#অসময়ের_বৃষ্টি
#পর্ব_৭
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
জারার কৌতুহলী মন থেমে থাকার নয়। সে স্মৃতির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই, একদম ফাঁকি দিবে না। সত্যি করে বলো তো, কী হয়েছে ভাবি? ভাইয়া কি তোমাকে বকেছে? নাকি কোনো কটু কথা বলেছে?”
স্মৃতি প্রথমে মুখ খুলতেই চাইল না। লজ্জায় আর ভয়ে তার মুখটা আরও ছোট হয়ে গেল। সে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কিন্তু জারা আর সারার একনাগাড়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে সে আর বেশিক্ষণ নিজের ভেতর কথা চেপে রাখতে পারল না। ছলছল নয়নে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“না রে জারা আপা, বকেনি। কিন্তু… কিন্তু উনি কেমন যেন করলেন!”
“কেমন করলেন মানে?”
সারা এবার একটু এগিয়ে এসে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
স্মৃতি চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল মুছে আমতা আমতা করে ছাদে ঘটে যাওয়া সব কথা বলতে লাগল। আফ্রিদির ওভাবে হুট করে জড়িয়ে ধরা এবং ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেওয়ার কথা অত্যন্ত ভয়ার্ত গলায় এক নিশ্বাসে বলে দিল। সবশেষে অত্যন্ত সরলভাবে ফিসফিস করে যোগ করল,
“উনি মনে হয় আমাকে আর ভালো চোখে দেখেন না। কেমন একটা বাজে ব্যবহার করলেন আমার সাথে!”
স্মৃতির মুখে এমন সরল স্বীকারোক্তি শুনে সারা তো লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। হাত দিয়ে সে নিজের মুখ ঢাকল। এদিকে জারা তো প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষণেই আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে বিছানায় হাত চাপড়ে মিটিমিটি করে হাসতে লাগল।
স্মৃতি জারাকে এভাবে হাসতে দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত আর বিরক্ত হলো। তার মনে হলো সে এত বড় একটা বিপদের কথা বলছে, আর জারা তা নিয়ে হাসাহাসি করছে! সে মুখ গোমড়া করে জারাকে একটু ঠেলে দিয়ে বলল,
“তুমি হাসো কেন জারা আপা? আমার এখানে জান যায় যায়, আর তোমরা হাসছ? উনি কি খারাপ কাজ করেননি?”
জারা নিজের হাসিটা কোনোমতে সামলে নিয়ে স্মৃতির কাঁধে হাত রাখল। সে বড় বোনের মতো স্মৃতিকে নিজের আরও কাছে টেনে বসাল।
“পাগলী একটা!”
জারা স্মৃতির চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
“ভাইয়া কোনো খারাপ কাজ করেনি সোনা ভাবী। আর তোমাকে ও অপছন্দও করে না, বরং অনেক ভালোবাসে।”
স্মৃতি বড় বড় চোখ করে তাকাল।
“ভালোবাসলে মানুষ এমন জবরদস্তি করে জড়িয়ে ধরে?”
সারা এবার অন্য দিক ফিরে থেকেই মৃদু হেসে বলল, “জারা, তুই ওকে একটু বুঝিয়ে বল। মেয়েটা তো আসলেই এসবের কিছু বোঝে না।”
জারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে খুব সহজ ভাষায় বলতে শুরু করল,
“শোন স্মৃতি, তুমি এখন আর শুধু একটা ছোট মেয়ে নও। তুমি এই বাড়ির বউ, আর ভাইয়া তোমার নিজের স্বামী। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা অন্য সব সম্পর্কের চেয়ে আলাদা হয়। সেখানে শুধু বকবক আর ঝগড়া থাকে না, একটা অন্যরকম অধিকার আর টানও থাকে। ভাইয়া যখন তোমাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরেছে, সেটা কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থেকে নয়, বা তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যেও নয়। ওটা ছিল ওর ভালোবাসার একটা প্রকাশ।”
জারা স্মৃতির হাতটা নিজের হাতের ওপর রেখে বুঝিয়ে বলল,
“দাম্পত্য জীবন মানে হচ্ছে দুটো মানুষের মন আর শরীরের এক হয়ে যাওয়া। স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসার টানে কাছে টানবে, স্পর্শ করবে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক আর পবিত্র নিয়ম। এতে ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। বরং স্বামী যদি স্ত্রীকে কাছে না টানে, তখনই বুঝে নিতে হয় সম্পর্কে কোথাও কোনো দূরত্ব রয়ে গেছে। ভাইয়া তোমাকে মন থেকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে বলেই আজ তোমাকে অতটা কাছে টেনেছে। বুঝতে পেরেছ এবার?”
জারার মুখে এই প্রথম দাম্পত্য জীবনের এমন সহজ আর গভীর ব্যাখ্যা শুনে স্মৃতি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে আড়চোখে সারার দিকে তাকাল, সারাও মাথা নেড়ে জারাকে সমর্থন জানাল।
স্মৃতি তার কোলের ওপর রাখা কাশ্মীরি চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল– তাহলে কি আফ্রিদি তাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে? সে কি আসলেই কোনো ভুল করেনি? জারার কথাগুলো শুনে স্মৃতির ছোট্ট মনের সব ভীতি এবার কর্পূরের মতো উবে গেল। তার মনে নতুন কৌতূহল উঁকি দিল। তাহলে এই ছুঁয়ে দেখার ভালোবাসা আবার কেমন? এটা কি সে আফ্রিদিকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করবে? স্মৃতি মনে মনে ঠিক করে ফেলল, আজ রাতে রুমে গিয়ে আফ্রিদিকেই একদম সোজাসুজি জিজ্ঞেস করবে সে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে একগাল মিষ্টি হেসে ননদদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা আপা, আমি বুঝতে পেরেছি।”
স্মৃতির হাসি দেখে জারাও হাসল। তবে পরক্ষণেই একটু গম্ভীর হয়ে সাবধান করার গলায় বলল,
“মনে যেন থাকে ভাবি! এরপর থেকে ভাইয়া তোমাকে কাছে টানলে এমন পাগলামি করে কাঁদতে বসবে না কিন্তু। এমন আচরণ করলে কিন্তু পুরুষ মানুষরা কষ্ট পায়। আর পুরুষদের বেশিদিন দূরে রাখলে তারা কিন্তু ঘরের বাইরে নজর দেয়!”
জারার এই কথা শোনা মাত্রই সারা পাশ থেকে প্রতিবাদ করে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে জারার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“তুই একদম বাজে কথা বলবি না জারা! বউ সুযোগ না দিলেই পুরুষ মানুষ বাইরে নজর দেবে এমন কোনো কথা নেই। যারা সত্যি ভালোবাসে আর ব্যক্তিত্ববান, তারা কখনোই এমনটা করে না। আর যারা সামান্য কারণে বাইরে নজর দেয়, তারা আসলে কাপুরুষ আর চরিত্রহীন!”
একটু থামে সারা স্মৃতির দিকে ফিরে নরম গলায় বলল,
“তবে হ্যাঁ ভাবী, স্বামীর হক অবশ্যই স্ত্রীকে আদায় করতে হবে। ইচ্ছে করে তাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা বা অবহেলা করা একদমই ঠিক না। স্বামীর হক আদায় করতে হবে, স্বামীও তার স্ত্রীর হক আদায় করবে। তুমি আজ রাতে ভাইয়ার সাথে একদম খোলামেলা কথা বলিও। নিজের মনের কথা বুঝিয়ে বললে, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সারা আর জারার কথায় স্মৃতি ভরসা খুঁজে পেল। সে চটপট সম্মতি জানিয়ে আলতো করে মাথা দোলাল,
“আচ্ছা আপা, আমি আজই ওনার সাথে কথা বলব।”
ব্যাস, মন হালকা হতেই স্মৃতির মুখের চেনা মিষ্টি হাসিটা আবার ফিরে এল। এবার আর কোনো দ্বিধা না রেখে সে বিছানায় রাখা কাশ্মীরি চুড়িগুলোর দিকে হাত বাড়াল। তিনজনে মিলে নিজেদের পছন্দের রঙের চুড়ি বেছে নেওয়া আর কার হাতে কোনটা বেশি মানাবে তা নিয়ে তুমুল দেখাদেখি আর খুনসুটি শুরু হয়ে গেল।
*
সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত দশটা ছুঁইছুঁই। জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে, বৃষ্টির বেগ কমলেও টিপটিপ শব্দটা এখনো থামেনি।
কিন্তু আফ্রিদি এখনো বাসায় ফেরেনি। সেই সন্ধ্যার বেশ কিছুটা আগে মুখ থমথমে করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে, তারপর আর কোনো খোঁজ নেই। সাধারণত আফ্রিদি এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে না, আর থাকলেও পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিয়ে এতক্ষণে ফিরে আসার কথা।
স্মৃতি ঘরের ভেতর অস্থির হয়ে একনাগাড়ে পায়চারি করছে। তার পরনে জারার দেওয়া নতুন মেরুন রঙের রেশমি কাশ্মীরি চুড়িগুলো, যা একটু নড়াচড়া করলেই রিনরিন করে শব্দ করে উঠছে। আর পরনে মেরুন রঙের একটা শাড়ি। সুন্দর করে চুলগুলো খোঁপা করে দিয়েছে সারা। জারার কথামতো সাজুগুজু করেছে স্মৃতি। পায়চারি করতে করতে ওর চোখ দুটো বারবার দরজার দিকে আর দেয়াল ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছে।
স্মৃতির মনের ভেতর অদ্ভুত ভয় আর অপরাধবোধ জাঁকিয়ে বসেছে। সে বিছানার কোণে গিয়ে বসছে, আবার উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিকেলে ছাদে অমন অবুঝের মতো আচরণ করার পর থেকে আফ্রিদির থমকে যাওয়া চেহারাটা তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে।
স্মৃতি কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে ভাবল, “লোকটা কি তবে সত্যিই আমার ওপর অনেক রাগ করল? জারা আপা যে বলল দূরে রাখলে পুরুষ মানুষ বাইরে নজর দেয়… উনি কি রাগ করে অন্য কোথাও চলে গেলেন?”
দাম্পত্য জীবনের মানে বোঝার পর এখন আফ্রিদির প্রতি স্মৃতির মনের অনুভূতিটা হয়তো বদলে যাচ্ছে। ভয়টা কেটে গিয়ে সেখানে এখন কাজ করছে এক তীব্র ব্যাকুলতা। সে বুঝতে পারছে না কী করবে। ফোন করে যে জিজ্ঞেস করবে, সেই সাহসও তার হচ্ছে না। লোকটা কি সত্যি রাগ করে বাইরে বসে আছে?, মেয়েটা শুধু চাতক পাখির মতো আফ্রিদির ঘরে ফেরার পায়ের আওয়াজটুকু শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
রাত তখন সাড়ে দশটা। হঠাৎ দরজার লক খোলার মৃদু আওয়াজ হলো। স্মৃতি চট করে দরজার দিকে তাকাল। আফ্রিদি রুমে ঢুকছে। চেহারায় ক্লান্তির চেয়েও বেশি এক বিষণ্ণতা। আসলে বিকেলের পর থেকে তার মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। স্মৃতির ওই কান্নাভেজা ভয়ার্ত মুখটা কোনোভাবেই মাথা থেকে সরাতে পারছিল না সে। তীব্র অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছিল তার। সব মিলিয়ে মনের ছটফটানি আর ভারী ভাবটা একটু হালকা করতেই সে সন্ধ্যার আগে হুট করে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় হেঁটেও মন শান্ত হয়নি, তাই এক বুক দ্বিধা নিয়েই ঘরে ফিরেছে।
কিন্তু রুমে পা রাখতেই আফ্রিদি অবাক হয়ে দেখল স্মৃতি খাটের কোণে বসে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। বরং সেজেগুজে বসে আছে, যা অন্য কখনো দেখা যায় না। শুধু তা-ই নয়, আফ্রিদিকে রুমে ঢুকতে দেখেই স্মৃতির মুখে কোনো রাগ বা ভয়ের চিহ্ন দেখা গেল না। উল্টো সে এক গাল মিষ্টি হেসে চঞ্চল গলায় বলে উঠল,
“আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”
স্মৃতির চঞ্চল কণ্ঠ আর হাসিমুখ দেখে আফ্রিদির বুকের ওপর থেকে যেন এক মস্ত বড় পাথর নেমে গেল। তার ঠোঁটের কোণেও অবচেতনভাবেই এক চিলতে স্বস্তির মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের পেছনের হাতটা সামনে এনে স্মৃতির দিকে কতগুলো সিল্কি ক্যাটবেরি চকলেট আর দুটো টকটকে লাল গোলাপ ফুল বাড়িয়ে দিল। শান্ত গলায় বলল,
“বাইরে ছিলাম। নাও,তোমার জন্য।”
ফুল আর প্রিয় চকলেটগুলো হাত বাড়িয়ে একসাথেই লুফে নিল স্মৃতি। তার চোখের তারা দুটো খুশিতে একদম চকচক করে উঠল। লাল গোলাপ দুটোর সুবাস নিয়ে আর চকলেটের প্যাকেটগুলো ওলটপালট করে দেখে সে মনে মনে মহাখুশি।
কিন্তু খুশির রেশ কাটতে না কাটতেই স্মৃতি হুট করে ফুল আর চকলেটগুলো বিছানায় রাখল। তারপর একদম সোজাসুজি আফ্রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করে বসল,
“আচ্ছা, দাম্পত্য জীবন কী?”
স্মৃতির মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আফ্রিদি একদম থতমত খেয়ে গেল! সে যেখানে ভাবছিল স্মৃতি হয়তো বিকেলের ঘটনার জন্য তার সাথে কথাই বলবে না, সেখানে মেয়েটা কিনা এমন একটা জটিল আর স্পর্শকাতর প্রশ্ন করে বসে আছে! আফ্রিদির মুখের কথা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল, সে চোখ বড় বড় করে স্মৃতির দিকে তাকিয়ে রইল।
চলবে….
