#ব্যাকবেঞ্চার (৫)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
বেশ কয়েক মাস কেটে যায়,
ফারিশের হতাশা দূর হয় না। তার ঘরে তার বিন্দু পরিমান দাম নেই। হতাশায় ফারিশের মাঝে মাঝে আফসোস হয়। এমন এক পরিবারে তার জন্ম নাহলে পারতো।
ফারিশের বাবা সম্মান, প্রতিপত্তি, স্ট্যাটাস নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন যে তার কাছে সন্তানের মূল্যই নেই। এমন এক পরিবারে জন্ম নিয়ে ফারিশের আফসোস হবে না কেন? তার ভীষণ আফসোস হয়। বিধাতা তাকে কোন গরিব পরিবারে জন্ম দিলেই পারতো। সেখানে হয়তো এতটা স্ট্যাটাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতো না বাবা। গরিব বাবা হয়তো তার ব্যর্থতায় কষ্ট পেতো। তাকে বকা দিতো। কিন্তু তার মান যেতো না। তাকে কেউ সন্তানদের জন্য হয়তো কথা শোনাতো না। তার বাবারও এতটা চিন্তা থাকতো না।
এগুলো ফারিশের ভাবনা। তার অবুঝ মনটা এমনভাবে বিষিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তার মন সবসময় এগুলোই ভাবে। তবে গত দু’দিন ধরে ফারিশ খুব খুশি। তার হতাশা কিছুটা কমে গিয়েছে। খুব শীঘ্রই তার বোন আসতে চলেছে। বোনের আগমনের আনন্দে, ফারিশের ছোট হৃদয়টা খুশি হয়ে যায়। ফারাজ এবং সে ভীষণ খুশি। তারা বোনকে স্বাগতম জানানোর জন্য সুন্দর করে তাদের ঘরটা সাজায়। যাতে এই ঘরে এসে তার বোন বিরক্ত না হয়।
___
দিনটি ছিলো সোমবার।
ফারিশের ছোট এক বোনের জন্ম হয়। হাসপাতাল থেকে তার বোনকে নিয়ে বাবা-মা বাসায় ফিরতে সে খুশিমনে বের হয়। নিজের ছোট বোনকে আদর করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। কোলে নেওয়ার জন্য বায়না ধরে। তার মা বারণ করে। সে বলে,“এখন নয়। পরে নিও।”
“না না। আমি বনুকে এখনই কোলে নিবো। প্লীজ আম্মু। দাও বনুকে। আমি একটু কোলে নিয়ে আদর করি।”
“পরে।”
না মায়ের কথা শোনে না ফারিশ। সে অনুরোধ করতেই থাকে। পুরো এক অনুরোধের ঝুলি নিয়ে বসে পড়ে। এই অনুরোধ মা ফেরাতে পারে না। তাই দেয় ফারিশের কোলে। ফারিশ তার বোনকে কোলে নিয়ে খুব খুশি হয়। তার ছোট বোনটির নাকে নাক ঘষে বলে,“আমিও বড় ভাই হয়ে গেলাম।”
ফারাজ পাশে ছিলো। সে ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“হ্যাঁ। দায়িত্ব বেড়ে গিয়েছে তোর।”
“হ্যাঁ জানি। আর আমি সব দায়িত্ব পালণও করবো।”
ফারিশের এসব কথার মাঝে তার বাবা আসে। সে নিচে গাড়ি পার্কিং করে এলো। মেয়েকে ফারিশের কোলে দেখেই রেগে যায়। কিছুটা ধমক দিয়ে বলে,“তুমি বাচ্চাকে কোলে নিয়েছো কেন? তোমার কোলে কে দিলো?”
সবাই চমকে যায়। বাবা কিছুটা জোর করে ফারিশের কোল থেকে মেয়েকে নেয়। অতঃপর বলে,“আমার মেয়ের আশেপাশে যেন না দেখি। তোমার মতো অপদার্থের সংস্পর্শে থাকলে আমার মেয়েটাও অপদার্থ হবে। ও আমার একমাত্র মেয়ে। আমি চাই না, আমার মেয়ে খারাপ হোক।”
“তুমি…।”
মা কিছু একটা বলতে চায়। তবে তাকে বলার সুযোগ দেয় না বাবা। সে মাকে থামিয়ে বলে,“নেক্সট টাইম আমি যেন ফারিশকে মেয়ের আসেপাশে না দেখি। ওর কাছ থেকে দূরে রাখবে। এটা মনে রেখো। আমি যদি ফারিশকে দেখি তবে সেদিনই ও ঘর ছাড়া হবে।”
“তুমি তোমার ছেলেকে ঘরছাড়া করবে?”
মা কিছুটা দুঃখ নিয়েই বলে। ফারিশের বাবা বলে,“আমি তো ফারিশকে আমার সন্তানই মনে করি না। যদি মনে করতাম তবে তো তার কাছ থেকে কিছু আশা রাখতাম। এখন কোন আশা রাখি না। কারণ সে আমার জন্য আমার সন্তান নয়।”
সদ্য নতুন মা হয়েছে ফারিশের মা। সে তার সংসারে আর ঝামেলা চায় না। তাই চুপ করে যায়। এদিকে ফারিশ অসহয় চোখে বাবা, মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে পড়ালেখায় ভালো নয়, এটা এতবড় অপরাধ যে সে তার বোনের পাশেও থাকতে পারবে না। এতটাই বড় অপরাধ।
____
সময় তার মতো চলে যায়। কিন্তু ফারিশের জীবনের কোন পরিবর্তন হয় না। সে শত চেষ্টা করেও বাবার প্রিয় হতে পারে না। ভাই হিসাবে ভালো হতে চায় তাও পারে না। বোনের সঙ্গে দেখা করতে হয় লুকিয়ে। তাকে নিয়ে খেলতে হয় ভয়ে ভয়ে। এই বুঝি বাবা এসে গেলো, এই ভয়ে ভালোভাবে খেলাও জমে না। সব মিলিয়ে ফারিশ একেবারে ভেঙে পড়ে। এখন তার চেষ্টা করতেও ইচ্ছা করে না। তার চেষ্টটা তো কারো নজরে পড়ে না। তবে চেষ্টা করে লাভ।
এক কথায়, ফারিশের মনটা ভেঙে গেছে। সবকিছু থেকে তার মন উঠে গেছে। তার এখন কিছুই ভালো লাগে না। ফারাজ তার ভাইয়ের মন বুঝতে পারে। সে চেষ্টা করে মন ভালো করার। কিন্তু হয় না। এটা হওয়ার? তাই এই বছর ফারাজ একটা বড় সিদ্ধান্ত নেয়। তার ধারণা তার জন্য তার বাবা তার ভাইয়ের পরিশ্রম দেখতে পারছে না। সে এত ভালো না করলে তার ভাই তার বাবার নজরে পড়বে। হয়তো কম বকা শুনবে। তাই সে এবার জেনেশুনে খারাপ করে। টপার থেকে নিচে নেমে যায়।
ফারাজ তার ভাইয়ের ভালোর জন্য এটা করছিলো। কিন্তু না। এটায় তার ভাইয়ের ভালো হয় নাই। বরং হিতে বিপরীত হয়। তার বাবার কাছে যখন ফারাজের রেজাল্ট কার্ড আসে সে হতভম্ব হয়ে যায়। তার ছেলে প্রথমবার টপার থেকে দূরে সরে গিয়েছে। এটা সে মানতেই পারছে না। ফারাজ মনেমনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বকা শোনার। কিন্তু না। সে বকা শোনেনি। বরং তার বাবা সরাসরি গিয়ে ফারিশের গালে কয়েকটা লাগিয়ে দেয়। ফারিশ হতভম্ব হয়ে বাবার দিকে তাকায়। বাবা রাগান্বিত গলায় বলে,“সব তোর জন্য হয়েছে। তোর মতো অপদার্থের জন্য। তুই সবসময় ফারাজকে নিয়ে খেলতে যাস, বোনকে দেখার ছুতোয় ফারাজকে তার ঘরে পাঠাস। তোর জন্য ও ঠিকভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেনি। তোকে বলছিলাম না, আমার ছেলে মেয়েদের থেকে দূরে থাকতে। কেন কথা শুনিসনি? নিজে তো মূর্খ হয়েছিস এখন আমার ছেলেটাকেও বানানোর ধান্দা?”
মা চিৎকার শুনে এগিয়ে আসে। সে এসে ঘটনা বোঝার আগে বাবা ফারিশকে আরও কয়েকটা দেয়। এক পর্যায়ে তো লাথিই বসিয়ে দেয়। সে কঠিন গলায় বলে,“তুই হিংসে করে ওর পড়ালেখার সময় ডিস্টার্ব করতি, তাই না? মানুষ ফারাজকে ভালো বলে, তা সহ্য হয়নি? হিংসা করতি?”
বাবা ইচ্ছামতো ফারিশকে বকে। ফারিশের চোখ দিয়ে পানি গড়গড় করে পড়ে। তা দেখে মায়া হয় না। আজ বাবা অন্য দিনের থেকে বেশি রেগে যায়। এতটাই রাগ যে মাও ভয় পায়। সে চুপ হয়ে থাকে। ফারাজ পুরো ঘটনায় খুব ভেঙে পড়ে। সে তো ভালোর জন্য এটা করছিলো। কিন্তু এটা খারাপ হয়ে গেলো।
সেদিন ফারিশ এত বেশি কষ্ট পায় যে সে নিজেই বড় ভাইয়ের থেকে দূরত্ব তৈরি করে নেয়। সে তার ঘর আলাদা করে নেয়। তার বাবাও এটা চায়। তারা আলাদা থাকলেই খুশি। মাও কোন কথা বলতে পারে না। কারণ মাও বিরক্ত। নিত্য নতুন এই ঝগড়া অশান্তি তার ভালো লাগছে না।
ফারিশ বাবার মার খেয়ে যতটা না কষ্ট পেয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট পেয়েছে তখন যখন দেখেছে বাবার বন্ধুরা ফোন দিয়ে ফারাজের খবর জেনে যখন বলছে,“ছেলেটা তো ভালো ছিলো। হঠাৎ এত খারাপ করলো?পড়ালেখায় এখন আর মন নাই?”
“না না। তা নয়। ফারাজ খুব মনোযোগী। খুব ভালো। এবার একটু খারাপ করেছে। ওটা কোন সমস্যা না। সামনে আরও ভালো করবে। তাছাড়া একবার একটু খারাপ করলে কি বা এসে যায়। এক্সামের রেজাল্টই তো সব নয়। ভবিষ্যতে কে কোথায় যেতে পারে সেটাই আসল।”
ফারিশ লক্ষ্য করে বাবা খুব হাসিমুখে বলে। এটা শুনে সে বেশি কষ্ট পায়। তার বাবাও জানে একটা পরীক্ষার ফলাফল একটা জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। না ভবিষ্যতের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ। সব জেনে বুঝে তার বাবা তাকে কথা শোনায়। তার বাবা তাকে কখনো বুঝতে চায় না। কিছুতেই না। সে কখনো বোঝার চেষ্টাটা করতে চায় না। অথচ সে তার মন জয় করার জন্য সবসময় চেষ্টা করেছে। তার প্রিয় হতে চেয়েছে। ফারিশ এবার বুঝতে পারে, ভুল মানুষের প্রিয় হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগে লাভ নাই। এটায় বরাবরই ফলাফল শূন্য হবে। জীবনের এই সহজ সমীকরণ ফারিশ বুঝতে পারছিলো না। আজ পারলো।
___
ফারিশ মন থেকে পাথর হয়ে যায়। এখন আর কারো জন্য মন পোড়ে না। পুড়লেও দেখা দেয় না। সে একদম শান্ত হয়ে যায়। কারো সাথে কথা বলে না, কারো কাছে কিছু বায়না করে না। সবসময় একা একা থাকে। এই একা থাকার সিদ্ধান্ত সে একদিনে নেয়নি। সবার কাছে থেকেও দূরে থাকার সিদ্ধান্ত সে এক মূহুর্তে নেয়নি। এটা ধীরে ধীরে নিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেদিন যেদিন তার মা তাকে বলেছে,“তুমি কোন কথা বুঝতে পারো না? সবসময় কেন ভুল করো? তোমাকে এতবার বলা হয়েছে ওর কাছে এসো না তাও আসো। কেন? তুমি বুঝতে পারছো না, তোমার জন্য আমার বিবাহিত জীবনটাও নষ্ট হচ্ছে। তোমার জন্য আমার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। তুমি দ্বায়ী। সবকিছুর জন্য তুমি দ্বায়ী।”
সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সবার মাঝে থেকেও একা থাকার। সেদিন সে তার বোনকে বাঁচাতে গিয়ে এটা হলো। তার ছোট বোন বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলো। কাজের মেয়ে অসাবধানবসত বাচ্চাকে বিছানায় শুয়ে রেখে গেছিলো, পাশে কোল বালিশ রেখে যায়নি। আর মেয়েটা ঘুমের মাঝে একা একা নড়তে নড়তে কিনারায় চলে আসে। ভাগ্যিস তখন ফারিশ এসেছিলো। নয়তো আর একবার নড়লেই মেয়েটা পড়ে যেতো। তার আগে ফারিশ এসেছিলো। সে তার বোনকে ঠিকভাবে শুইয়ে দেয়। এটা এসে তার বাবা দেখে। তার ধরার জন্য বাচ্চাটা জেগে উঠে। স্বাভাবিকভাবেই কেঁদে ওঠে। এটা হলো সমস্যা। তার বাবা শুধু তার জন্য মেয়ে কাঁদছে দেখছে, মেয়ে যে সে না আসলে পড়ে যেতো তা দেখেনি। সেটা নিয়েই তার বাবা ফারিশের গায়ে আবার হাত তোলে। এটা নিয়ে তার বাবা, মায়ের আবারও ঝগড়া হয়। এসব ঝামেলায় বিরক্ত হয়ে তার মা তাকে উপরোক্ত কথাগুলো বলে। ঐ কথা যে তার হৃদয়ে কত আঘাত করেছে সেটা বোঝার চেষ্টা করেনি। শুধু তাই নয়, এরপর থেকে তার মায়ও কখনো তার মন বোঝার চেষ্টা করেনি। সেও সবকিছুতে তার দোষ ধরা শুরু করে। অতঃপর ফারিশ শান্ত হয়ে যায়। সবার মাঝে একা বাঁচতে শুরু করে। তার ছোটবেলাটা এতটা যন্ত্রণায় কাটে। সেই যন্ত্রণা আজও দূর হয়নি। কখনো হওয়ার কথা না।
’
’
চলবে,
(ভুলক্রুটি ক্ষমা করবেন।)
