#সূচনা_পর্ব
#রাতের_নক্ষত্র
#মুক্ত_রহমান
“একটা ধর্ষিতা হয়ে খান বাড়ির একমাত্র ছেলের বউ হবে?তোমার কি সেই যোগ্যতা আছে অরাত্রিকা?খান বাড়ির পুত্রবধূ হওয়ার এতো শখ, নিজেকে আয়নায় দেখেছো কখনো? ইউ লুক লাইক হোর, এ স্ল্যাট !”
একটু আগের করা অপমানগুলো কল্পনা করতে থাকে। সয্য করতে না পেরে মেয়েটা এবার চিৎকার করে বলে – “ধর্ষিতা!হ্যাঁ, আমি ধর্ষিতা… উম… শুনতে খারাপ লাগছে? তবে সত্যিটা কখনো পাল্টে যাবে না, বুঝেছেন আপনি?”
থেমে আবারও বলে ওঠে-”ধর্ষিতাদের কি কোনো সম্মান আছে? না আছে আত্মগরিমায় ঘেরা আত্মমর্যাদা। তাদের হারানোর মতো নিজের সতিত্বটুকুও আর নেই।“
বলেই মেয়েটা অঝোরে কেঁদে ওঠে। ফ্লোরে লুটোপুটি খাচ্ছে। কান্নার দমে বুকটা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাঁপছে। পিঠ উঠানামা করছে তীব্র শ্বাসে। রেশমি চুলের গোছা ছড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে। ফুলে ওঠা হরিণী চোখদুটোতে জমে থাকা অশ্রু জানালা গলিয়ে ঢোকা আলোয় চিকচিক করছে।অন্ধকার ঘরটার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে কান্নায়। সারা দেহে ক্লান্তি, মনে শূন্যতা। শরীরটা যেন নিজের নয়। প্রত্যেক ইঞ্চিতে লেগে আছে ঘৃণার ছাপ,এক নোংরা স্মৃতি। চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে, খাবার অনীহায় একপাশে ঢাকা। ঘরবন্দি মেয়েটা নড়তে পারে না, কথা বলতে পারে না শুধু শূন্যে তাকিয়ে থাকে, যেন নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।সে তো এমন জীবন চায়নি। এমন অসম্মান, এমন অমানুষিক যন্ত্রণা। সে চেয়েছিল মুক্তি, চেয়েছিল শান্তি। কিন্তু এখন সে বেঁচে আছে নিঃশব্দ দহন হয়ে যেখানে কান্নাও তাকে ধোঁকা দেয়। চোখে অশ্রু জমে না, শুধু নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে তাকে গিলে খায়।
নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎ মেয়েটার মাথায় কারও উষ্ণ হাতের স্পর্শ পড়ে। পুরুষালি সেই স্পর্শে মেয়েটা কেঁপে ওঠে। মাথা তুলে তাকায়। পরক্ষণেই ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো চিৎকার করে ওঠে,
”ছোঁবেন না আমাকে, খান সাহেব! ছোঁবেন না আমাকে! এই যে দেখুন, আমার সারা দেহে নোংরা স্পর্শের দাগ। আপনি আমাকে ছোঁবেন না, দয়া করে। চলে যান এখান থেকে!“
নক্ষত্র কিছু বলে না। স্থির চোখে মেয়েটার ভাঙা কথাগুলো শোনে নিঃশব্দে, যেন এক নিবেদিত শ্রোতা। তারপর ধীরে খুব ধীরে আবার হাত রাখে রাতের মাথায়। আঙুলের ডগার স্পর্শে থাকে আশ্বাসের উষ্ণতা।রাত দু’কদম পেছনে সরে যায়। তবুও নক্ষত্র নড়ে না। বরং আরও এগিয়ে এসে রাতকে নিজের প্রশস্ত বুকে জড়িয়ে ধরে। রাতের মাথা বুকের কাছে চেপে ধরে শান্ত স্বরে বলে,
- ”তুই ফুলের মতো পবিত্র, রাত। তুই নোংরা নস। তোর শরীর হয়তো আঘাতে ভরা, কিন্তু তোর আত্মা এখনো অপরূপ স্বচ্ছ। যারা তোকে ভাঙতে চেয়েছিল, তারা হার মানবে তোর চোখের এই অশ্রুতে। তুই নোংরা নস, রাত। এই পৃথিবীটাই নোংরা। যারা তোর মতো ফুলকে ছিঁড়ে ফেলার সাহস করে, তাদের মনটাই আসল অপবিত্র। আমি কথা দিচ্ছিএক একটা জানোয়ারকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলব। যারা আমার ফুলের গায়ে হাত দিয়েছে, তাদের দুনিয়ার বুক থেকে নিঃচিহ্ন করে ফেলব। এই ধরনীর বুকে তাদের কুলুষিত চেহারা চিরতরে মুছে দেব। কথা দিচ্ছি। গড প্রমিস।“
নক্ষত্রের বুকে মুখ লুকিয়ে রাত হু হু করে কেঁদে ওঠে। যতই আশ্বাস দিক, তবুও রাতের কাছে সবকিছু বিষাক্ত মনে হয়। চারপাশের বাতাস যেন তার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। না এই জীবন আর রাখবে না, কোনোভাবেই না। হয়তো এটাই জীবনের নির্মম পরিহাস, যেখানে বেঁচে থাকাটাই যন্ত্রণার সমান।রাত নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে নক্ষত্রের বুকে। দৃষ্টি শূন্য, ভাবনাগুলো অগোছালো। একদিকে ঘৃণা, অপরদিকে ভয় সব মিলিয়ে এক অচেনা শীতলতা রাতকে গ্রাস করে।অপরদিকে খান বাড়িতে তখনও কেউ ঘুমায়নি। বাড়ির প্রতিটি মানুষ আতঙ্ক আর ক্ষোভে ভারী নিঃশ্বাস ফেলছে। একমাত্র মেয়েটার এমন পরিণতি কেউই মেনে নিতে পারছে না। পুলিশ, সাংবাদিক, আশপাশের লোকজন সবাই ব্যস্ত অপরাধীদের খোঁজে। অথচ এখনো কোনো হদিস নেই।ঠিক এমন সময়ে নিস্তব্ধতার মাঝেই নক্ষত্র নিচু স্বরে বলে ওঠে,
”আমায় বিয়ে করবি, লিটলষ্টার ?“
রাত স্তব্ধ হয়ে যায়। শব্দগুলো কানে ঢোকে, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে বসে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সে মাথা তোলে। চোখ ভিজে ওঠে, রক্তিম ঠোঁটজোড়া কাঁপছে। নক্ষত্রের চোখে রাত কিছু খুঁজে ফেরে।তার খান সাহেব কি তাকে দয়া করছে? তার কোনো দয়ার প্রয়োজন নেই। যে জীবনের কোনো দাম নেই, সেই জীবনে কেন সে খান সাহেবকে জড়াবে? কোনোভাবেই না অহু কোনোভাবেই না।
তবুও বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে,আমি কি এখনও বিয়ের যোগ্য?কিন্তু নক্ষত্রের দৃষ্টি বলে দেয়-রাত এখনো তার লিটলস্টার, একইরকম পবিত্র,একই রকম আপন।
থরথর করে কাঁপছে রাতের হাত। তবুও সেই কম্পমান হাত উঁচিয়ে সে বলে,
”দেখুন দাগগুলো! এগুলোর স্মৃতি বয়ে আমি কিভাবে বাঁচব? আপনাকে দেওয়ার মতো আমার মাঝে আর কিছু অবশিষ্ট নেই, খান সাহেব।“
নক্ষত্রের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে ওঠে। শান্ত মূর্তিটা মুহূর্তেই অস্থির হয়ে ওঠে। চোখে-মুখে হিংস্রতা ফুটে ওঠে। যাকে নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবেসেছে, তাকেই জানোয়াররা ছিঁড়ে খেয়েছে। বেজন্মার বাচ্চাগুলো মেয়েটাকে আবর্জনার স্তূপে ফেলে রেখে গেছে-ছিন্নভিন্ন বস্র, অসংখ্য দাগে জর্জরিত ছোট দেহখানি।উদ্ধারের পঞ্চম দিনে তার জ্ঞান ফিরেছে। আজ সাত দিন হলো উদ্ধার করা হয়েছে, অথচ এর মধ্যেই মেয়েটা দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। নক্ষত্রের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।মনের গহীনে যার জন্য তিলে তিলে এত আসক্তি, এত ভালোবাসা জমিয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করেছিল অথচ কী হয়ে গেল! রাতের আশপাশে কেউ ভয়ে আসতে পারছেনা। মেয়েটা পাগলের মতো আচরণ করছে। একমাত্র নক্ষত্রই রাতকে সামলে রেখেছে।
_________
রাতের সুনশান সড়ক। গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। প্রকৃতির নীরবতা চিরে ফাঁকা সড়ক বেয়ে ছুটে আসছে একটি গাড়ি। হেডলাইটের হলদে আলো সামনে ছড়িয়ে পড়ছে। গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে হৈচৈ। পাঁচজনের দলটা আনন্দে আত্মহারা। তাদের কাছের একজন আজ বহু বছর পর দেশে ফিরেছে। সেই সুবাদে সবাই খুশি।এতসব হৈচৈ ড্রাইভ করতে থাকা লোকটার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। লোকটা নিজের মনে গাড়ি চালাচ্ছে। কুচকুচে কালো চোখের মণিতে চিকন ফ্রেমের রিমলেস চশমা। ঘন কালো পাঁপড়ি যুগলে আবৃত একজোড়া আঁখিপল্লব। ফর্সা, লম্বা হাতদুটোর আস্তিন গুটিয়ে রাখা। তীক্ষ্ণ চোয়াল, ক্লিনসেভ চেহারায় লোকটাকে গ্রিক গডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাম হাতে ক্ষুদ্র একটি স্টার ট্যাটু করা, সঙ্গে কালো একটি হেয়ার ব্যান্ড নিপুণভাবে পরা যা আটসাঁট হয়ে আছে কবজিতে। পরনে কালো প্যান্ট, স্লিক সাদা শার্ট। বুকের কাছের দুটো বোতাম খোলা।লোকটার পাশের ফ্রন্ট সিটে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা একটি মেয়ে বসে আছে। হেভি মেকআপে মুখ ঢাকা। মেয়েটার দৃষ্টি বারবার ড্রাইভ করা লোকটার দিকে আটকে যাচ্ছে,চাহুনিতে যেন গিলে খাওয়ার তাড়না। অথচ এতে লোকটার কোনো হেলদোল নেই।
ব্যাকসিটে একজন মেয়েসহ দুটো ছেলে। তারা নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ে তর্কবিতর্ক করছে। এতে সামনের মেয়েটা বেজায় বিরক্ত। হাতে ক্ষমতা থাকলে শয়তানের দলটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে বের করে দিত। মনে মনে কয়েকটা গালি বসিয়ে কানে পড গুঁজে গান ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ইকরা জামান।এরই মধ্যে হঠাৎ লোকটা গাড়ির ব্রেক কষে। সবাই আকস্মিক ব্রেকে সামলে হেলে পড়ে। আর একটু রাফভাবে ব্রেক কষলে নির্ঘাত বড় কোনো অঘটন ঘটত। পুরুষালি হাতদুটো তখনও শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরে রেখেছে। দৃষ্টি সামনের ফাঁকা সড়কের পাশে পড়ে থাকা আবর্জনার স্তুপে।এদিকে ইকরা জামানের কপাল অল্পের জন্য বেঁচে যায়। কোনোমতে নিজেকে সামলে ক্ষোভে পাশের লোকটাকে কিছু বলতে যাবে ওমনি কানে ভেসে আসে পুরুষালি তীক্ষ্ণ স্বর,
”আয়রা, আমার কোটটা দে। মেয়েটার গায়ে কোনো জামা নেই।“
হতভম্ব চোখে কোনো প্রশ্ন না করেই মেয়েটা কোট বাড়িয়ে দেয়। পুরুষালি হাতটা থাবার মতো কোটটা কেড়ে নিয়ে দরজা খুলে নেমে যায়। সামনে গিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে আলো ধরতেই চোখে পড়ে রক্তমাখা মুখশ্রী। ছিন্নভিন্ন বস্র, যখমে ভরা ছোট্ট একটি দেহ। পুরুষালি হাতটা ফোনটা দু’ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে সতর্কভাবে মেয়েটাকে কোট দিয়ে ঢেকে দেয়।রক্তে মাখা দাগে বোঝার উপায় নেই মেয়েটা দেখতে কেমন। আদৌ বেঁচে আছে কিনা, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। তৎক্ষণাৎ লোকটা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মেয়েটার সামনে। ততক্ষণে বাকিরা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।অজ্ঞাত মেয়েটা বেঁচে আছে কিনা দেখার জন্য লোকটা যেই হাত বাড়ায়, ওমনি ভেসে আসে কর্কশ কণ্ঠস্বর,
”ওহ শিট! একটুর জন্য বেঁচে গেছি। এই মেয়েটার জন্য আমাদের যদি কোনো ক্ষতি হতো? এই নোংরা মেয়েটাকে টাচ করছ কেন তুমি? হয়তো মরে গেছে, উঠে এসো। কী দুর্গন্ধ নাকে লাগছে, ইশ!“
মেয়েটা যে স্বার্থপর, তা ভালোভাবেই জানত সে। কিন্তু অমানুষের কাতারে তার উন্নতি হয়েছে তা জানা ছিল না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে লোকটা নিজের দু’আঙুল মেয়েটার নাকে চেপে ধরে।পেশাগত কারণে বুঝে যায় শ্বাস চলছে, যদিও খুব ধীরে। হয়তো এখনো বাঁচার চেষ্টা করছে।
”নক্ষত্র!“
তড়াক গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় নক্ষত্র। মিনহাজ ডেকে উঠেছে হাতে একটি পানির বোতল। অজ্ঞাত মেয়েটার প্রতি তার গভীর মায়া হতে থাকে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে দেখেই বুঝে ফেলে। না জানি মেয়েটার পরিচয় কী। নিশ্চয়ই বাড়ির লোকেরা এতক্ষণে খুঁজছে। সবাই দুশ্চিন্তায় কাঁদছে হয়তো।মিনহাজের নিজেরও একটি ছোট বোন আছে। আদুরে বোনটাকে সে খুব ভালোবাসে। বন্ধুর দিকে বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে শুষ্ক ঠোঁটজোড়া কামড়ে ধরে আওড়ালো,
”মেয়েটাকে একটু পানি খাওয়া, তারপর হাসপাতালে নিতে হবে। দেখে মনে হচ্ছে কন্ডিশন খুব একটা ভালো না। বাঁচবে কিনা বলা যাচ্ছে না।“
নক্ষত্র খুব সতর্কতার সঙ্গে মেয়েটাকে আবর্জনার স্তুপ থেকে তুলে নেয়। কোটটা আর একটু ভালো করে জড়িয়ে নিজের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে জড়িয়ে। ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার লোকটার বুকে মেয়েটা নিতান্তই ছোট।যেন একটি টেডি।বিশাল পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।নক্ষত্র এক পা এক পা করে গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। নক্ষত্রের ছোট বোন আয়রা দৌড়ে গিয়ে ব্যাকসিটের দরজা খুলে দেয়। নক্ষত্র সেদিকে এগোতেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ইকরা জামান। ব্যাকসিটের দরজার সামনে গিয়ে হাত দুটো উঁচু করে বাধা দেয়। বিরক্তিতে মুখ বেঁকিয়ে নাক সিটকে বলে ওঠে,
”পাগল হয়েছিস নক্ষত্র? কোথাকার কোন মেয়ে! আদৌ রেপের শিকার, না কোনো পতিতা। কে জানে! তাকে তুই গাড়িতে তুলছিস ? যেখানে পেয়েছিস, সেখানেই রেখে দে। বাড়ি চল, কুইক।“
আয়রার ইচ্ছে করে ঠাস করে চড় মেরে দু’গাল লাল করে দিতে। কিন্তু পারে না। হাজারো খালাতো বোন।তার ওপর ইকরা তাকে বেস্টফ্রেন্ড ভাবে। চড় কষাতে না পারলেও কটু কথা বলতে ভোলে না আয়রা। শক্ত হাতে ইকরাকে সামনে থেকে টেনে সরিয়ে দেয়। ইকরা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে থাকে। তাতে কোনো তোয়াক্কা না করে আয়রা বলে ওঠে,
-”মুখ সামলে কথা বল, ইকরা। ভুলে যাস না, তুইও একটা মেয়ে! আজ যদি মেয়েটার জায়গায় তুই থাকতি, তাহলে কী হতো? পারতিস এইভাবে অমানবিকতার পরিচয় দিতে? সময় থাকতে ভালো হয়ে যা। মেয়েটার অবস্থা দেখছিস যেকোনো মুহূর্তে কিছু হয়ে যেতে পারে। তাই আবারও বলছি, নিজের বিবেক-বুদ্ধি ভালো কাজে ব্যবহার কর। অমানুষের পরিচয় দিস না।“
কথার মাঝেই আয়রার ফোনটা বেজে ওঠে। সাইলেন্টে থাকায় এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এবার স্ক্রিনের আলো চোখে পড়ে। বাড়ি থেকে একশ কুড়িরও বেশি মিসড কল নানা নাম্বার থেকে। অজানা আশঙ্কায় আয়রার বুক কেঁপে ওঠে। এতগুলো কল মানেই নিশ্চয় কিছু হয়েছে।আর দেরি না করে ফোনটা রিসিভ করে কানে চাপে। গাড়ি থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায় আয়রা। দৃষ্টি পড়ে গাড়ির ভেতরে শুয়ে থাকা অজ্ঞাত মেয়েটার দিকে। আয়রা খেয়াল করে,মেয়েটার হাতে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। একটি রিং। কেমন যেন পরিচিত লাগে তার।
এদিকে ততক্ষণে নক্ষত্র মেয়েটাকে সিটে শুইয়ে দিয়েছে। বোতল থেকে অল্প অল্প করে পানি মুখে ঢালছে, কিন্তু মেয়েটার কোনো সাড়া নেই। ঠোঁট ফাঁক দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে রক্তমাখা গাল বেয়ে। হয়তো মাথায় আঘাত লেগেছে সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পুরো শরীরে লেগে আছে। জায়গায় জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। চোখ দুটো বন্ধ।নক্ষত্র মুখটা একটু নামিয়ে আবার পানি ঢালতে যেতেই মেয়েটা খুক খুক করে কেশে ওঠে। রক্তমাখা পানি গড়িয়ে পড়ে নক্ষত্রের বুকের কাছে। সাদা শার্টটা রক্তে মেখে যায়। তাতেও নক্ষত্রের কোনো হেলদোল নেই বরং আরও সাবধানে পানি খাওয়াতে থাকে।
হঠাৎ আকস্মিক ধাক্কায় নক্ষত্রকে সরিয়ে আয়রা গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। নক্ষত্র ছিটকে দাঁড়ায়। হাত থেকে পানির বোতল পড়ে যায় সিটের কাছে। একটু দূরে আবর্জনার স্তুপের কাছেই ফোনটা পড়ে আছে-ওপাশ থেকে ভেসে আসছে, “হ্যালো… হ্যালো…”সবাইকে হতবাক করে দিয়ে আয়রা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। বস্রহীন, যখমে ভরা দেহটা বুকে টেনে নিয়ে বলে ওঠে,
”আমার রাতকে ছিঁড়ে খেয়েছে, ভাইয়া। জানোয়াররা আমার রাতপাখিকে আবর্জনার স্তুপে ফেলে গেছে। এইটা আমাদের অরাত্রিকা। রাত… এই রাত! চোখ খোল। দেখ, তোর আপি এসেছে। এই সোনা, কী হয়েছে তোর? চোখ খোল, সোনা, প্লিজ!“
নক্ষত্রের গলা শুকিয়ে আসে। একবার বলতে চায়“রাত…? আমার রাত?”কিন্তু শব্দ বের হয় না। নিজেকে সামলে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
”রাত এখানে কীভাবে? রাতের তো বাড়িতে থাকার কথা ছিল।“
ছোট্ট দেহখানি আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরে আয়রা জবাব দেয়-
-”বাড়ি থেকে একশ কুড়িটা মিসড কল এসেছে, ভাইয়া। আমি খেয়াল করিনি।তাহমিদ ভাইয়াকেও কল করেছে ফোন বন্ধ। অরাত্রিকা নাকি বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে শপিং মলে গিয়েছিল। অন্ধকার হওয়ার পরও যখন বাড়ি ফেরেনি, মামুনি, বাবাই সবাই খুঁজতে থাকে। ওর বন্ধুরা জানিয়েছে, তারা অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। আজ বাড়ির গাড়িটাও রেখে গেছে। কিন্তু দেখ জানোয়ারগুলো মেয়েটার কী হাল করেছে। ভাইয়া, এইটা আমার রাত। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চল, ভাইয়া।“
নক্ষত্র বিশ্বাস করতে পারে না। যেন কেউ তার বুকের মাঝে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। চোখ দুটো অবিশ্বাসে বড় হয়ে আছে। হাতের শিরাগুলো দপদপ করে জ্বলছে। মেয়েটার রক্তমাখা মুখ নক্ষত্রের চোখে ধীরে ধীরে আরেক রূপ নেয়। বুক ধড়ফড় করে ওঠে, অথচ মুখটা নিস্তব্ধ একদম শান্ত, শীতল।দু’সেকেন্ডের মাথায় নক্ষত্রের হাঁটু ভেঙে আসে। মাটিতে লুটিয়ে পড়বে এমন সময় তাহমিদ আর মিনহাজ জাপ্টে ধরে। তারাও যেন বাকরুদ্ধ। যে মেয়েটাকে কিছু ঘণ্টা আগেও তারা দেখেছে, এখন সেই মেয়েটাই তাদের সামনে নিঃতেজ হয়ে পড়ে আছে।গাড়ির সিটে শুয়ে থাকা অরাত্রিকার দিকে তাকিয়ে নক্ষত্রের দৃষ্টি কেঁপে ওঠে। চারপাশের সব শব্দ ম্লান হয়ে যায়। কানে শুধু ভেসে আসে আয়রার কান্না। অথচ নক্ষত্রের নিজের শরীরটাই যেন আর সাড়া দিচ্ছে না। মাথার ভেতরে শুধু একটাই শব্দ ঘুরপাক খেতে থাকে, ”অরাত্রিকা… আমার অরাত্রিকা!“তাঁর শক্ত, অপরাজেয় পুরুষালি চেহারায় হঠাৎ গভীর ভয়ের রেখা আঁকা পড়ে। মেয়েটাকে কোলে নেওয়ার সময় যে দৃঢ়তা ছিল, সেই জায়গায় ভয়, শূন্যতা আর আদিম রাগ চেপে বসে। নিকষ কালো চোখে তীব্র শোকে দৃষ্টি জমে যায়। নক্ষত্রের ঠোঁট কাঁপতে থাকে, কিন্তু কান্না বের হয় না। হঠাৎ বিকট এক হিংস্র হুহংকার ছেড়ে বলে ওঠে,
”আমায় মাফ করে দিস, লিটলস্টার! তোকে রক্ষা করতে পারিনি। তোর এত কাছে থেকেও তোকে চিনতে পারিনি। এই তুই-ই তো বলেছিলি আমি ফিরলে শহর ঘুরবি, আমার সঙ্গে ফুচকা খেতে যাবি। তাহলে কেন শুয়ে আছিস? চোখ খোল। শুনছিস তুই? চোখ খোল, লিটলস্টার। তোর নক্ষত্র এসেছে,দেখ।“
কোনো এক উন্মাদ প্রেমিকের আহাজারির মতো করে ওঠে নক্ষত্র। এতক্ষণকার শক্ত পুরুষটা নিমিষেই তছনছ হয়ে যায়। যার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল মহলে, তাকেই কিনা খোদা এনে দাঁড় করাল এই আবর্জনার স্তুপে। নক্ষত্রকে সামলানো দায় হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার উন্মাদনা বাড়তে থাকে।তাহমিদ জোর করে নক্ষত্রকে গাড়ির দিকে টেনে নেয়। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে যেতে হবে। দেরি হলে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। তাই মিনহাজকে ইশারা করে গাড়ি ড্রাইভ করতে বলে। পেছনে ইকরাকে পাঠায় আয়রার কাছে ওকে সামলাতে।আকস্মিক এদিকে নক্ষত্র পাগলের মতো ছুটে যায় রাতের কাছে। পড়ে থাকা পানির বোতল থেকে পানি নিয়ে রাতের চোখে-মুখে ঢালতে থাকে। যেভাবেই হোক, মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। হঠাৎ রক্তমাখা মুখটা পরিষ্কার করে দেখতে ইচ্ছে করে নক্ষত্রের। তৃষ্ণার্ত চোখদুটো ছটফটিয়ে ওঠে।নিজের শরীর থেকে শার্ট খুলে পানিতে ভিজিয়ে নক্ষত্র যত্ন করে রাতের মুখ মুছতে থাকে। আয়রা তখনও হাউমাউ করে কাঁদছে। তার কান্না কোনোভাবেই থামছে না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নক্ষত্র রাতকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে। রক্তভেজা মুখটায় পরপর অজস্র চুম্বন এঁকে দেয়। বন্ধ চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে আকুতি ভরা স্বরে আয়রাকে বলে ওঠে,
-”এই আপি,ওর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব কিভাবে? ওর যদি কিছু হয়ে যায়, আমাকেও মেরে ফেলিস তুই। দুনিয়া হোক বা আখিরাত ওর পিছু ছাড়ছি না আমি। ওর কিছু হয়ে গেলে, ওর পাশের কবরটা যেন আমার হয়, আপি। ওকে বল না চোখ খুলতে। এই সোনা,তোর নক্ষত্র এসেছে দেখ। অভিমান করিস না আর, প্লিজ। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।“
চলবে….
