#রাতের_নক্ষত্র – ০২🌿
#মুক্ত_রহমান
বারো বছরের দীর্ঘ একটা সময় লন্ডনে কাটিয়ে নিজ দেশে ফিরছিলো নক্ষত্র। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হওয়ায় লন্ডনে পড়াশোনার সুযোগ মিলেছিল তার। অথচ ছুটিতে দেশে আসার জন্যে পরিবারের সবার জোরাজুরি থাকলেও নক্ষত্র অজানা এক কারণে বারবার এড়িয়ে যেত। তখন হয়তো নিজেকেই বোঝাতে পারতো না কেন দূরে থাকতে চাইছে। কিন্তু আজ সে নিজের ওপরই ঘৃণা অনুভব করছে।তার আগমন যেন কারো জীবনে ভুমিকম্পের মতো আছড়ে পড়েছে। আজ সে দূরে থাকলে নিশ্চয় অরাত্রিকা ভালো থাকতো, সুস্থ থাকতো। হয়তো এমন অঘটন ঘটতো না। এই ভাবনাটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। নক্ষত্র নিজেকেই দায়ী করতে থাকে সবকিছুর জন্য। অপরাধবোধে চোখদুটো ছলছল করে ওঠে।ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ভেঙে আড়ছে পড়ে।
বাহিরের অন্ধকার ধরণিতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন গ্রাস করছে নিজের ভেতর।ভোর হয়ে এসেছে।হয়তো তিনটের কাছাকাছি।অথচ নক্ষত্রের চোখে এখনো ঘুম ধরা দেয়নি। রাতকে ঘুমিয়ে একটু আগেই রুমে এসেছে, কিন্তু তার মাথা ভর্তি শুধু দুশ্চিন্তা মেয়েটার জন্যে। সময় তার হাতে খুব বেশি নেই। কিছুদিনের ভেতরেই আবার ফিরতে হবে লন্ডনে।যান্ত্রিক মেশিনটার ভেতরে অসংখ্য মেইল জমা হয়ে আছে, অথচ সেদিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। নক্ষত্র আলগোছে চোখের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দেয়। কপালটা একটু কুঁচকে আসে। মাথার ভেতরে ধীরে ধীরে কিছুর ছক কষছে সে। মুখের অভিব্যক্তি অস্বাভাবিক নির্বিকার হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে আছে হিংস্রতা, ক্রুর।
বারো বছরের লন্ডনবাস নক্ষত্রকে শুধু শিক্ষিত করেনি, বদলে দিয়েছে ভেতরের মানুষটাকেও। একসময় যে ছেলেটা আবেগে সিদ্ধান্ত নিত, আজ সে হিসাব করে নিঃশ্বাস নেয়। লম্বা শরীর, চওড়া কাঁধ।চুপচাপ বসে থাকলেও তার উপস্থিতি নজর কারা। মুখের গড়ন ধারালো, চোয়ালের রেখা শক্ত, যেন বহুদিন ধরে দাঁতে দাঁত চেপে রাখা রাগ সেখানে পাকাপোক্ত। চোখ দুটো সবচেয়ে ভয়ংকর অতিরিক্ত গভীর, অতিরিক্ত শান্ত। সেই শান্তির নিচে কী লুকিয়ে আছে, কেউ আন্দাজ করতে পারে না।অপরাধবোধে ভিজে থাকা চোখদুটোর পেছনে ধীরে ধীরে অন্য এক ছায়া জমে উঠে। অনুশোচনা গলে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে সংকল্প। নিজেকে দায়ী করার সেই অসহ্য ভারটাই এখন তাকে ঠেলে দিচ্ছে অন্য পথে। যে পথে নৈতিকতার প্রশ্ন নেই, আছে শুধু ফলাফল। আঙুলের ফাঁকে জমে থাকা অস্থিরতা নক্ষত্র টেবিলের উপর ঠুকরে ঠুকরে নামায়। চশমা খুলে রাখার পর চোখের দৃষ্টি আরও নগ্ন, আরও হিংস্র।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।একটানা বাজতে থাকে কয়েক সেকেন্ড।নক্ষত্র তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে।তাড়াহুড়া নেই। যেন জানে, ওপাশের মানুষটা অপেক্ষা করতেই অভ্যস্ত।খানিকক্ষণ বাদ কলটা রিসিভ করে।ওপাশের কণ্ঠটা ব্যতিব্যাস্ত ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ফিরেছিস?”
নক্ষত্র গলা নিচু করে বলে -“ফিরতে হলো।”
“তোর চোখে ঘুম নেই কেন?”
নক্ষত্র জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকায়।
নিজের রাগটা গিলে সুধায় – “কিছু হিসাব ঘুমোতে দেয় না।”
“সময় কতটা?”
“যতটা দরকার।”
কণ্ঠটা ঠান্ডা হয়ে আসে আরো,নক্ষত্র ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, নিষ্ঠুর একটা হাসি টানে।
“খেলা শেষ মানেই আলো জ্বলে যাবে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর শুধু একটা কথা।
“ভুল করিস না।”
নক্ষত্র এবার সরাসরি জবাব দেয়-“ভুল করার লোক আমি না।”
কল কেটে যায়।নক্ষত্র ফোনটা টেবিলে রাখে। বুকের ভেতরের দোলাচল এখন স্থির। সে উঠে দাঁড়ায়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকায়।সেখানে আর কোনো দ্বিধা নেই।তারপর ধীরে পা বাড়ায় ওয়াশরুমের দিকে। কিছুক্ষন পরেই নক্ষত্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে নিঃশব্দে। মুখে পানি ছিটানোর পর চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন, আরও স্থির। আলমারি খুলে কালো হুডিটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। হুডটা টেনে মাথার ওপর তুলে দিয়ে মুখটা মাস্কে ঢেকে ফেলে।চেনা মুখটা এক মুহূর্তে অচেনা হয়ে যায়। নক্ষত্র আলগোছে জানালার কাছে গিয়ে একবার চারপাশটা দেখে নেয়। বাইরে গভীর অন্ধকার, নিচে নীরব শহর।জানালার গ্রিল বেয়ে অনায়াসে নিচে নামে। কালো ছায়ার মতো সে অন্ধকারে মিশে যেতে থাকে।হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁটে উঠে আসে বেসুরে এক শিসধ্বনি।
—–
খান পরিবারের প্রধান কর্তা মৃত নাফিস খানের দু-ছেলে। বড় ছেলে আমজাদ ও ছোট ছেলে আদনান খান। বাড়ির কর্তা হিসাবে এখন সকল ধরণের দায়িত্ব পালন করে আমজাদ খান।লিভিং রুমে তিনি চিরচেনা সেই গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সামনে পুলিশ ইন্সপেক্টর সাবিত মহান বসে।সক্কাল সক্কাল তাকে জুরুরি তলব করেছেন বাড়ির কর্তা।আরাত্রিকার কেসটা তিনি হ্যান্ডেল করছে। এখনো ক্রিমিনালদের হদিস মেলেনি। অরাত্রিকা কোনো জবানবন্দি না দিলেও ওর মেডিকেল রিপোর্ট বলে দেয় সবকিছু। মূলত তিন থেকে চারজনের গ্যাং মিলে এমন নৃশংস ঘৃনীত কাজটা করেছে। যাকে বলে ব্রুটাল রেপ। অরাত্রিকাকে শারীরিক যখম করেছে বেশ, মাথায় ভারি রড জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করেছে। হাতে পায়ে মারের অসংখ্য দাগ। যৌন নির্যাতনের থেকে তাঁদের মূল লক্ষ্য বোধহয় তাকে মেরে ফেলার ছিলো। তবে কথায় আছে – রাখে আল্লাহ মারে কে। বেঁচে গেছে অরাত্রিকা।
স্যার!
ডাকতে ডাকতে হুরমুড়িয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন্সপেক্টর সৈকত। হঠাৎ এইভাবে ঢুকে পড়ায় ঘরের ভেতরের সবাই সেদিকে তাকায়।এদিকে সৈকতের চোখেমুখে ভয়ের চাপ স্পষ্ট।কপালে ঘাম জমে আছে, শ্বাস নেওয়ার গতিটাও স্বাভাবিক নয়। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, যেন দৌড়ে এসেছে।সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ছুটে গিয়ে থেমে যায় সাবিত মহানের সামনে। কথা বলার আগেই গলা আটকে আসে। ঠোঁট শুকনো, চোখে অস্থিরতা। কোনো ভূমিকা ছাড়াই আলগোছে নিজের ফোনটা সাবিতের দিকে বাড়িয়ে দেয়।সাবিত মহান বিস্মিত হয়ে ভ্রুজোড়া ভাঁজ করে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ ফোন এগিয়ে দেওয়ার মানে বুঝে উঠতে পারে না। সৈকতের দিকে একবার, ফোনের স্ক্রিনের দিকে আরেকবার তাকায়। প্রশ্ন করার আগেই ভয়ার্ত কণ্ঠে সৈকত বলে উঠে,
-“জঙ্গলের ভেতরের সেই পরিত্যক্ত ওভারব্রিজে পাওয়া গেছে তিনটি লাশ। জায়গাটা এমনিতেই লোকচক্ষুর আড়ালে, চারপাশে ঝোপঝাড় আর নীরবতার চাপা অন্ধকার। সেখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তিনটি অর্ধ-গলিত নগ্নদেহ। প্রত্যেকটির শরীরেই ভয়ংকর নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন।যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা, শরীরের বিভিন্ন অংশে কেমিকেল ঢেলে ঝলসিয়ে দেওয়া হয়েছে। চামড়া উঠে গেছে অনেক জায়গায়, কোথাও কোথাও মাংস কালচে হয়ে গেছে। গন্ধটা এতটাই তীব্র যে কাছাকাছি দাঁড়ানো দায়।কপালের মাঝ বরাবর “আমি ধর্ষক” লিখা।দেহগুলো এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই সবাইকে দেখানোর জন্যে।একটা নীরব বার্তা ছুড়ে দেওয়ার মতো। পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না স্যার , মুখমণ্ডল বিকৃত, আঙুলের ছাপ নষ্ট। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর আগে ওদের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। কে বা কারা, এখনো নিশ্চিত নয়। লাশগুলো উদ্ধার করে দ্রুত পোস্টমর্টেমের জন্যে ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।তবে দেখে মনে হচ্ছে এটা শুধু খুন নয়, পরিকল্পিতভাবে করা এক ভয়াবহ প্রতিশোধ।”
খবরটা শেষ হতেই লিভিং রুমে এক মুহূর্তের জন্য নিঃতব্ধতা নেমে আসে।আমজাদ খান এতক্ষণ যেভাবে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে। মুখের গাম্ভীর্য একচুলও বদলায় না, কিন্তু চোখের ভেতরের দৃষ্টি কেমন যেন কঠিন হয়ে ওঠে।একজন রিটায়ার পুলিশ অফিসার হিসাবে ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, ঠোঁটের কোণ সামান্য কেঁপে ওঠে।তিনি চাকরি জীবনেএমন ঘটনার সম্মুখীন কখনো হননি। তবে নিজেকে যতাসম্ভব সামলিয়ে। সাবিতের দিকে তাকায় গভীর ভাবে। তবে কোনো প্রশ্ন করেনা। কোনো বিস্ময় প্রকাশ করেন না।শুধু একবার গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেন।কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু ভারী।
“তিনজন?”
সাবিত মহান মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
আমজাদের চোখ অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে যায়। যেন কোথাও হিসাব মিলাচ্ছেন। তিনজন। গ্যাং। অরাত্রিকা। মেডিকেল রিপোর্ট। এখন এই তিনটা লাশ।আমজাদ ধীরে করে উঠে দাঁড়ান। পকেটে হাত ঢুকিয়ে জানালার দিকে তাকান। বাইরে সকালের রোদ ঝলমলিয়ে চারিদিকে ছড়িয়েছে।
“নিশ্চিত হও ওরাই?”
এবার প্রশ্নটা সাবিতের দিকে, কিন্তু চোখ জানালাতেই আটকানো।সাবিত মহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
“পুরোপুরি নিশ্চিত না। তবে প্যাটার্ন এক।”
—
জীর্ণশির্ণ দেহখানি লেগে গেছে বিছানায়। জ্বরের তোপে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। রাত হাত বাড়িয়ে খুব কষ্টে কমফোটার টেনে নেই গায়ে। ঠান্ডায় তাঁর ঠোঁটদুটো নীল হয়ে এসেছে। ঘরটা ভেতর থেকে বরাবরের মতো বন্ধ করা। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙচুর করা আসবাবপত্র।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাতের সাথে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা কেটে যাওয়ার ছোমাস।সবাই স্বাভাবিক আচরণ করতে চেয়েও পারেনা রাতের মুখ চেয়ে। আগের দুরন্ত চঞ্চল মেয়েটা একদম ভেঙে পড়েছে। না ঠিক ভাবে খায় আর না ঘর থেকে বের হয় অরাত্রিকা।কংঙ্কালসার দেহ নিয়ে পড়ে থাকে নিজের চার দেয়ালের বন্ধি ঘরটাই।কাশিতে খুক খুক করে কেশে উঠে রাত।চোখদুটো শত চেষ্টা করেও মেলতে পারেনা। পানি পিপাসায় কাতর অরাত্রিকা হাত বাড়িয়ে পানি খুঁজতে থাকে। তবে পানি নাগালে না পেলেও হাত লেগে কাঁচের পানি ভর্তি জগটা ফ্লোরে পড়ে ভেঙে যায় শব্দ করে।নিঃতব্ধ রাতে শব্দটা কেমন ভৌতিক মনে হয়।এদিকে অরাত্রিকা আধো আধো অস্পষ্ট সুরে পানি, পানি জবতে থাকে। অথচ সারাদিনের ক্লান্তিতে খান পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে।
হটাৎ ধপ শব্দে অরাত্রিকার আধভেজা জানালা দিয়ে কেউ ভিতরে প্রবেশ করে। জোস্না রাতের আলোয় এক দানবীয় অবয়ব দাঁড়িয়ে ঠিক অরাত্রিকার পায়ের কাছে। এমন সময় দূর থেকে ভেসে আসে ঘন্টার আওয়াজ। যা যানান দিতে থাকে, রাত ১২:০০ মিনিট।অবয়বটা সতর্কতার সাথে রাতের দিকে এগিয়ে যায়। ঠিক মাথার কাছে গিয়ে থামে অবয়বটা।
পানি পানি পানি।
রাতের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছায়না নক্ষত্রের।তবে রাতের ঠোঁট নড়ানো দেখে নক্ষত্র নিজের মাথা নিচু করে। ঠিক রাতের অধর সমান। নক্ষত্রের কানে ভেসে আসে অস্পষ্ট ভাঙা গলায় পানি শব্দ। বুঝে ফেলে রাতের পানি তৃষ্ণা পেয়েছে। নিজের হুডির ভেতর থেকে সতেজ সাদা গোলাপের তোরাটা বেড টিবিলে রেখে, দ্রুততার সাথে পানি নিতে গেলে ঘটে আরেক অঘটন। ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরো জুতা ভেদ করে নক্ষত্রের পায়ে জখম করে। ব্যথায় কিৎচিত নক্ষত্র চোখ খিচিয়ে নিলেও মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়।সাবধানে জুতা থেকে কাঁচের টুকরো আলাদা করে ফ্লোরটা ক্লিন করে হাঁটা দেয় ডাইনিংএর দিকে। কিছুক্ষন পরেই ফিরে আসে পানি সমেত। রাতের মুখ থেকে আলগোছে চুল সরিয়ে কাঁধের নিচে হাত গলিয়ে দেয় নক্ষত্র। রাতের উন্মোক্ত গরম কাঁধে ঠান্ডা হাতের ছোয়া লাগতেই কেঁপে ওঠে রাত। মুহূর্তেই জরিয়ে ধরে নক্ষত্রের পেট।নক্ষত্র অবাক হয় ভীষণ।মেয়েটার গায়ে জ্বর এসেছে। পানির গ্লাসটা সাইডে রেখে রাতকে কমফোটার সহ জড়িয়ে নেই বুকে। জ্বরের ঘোরে রাত তখনও ভুলবাল বকছে। নক্ষত্র খুব যত্নে পানির গ্লাস রাতের অধরে ধরতেই সবটুকু পানি এক নিমিষে খেয়ে ফেলে অরাত্রিকা। সেদিকে তাকিয়ে নক্ষত্রের অধরে তৃপ্তির এক হাসি ফুটে উঠে।
“তুই জানিস লিটলষ্টার!আমি আমার কথা রেখেছি। তোকে ছোওয়ার অপরাধে সবাইকে আমি নরকে পাঠিয়েছে। চলে যাওয়ার আগে শুধু আর একটা কাজ করে যেতে চাই – তোকে আমার সাথে নিয়ে ভিনদেশে একখানা সংসার গড়া।সেখানে শুধুমাত্র তুই আমি আর আমাদের সন্তান।”
অর্ধ-অচেতন রাতের কানে সে কথা পৌঁছায় না। জ্বরের ভারে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, মাথাটা এলিয়ে আছে পুরুষালি প্রশস্ত বুকের ওপর। নিশ্বাসের ওঠানামা ভারী, কপাল জ্বলন্ত আগুনের মতো উত্তপ্ত। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাতের জ্বর হুহু করে বাড়ছেই।নক্ষত্র আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। সাবধানে রাতের গা থেকে কমফোর্টারটা টেনে সরিয়ে নেয় সে। পরের মুহূর্তেই এক ঝটকায় রাতকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে নক্ষত্র।ভেতরে ঢুকে আর সময় নষ্ট করে না। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নব ঘোরাতেই ঝর্ণার মতো ঝমঝমিয়ে পানি নামতে শুরু করে। মুহূর্তেই দুজনের শরীর ভিজে যায়। উষ্ণ বাষ্পে ভরে ওঠে ছোট্ট জায়গাটা।কিন্তু আকস্মিক পানির স্পর্শে রাতের শরীর শীতে কেঁপে ওঠে। অসহ্য কষ্টে চোখজোড়া ধীরে ধীরে খুলে যায়। ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধু আবছা নক্ষত্র। পরিচিত সেই ছায়াটুকু চিনতে পেরেই যেন একটু সাহস পায় সে।তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠজোড়া কষ্টে নড়ে ওঠে। অস্ফুট, ভাঙা কণ্ঠে রাত সুধায়,
“আমার ঠান্ডা করছে ভাইয়া। প্লিজ পানি বন্ধ করুন।”
নক্ষত্র মুখটা নামিয়ে রাতের কপালে নিজের উষ্ণ ঠোঁটজোড়া চেপে গভীর চুম্বন বসিয়ে বলে,
“সরি জান। এতো রাতে তোর গায়ের জ্বর কমানোর ভালো উপায় এছাড়া আর দেখছিনা।এখন একটু সয্য করে নে। এরপর তোকে নিজ দায়িত্বে উষ্ণতায় মোড়াবো।”
রাত চুপ করে থাকে। তবে ভালো করে শাওয়ার নেওয়ার জন্য নক্ষত্র রাতকে ফ্লোরে দার করিয়ে দেয়। ঠান্ডা ফ্লোর স্পর্শ হতেই রাত নক্ষত্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবারো। অর্ধচেতন রাত তখনও যানেনা একজন খুব সতর্কতার সাথে তার জামার ভিতরে নিজের হাত ঢুকিয়েছে।রাত বাধা দিতে পারেনা। যেন সে নিজ দুনিয়ায় নেই। এদিকে রাত যতক্ষনে পুরুষালি স্পর্শ অনুভব করবে,ততক্ষনে নক্ষত্র রাতের জামা সম্পূর্ণ খুলে ফেলেছে। নক্ষত্র হাত বাড়িয়ে নিজের ভেজা হুডিটাও খুলে ছুড়ে মারে এক সাইডে।রাত তখনও বেহুঁশের মতো পরে থাকে নক্ষত্রের আলিঙ্গনে। অন্যদিকে নগ্ন প্রসস্থ বুকে রাতকে জড়িয়ে নিয়ে নক্ষত্র রহস্যমাখা হাসি হেসে ফিসফিসিয়ে বলে,
“Happy 13 marriage anniversary little star.”
থেমে আবারো বলে,
“তোর অসুস্থতার ফায়দা একটুও নিতে চাইনি পাখি।তবে পরিস্থিতি এমন তোর অনুমতি ছাড়া তোকে ছুঁতে হলো। আমায় মাফ করে দিস। কাল যখন সকালে তোর বিছানায় আমাকে দেখবি তখন চিৎকার করিসনা।সময় হলে সবটা জানতে পারবি ততক্ষন আমায় ভুল বুঝিস না।”
গোসল শেষে, নক্ষত্র টাওয়ালে মোড়া অর্ধনগ্ন রাতকে বুকে জড়িয়ে রুমে ঢোকে। রাতের শরীরটা এখনো দুর্বল, তাই হাঁটার প্রতিটি ধাপ ধিমি। মৃদু আলোয় নক্ষত্র নিজের হাতে রাতকে উষ্ণ কাপড়ে মুড়ে দিয়ে নিজেও চেঞ্জ করে নেই।এখন রাতের জ্বর কম। শাওয়ার নেওয়াই জ্বরের শেষ আঁচটুকু কমে এসেছে।ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা রাতের দিকে চেয়ে মুসকি হাসে নক্ষত্র। কম্পোমান ঠোঁটজোড়ার দিকে তাকিয়ে নক্ষত্রের ঘোর লেগে আসে। তবে নিজের পুরুষত্বকে দমিয়ে রাখে বাড়তে দেয়না।আর দেরি না করে নক্ষত্র রাতকে শুয়ে দেয় বিছানায়। নক্ষত্র শুয়ে পড়তেই রাতকে টেনে নেয় নিজের বুকে। প্রশস্ত বুকের উষ্ণতায় রাতের কপালটা ঠেকে থাকে। নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে স্থির হয়, কাঁপুনি থামে। আগের ভারী উত্তাপ আর নেই।জ্বর যেন নক্ষত্রের আলিঙ্গনে হার মানে।নক্ষত্র এক হাত দিয়ে রাতের পিঠ আগলে রাখে, অন্য হাতটা চুলে আলতো করে বুলিয়ে দেয়। কোনো কথা নেই যেনো নীরবতাই তখন তাদের ভাষা। রাত গভীর হয়, আলো ম্লান হয়ে আসে। নিঃশব্দ আলিঙ্গনে দুজনেই ঘুমের জগতে হারিয়ে যায় নিরাপদ, শান্ত, ভালোবাসার ভেতর।
চলবে….
