#ব্যাকবেঞ্চার (৪)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
ফারিশদের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পায়। ফারিশ খুব খুশি হয়। কারণ এই প্রথম সে এত চেষ্টা করার ফল পেয়েছে। সব বিষয়ে পাশ করেছে। খুব কষ্টে পাশ মার্ক তুলেছে। প্রতিবার তো বেশিরভাগ বিষয়ে ফেল করে। এবার পাশ করায় খুব খুশি হয়। ফারিশের মনে আশা জাগে। আজ পাশ হয়েছে, কাল ভালো ফলাফল হবে। ফারিশের মা রেজাল্ট কার্ড হাতে পেয়ে খুব খুশি হয়, সে ফারিশকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। খুব আদর করে। গর্বিত হয়ে বলে,“আমার বাচ্চা অনেক চেষ্টা করেছে, তাই তো ভালো করেছে। আমার বাচ্চা খুব মনোযোগী।”
তবে ফারিশের এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তার বাবা এটা শুনে খুশি হয়। বরং এবারও তার উপর রাগ করে। সে কিছুটা রাগান্বিত গলায় বলে,“সারারাত তো ঘরের লাইট জ্বালানো দেখি, পড়া হয় নাকি শুধুই ফাঁকিবাজি? এত পড়া হলে তো ভালো রেজাল্ট করতো। এভাবে টেনেটুনে পাশ আসতো না। গর্দভ, অপদার্থ পালি।”
ফারিশের মুখটা শুকিয়ে যায়। তার বাবাকে খুশিতে তো করা যায় না বরং এতই বিরক্ত হয় যে সে ছোট বাচ্চার কাজে বিলের টাকার পরিমান তুলে ধরে। সারাদিন যে বিদ্যুৎ সে অপচয় করে এত বিল বানিয়েছে। তার পিছনে মাসে মাসে কত খরচ হয় তা বলতে থাকে। এসব দেখে মা কথা বলতে নিলে, তাদের মাঝে আবারও ঝগড়া হয়। মা অনেক কষ্ট পেয়েই বলে,“ছেলেটা চেষ্টা করে এতটুকু পেরেছে, কোথায় তাকে একটু অনুপ্রেরণা দিবে তা না করে এসব বলছো? সত্যি বলতে, তোমার ফারিশকে নিয়েই সমস্যা। তার রেজাল্ট না। যদি তাই হতো তাহলে তুমি দেখতে, সে কতটা ভালো করেছে।”
ব্যাস। এটা নিয়ে শুরু হয় তর্ক। খুব বিশ্রী রকমের তর্ক। এক পর্যায়ে বাবা বলে,“এই ছেলের জন্য যদি এতই মায়া তবে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। থাকো তাকে নিয়ে।”
“তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলছো?”
ফারিশের মা কষ্ট পেয়ে বলে। তার বাবা এক বাক্যে ‘হ্যাঁ’ বলে। ফারিশের মা আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের মধ্যে চলে যায়। সে আজ ভীষণ রেগে গিয়েছে। এবার সে সত্যি তার ছেলেকে নিয়ে চলে যাবে। এতটুকু বাচ্চার মনটা বিষিয়ে দিচ্ছে, মিথ্যে দাম্ভিকতায়। থাকবে না সে। এর মাঝে ফারাজও তার রেজাল্ট নিয়ে আসে। সে বরাবরের মতোই ভালো করেছে। তার বাবা তাকে আদর করে দেয়। তবে এতক্ষণে ফারাজ বুঝে যায়, তার বাবা-মায়ের আবার ঝগড়া হয়েছে। এই বিষয়টা তার মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে। খুবই বাজে প্রভাব।
____
ফারিশের মা তাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিলো, সেই সময়ে ফারাজ এসে দাঁড়ায়। সে অসহয় চোখে মায়ের দিকে তাকায়। তার মা এটা দেখে বলে,“তুমিও তৈরি হও ফারাজ। আমরা এখন বের হচ্ছি।”
তাদের বাবা বসার ঘরেই ছিলো। এটা শুনে রেগে যায়। খুব রাগান্বিত গলায় বলে,“ও যাবে কেন? যাবে তোমরা, ও যাবে না। ও আমার ছেলে। আমার সঙ্গে থাকবে।”
”ও তোমার একার সন্তান নয়। আর আমার মনে হয় তোমার সঙ্গে থাকলে ওর মানসিকতা নষ্ট হয়ে যাবে। আমি মা হয়ে ছেলের ক্ষতি তো চাইতে পারি না। তাই আমি ওকে নিয়ে যাবো।”
ব্যাস। দু’জনের মাঝে আবার শুরু হলো। এসবের মাঝে ফারিশ লক্ষ্য করে, তার বাবা ফারাজকে নিজের কাছে রাখতে কত মরিয়া। এটা তার সন্তান। সে তাকে ছাড়বে না। মাকে তো সে যেতে বলেনি। ফারিশের প্রতি এত মায়া দেখায় বলেই তো বলে। এছাড়া সেও থাকতে পারে। ফারিশ তার বাবার নিজের প্রতি এত ঘৃণা আর সহ্য করতে পারে না। আবারও তার মধ্যে আত্ম হত্যা করার প্রবণতা বেড়ে উঠে। তার মনে হয়, সে শেষ হলেই সব শেষ। সব সুন্দর হবে।
ফারিশ আবার ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু হয় না। এবারও সে এটা করতে পারে না। তার মাঝে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে যায়। এটা দেখে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে যায়। তাদের বাবা ডাক্তার ডাকার জন্য ফোন দিতে নেয়। মা থামায়। সে নিজেও ডাক্তার। তাছাড়া সে জানে, এটা কেন হচ্ছে? এই সময়ে এমন হয়। ফারিশের বাবা অবাক হয়ে বলে,“এই সময়?”
“আমি আবার মা হতে চলেছি।”
মায়ের মুখে এই কথা শুনে বাবা কয়েক মূহুর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে যায়। যদিও তারা বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা করেনি। তবে অখুশি হয় না। তারা দু’জনেই খুশি হয়। ফারাজ, ফারিশও তাদের আর একজন ভাই/ বোন আসবে শুনে খুশি হয়। ফারিশের অবুঝ হৃদয় হঠাৎ চায়, তার অনাগত ভাই বোনের মুখটা দেখতে। সেটা দেখেই নাহয় সে সব শেষ করবে। বড় ভাই হিসাবে দেখা উচিত তো। তার বন্ধু জনির ভাই হয়েছে। এখন সে বড় হওয়া কত দায়িত্ব পালণ করছে। সবসময় এসে গল্প করে। তারও তো দায়িত্ব রয়েছে।সেটা পালণ না করে ম রবে না। এবারের মতো মৃ ত্যুর সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে দেয় ফারিশ।
____
নতুন বছর শুরু হয়। নতুন ক্লাসরুম। নতুন বই। সব মিলিয়ে অন্যরকম আনন্দ। তবে ফারিশের তেমন আনন্দ হচ্ছে না। তার ফালফল যে এবারও ভালো হয়নি। তার বাবা খুশি নয়। ঘরে শান্তি নেই। তার জন্য বাবা, মায়েরও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। যদিও নতুন বাচ্চার জন্য বাবা একটু ভালো আচরণ করছে। মাও ফারিশের বিষয় না তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা করলে যেহেতু ঝামেলা তৈরি হয়, তাই। এই সব বিষয় নিয়ে ফারিশ হতাশায় ডুবে রয়েছে। তার মাঝে কোন আনন্দ নেই। আজ নতুন বই হাতে পেয়ে সবাই কত খুশি? আর তার বাবা তাকে ভর্তি করাতে যে টাকা দিতে হয়েছে, সেটা দিতে গিয়ে কত কথা শুনিয়েছে? সেজন্য নতুন ক্লাসে ভর্তি হয়ে, নতুন বই পেয়েও তার খুশি লাগছে না।
হঠাৎ ফারিশের নজরে যায় তার বন্ধু জামির দিকে। এই ছেলেটাও তার মতো খারাপ ছাত্র। এবারও পাশ করতে পারেনি দুই বিষয়ে। তার বাবা, মা অনুরোধ করে নতুন ক্লাসে তুলে। সেও নতুন বই পেয়ে কত খুশি? এটা দেখে ফারিশ তার কাছে যায়। শান্ত গলায় বলে,“এত খুশি যে? তুই তো পাশ করিসনি এবারও? তাও এত খুশি?”
“হ্যাঁ। কারণ আমি আগের চেয়ে ভালো করেছি। আগে তো অনেক বিষয়ে ফেল করতাম। এবার মাত্র দুইটা। আমার আব্বু এজন্য খুশি হয়ে আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছে।”
“কি!”
ফারিশ অবাক হয়ে যায়। সে ফেল করার পরও তাকে সাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছে। সত্যি তাই। ফারিশ ঘটনা জানতে চায়। জামি হাসি মুখে বলে,“এবার তোর সঙ্গে একত্রে পড়লাম। তারপর বাসায়ও অনেক পড়ালেখা করেছি। আব্বু আম্মু তো সব দেখেছে। আম্মু তো রাত জেগে আমার কি কি লাগবে, ক্ষুধা লাগছে কি-না তাও দেখেছে। তারপর আমি যখন রেজাল্ট নিতে আসি তখন দুঃখী ছিলাম। আমার এবারও পাশ আসবে না জানতাম। তাই কষ্টে ছিলাম। তখন আমার আব্বু আমাকে সাহস দেয়। সে বলে, তুমি অনেক চেষ্টা করেছো। তোমার এই চেষ্টাটাই অনেক। আজ যা হয় হোক। আগামীতে এভাবেই চেষ্টা করো, একদিন সফল হবে। তুই জানিশ, আমি রেজাল্ট হাতে পেয়ে কান্না করায় আমার বাবা-মা বকেছে। এতে কাঁদার কি আছে? একটা রেজাল্ট সব ঠিক করতে পারে না। ভবিষ্যত তো নয়। আমার আব্বু, আম্মু আমাকে এত ভরসা দিয়েছে যে এখন আমি খুব খুশি। ফেল করেও খুশি। আমি তো চেষ্টা করেছি। চেষ্টা অনুযায়ী ফল পেয়েছি। এটাই অনেক।”
জামির মুখের মিষ্টি হাসিটা ফারিশের মন কাড়ে। হঠাৎ হিংসে লাগে। তার ভাগ্য দেখে হিংসেই লাগে। এটাই তো চায় তারা। একটুখানি ভরসা। অথচ তার ঘরে চলছে যুদ্ধ। এদিকে জামির বাবা-মা সন্তানের খুশি দেখছে। যেটা জামিকে আগামীতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। জামি তো হাসি মুখে বলে,“তুই দেখিস আমি আগামী বছর খুব ভালো রেজাল্ট করবো। চেষ্টায় আছি ১-৩ রোলে থাকার।”
“তুই সফল হ। এটাই দোয়া করি।”
ফারিশ ম্লান হেসে কথাটা বলে। অতঃপর মনমরা হয়ে বই নিয়ে বাড়ি ফেরে। যাবার সময় জামি জনিদের দেখে। যাদের সঙ্গে আজ তাদের বাবা, মা এসেছে। যারা শিক্ষকদের কাছে, নিজের ছেলেদের পড়ায় মনোযোগী হওয়ার গল্প করছে। অথচ তার বাবা-মায়ের স্কুলে আসার সময় নাই। তার সঙ্গ দেওয়ার সময় নেই। ফারিশ কষ্ট মনে নিয়েই বাড়ি ফেরে।
’
’
চলবে,
