেসা কল ধরেন। তিনি সালাম দেন। সাইফের বাবা সালামে উত্তর নিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
বউমা ও বাড়ি গিয়েছে দুই দিন হয়ে গেলো এখনো বাসায় আসছে না কেনো?
_ এসেছে আরও কয়দিন থাকুক। ওর স্বামী থাকে বিদেশে ওখানে একা একা কি করবে ও?
_ কি করবে মানে? এখন এটাই ওর বাড়ি। স্বামী বিদেশে রয়েছে তাতে কি হয়েছে আমরা আছি না? আগামীকালের মধ্যে আমি বউমাকে বাড়িতে দেখতে চাই নয়তো চিরকাল বাপের বাড়ি থেকে যাক এই বাড়ি আর আসার দরকার নেই ।
এই কথা বলে তিনি কল কেটে দেন। মেহেরুন্নেসা রেগে গিয়ে আয়জাকে বলেন,
এটা কোন ধরনের কথা বললেন উনি? উনি কি তালাকের হুমকি দিলেন? এই ছোট্ট বিষয় নিয়ে? মানুষ কি বিয়ের পর বাপের বাড়ি থাকে না? সবাই থাকে কম বেশি। আর যাদের স্বামী বিদেশে থাকে তারা তো বেশিরভাগ সময়টাই বাপের বাড়ি থাকে।
আয়জা তার মাকে বলে,
থাক আম্মা তুমি শান্ত হও।
_ শান্ত হবো মানে? উনি কত বড় কথাটি বললেন শুধু দুই দিন তুই এই বাড়িয়ে আছিস বলে। আমি এখনই সাইফকে কল দিবো।
_ না আম্মা এই কাজ করো না। উনি এখন কাজে আছেন। এগুলো শুনলে উনি চিন্তিত হয়ে পড়বেন। উনি যখন বেশি টেনশনে থাকেন তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন । আল্লাহ না করুক তার যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়? তুমি কিছু বলো না আম্মা।
আয়জা বারবার বলাতে উনি আর সাইফকে কল দেন না। পরের দিন আয়জা সকাল সকাল শ্বশুরবাড়ি চলে যায় এবং গিয়েই তার দৈনন্দিন কাজে লেগে পড়ে।
উক্ত ঘটনার এক সপ্তাহ পর মেহেরুন্নেসা এবং জাওয়াদ আহমেদ আয়জার শ্বশুরবাড়িতে আসেন আয়জাকে দেখতে। তাদের সাথে সাফওয়ান ও এসেছে। উনি এসেই দেখেন তার মেয়ে রান্না ঘরে রান্না করছে। গরমে ঘেমে পুরো শাড়ি ভিজে আছে তার, গরমে মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে তার ননাস এবং ননদ মিলে গল্প করছিলো। আফসানা প্রায় সময়ই মায়ের বাসায় এসে থাকেন যেহেতু তার শ্বশুরবাড়ি একই এলাকায়। এই দৃশ্য দেখে মেহেরুন্নেসা রেগে যান। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
এই জন্য আমার মেয়েকে এই বাড়িতে আনার জন্য আপনারা পাগল হয়ে যান? আমার মেয়ে না থাকলে আপনাদের কাজ গুলো কে করবে? রান্না করে কে খাওয়াবে? আমি কি আমার মেয়েকে কাজের লোক হিসেবে এই বাড়িতে পাঠিয়েছি?
আফসানা বলে,
মেয়ে মানুষের কাজই তো সংসারের কাজ করা। সে তো সেটাই করছে এখানে কাজের লোক বলার কি আছে?
মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করেন,
তাই?
_ হ্যাঁ।
_ তাহলে তুমি তোমার শ্বশুরবাড়ি ফেলে এখানে পড়ে আছো কেনো? তোমার সংসারের কাজ গুলো কে করছে?
_ আপনি কিন্তু বেশি বেশি করছেন।
_ আমি মোটেও বেশি করিনি উচিত কথাটিই বলেছি।
মেহেরুন্নেসা আয়জাকে বলেন,
আয়জা যাও ব্যাগ গুছাও।
সাইফের বাবা জিজ্ঞেস করেন ,
ব্যাগ গুছাবে কেন?
_ কারণ ওকে এখন আমরা নিয়ে যাবো।
আয়জাকে যেতে না দেখে মেহেরুন্নেসা আবার মেয়েকে ধমক দেন এবং ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আসতে বলেন। এবার সে ধমক শুনে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আসে। জাওয়াদ আহমেদ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
আমি আশা করি নি আপনারা আমার মেয়ের সাথে এমন ব্যবহার করবেন। এই কষ্ট করার জন্য আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেই নি।
মেহেরুন্নেসা আয়জার হাত ধরে বের হতে নিলে সাইফের বাবা তাদেরকে বলেন,
আজ যদি আয়জা এই বাড়ির চৌকাঠ পার হয় তাহলে এই বাড়িতে তার আর কোনোদিন জায়গা হবে না।
মেহেরুন্নেসা মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে গিয়ে বলেন,
আপনি কি আসতে দিবেন না? আমি নিজেই আমার মেয়েকে এই বাড়িতে আর আসতে দিবো না।
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২১
আয়জারা বাসায় পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই তাদের টেলিফোনটি উচ্চ শব্দে বেজে উঠে। আয়জার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে কে টেলিফোন করেছে। আয়জা দৌঁড়ে গিয়ে কল ধরে । সাইফ জিজ্ঞেস করে,
কি হয়েছে? তুমি চলে এসেছো কেনো? বাবা আমাকে ফোন দিয়ে চিল্লাচিল্লি করছে কেনো?
_ আসলে হয়েছে কি
আয়জা কথা শেষ করার আগেই মেহেরুন্নেসা তার হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভার কেড়ে নেন এবং বলেন,
ও কি বলবে ? আমি বলছি। আমার মেয়েকে কি তোমার বউ করে ওই বাড়ি পাঠিয়েছি নাকি কাজের লোক করে পাঠিয়েছি?
_ কেনো কি হয়েছে?
_ আমার মেয়েটা দুই দিন আমার কাছে এসে থাকতে পারে না তোমার পরিবার হইহুল্লোড় শুরু করে দেয় আবার তোমার বাবা তালাকের হুমকি দেয়। আমার মেয়েকে সারাদিন রান্নাঘরে ঘামে ভিজে কাজ করতে হয় এবং তোমার বোনরা একটু সাহায্য ও করে না বসে বসে গল্প করে। শ্বশুরবাড়িতে সব মেয়েদেরই কাজ করতে হয় অবশ্যই করবে। আমরাও করেছি । তাই বলে এমন জুলুম করবে? তাকে কেউ একটু সাহায্য করবে না? সে কি মানুষ না? একা এত কাজ করা সম্ভব?
_ আমি তো এত কিছু জানি না। আর আয়জা আমাকে এসব বিষয়ে কখনো নালিশ করে নি।
_ করবে না তো। মরে গেলেও বলবে না। আমাকেও তো বলে নি। আমি যদি নিজের চোখে না দেখতাম তাহলে তো জীবনেও জানতে পারতাম না। যাই হোক তুমি এটার একটা বিহিত করবে এর আগে আমি আমার মেয়েকে ওই বাড়িতে পাঠাবো না।
এই কথা বলে মেহেরুন্নেসা কল কেটে দেন। তিনি অনেকক্ষণ যাবত আয়জাকে বকাবকি করেন তাকে কিছু না জানানোর জন্য। তিনি বলেন,
সাইফ যদি এটার কোনো বিহিত না করে তাহলে আমি করবো।
আয়জা শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
কি বিহিত করবে?
_ ওর সাথে তোর তালাক করাবো। তোকে অন্য কোথাও বিয়ে দিবো যেখানে তুই ভালো থাকবি সুখে থাকবি।
_ যদি সেখানেও সুখ না জুটে ?
আয়জার এমন প্রশ্নে মেহেরুন্নেসা থমকে যান স্তব্ধ হয়ে যান। এই প্রশ্নের কি উত্তর দিবেন সেটা ভেবে পাচ্ছেন না। মা কে উত্তর দিতে না দেখে আয়জা পুনরায় প্রশ্ন করে,
উত্তর দিলে না যে আম্মা? যদি সেখানেও সুখ না জুটে? তখন কি করবো?
আয়জা কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে,
শোনো আম্মা আমার ভাগ্যে যা আছে সেটাই হবে। আমার পরিবারে আজ পর্যন্ত কারও তালাক হয় নি। তাহলে আমি কেনো নিজের গায়ে এই তকমা লাগাবো? আমি কেনো সমাজের কথা শুনবো? হয়তো এখন আমার দিন খারাপ যাচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যতে আমার সাথে কি হবে সেটা তো আমরা কেউ জানি না। হয়তো ভবিষ্যতে আল্লাহ আমাকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন।
_ তুই কি বলতে চাচ্ছিস সোজাসুজি বল।
_ আমি উনার বাড়িতে লাল বিয়ের শাড়ি পড়ে ঢুকেছি কাফনের সাদা কাপড় পড়েই সেই বাড়ি থেকে চিরতরে বের হবো।
মেয়ের কথা গুলো শুনে মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ হয়ে যান। আজ তার কাছে মনে হচ্ছে তার মেয়ে আসলেই বড় হয়ে গিয়েছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
উক্ত ঘটনার এক সপ্তাহ পরেই সাইফ জার্মানি থেকে বাংলাদেশে আসে ছুটি নিয়ে। অনেক ঝগড়া এবং অশান্তির পর দুই পরিবারের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক হয়। আয়জা পুনরায় সাইফের বাসায় ফেরত আসে। এখন আর তাকে একা কাজ করতে হয় না বাকিরাও তার কাজে সাহায্য করে।
সাইফ এসেছে দুই মাসের বেশি হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এখন বেশ স্বাভাবিক। কিন্তু রাবেয়া বেগমের অসুস্থতা বেড়েই চলেছে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছে সাইফ। এদিকে আয়জারও বেশ কিছুদিন ধরে শরীরটা ভালো লাগছে না। সে ঠিক মতো খেতে পারছে না, ঘুমাতে পারছে না। বারবার বমি করে নাজেহাল অবস্থা তার। সাইফ বিছানায় বসে ছিলো আয়জা ঘরে এলে সে বেশ সময় নিয়ে আয়জার দিকে তাকিয়ে থাকে। আয়জা তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন?
_ তোমাকে এত মলিন লাগছে কেনো?
_ কি জানি। শরীরটা কয়েকদিন ধরে ভালো লাগছে না।
_ এদিকে এসো আমার সামনে বসো।
আয়জা সাইফের সামনে গিয়ে বসে। সাইফ তার গালে হাত রেখে বলে,
আমাকে মাফ করে দিও। মায়ের অসুস্থতার জন্য তোমার দিকে ঠিকমতো খেয়াল দিতে পারছি না। কি করবো বলো মাকে তো অনেক ভালোবাসি। আমার মা বাকি সবার থেকে আমাকে বেশি ভালোবাসে। আমিও আমার মাকে অনেক ভালোবাসি। তার অসুস্থতা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি চোখের সামনে আমার মাকে কষ্ট পেতে দেখছি কিন্তু সন্তান হিসেবে তাকে শান্তি দিতে পারছি না।
আয়জা সাইফের কাঁধে হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করে বলে,
আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কোনো ডাক্তার তো দেখাতে বাদ রাখছেন না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। মাকে আমিও অনেক ভালোবাসি। আমি যখন বিয়ে করে এই বাড়িতে এসেছি তারপর থেকে এই বাড়িতে আমাকে যে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে এবং বুঝেছে সে হলো মা।
সাইফ উঠে ড্রেসিং টেবিল থেকে তেলের বোতল নিয়ে আয়জার পিছনে বসে। আয়জা জিজ্ঞেস করে,
কি করছেন?
_ চুপ করে বসো। আমি তোমার মাথায় তেল দিয়ে দেই আরাম পাবে। কাল সকালে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।
সাইফ সুন্দর করে মালিশ করে করে আয়জার মাথায় তেল দিয়ে দেয়। আরামে আয়জার ঘুম চলে আসে। সাইফ আয়জার চুল আঁচড়িয়ে বেণী গেঁথে দেয়। এরপর তেলের বোতল রেখে হাত ধুয়ে বিছানায় এসে আয়জাকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আরামে আয়জা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
পরের দিন সকালে সাইফ আয়জকে হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে টেস্ট দিয়ে আসে। দুইদিন পর টেস্টের রেজাল্ট আসলে জানা যায় আয়জা মা হতে চলেছে। এই খবর পেয়ে দুই পরিবার বেশ খুশি। সাইফ আরও বেশি যত্ন করে আয়জাকে। রাবেয়া বেগম ও বেশ খুশি হয়েছেন এই খবর পেয়ে। প্রাণ ভরে দোয়া করেছেন তাদের এবং তাদের অনাগত সন্তানের জন্য।
সময় খুব দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে। সাইফের ছুটি প্রায় শেষ। এখন তাকে ফিরে যেতে হবে। আয়জা সাইফকে জড়িয়ে ধরে বলে,
আপনি এখন যাবেন না প্লীজ। আপনাকে দেখলে আমি সাহস পাই । আপনি আমার পাশে থাকলে আমি ভরসা পাই।
_ কিন্তু ওরা তো আমাকে আর ছুটি দিবে না। এমনি আমি এই বছর অনেক ছুটি নিয়ে ফেলেছি।
_ আপনার আর বিদেশে যাওয়া লাগবে না। আপনি দেশেই থেকে যান।
_ এখানে আমি কি করবো? ওইখানে ভালো একটি চাকরি করি ভালো টাকা বেতল পাই। তোমাদের ভালো রাখতে পারছি। এখানে থেকে কি করবো? কয় টাকা রোজগার করবো?
_ আমার টাকা পয়সা লাগবে না। আমি পোলাও মাংসের পরিবর্তে ডাল ভাত খাবো তাও আপনি আমার কাছে থাকুন।
আয়জার জোরাজোরিতে সাইফ টেলিফোনে তার বসকে কল দেয় । তাকে বুঝিয়ে বলে তার অবস্থার কথা। তার বস আরও ছয় মাস তার ছুটি বাড়িয়ে দেয়। সাইফ যেহেতু খুবই কর্মঠ এবং মেধাবী একজন ছেলে তারমধ্যে সে কখনো এত ঘন ঘন ছুটি নেয় নি যার কারণে তার ছুটি বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এক মাস পরেই রাবেয়া বেগম মারা যান। মায়ের মৃত্যুতে সাইফ প্রচন্ড ভেঙে পড়ে। আয়জা পরিবারের সবাইকে আগলে রাখে। আয়জার শ্বশুরের চিন্তাধারাও পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তিনি আর আগের মতো নেই। তিনি এখন আয়জাকে নিজের মেয়ের মতোই আদর করেন। মেহেরুন্নেসা আয়জাকে দেখতে আসেন। আয়জা তার মাকে বলে,
দেখেছো আম্মা সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে? আমি বলেছিলাম না সব ঠিক হয়ে যাবে?
_ হুম দেখলাম তো। কিন্তু তুই এত ভরসা করে বলতি কীভাবে যে সব ঠিক হবেই?
_ কারণ আমি কখনো কারো সাথে খারাপ করি নি এবং কারো খারাপ চাই নি। আর যারা অন্যের ক্ষতি করে না তাদের সাথে কখনো খারাপ হতে পারে না।
মেহেরুন্নেসা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তার মেয়েটা বড্ড জ্ঞানী হয়েছে। তার কাছে ভাবতেই অবাক লাগে তার চঞ্চল হরিণী মেয়েটি কিভাবে এত বড় হয়ে গেলো এবং সংসারী হয়ে উঠলো? সাইফের বাবা রাবেয়া বেগম মারা যাওয়ার পর থেকেই শোকে দুর্বল হয়ে পড়েন। তিনি দিন রাত এক করে কান্না করেন তাকে মনে করে। আশেপাশে শুধু তাকে পাগলের মতন খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ একদিন রাতে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। মা বাবাকে হারিয়ে সাইফ বেশ চুপচাপ হয়ে যায়। এদিকে লাবিবাও স্তব্ধ হয়ে যায়। সে ভাবতেও পারিনি এভাবে এত তাড়াতাড়ি মা বাবাকে হারিয়ে ফেলবে সে। আফসানা ভাইকে এবং বোনকে শান্তনা দেয়। সাইফের ছোট ভাই ও বিদেশ থেকে ছুটি নিয়ে আসে। একটি ভালো পাত্র খুঁজে লাবিবাকে বিয়ে দেওয়া হয়। সাইফের ছোট ভাইও বিয়ে করে। অগোছালো পরিবারটি ধীরে ধীরে গুছাতে শুরু হয় আবার।
~~~~~~~~~~~~~~~
আয়জার মেয়ে হয়েছে। সাইফ মেয়েকে কোলে নিয়ে বলে,
আমার মা এসেছে আমার কাছে।
আয়জা তার মেয়ের নাম রাখে সুবহা। যার অর্থ সুন্দর সকাল অথবা সকালের আলো। তার মেয়ে তার জীবনে সুখের আলো হয়ে এসেছে যার কারণে এই নামটি তাকে দেওয়া। সুবহা হয়েছে বাবাভক্ত। সারাক্ষণ কান্না করতে থাকে কারো কোলে গিয়ে সে কান্না থামায় না কিন্তু যখন বাবার কোলে যায় সে একদম চুপ। বাবার বুকে যেনো পৃথিবীর সকল শান্তি। বাবার গলার আওয়াজ পেলেই সে ঠান্ডা। শুধু খাওয়ার সময় ছাড়া মায়ের কথা যেনো তার মনেই থাকে না। সে দিনের বেলা ঘুমায় এবং রাত হলেই জেগে থাকে এবং কান্না করে। আয়জা বহু চেষ্টার পরও তার কান্না থামাতে পারে না। সাইফ রাতভর জেগে তাকে নিয়ে হাটে । একটু বসতে গেলেই আবার কান্না শুরু হয়ে যায় তার। একদিকে আয়জা ঘুমে তলিয়ে থাকে তো অন্যদিকে সাইফ রাতভর মেয়েকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে।
চলবে।
