#অসময়ের_বৃষ্টি
#পর্ব_৩
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
আফ্রিদি সাফোয়ানের দিকে একটা বালিশ ছুড়ে মারল। তারপর খানিকটা নিচু আর বিষণ্ণ গলায় বলল,
“রাহিকে আমি নিজে সব সত্যি কথা খুলে বলব। তাছাড়া আমি এমনিতেই বেকার বলে রাহির ফ্যামিলিতে অনেক সমস্যা ছিল। এটা খুব স্বাভাবিক, ওর পরিবার মেয়ের জন্য ভালো, প্রতিষ্ঠিত ছেলে চায়। তার ওপর এখন যদি এই বিয়ের কথা শোনে…”
কথাটা শেষ না করেই আফ্রিদি চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ করেই একরাশ বিষাদ এসে ভর করল ওর চেনা রুক্ষ চেহারায়। দুই বছরের প্রেম, আর রাহির সাথে পরিচয় তো প্রায় চার-পাঁচ বছরের। চাইলেই কি মন থেকে এত সহজে সবকিছু মুছে ফেলা সম্ভব? কিন্তু পরিস্থিতি যে আজ সব ওলটপালট করে দিয়েছে! এই মুহূর্তে আফ্রিদি এক তীব্র মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরের নৈতিকতা আর আল্লাহর কালাম সাক্ষী রেখে করা বিয়েটা তাকে বিবাহিত স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধা দিচ্ছে, অথচ বুকের ভেতরের প্রেম তাকে রাহিকে চিরতরে হারানোর ভয় দেখাচ্ছে।
দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলল আফ্রিদি। সাফোয়ান হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বুঝতে পারছি, তুই খুব টেনশনে আছিস। কিন্তু ভাই, তুই ওখান থেকে এভাবে রাগ করে চলে এলি কেন? মাত্রই তো বললি বউ ছাড়বি না, তাহলে আবার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার কী দরকার ছিল?”
আফ্রিদি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। আড়মোড়া ভেঙে ক্লান্ত গলায় বলল,
“তখন মেজাজ প্রচণ্ড গরম ছিল। এখন যে ঠান্ডা হয়েছে, তা নয়। তবে সবকিছুর মধ্যে এটুকু বুঝতে পারছি আমাদের কারোরই কোনো দোষ নেই, সবটাই কপাল! নয়তো আমার সাথেই কেন এমন হবে? তোর সাথে হলেও তো পারত!”
শেষের কথাটা শুনে সাফোয়ানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল,
“তোর মতো বন্ধু যার থাকে, তার জীবনে আর শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না!”
একটু থেমে সে রসিকতা করে আবার বলল,
“যদিও আমি এখনো সিঙ্গেল, হুট করে এমন একটা বিয়ে হয়ে গেলেও আমার কোনো সমস্যা ছিল না।”
আফ্রিদি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ঠোঁটের কোণে গুঁজল। এরপর ইশারায় সাফোয়ানকে জিজ্ঞেস করল,লাইটারটা কোথায়? সাফোয়ান মৃদু হেসে বেডসাইড টেবিলের ওপরে রাখা লাইটারটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“আমার বাপটা হলো দুনিয়ার চালাক লোক। আমি বিয়ে করব না শোনা মাত্রই ত্যাজ্যপুত্র করার ভয় দেখাল।”
সিগারেট ধরাতে ধরাতে ক্ষোভ উগরে দিল আফ্রিদি।
সাফোয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“আর তুইও বাপের ত্যাজ্যপুত্রের ভয়ে সুড়সুড় করে বিয়ে করে নিলি!”
“পরিস্থিতি ওমনই ছিল।”
“এবার একটা চাকরি-বাকরি কর, মামা। নিজে কিছু একটা করলে অন্তত অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর এভাবে বসে থাকতে হবে না।”
“জ্ঞান মারাবি না তো, বাল!”
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বিরক্ত হয়ে বলল আফ্রিদি।
ঠিক তখনই ওর ফোনটা পকেটে কেঁপে উঠল। ভাইব্রেট হওয়ার শব্দে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল স্ক্রিনে মায়ের নম্বর ভাসছে। আফ্রিদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কলটা রিসিভ করবে কি না, সেই সংশয়ে কেটে গেল কয়েক সেকেন্ড।
“কল রিসিভ করছিস না কেন?” সাফোয়ান জানতে চাইল।
“মা কল করেছে।”
“হ্যাঁ, তো কথা বল!”
এরই মধ্যে ওপাশ থেকে কলটা কেটে গেল। আফ্রিদি আর দেরি না করে নিজেই কল ব্যাক করল। ওপাশ থেকে প্রথম রিংয়েই দ্রুত রিসিভ হলো কল।
“আফ্রিদি, তুই কোথায় আছিস? দ্রুত বাসায় আয়। আমরা ঢাকা পৌঁছে গেছি।”
ওপাশ থেকে শারমিন খন্দকারের ব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
“আসছি।”
এতটুকু বলেই কলটা কেটে দিল আফ্রিদি।
সাফোয়ান বলল,
“যা, বাসায় যা। পরে কল করে জানাস কী হলো।”
আফ্রিদি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“কেন রে? ওখানে কি কোনো রঙতামাশা হবে যে তোকে লাইভ শোনানো লাগবে?”
বিরক্তিতে একটা চ-জাতীয় শব্দ উচ্চারণ করে সাফোয়ান বলল,
“তুই এত ত্যাড়া কেন রে ভাই! সোজা কথা সোজাভাবে নিতে পারিস না কোনোদিন!”
আফ্রিদি দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“গেলাম।”
তারপর সে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল। সাফোয়ান আর নতুন করে কিছু বলার সুযোগ পেল না।
**
দুপুরের পরপরই ঢাকায় এসে পৌঁছেছে স্মৃতি। নতুন জায়গা, নতুন বাড়ি, চারপাশের মানুষগুলোও একদম নতুন। সব মিলিয়ে মেয়েটার কাছে এখন সবকিছু রূপকথার স্বপ্নের মতো লাগছে। ঢাকায় পা রাখতেই শাশুড়ি তাকে কত ভালোমন্দ খেতে দিয়েছেন! এত পদের সুস্বাদু খাবার তো সে তার পুরো জীবনেও কোনোদিন চোখে দেখেনি। মনে মনে ভাবল, মামা সত্যিই বলেছিলেন–বিয়ে হওয়ার পর স্মৃতির সব দুঃখ ঘুচে যাবে।
শারমিন আফ্রিদির রুমেই স্মৃতিকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখন শেষের পথে। বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে, সাথে বইছে কনকনে ঝড়ো হাওয়া। আবহাওয়া মোটেও সুবিধার নয়। তবে স্মৃতির মনে অন্যরকম এক বসন্তের আনন্দ। সে কখনো আগে এমন ইট-পাথরের বড় বড় দালানকোঠা দেখেনি, এমন রাজকীয় বাড়িতে পা রাখাও ছিল তার কল্পনার বাইরে। আফ্রিদির রুমটাও ওর কাছে আলাদিনের চেরাগের মতো রহস্যময় ঠেকছে। রাজকীয় খাটের পাশে সুন্দর একটা টেবিল, আর তার ওপরে অদ্ভুত দেখতে একটা ল্যাম্প বাতি। ওটাকে কীভাবে জ্বালাতে হয় স্মৃতি জানে না, তবে দূর থেকে দেখতে ভারী চমৎকার লাগে।
তবে রুমটা বড্ড অগোছালো। চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো জিনিসপত্র। সেগুলোর দিকে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল স্মৃতি। মেয়েটার পরনে এখন একখানা কলাপাতা রঙের মসলিন শাড়ি, লম্বা চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করা। ডাগর ডাগর চোখে ঘন করে কাজল দেওয়া। চারপাশের ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে স্মৃতি আর চুপ করে থাকতে পারল না। কোমর বরাবর শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে গুঁজে নিল সে। তারপর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘর গোছানো শুরু করল।
জামাকাপড়, গিটার, সিগারেটের খালি প্যাকেট, রংতুলি–কী নেই এই ঘরে! দেখে মনে হয় এটা কোনো ঘর নয়, বরং একটা ছোটখাটো স্টোররুম। দীর্ঘক্ষণের পরিশ্রমে ঘরটা চকচকে করে গুছিয়ে নিয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে স্মৃতি স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল,
“এবার ঠিক আছে, বাবা! কত্ত আউলানো ছিল ঘরটা।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গম্ভীর আর রাগী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“আমার রুমে কী করছ তুমি?”
তড়িৎ গতিতে পেছনে ফিরে তাকাল স্মৃতি। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আফ্রিদিকে দেখে সে যেন পলক ফেলতে ভুলে গেল, হা করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এমন সুদর্শন বেটা মানুষ তো সে কেবল সিনেমার পর্দায় দেখেছে! জিম করা টানটান শরীর, চওড়া বুক, রেশমি কালো চুল আর নাকের ডগায় সারাক্ষণ রাগ ফুঁসছে! সিনেমার নায়কের সব গুণের সাথে তো এই মানুষটা হুবহু মিলে যাচ্ছে।
স্মৃতি লজ্জা ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর চটপটে পায়ে এগিয়ে গেল আফ্রিদির দিকে। একদম সামনাসামনি দাঁড়াতেই সে টের পেল–এই দীর্ঘদেহী নায়কের সামনে তাকে বড্ড পুঁচকে লাগছে। কোনোমতে আফ্রিদির বুক অবধি তার উচ্চতা।
স্মৃতি ডাগর চোখ দুটো মেলে সোজাসুজি প্রশ্ন করল,
“আপনি কি আমার বর?”
প্রশ্নের বদলে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে ভড়কে গেল আফ্রিদি। এ কেমন কথা! এই মেয়ে কি জানে না কে ওর বর? অবশ্য না জানলেও ওর কোনো দোষ নেই, বিয়ের আসরে যেভাবে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল!
আফ্রিদি গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,
“হ্যাঁ। কেন?”
আফ্রিদির মুখের উত্তর শুনে স্মৃতি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে চটজলদি দুই হাত জোড় করে বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম। আম্মা বলছেন মুখে সালাম দিতে, এই জইন্য পায়ে হাত দিলাম না।”
আফ্রিদি ওর এই নিষ্পাপ সরলতা দেখে ভেতরে ভেতরে ভীষণ অবাক হলো। এত অবুঝ, দুনিয়াদারী না বোঝা একটা বাচ্চাকে মানুষ কীভাবে এভাবে বিয়ে দিয়ে দিতে পারে! এর ওপর রাগ দেখিয়েই বা লাভ কী? আফ্রিদির কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম হলো,
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। ভালো করেছ। এখন সামনে থেকে সরো, আমি ফ্রেশ হব।”
‘ফ্রেশ’ শব্দটা শোনা মাত্রই স্মৃতির মনে পড়ে গেল–এটার মানে তো ওর শাশুড়ি শিখিয়ে দিয়েছেন! সে মাথা নেড়ে বলল,
“ফেরেশ হবেন? আচ্ছা যান তাইলে।”
“ফ্রেশ… ফেরেশ নয়।” আফ্রিদি সুধরে দেওয়ার চেষ্টা করল।
স্মৃতি একগাল হেসে অবলীলায় বলল,
“ওই হইলো এক কথা! যান, মুখ-হাত ধুয়ে আসুন। আমি আপনার জইন্য জলদি নাস্তা নিয়ে আসি।” বলেই ফুরফুরে মেজাজে রুম থেকে বেরিয়ে গেল স্মৃতি।
আফ্রিদি ওখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটাকে দেখে কেমন মায়া হচ্ছে ওর। এত অল্প বয়সে কেমন একটা পরিস্থিতি পার করতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু আফ্রিদিও বা কী করবে? সে-ও তো পরিস্থিতির শিকার। এর মধ্যে রাহি কয়েকবার কল করেছিল, সে একটাও রিসিভ করেনি। কল করলেই রাহি দুদিন ধরে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকার জন্য প্রচণ্ড চিল্লাচিল্লি করবে। তারপর যখন শুনবে এই বিয়ের কথা… তখন কী হবে, তা ভেবেই আফ্রিদির মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। আগে গোসলটা সেরে নেওয়া দরকার, শরীর-মন দুটোই বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে।
ওদিকে ড্রয়িংরুমে তখন বসে আছেন শারমিন আর সারা। জারা কোনো একটা দরকারী কাজে বাইরে গেছে। মা-মেয়ে মিলে টুকটাক কথা বলছিলেন। এমন সময় চড়কির মতো ঘুরতে ঘুরতে স্মৃতি এসে দাঁড়াল সেখানে। শারমিন ওর মুখটা শুকনা দেখে কিছুটা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আফ্রিদি কি তোমাকে কিছু বলেছে? বকেছে ও?”
“না তো, আম্মা! আমি তো উনার জইন্য নাস্তা বানাব বলে এলাম। কিন্তু আম্মা, আপনার পাকের ঘরটা কোন দিকে?”
স্মৃতি রান্নাঘরের খোঁজ চাইল।
শারমিন সোফা থেকে উঠে স্মৃতির কাছে এসে স্নেহে ওর গালে হাত রাখলেন,
“তুমি রান্নাঘরে গিয়ে কী করবে, স্মৃতি? এতটুকু একটা মেয়ে! নাস্তা আমিই বানিয়ে দিচ্ছি। তুমি বরং এখানে বসে সারার সাথে গল্প করো।”
“ আচ্ছা।”
বলে সারার পাশে গিয়ে বসল স্মৃতি। সারা হেসে বলল,
“ স্মৃতি তুমি তো সুন্দর করেই কথা বলো। কিন্তু মাঝে মধ্যে আঞ্চলিক ভাষা বলে ফেল। ওগুলো শুধরে নিতে হবে। আজ থেকে আমি তোমার ভাষার দিকে নজর রাখব। “
স্মৃতি মাথা চুলকে ওর কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করল।
“ না কইলে কী সমস্যা হবে?”
“ এই দেখো! কইলে আবার কী? ‘বললে’ বলো। আর হ্যাঁ সমস্যা হবে৷ এটা ঢাকা শহর। তোমাকেও সেভাবেই চলতে হবে, যেভাবে আমরা চলি। বুঝেছ?”
সারা মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল। স্মৃতি দু’দিকে মাথা নেড়ে জানাল, সে বুঝতে পেরেছে।
চলবে…..
